দেখতে দেখতে পড়া (পাঠ প্রতিক্রিয়া) রঞ্জিতা পাল

কবিতা পড়ি, কবিতা শুনি,ভালোলাগে। কিন্তু কবিদের ব্যক্তি জীবনকে আমরা কতটুকুই বা জানি? কেমন ছিলেন তারা? সম্প্রতি শেষ করেছি কবি অংশুমান কর এর "দেখা পড়া"। তিনি গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করেছেন পনেরোজন প্রয়াত কবির সঙ্গে তাঁর দেখা, কবিতা পড়া ও চেনার অভিজ্ঞতা বর্ণনায়।
অংশুমান কর 'কবিতার ক্লাস'পড়ে যাঁর সান্নিধ্যে এলেন তিনি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।অনন্তকাল কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী অজান্তেই শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন এমন বহু ছাত্রের,কখনো বইয়ের মাধ্যমে কখনো বা বাঘশিকারের গল্প শুনিয়ে-শুধু লেখাপড়া নয় জীবনের শিক্ষা দিতেও সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
লোকাল ট্রেনে সাধারণের সহযাত্রী হয়েছিলেন সকলের প্রিয় কবি, সুনীলদা-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলার কবিদের কাব্যিক আলোচনা ও পরস্পরের সঙ্গে সখ্যতা বজায় রাখার সার্থক যোগসূত্র তৈরি করেছিলেন তিনি। একাধারে কবি ও ঔপ‍্যনাসিক হিসেবে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সাহিত্যের ইতিহাসে।স্বাধীনচেতা কবি দিব্যেন্দু পালিত কখনো মৃদু র্ভৎসনায় কবির ভুল সংশোধন করেছেন আবার জীবনের শেষ কটা দিনে সকলকে আঁকড়ে ধরে জীবনের শূন্যতাকে ঘোচাতে চেয়েছিলেন।
বড় কবি হয়েও উৎপল কুমার বসু "নাটমন্দির"পত্রিকা পাঠ করে নিয়মিত উত্তর দিতেন। ঠিক একইভাবে 'নাটমন্দির'পাঠ ও তরুণ কবিদের যথাযথ সম্মান করতেন অগ্রজ কবি মনীন্দ্র গুপ্ত। অকপটে তা স্বীকার করেছেন কবি অংশুমান কর "দেখা পড়া"য়। অভিমানী শিশুমনের কবি বাদল বসুর চরিত্রে সংযমতাই প্রধান ছিল। তরুণ হোক বা প্রবীণ সকল কবিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক রক্ষা করেছেন আর কবিদের দিয়েছেন অগাধ স্নেহ,অনেকটা প্রশ্রয়। সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতার ভুবনে "ব্ল্যাক কমিডির অন্তঃসার" কৃষ্ণহাসির বিচ্ছুরণ ঘটলেও তাঁর লেখা "কবির ঘর গেরস্থালি" কবিতায় দেখা যায় তাঁর প্রেম ও পরিবার মগ্নতার চিত্র।
সোনাগাছি অঞ্চলে বেড়ে ওঠা কলকাতার কবি নিশীথ ভড়। আবার তিনি ছিলেন বন্ধুবৎসল, তাই তার কবিতাগুলি স্বভাবতই সমৃদ্ধ হয়েছে কখনো যৌনকর্মী মালতীর কথায় কখনো বন্ধুত্বের আঙিনায়।
অবচেতন মনে কতকটা কল্পনা করে নিতে হয় তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে- তিনি কবি নিত্য মালাকার। কিছু সময় বাস্তবের ভেলায় চড়ে অন্ত্যমিলে কাব্যের চেহারা দিতে চেষ্টা করলেও বেশিরভাগ সময় মূলত গদ্যের জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে তার কবিতাগুলি।
বাংলার দার্শনিক কবি অশোক মহান্তী ব্যক্তি জীবনে ছিলেন মিষ্টি ব্যবসায়িক, তার দোকান "পান্থসখা" ছিল যেন তরুণ কবিদের কফি হাউস। সেখানে কেনাবেচার পাশাপাশি চলতো তাঁর ছন্দের পরিচর্যা। প্রকৃতি-প্রেম-যুদ্ধ তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে তাতে কখনো লেগেছিল উপমার ছোঁয়া। কবিতাকে কলকাতা কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে নতুন চমক এনেছিলেন কবি বারীন ঘোষাল। নতুন শব্দের ব্যবহার,নতুন ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে তরুন কবিদের তিনি উৎসাহ প্রদান করতেন অত্যন্ত স্নেহভরে।
কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত ব্যক্তিজীবনে কখনো হার মানতে শেখেননি, লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ছিলেন সুন্দরের পূজারী। অনাড়ম্বর প্রতিভাসম যেন উজ্জ্বল এক ধ্রুবতারা। তিনি নিজে কাউকে বিড়ম্বনায় ফেলতে চাইতেন না অথচ সকলের ভালো মন্দের দিকটায় সর্বদা খেয়াল রাখতেন।
"তরুণ,ওগো তরুণ, তুমি/আমার বুকে লতিয়ে উঠবে না?/তরুণ,ওগো তরুণ,আমার/অস্থি দিয়ে বজ্র বাঁধবে না"- যিনি কবিতাটি লিখলেন তিনি নিজেকে কবি বলতে না চাইলেও তরুণ কবিদের যত্নে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি অগ্রজ কবি জয়দেব বসু। তিনি ছিলেন সিপিএম এর এলিট কবি এবং তাঁর অভ্যাসে মিশে গিয়েছিল গণতন্ত্র। তার ব্যক্তিত্বে ছিল কিঞ্চিৎ ছেলেমানুষি আর রসিকতা, তাই কবি অংশুমান কর কলকাতার শীতে মাফলার ব্যবহার করতেন বলে জয়দেব বসু তাঁকে বলেছিলেন,-"তুই হচ্ছিস বাংলা ভাষার একমাত্র মাফলার পরা তরুণ কবি"
উনিশ শতকের বাঙালী জীবন ও প্রেমকে যিনি কবিতায় ঠাঁই দিয়েছিলেন তিনি পিনাকী ঠাকুর । কৃত্তিবাস পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক। কবিতার ভাষাকে সে সর্বদাই উল্টে পাল্টে দেখেছিলেন, কোথাও স্বরবৃত্তে অন্ত্যমিল না রেখে আবার কোথাও বাংলা ভাষাকে হিন্দি ইংরেজির সঙ্গে মিশিয়ে চিরাচরিত ছাঁচ থেকে মুক্ত করে তুলেছিলেন। নয়ের দশকের বাংলা কবিতাকে যেন সম্পদ করে তুলেছিলেন আত্মবিশ্বাসী কবি পৌলমী সেনগুপ্ত। অহংকার তাকে কখনোই স্পর্শ করেনি বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে। একজন লেখককে দিয়ে নতুন সৃষ্টির অভিনবত্বেই তাঁর শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব।
কবি অংশুমান কর অগ্রজ কবিদের জীবনের টুকরো সময়ের স্মৃতি বর্ণনায় তার সঙ্গে গড়ে ওঠা কবিদের সখ্যতা,স্নেহান্ধতা ও তাদের ব্যক্তি জীবন সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সরল ভাষায়। মুগ্ধ হয়ে তা পড়ে ফেললাম।মনের স্মৃতিপথে সঞ্চয় হয়ে থাকুক "দেখা পড়া".


দেখা পড়া
অংশুমান কর
১৫০ টাকা
পরম্পরা প্রকাশন
কল ৯
৯৯০৩০৯১২২৫