গ্রন্থি - মৌলীনাথ গোস্বামী

মধ্যবয়স্ক ফাল্গুনের দুপুর। শান্ত। নিস্তব্ধ। সকল মানুষকে পেট ভরে খাইয়ে মফস্বলের চোখে ভাতঘুম। তিন্নিরও খাওয়া হয়ে গেছে। চোখের পাতার শরীরে আলস্য এসেছে। খাটে শুয়ে আছে তিন্নি। গরম পড়ে গেছে। শুকনো ঠোঁট চাটছে তিনতলার ঘর। মাথার ওপর নিঃশব্দে পাখা ঘুরছে। শনশন আওয়াজ। কপালের ওপর পড়ে থাকা বেয়াড়া চুলের গোছা হাওয়ায় কাঁপছে। চোখের পাতা কাঁপছে। তিরিতিরি... তিরিতিরি... দূর থেকে নিদ্রাতুর হাওয়ার আবেশে ভেসে আসছে লতার কণ্ঠস্বর-

"নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা..."

শান্ত বালিয়াড়ির বুকে বয়ে যাওয়া নিঃসঙ্গ বাতাসের মত, হু হু করে ওঠে তিন্নির মন। উঠে পড়ে। জানলার পর্দা উড়ছে ফ্যানের হাওয়ায়। পর্দা সরিয়ে জানলার আলসেতে বসে তিন্নি। কৌতূহলী চোখ খোঁজে মূর্চ্ছনার উৎসমুখ। নিচে রাস্তার ওপারে টালি ছাওয়া বাড়িটা থেকে গানটা ভেসে আসছে। বাদলকাকুর বাড়ি। অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় বাড়িটা ঝিমোচ্ছে। যেমন বারান্দায় একফালি লম্বা বেঞ্চিতে চিৎ হয়ে শুয়ে ঝিমোচ্ছে বাদলকাকু। খদ্দের নেই। তাই ব্যাগ সেলাইয়ের ঝকমারি নেই। রেডিওতে হেমন্ত গাইছে....

"ও আকাশ, সোনা সোনা...."

গোটা মফস্বলের ঝুপসী বাড়িগুলোর গায়ে লেগে আছে এক অলীক রোদ্দুর। হলুদ। সোনালি। কর্মক্লান্ত অটোরিক্সার মাথায়, দাঁড়িয়ে থাকা ঠেলারিক্সার খোঁদলে, পা উল্টিয়ে বেহুঁশ ঘুমিয়ে থাকা রোগা রিক্সাওয়ালার গায়ে, একতলা বাড়ির ছাদে শুকোতে দেওয়া আচারের বয়ামের ভেতর ,তেলে ডুবে থাকা লঙ্কাদের গায়ে, অথবা ঝিমিয়ে থাকা এলোমেলো সজনে ফুলেদের পাড়ায় লেগে আছে অলস রোদ্দুরের গন্ধ। সকলে ঘুমিয়ে আছে দুপুরের তন্দ্রায়। কয়েকটা কোকিল কোন গাছের পাতার ফাঁক থেকে ঘুম ভেঙে মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে তীক্ষ্ম স্বরে। হাওয়া বইছে। মন্থর হাওয়া। রেডিও গাইছে---

"রঙ্গিলা বাঁশিতে কে ডাকে! ঘুমঘুম নিঝঝুম...."

তিন্নি ওপর থেকে দেখছে, বাদলকাকুর বাড়ির পাশে এক চিলতে মিষ্টির দোকানে গোলক ময়রা, পরনের স‍্যান্ডো গেঞ্জি গুটিয়ে ভুঁড়ি বের করে, গানের তালে তালে মাথা দুলিয়ে ঝিম খাচ্ছে। সুবল গোয়ালার খাটালের মোষগুলো আধবোজা চোখে মাটিতে শুয়ে, থেকে থেকে লেজ নাড়িয়ে মাছি তাড়াচ্ছে। ওরাও বুঝি গান শুনছে ! পাড়ার শরীরে নেমে এসেছে এক অপরূপ সুরেলা দুপুর। আর সেই দুপুরের সরগমে আচ্ছন্নের মত ভেসে যাচ্ছে তিন্নি---

ভেসে যাচ্ছে তিন্নির যুবতীকাল...

ভেসে যাচ্ছে বিগত শৈশবের দিকচক্রবালে...

সেই তখন দুপুরবেলা ঠাম্মার সাথে বিছানায় শুয়ে রেডিওতে শোনা পুরোনো দিনের গান- আখতারি বাঈ, ফিরোজ়া বেগম... ঠাম্মার ওমের আদরে দুপুরের মাদুরে শুয়ে থাকা গল্পের বাগান... সেইসব দুপুরের বুকে শুয়ে শোনা উদাসী আজান... তখনও কোকিল ডাকত গুলমোহরের পাতার আড়ালে... কাঠমিল থেকে ভেসে আসত কাঠ চেরাইয়ের শব্দ... বাগানে কাঁঠাল গাছের নিচে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বিজ্ঞের মত হেঁটে যেত ধূসর ঘুঘু... কুরকুর কুরকুর করে বিষাদের নাম ধরে তাদের করুণ ডাকাডাকি... জানলার শিক দিয়ে গলে এসে ঘরের ভিতর, তেরছা হয়ে দেয়ালের গায়ে আটকে গল্প শুনত বিকেলের আনমনা রোদ্দুর....

অথবা শুনত এসে রেডিওতে গেয়ে চলা গান---

"শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি....."

কী আশ্চর্য! বাদলকাকুর টালিছাওয়া ঘরের শান্ত নির্জনতা থেকে ভেসে আসছে এই গানটাই ! খুব ভালো লাগছে তিন্নির। বিরল এক ভালোলাগায় ভেসে যাচ্ছে সে ! সুরের গ্রন্থি আজ হঠাৎ কেমন করে হাতের মরিয়া মুঠোয় ধরে রাখা বর্তমানকে, মিলিয়ে দিল আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সাথে...