চোখ - দত্তা

আধঘণ্টা হলো অফিস থেকে বেরিয়ে ধর্মতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে অনু। একটাও বাস নেই। চারদিকের সব দোকানপাটও বন্ধ। দূরে দু 'একজন লোক তারই মত ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ অন্ধকার করে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গতকাল থেকেই আবহাওয়া দপ্তর সতর্কতা জারি করেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়বে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা। তাই অফিস থেকে ফার্স্ট হাফের পরই সে বেরিয়ে এসেছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে স্মার্টফোন খুলে অ্যাপে একটা গাড়ি বুক করে নিলো। গাড়ি এলো মিনিট সাতেক পর। অনু পেছনের দরজাটা খুলে কুর্তির নীচের ভেজা অংশ ঝেড়ে নিশ্চিন্তে বসলো।

- চলুন,
বলে মিররে তাকাতেই একটা ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে গেলো তার শরীর জুড়ে। ড্রাইভার একদৃষ্টিতে তাকে দেখছে। মনে হলো ঐ দু'টি চোখ তার অনেক অনেক দিনের চেনা। করোনা সতর্কতা মেনে আর পাঁচজনের মত তার মুখেও মাস্ক। তাই মুখটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ঐ অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে অনু কেমন যেন স্থির হয়ে গেলো। চোখে চোখ পড়তেই ড্রাইভার চোখ নামিয়ে নিলো আর কয়েক সেকেন্ড পরে ডেস্টিনেশন কনফার্ম করে গাড়িতে স্টার্ট দিলো। অনু নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে থাকলো। কিন্তু চোখ চলে যাচ্ছে বারবার মিররে আর ক্রমাগত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে অস্বস্তি। অদ্ভুত একটা বন্ধন অনুভব করছিলো সে ঐ মণি দু'টোর সাথে।
দ্বিতীয় হুগলী সেতু পার হতেই গাড়ি অনেকটা স্পিড বাড়িয়ে দিলো। অনু জানলার কাচ দিয়ে দেখলো বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। হাওয়াও তার শক্তি বাড়িয়েছে। গাড়ির ভেতরে এ সি চলছে। কিন্তু তবুও অনুর সারা শরীর ঘামছে। একটা নাম মনে আসছে তার বারবার কিন্তু সে তো ব্যাঙ্গালোরে পোস্টেড, দশ বছর আগেই সেই ছোট কোম্পানী ছেড়ে আই টি ম্যানেজার হয়ে একটা সম্পর্কের চিরকালীন ইতি টেনে দিয়ে ! সে দিনটাতেও এরকম ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিলো। কলিগদের সাথে তারা দুজনেও আটকে পড়েছিলো অফিসে। সে ভীষণ দুর্যোগের দিন। জানলার কাচ গুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ঢুকে টেবিল মেঝে সব ঢেকে ফেলছিলো।
অনু কিন্তু কিছুতেই কিছু মেলাতে পারছে না এই মানুষটার সাথে।
-আপনার গন্তব্য এসে গেছে । একটা ঠাণ্ডা কন্ঠস্বরে সম্বিত ফিরলো অনুর। কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাগের সাইডের চেন খুলে একটা পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দিলো। অনু নাম জিজ্ঞেস করতে যাবে আবার সেই কন্ঠ স্বর,
-আমাকে ফিরতে হবে যদি একটু তাড়াতাড়ি করেন।
সংযত হয়ে জড়ানো পায়ে গাড়ি থেকে সে ধীরে ধীরে নেমে এলো। পেছন ফিরে দরজা বন্ধ করতে যেতেই ড্রাইভার ডান হাত বাড়িয়ে বললো,
আপনার ব্যালান্সটা। অনু টাকাটা নিতে নিতে স্পষ্ট দেখলো হাতের তালুতে একটা কাচ কাটা সাদা লম্বা দাগ। চমকে উঠে মুখ তুলে তাকাতেই দেখলো ড্রাইভার তার থেকে দৃষ্টি সামনের রাস্তার দিকে সরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তার মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

হঠাত্ ই অনুর মনে হলো তার চোখ দু'টো খুব জ্বালা করছে। আকাশের দিকে সে নিজের দু'টো চোখ মেলে ধরতে চেষ্টা করলো। যদি বৃষ্টির জল তার চোখ ধুয়ে দিলে একটু শান্ত হয় ।