ক্যাটারিং - গৌরাঙ্গ মুখার্জি

সকাল বেলা বিভা দেবী গিয়েছিলেন ছাদে ভিজে জামা কাপড় মেলতে। হঠাৎ দুদ্দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। মহিম বাবু বারান্দার এককোণে বসে দাড়ি কামাচ্ছিলেন। মেজাজ টা খিঁচরে আছে। সকালে তিনবার মন্দিরে ঢুকেছেন । এক বান্ডিল বিড়ি খরচা হয়ে গেছে । কিন্তু ক্লিয়ার হয়নি। স্ত্রী কে সিঁড়ি দিয়ে ওইভাবে নেমে আসতে দেখে খিঁচিয়ে উঠলেন ,
-কি হলো? দিনের বেলা ভূত দেখলে নাকি ।
বিভা দেবী হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
-ভূত নয়, রাক্ষস।
মহিমবাবু বুঝলেন কেস সিরিয়াস। তাই চুপ করে গেলেন । ওনাকে চুপ করে যেতে দেখে বিভা দেবী গলা নামিয়ে বললেন,
-রাজাকে দেখলাম গো ।আমাদের বাড়ির দিকেই তাকিয়ে আছে ।
মহিমবাবু ও দেখেছেন রাজাকে কিন্তু স্ত্রী কে কিছু বলেননি । দাড়ি কামানো মাথায় উঠে গেল। মহিমবাবু চুপচাপ নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
সিনেমায় দেখানো ফ্লাশব্যাকের মতো তাঁর মনে পড়ে গেল ছ’মাস আগের এক ঘটনা। আজকের মতো সেদিনটাও ছিল রবিবার ।সকালবেলা বাজারে গিয়ে অনেক দেখেশুনে পছন্দ করে পাবদা মাছ ও দই কিনে এনেছেন। গিন্নী কে অর্ডার করেছেন দই পাবদা করার জন্য । গিন্নী গেছেন মন্দিরে পুজো দিতে। মেয়ে রিমি চা বানিয়ে দিয়েছে। মৌজ করে চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে পেপার পড়ছিলেন ।হঠাৎ বুকের বাঁদিকে তীব্র যন্ত্রণা। মনে হলো কেউ যেন ছুঁচ ফুটিয়ে দিল। তারপরেই সব অন্ধকার। যখন ঞ্জান এলো তখন শহরের এক নামী নার্সিংহোমে তিনি শুয়ে আছেন। পরে সব জানতে পারলেন । সেদিন মেয়ে রিমি একা থাকায় প্রথমটা খুব ঘাবড়ে গেছিল। কিন্তু তার পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে দৌড়ে চলে গেছিল বাড়ির কাছেই ক্লাবে। রবিবার থাকায় ওখানে ছেলেরা ক্যারম খেলছিল। সব শুনে ওরাই অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে খুব তাড়াতাড়ি নার্সিংহোমে নিয়ে গেছিল । দেরী হলে হয়তো বাঁচানো যেতো না। দিন কুড়ি পর বাড়ি ফিরলেন মহিমবাবু। এই কদিনে রাজা, ক্লাবের ছেলেটা খুব করেছে। নার্সিংহোমে দেখাশোনা থেকে শুরু করে,ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলা। এমনকি মেডিক্লেমের টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা । বাড়ি ফেরার কদিন পর মহিমবাবু বুঝতে পারলেন, তাঁর অবর্তমানে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে রাজা নামের ছেলেটি। এখন প্রায়ই আসে ,চা খায়, গল্পগুজব করে। মহিমবাবু অভিজ্ঞ মানুষ। এর বিপদজনক দিকটার কথা চিন্তা করে শিউরে উঠলেন । মেয়েকে তিনি খুবই ভালবাসেন। তাঁর জীবনের একটাই লক্ষ্য। খুব ভাল ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন। সেই মতো মেয়েকে পড়িয়েছেন। গান শিখিয়েছেন। নিজেদের শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে তিল তিল করে টাকা জমিয়েছেন ঘটা করে একমাত্র সন্তানের বিয়ে দেবেন বলে। নিজে অনেক অনুষ্ঠানে নেমতন্ন খেয়েছেন। তাই প্রচুর লোককে নেমতন্ন করে প্রাণভরে খাওয়াবেন। গোপনে মেয়ের বিয়ের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার মধ্যে শরীরটা খারাপ হলো ।মহিমবাবুর আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে একদিন রাতে খাবার টেবিলে মেয়ে রিমি ঘোষণা করলো,
