ব্যবহারিক ধর্ম পবিত্র ইসলামে আধ্যাত্মিক সাধনায় সংসার ত্যাগ কে জীবনের চরমতম কর্তব্য হিসেবে নির্দেশ করা হয়নি। সংসার ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতার প্রচার- এই দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন হযরত মহম্মদ মোস্তাফা ( সাঃ)। অত্যন্ত অনাড়ম্বর যাপনচিত্রের ভিতর দিয়ে জীবনের অর্থ তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। আধ্যাত্মিকতা আর সংসার জীবনের সমন্বয়ে এক অপূর্ব জীবনযাপনের দৃষ্টান্ত তিনি গোটা বিশ্বের মানব সমাজের সামনে রেখে গিয়েছেন। পরবর্তী কালে খলিফা রাও তাঁর অননুকরণীয় জীবন যাপনকে নিজেদের যাপনচিত্রে প্রতিফলিত করেছিলেন।
সেই যাপনচিত্রের ধারাকে অনুসরণের ভিতর দিয়েই পরবর্তী সময়কালে ব্যবহারিক ধর্ম পবিত্র ইসলামে সংসার বিরাগী একটি ধারণা ধীরে ধীরে আসে। এই ভাবনার বিশ্বাসীরা অনেকেই সরাসরি সংসার ছেড়ে যান নি, আবার সংসারের কাঠামোতে খুব নিবিড় ভাবে নিজেদের বাঁধেন নি। সংসারে থেকে ও সংসারে না থাকার একটা পরম আধ্যাত্মিক চেতনার ভিতরেই এঁরা নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করেছিলেন। ভাবনাকে বহমান রেখেছিলেন। এই ভাবনাই হল ' তসাউওফ'। আর সেই ভাবনার সাথে যাঁরা নিজেদের জীবনকে সম্পৃক্ত করেছিলেন, সেই মানুষেরাই হলেন,' সুফি' ।
' সুফি' শব্দটা এসেছে আরবি 'সুফ' শব্দ থেকে। আরবিতে ' সুফ' শব্দটির অর্থ হল; পশম। সুফি শব্দটির একদম আভিধানিক অর্থ করলে দাঁড়ায়, যে সমস্ত মানুষেরা পশমের বস্ত্র পরিধান করেন। পবিত্র ইসলামের প্রথম কালে সাধকদের ভিতর পশমের কাপড় পরে সাধনা করবার একটা রেওয়াজ ছিল।সেই রেওয়াজ থেকে ওই ধরণের সাধকদের ' সুফি' বলবার দস্তুর ছিল। ইসলাম গবেষকেরা পরবর্তীতে এই ' সুফি' শব্দের মর্মার্থ হিসেবে আর ও কয়েকটি শব্দের সংযোজন ঘটান। হযরত মহম্মদ ( সাঃ) সময়ে যাঁরা মসজিদের মাটিতে বসে সাধনা করতেন, সেই ' আহল উস- সুফ্ ফা ' থেকে ' সুফি' শব্দটির উৎপত্তি, এমন মতামত অনেকেই দিলেন।
কুফার জাবিন বিন হাইয়ান ছিলেন অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়কালের একজন সাধক। তাঁর এবং আবু হাশিম নামক অপর এক সাধকের নামের সঙ্গে এই 'সুফি' শব্দটির প্রথম ব্যবহার আমরা দেখতে পাই।এই ব্যবহারের কমবেশি পঞ্চাশ বছর সময়কালের ভিতরেই গোটা ইরাকের মুসলমান সাধকদের নামের সঙ্গে ' সুফি' শব্দটির ব্যাপক ব্যবহারের প্রচলন আমরা দেখতে পাই। এই ঘটনাক্রমের পরবর্তী দুশো বছরের সময়কালে মুসলিম সাধকদের সঙ্গে ' সুফি' শব্দটির ব্যবহার এবং জনপ্রিয়তা গগণচুম্বী হয়। আজ ও সেই ধারাই অব্যাহত আছে।
নির্জনতার নিঃসঙ্গ প্রেম, 'সুফি' তত্ত্বের একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য। জনকোলাহলের বাইরে গিয়ে অত্যন্ত অনাড়ম্বর যাপনচিত্রের ভিতর দিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কাকুতি নিবেদন হল সুফি জীবনের সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশিষ্ট্যের অনুশীলনে আনাড়ম্বর, বৈভব বিহীন জীবন যাপন, এঁদের জীবন আর সাধনার অন্যতম বড়ো বৈশিষ্ট্য। এভাবে সাধনার ভিতর দিয়েই পবিত্র কোরান শরীফের গহীনে ডুব দিয়ে সৃষ্টিকর্তার স্পন্দন অনুভব করাই ' সুফি' সাধনার সব থেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য।
এভাবেই একদিকে সমাজের অনাচার, সভ্যতাকে বিকৃত করে, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেকে বিপথে পরিচালিত করে, সৃষ্টিকর্তার সন্তান মানুষ, আর সেই মানুষের সৃষ্ট সভ্যতার প্রতি অনাচারের বিরুদ্ধতা ছিল সুফি সাধনার অন্যতম মর্মবস্তু। কেবল মানুষের অনাচার বা সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধতাতেই সাধনার গতি প্রকৃতিকে তাঁরা পরিচালিত করতেন না।নিজের আত্মার দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে দ্রোহের ভিতর দিয়েই তাঁরা নিজেকে জানা আর সেই নিজেকে জানার অতলস্পর্শী ধারার ভিতর দিয়ে অপরকে উপলব্ধিতে আনার নিত্য প্রবাহমান ধারাতে তাঁরা অবগাহণ করার অভ্যাসের সূচনা করেন।
