শেখ রিয়াজুল হুসেন - দেবাশীষ সরকার

এই খেয়েছে রে, না জানি আবার কী লাফড়া হয় ! যন্ত্রণা মাইরি ! আর কাউকে পেলো না? ইস্টুপিড যত্তোসব...

কাল আপিসের ফাংশান থেকে ফেরার পথে, রাসবিহারী মোড়ে, রাত তখন পৌনে দশটা। এই অবধি সঙ্গে ছিল বন্ধু কয়েকজন। তারা যে-যার দিকের অটো ধরে বেরিয়ে গেল। মোবাইল অ্যাপ খুলে দেখি উবের বা ওলা-র চারচাকা কিস্যু নেই, কিন্তু এক মিনিট দুরত্বেই একটা ওলা বাইক আছে! আজকাল চাপি, অ্যাপের বাইক। এই একটা হেব্বি সুবিধের জিনিস হয়েছে শহরে। 'জয়ত্তারা' বলে বুকিং করলাম।

এসেও গেলো তুরন্ত্। উঠতে যাবো, হঠাৎ রাইডারের নামটা অ্যাপের পর্দায় দেখে... সে মরুক-গে-যাক, এখন উঠে তো পড়ি । আবার ক্যানসেল করা ইত্যাদি, সে আরো বিগ ঝাম। তার চেয়ে...

বাইকে চাপলে ফুরফুরে একটা হাওয়া গায়ে এসে লাগে, বেশ লাগে। এসির কৃত্রিমতা নেই এ-হাওয়ায়। অফিস টাইমের গাড়িঘোড়ার চাপও এখন বেশ কমে এসেছে। রাইডারের মুখ দেখিনি, তিনি তো আগে থেকেই 'হ্যামলেট', থুড়ি হেলমেট পরিহিত ছিলেন।

মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠান শেষে রাশিদ খানজি-কে একটু আগেই ব্যাকস্টেজে বলে এসেছি,-অ্যাডভান্স ঈদ মোবারক, উস্তাদজী । উনি বললেন, আপ কো ভী । ভাবলুম এনাকেও বলি। বল্লুম। বাইক তখন দেশপ্রিয় পার্কের সিগন্যালে থেমে। হেসে বললেন, -দাদা আজ আমি দেখবো কতক্ষণ প্যাসেঞ্জার পাই । ঈদের আগের রাত তো। মিসেস-কে বলেই বেরিয়েছি। না, উনি 'বিবি' বা 'বেগম' বললেন না!

ব্যাস, গপ্পো শুরু আমাদের । কত কথা যে বলাবলি করলাম আমরা দুই 'পথের মিতা', তার ইয়ত্তা নেই।

বাড়ি আমার খানাকুল। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্যে তপসিয়ায় ভাড়া থাকি। বলে কী লোকটা ! হুগলির খানাকুলে তো আমারও দেশগাঁ ! কস্মিনকালে গেছিলুম দু-চারবার। জানা গেল, তিনি আমার গ্রাম নতিবপুর, আমাদের পদবী-অঙ্কিত সরকারপাড়া, রাধাকৃষ্ণ মন্দির, শিবমন্দির প্রভৃতি সবই চেনেন। তার দুটো গ্রাম পরেই যে তিনিও থাকেন। মানে, থাকতেন। এখন মা থাকেন, আর কিছু জ্ঞাতিগুষ্টি।

জানেন, ছেলেরা গরুর মাংস একদম খেতে চায় না! আজকেও বলে দিয়েছে, চিকেন আনবে। রোজ রোজ চিকেনের ফরমাইশ!
পিছনে-বসা শ্রোতা এদিকে প্রায়শই নিজামের বিফরোল সাঁটিয়ে-আসা জন্ম হিন্দু পাব্লিক !