-আমার জন্য পাত্র দেখো না বাবা ,আমি রাজা কে বিয়ে করবো।
মহিমবাবু, বিভা দেবী হতবাক। একি সর্বনাশ হলো। বোমাটা ফাটিয়ে মেয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ওনারা জানেন আজ রাতে মেয়ে আর দরজা খুলবে না। স্বামী স্ত্রী মিলে এক বিনিদ্র রাত্রি কাটালেন। নিজেরা আলোচনা করে সিদ্ধান্তে এলেন বকাঝকা নয়।মেয়েকে বোঝাতে হবে। সেই সঙ্গে রাজার সঙ্গে করতে হবে শীতল ব্যবহার।
পরদিন সকাল থেকে শুরু হলো সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ। আস্তে আস্তে একটা সময়ে বরফ গলতে শুরু করলো। মহিমবাবুর এক বোন থাকেন শিলিগুড়িতে। স্কুল শিক্ষিকা। রিমি এই পিসিটিকে খুবই শ্রদ্ধা করে। খবর পেয়ে উনি এসে দিন সাতেক কাটিয়ে গেলেন। এতে মহিমবাবুর কাজ অনেকটা এগিয়ে গেল।একদিন এলেন বিভা দেবীর ভাই। খুব করিতকর্মা মানুষ। সব শুনে তিনি একদিন রাজার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ওদের সঙ্গে ক্যারম খেললেন। ক্লাবের উন্নতির জন্য কিছু টাকাও দিলেন। রাজাকে নিজের গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গিয়ে রেঁস্তোরায় ভাল মন্দ খাওয়ালেন। সবশেষে গঙ্গার ধারে বসে ঠান্ডা মাথায় রাজাকে বুঝিয়ে বললেন এই সম্পর্ক থেকে সরে এলে সকলেরই মঙ্গল। কারন রিমি যদি ঝোঁকের মাথায় রাজাকে বিয়েও করে, চালচুলোহীন বেকার বাউণ্ডুলে রাজা কি করে খাওয়াবে রিমি কে ? এই বিয়ের পরিনতি হবে ভয়ংকর। রিমি ও একদিন রাজাকে ডেকে বোঝালো এই বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর মহিমবাবু শুরু করলেন মেয়ের বিয়ের তোড়জোর। একটি ছেলেও পাওয়া গেছে। শিবপুর থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার। এখন কর্মসূত্রে নাগপুরে থাকে। পালটি ঘর। একটি মাত্র ছেলে। একবার একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে রিমিকে দেখে পছন্দ হয়েছিল। বিয়ের আর তিন মাস বাকী। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ এগোচ্ছে। আগামী কাল ক্যাটারিং ফাইনাল করার কথা। চারশোর ওপর নিমন্ত্রিত থাকবে। মুখের কথা নয়। কিন্তু বিভা যা শোনালো তাতে তো চিন্তা হচ্ছে এই রাজা ছোকরার মতলবটা কি? নতুন করে কিছু ঝামেলা পাকাবার ধান্দা! নাহলে এই বাড়ির কাছে ঘুরঘুর করছে কেন? এইসব ভাবনার মাঝে ডোর বেল বাজলো। মহিমবাবু গিন্নী কে হাঁক দিলেন। সাড়া পাওয়া গেল না। মনে হয় উনি বাথরুমে। শাওয়ার খোলা থাকলে কিছু শোনা যায় না। মেয়ে গেছে বন্ধুর বাড়িতে । অগত্যা মহিমবাবু নিজেই গিয়ে দরজা খুললেন ।দরজার সামনে রাজা দাঁড়িয়ে। বলল,
-মেসোমশাই ভালো আছেন ? ভিতরে আসবো? একটু কথা ছিল ।
মহিমবাবু বললেন,
-ভালো আছি । এসো,ভিতরে এসো।
রাজা এসে সোফায় বসলো।বললো,
-একটু জল খাওয়াবেন? মহিমবাবু জল এনে দিলেন। মনে মনে বেশ নার্ভাস ফিল করছেন কিন্তু প্রকাশ হতে দিলেন না। বিভা আর স্নান করতে যাবার সময় পেলো না। রাজা জল শেষ করে গ্লাসটা নামিয়ে রাখলো। পকেটে থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছলো। একটু ঢোক গিলে বললো,
-মেসোমশাই, রিমির বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে শুনলাম । খুবই আনন্দের খবর । আর আমি তো চাকরিবাকরি পেলাম না। রিসেন্টলি ক্যাটারিং এর ব্যবসা শুরু করেছি। বলছিলাম কি রিমির বিয়ের ক্যাটারিং এর কনট্রাক্টটা যদি আমাকে দেন ...