আত্মার পরিশুদ্ধি না ঘটলে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য পাওয়া যায় না- সুফি তত্ত্বের এই গভীর অথচ গম্ভীর মরমীয়া ধারা, এই ভাবনাকে একটা বড়ো রকমের মানবিক আত্মানুসন্ধানের মাপকাঠি হিসেবে মানব সমাজের কাছে তুলে ধরেছে। সুফি তরিকার প্রাচীন সাধক হাসান বশরীর জীবনচর্চা এইসব বৈশিষ্ট্য গুলিকে ফুটিয়ে তুলেছে। এই পর্যায়ে শাসকের সঙ্গে সুফি সাধকদের সংঘাত তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র বিরোধের পরিবেশ ও কখনো তৈরি হয় নি।
এই পর্যায় চলতে থাকলে মুসলমান আইনবিদের ভিতর একটি অংশ, বিশেষ করে ফিকাহ শাস্ত্রকারেরা এবং মুতাকাল্লিমীনেরা সুফি সন্তদের এই ভাবধারাকে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তাঁরা মনে করতেন, পবিত্র কোরানের ভিতরেই সব ধরণের বাহ্যিক আত্মশুদ্ধি এবং আত্মচর্চার পথের দিক নির্দেশ খুব ভালোভাবে রয়েছে। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটাই উঠে আসছিল যে, পবিত্র কোরানে মানুষের বাহ্যিক পাপের শাস্তি সম্পর্কে খুব সুনির্দিষ্ট ভাবেই পথনির্দেশ রয়েছে। তাঁরা ধর্মীয় ভন্ডামি বিচার কিংবা শাস্তি প্রসঙ্গে খুব পরিষ্কার করেই বলতেন যে, মানুষের মনের সব খবর রাখবার একমাত্র হকদার হলেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। তিনি ব্যাতীত অন্য কোথাও, কোনোভাবেই মানুষের মনের খবর রাখা সম্ভবপর নয়-- ফিকাহ শাস্ত্রকারেরা আর মুতাকাল্লিমীন আইনবিদেরা খুব জোরের সঙ্গে এই কথা বলতেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির বশবর্তী হয়েই এইসব আইনবিদেরা সুফি ভাবধারা এবং সুফি সন্তদের ধর্মবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁরা বলতে থাকেন; সুফিরা যে বলেন; প্রকৃত কাজের চাইতে কাজের ইচ্ছা, এই বিষয়টি অনেক বেশি মূল্যবান। শরীয়তের বিধানের থেকেও প্রকৃত জীবনধারণের আদব কায়দা অনেক বেশি উৎকৃষ্ট-- এই সব ভাবনা আদৌ ঠিক না। বাধ্যতামূলক অনুষ্ঠান পালনের প্রতি সুফিদের কখনোই কোনো আকর্ষণ নেই। বাধ্যতামূলক অনুষ্ঠান পালনকে সুফিরা আদৌ সমর্থন ও করেন না- এই ভাবধারাও ওইসব আইনবিদেরা কোনো অবস্থাতেই সমর্থন করতে পারেন নি।
এইসব দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই আইনবিদদের একটি অংশ সুফিদের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে চলতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে রক্ষণশীল এইসব ধর্মজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে সুফি সন্ত এবং তাঁদের ভাবধারার মানুষদের প্রবল দ্বন্দ্ব, ক্রমে বাদানুবাদ তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। রক্ষণশীল এইসব আইনবিদদের সঙ্গে শাসকদের সম্পর্কটা ছিল বেশ ভালো। ফলে শাসক জন্মসূত্রে মুসলমান হলেও তাঁরা শাসনক্ষমতা কে টিকিয়ে রাখতে রক্ষণশীল আলেমদের সঙ্গে একটা আপাত সমঝোতা করে চলতে শুরু করেন।
এই সমঝোতার ফলেই একাংশের রক্ষণশীল আলেমদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনার ফলে শাসকদের সঙ্গে তুমুল সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়ে যায় এইসব সুফি সাধকদের। এমন বিরোধ আর সংঘাতের বহু নিদর্শন যেমন দুই বাংলাতে ই রয়েছে, তেমনই যদি গোটা ভারতবর্ষের দিকে তাকানো যায়, তাহলে ও দেখতে পাওয়া যাবে যে, সুফি সন্ত আর শাসকদের ভিতরে ক্রমশ দ্বন্দ্ব আর কোনো কোনো জায়গাতে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। ( চলবে) ।