আমার বৌয়ের আবার মাছের মাথা খুব পছন্দ। কলকাতার মেয়ে। দু'বছর গ্রামে আমার সঙ্গে শ্বশুরঘর করার পর, এখানে চলে আসি। না না, শ্বাশুড়ি-বৌমায় খুউব ভাব ! গেলে, ফেরার সময়ে তাদের সে কী কান্না দাদা, কী বলবো! আমি বৌকে বলি, তোমাদের কান্নাকাটির পালাটা বাপু আগের দিন সেরে রেখো তো। গড়িয়াহাট মোড়।

পেছনে যিনি বসে আছেন, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা যে তার খুবই পছন্দসই বিষয়, কী করে জানলো লোকটা ! বিজন সেতু। বললো, এই ব্রিজের নীচে যে চাষীগুলো ক্যানিং সাইড থেকে সবজি নিয়ে এসে বসে, খুব ফ্রেশ। আমি কিনি। বুঝলেন দাদা, একদিন এখান থেকে একটা কচি এঁচোড় আর কুচো চিংড়ি বাড়ি নিয়ে গিয়ে মশ্লাপাতি দিয়ে কষিয়ে রাঁধলুম। বৌ-বাচ্চা তো খেয়ে ফ্ল্যাট ! এসব খায়নি তো কোনোদিন!

কসবা। আমরা তখন পাঁচমিশালি কুচোমাছের ঝাল-ঝাল বাটিচচ্চড়ি দিয়ে ভাত মেখে... কীভাবে যেন, একথালায় ভাত খাচ্ছি !

গতবছর বাবা মারা যাওয়ার পর চাষজমি-গুলো বেচে দিলাম। কে করবে আর, চাষবাস ! আমার ছেলে তো... কলকাতায় মানুষ করছি... ও-লাইন মাড়াবে না। আমি কিন্তু দাদা লাঙল চালাতে পারি! ট্র‍্যাক্টরও! বাবার সঙ্গে কতদিন ক্ষেতে কাদা মেখে, কাজ করে কাটিয়েছি! তারপর তো...বল্লুম, চাষীর ছেলে যদি চাষে না আসে, এসব তো উঠে যাবে । খাবো কী তখন? বললো, বড্ড অনিশ্চয়তা দাদা। বাপেরাই আর চাইছেনা...

রুবির মোড়। আর অল্পই বাকি। শাক-দিয়ে-মাছ-ঢাকা পর্ব চলছে আমাদের । লাল নোটে আর কাটোয়ার মোটামোটা ডাঁটাওয়ালা, সেও আরেক রকমের নোটেই তো ! পুঁইশাকের পাতাগুলোকে চকচকে করার জন্য একরকমের বিষাক্ত স্প্রে... বুঝলেন দাদা... হাল্কা গরমজলে ভাপিয়ে, জলটা ফেলে দিয়ে তারপর রান্না করলে... চাষীর ছেলের এইসব দূরুহ বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে... যাত্রাশেষ ।

হেলমেট খুলে ওনার হাতে দিলাম। গুডনাইট দাদা। হাত মেলালাম। নতুন বুকিং ঢুকলো ওনার। গাড়ি ঘোরালেন। মুখটা দেখলাম। চশমা আঁটা অতি সাধারণ মাঝবয়েসী এক মুখশ্রী। ম্লান হেসে বলে গেলেন, এখনো আমার ইফতার করার সময় পাইনি দাদা। থুতুও গিলতে নেই আমাদের। প্রাণপণে ট্রিপ মারছি। কাল ঈদ। এক্সট্রা কিছু আমদানী চাই, বৌ-ছেলেমেয়ে... বোঝেনই তো!

ঘন্টাখানেক আগে অ্যাঙ্করিং করার সময়ে গলা কাঁপিয়ে 'জীবন এক সঙ্গীত!' ইত্যাদি বলছিলাম। ওসব সাজানো বুলি, জনচিত্তহরণের প্রচলিত পদ্ধতি। কিন্তু জীবন সঙ্গীতের যে বন্দিশটা আজ এই রাস্তাটুকুর মধ্যে পেলাম, আহা ! মনের গহণ অভ্যন্তর অবধি যেন 'বেজে উঠলো'! জীবনবীণার ঝঙ্কারে!

ঈদ মোবারক, রিয়াজুল... ভাই! আল্লাহ মেহরবান!