তার নাম যে কে রঙিন রেখেছিলো , তাকে একবার বড় দেখার সাধ হয়। তার জীবনটা যে মোটেই রঙিন নয়, একদম সাদা কালো তা কি বলে দিতে হয় ? ক্লাস সেভেনে বাবা গেলেন । ক্যান্সারের বীজ যে শরীরে বাসা বেঁধেছিলো পাটকলের বড়বাবু তা বুঝতেই পারেননি। অন্ধের যষ্ঠির মতো মা তাকে শত ঝড়ঝাপটা থেকে আগলে রাখতো। সেই মা ,রঙ্গিনের থার্ড ইয়ার এ চারদিনের জ্বরে চলে গেল । সংসার সমুদ্রে রঙিন তখন কুলহারা নাবিক । ভাগ্যিস এক পিসি ছিলো। পিসিরও তিন কূলে কেউ ছিল না। ভেসে যাওয়া নৌকার হালটা ধরলেন এই পিসি। নেহাত অনার্সের রেজাল্টটা ভালো ছিল, ব্যাংকে কারণিকের চাকরি পেলো রঙ্গিন। চব্বিশ বছরের বাঙালি যুবক দুটি কাজ করে। কবিতা লেখে এবং প্রেমে পরে । রঙ্গিন কোনটা প্রথম করলো কে জানে ! কবিতা লিখতে লিখতে প্রেমে পড়লো নাকি প্রেমে পড়ে কবিতা লিখলো তা দুর্জনেরা বের করুন। আমরা রঙিন এই থাকি।
ব্যাংকের আর এক কেরানি কুসুমলতার প্রেমে পারলো রঙ্গিন । কুসুমলতা জোয়ারদার। বি এ, অর্থনীতি। বাবা ব্যাংকের হেড ক্লার্ক ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সহমর্মিতার চাকরি পেয়েছে। কুসুমলতা , পেলব, শিখর দশনা, গুরু নিতম্বিনী। রঙ্গিনের দৃষ্টি আকর্ষণ হতে দেরি হলো না। প্রথমে ক্যান্টিনে পরোটা আলুভাজা ভাগ করে খাওয়া, তিরিশ দিনের মাথায় ব্যাংক এর বাইরে আধ ঘন্টার দেখা। চল্লিশ দিনের মাথায় শোলে, আটচল্লিশতম দিনে রাজেশ খান্নার রেড রোজ। একষট্টিতম দিনে স্টিমার ঘাটে আঙুলে আঙ্গুল জড়িয়ে ধরা। উনসত্তরতম দিনে জয় মহাকাল ছবির ফাঁকা হলে প্রথম চুম্বন। রঙিনের জীবনটা যথার্থ রঙিন হয়ে উঠছিলো। রেস্টুরেন্ট, সিনেমা, রিকশা করে বেড়ানো সব চলছিল। এমনকি একশো বারোতম দিনে পিসির কাছেও কুসুমকলিকে নিয়েও গিয়েছিলো রঙিন। সেদিন ফাঁকা বাড়িতে রঙিন আর একটু রঙিন হতে চেয়েছিলো। কুসুমকলি শেষ মুহূর্তে এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বলেছিল - যাও , ও সব বিয়ের পর হবে। রঙিন খাবি খেয়ে সরে এলেও রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল । দুশো বাহাত্তরতম দিনে রঙিনের দুনিয়া সাদাকালো করে দিয়ে কুসুমকলি ঘোষণা করলো - এই জানো, মা না আমার বিয়ের ঠিক করেছে । পাত্র আই এ এস । কি করি বলো মায়ের তো আমি একটাই মেয়ে ? ব্যাংকের ক্লার্কও যে আই এ এস পাত্রের কাছে দাঁড়াতে পারে না তা রঙিন বিলক্ষণ জানতো। তিনশো একতম দিনে কুসুমলতা জোয়ারদার হিন্দু শাস্ত্রমতে কুসুমলতা ঘোষ হলো। রঙিন 'বিরহ মধুর হলো বেলা ' শীর্ষকাকতী লং প্লেয়িং রেকর্ড কুসুমলতাকে উপহার দিয়ে কাশ্মীরি আলুর দম, ছোলার ডাল, চিকেন চাপ, বিরিয়ানি খেয়ে বাড়ি ফিরে তক্তপোষে শুয়ে নিজের সাদা কালো জীবনের কথা ভাবছিলো।
কুসুম কুসুম তোমার কি মন নাই...।
গল্পটি এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু হলোনা । চারশো আশিতম দিনে রঙিন খবর পেল, কুসুমলতা ঘোষের একটি সন্তান হয়েছে। ছেলেটির নাম সে রেখেছে রঙিন...