‘করোনা’ কার্ফু - অমর নাথ রক্ষিত

করোনা ভাইরাস মানুষকে গৃহবন্দী করেছে। অনিলবাবুও আজ গৃহবন্দী। এমনিতে অবসরের পর থেকে সকাল-বিকেল গঙ্গার হাওয়া খেতে যাওয়া ছাড়া তিনি বড় একটা বাইরে বেরোন না। আর আজ তো বাইরে বেরোবার প্রশ্নই নেই। মারণ রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে, তার নাগাল এড়িয়ে চলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। ‘জনতা কার্ফু’, সারা দেশ তাই আজ গৃহবন্দী।
দুপুরের খাবারের পর রাস্তার ধারের জানালাটা খুলে শুনশান পথের দিকে তিনি তাকিয়ে থাকেন। পথ জনশূন্য। খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায় আর বন্ধ জানালা-দরজার দিকে তাকিয়ে বুঝি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে! অন্য ঘরে টিভি চালিয়ে তাঁর স্ত্রী কোন সিরিয়াল অথবা রান্নাবান্নার কোন এপিসোডে মশগুল। আর তিনি একাকী ভাবছেন কবে এর প্রতিষেধক মানুষ আবিষ্কার করতে পারবে !
এই পৃথিবীর সমগ্র মানব সমাজ আজ এক ঘোর সংকটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অস্তিত্বের সংকট ! এবং তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে করোনা ভাইরাস। সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি নাকি মানুষ ! হায় রে মানুষ ! তোমারই অস্তিত্ব আজ মারণ ব্যাধির হানায় বিপর্যস্ত। এক অদৃশ্য শত্রু ওঁত পেতে আছে জীবন-মরণের সীমানায়। এক খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অসহায় মানুষকে। তার গর্বকে দিয়েছে এক নাড়া। মানুষ আজ দিশেহারা। স্বেচ্ছা গৃহবন্দী হতে বাধ্য করেছে তাকে।
এমন ভাবেই বুঝি ধ্বংস হয়ে গেছে অতীতের অনেক সভ্যতা। ইতিহাসের পাতায় পাতায় তার ইতিহাস লেখা হয়েছে।
এসব ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রার ছোঁয়া লাগে তার দুচোখে। তিনি জানালা বন্ধ করতে ওঠেন আর তখনই দেখতে পান একজন লোককে। খোলা জানালা দেখেই সে এদিক পানে দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকে। জানালা বন্ধ না করে তিনি অপেক্ষা করেন। সেই লোকটি দুহাত জোড় করে তাঁর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
অনিলবাবু বলেন, এ কী? তুমি রাস্তায় বেড়িয়েছ কেন? জান না আজ ‘জনতা কার্ফু’? ‘করোনা ভাইরাস’ থেকে বাঁচতে আজ যে সবার ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকার কথা? কোন সাহসে তুমি পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছ? কোথায় থাকো তুমি? কাঁধের ব্যাগে কী আছে? ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনিলবাবুর অতগুলো প্রশ্নের ধাক্কায় বুঝি সেই লোকটি হতচকিত হয়ে পড়ে। জানলার নীচে বসে পড়ে। কাঁধের ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে রেখে সে বলে, বাবু, আমি একজন হকার। ট্রেনে ট্রেনে ছোটোখাটো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ফেরি করি। আর তা দিয়েই তিনজনের সংসার চালাই। কিন্তু কয়েকদিন ধরে করোনার ভয়ে মানুষ খুব কম বাইরে বেরোচ্ছে। অফিস, স্কুল, কলেজ, দোকান বাজার বন্ধের মুখে। আমার জিনিস আর বিক্রি হচ্ছে না। গাড়ি, বাস, ট্রেনও সংখ্যায় কম চলছে। খুব মুশকিলে পড়েছি। বাচ্চাটা তার বাবার অপেক্ষায় বসে রয়েছে। কখন তার বাবা কিছু খাবার নিয়ে ঘরে ফিরবে।
তা আমি তোমায় কী ভাবে সাহায্য করতে পারি? অনিলবাবু বলেন।
সে তার ব্যাগ খুলে নানা জিনিসপত্র বার করতে থাকে। তারপর একটা প্যাকেট হাতে দিয়ে বলে, এক প্যাকেট মুখোশ আছে, নেবেন? এখন তো সকলের খুব দরকার !
কত দাম?
আপনাকে দাম দিতে হবে না। সব দোকান তো বন্ধ! টাকা দিয়েও কিছু কিনতে পারবো না। যদি কিছু খাবার দেন, তবে বড্ড ভালো হয়। বাচ্চাটা না খেয়ে বসে আছে।
অনিলবাবু তাকে অপেক্ষা করতে বলে রান্নাঘরে ঢোকেন। দেখেন, রান্না্র মাসি রাতের জন্য রুটি তরকারি করে গেছে তাঁদের দুজনের জন্য। তিনি চিন্তায় পড়ে যান। রুটিগুলো তো ঠোঙ্গায় ভরে দিতে পারবেন, কিন্তু তরকারি কিসে দেবেন। চকিতে মনে হয়, কিছু চিনি কাগজের ঠোঙ্গায় দিয়ে দেবেন।
রুটি আর চিনি নিয়ে তিনি আবার জানালার পাশে আসেন। তারপর লোকটাকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দেন। বলেন, এই যা ছিল দিলাম।
লোকটি উঠে দাঁড়ায়। কৃতজ্ঞচিত্তে করজোড়ে প্রণাম করে।
অনিলবাবু জানালা বন্ধ  করতে যাবেন, পিছন থেকে তাঁর স্ত্রীর কন্ঠ শুনতে পান, -ওকে যেতে বারণ কর। এই তরকারিটা দিয়ে দাও। রাতের খাবার আমি তৈরী করে নেব।