মণীন্দ্র মনীষা - ​গৌতম সাহা

সাহিত্যে গুরুবাদের বিশেষ স্থান নেই। কারণ সাহিত্যে যে ব্যাপ্ত আলো তা ছড়িয়ে পড়ে চরাচর জুড়ে। আপন সত্যের জোরে সে আলো বেঁচে থাকে। যারা এই আলোর খোঁজ পায় তারা ধন্য হয়। সেভাবেই আমি ধন্য হয়েছি। মণীন্দ্র গুপ্তের জন্ম বরিশালে। বরিশাল বললেই মনে আসে জীবনানন্দের কথা। তারও আগে বিজয় গুপ্ত। একটা পরম্পরা আছে। আরও অনেক কবি জন্মেছেন ওপার বাংলায় এবং এপার বাংলায়। বাংলাদেশ কবির দেশ, কবিতার দেশ। তাঁদের প্রতি নিশ্চয়ই একটা শ্রদ্ধা রেখে বলছি মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া এত ভাবে জীবনকে দেখার অভিজ্ঞতা খুব কম কবিরই হয়েছে। কবিদের মধ্যে বিদ্বান-বিদূষীর অভাব নেই। কিন্তু পঠিত ধারণা এক জিনিস আর জীবন দিয়ে উপলব্ধি অন্য জিনিস। মণীন্দ্র গুপ্তের ছিল দুটোই। তিনি ব্যক্তি জীবনে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তিনি তাঁর গড়ে ওঠার পিছনে গ্রাম জীবনকে খুব গুরুত্ব দিতেন। সত্যিই গ্রাম মনোবিকাশের ক্ষেত্রে একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে। তাঁর জন্ম বরিশালে। বড় হয়েছেন শিলচরে। তারপর চলে আসেন কলকাতায়। নিজের অনিচ্ছাতেও তাঁকে ভর্তি হতে হয়েছিলো আশুতোষ কলেজে। তিনি অবশ্য নিজে চেয়েছিলেন আর্ট কলেজে ভর্তি হতে। প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন জেদি-একগুঁয়ে। কলেজ না করেই একদিন ঢুকে পড়লেন হাওড়ার একটা জুটমিলে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি সেখান থেকে পালালেন। তাঁর পথে পথে পাথর ছড়ানো। আবার ঢুকলেন অন্য চাকরিতে। সেটা বিলিতি ইনসিওরেন্স কোম্পানী। কিছু দিন পরে সেই কোম্পানী কলকাতা ছেড়ে লখনৌ চলে যায়। মণীন্দ্র গেলেন না। আবার পড়াশুনায় মন দিলেন। সেসময় শিবপুরে ড্রাফটসম্যানশিপের কোর্স করানো হতো। তিনি ভর্তি হলেন। তারপর এলো তাঁর ফৌজি জীবন। সময়কাল ১৯৪৩-৪৬। কলকাতায় ফিরে দেখলেন দেশভাগ। শিলচরে থাকতেই ছবি আঁকার নেশা পেয়ে বসেছিল। সেসময়ে তিনি পড়তেন শিশুসাহিত্য। লাহোর থেকে কলকাতায় ফিরে তিনি আবার ছবি আঁকায় মন দিলেন। তবে তিনি বুঝতে পারলেন ছবি আঁকাতে গেলে এবিষয়ে কিছু পাঠ নেওয়া প্রয়োজন। চিঠি লিখলেন নন্দলাল বসুকে। ভাবলেন উত্তর পাবেননা। কিন্তু তাঁর চিন্তাকে উল্টে দিয়ে নন্দলাল তাঁকে দেখা করতে বললেন। পরে পরে আলাপ হল রামকিংকরের সঙ্গে। একদিকে নানা জায়গায় ঘোরার অভিজ্ঞতা, ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক এবং পরবর্তীতে বিরাট পড়াশুনার অধিকার নিয়ে তিনি যখন চোখের সামনে দেখলেন শতভিষা বের হচ্ছে, কৃত্তিবাস বের হচ্ছে তখন একটা ঘোর লাগাভাব এসে গেছে তাঁর মনে। ভাবতে অবাক লাগে সেই শিশু বয়সে মণীন্দ্র পড়ে ফেলেছেন অন্যান্য বই এর সাথে ' বিদ্যাসুন্দর '।তিনি পাঠ নিয়েছেন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর। ফলে জেনেছেন তাদের রীতিনীতি, বিশ্বাস-অবিশ্বাস। জীবনকে তন্নতন্ন করে না পাঠ করলে সত্যিই এমন কবিতা পাওয়া সম্ভব না। ছবি নিয়ে তাঁর পড়াশুনা অনেক। নন্দলাল রামকিংকরের কাছে থাকা নিশ্চয়ই তাঁর সহায়ক হয়েছে। তিনি বারবার প্রকৃতির কাছে যেতে বলেছেন। আসলে প্রকৃতির কাছে গেলে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। নইলে পাহাড় বা সমুদ্র থেকে ফিরে আসার সময় আমাদের মন খারাপ করে কেন? কবিকে সন্ন্যাসী হতে হয় এমনই ধারণা ছিল তাঁর। তাঁর কবিতা জুড়ে তেমন আবছায়া নেই, রহস্য বিশেষ নেই কিন্তু রয়েছে কালের মর্মর ধ্বনি। আর অধ্যাত্মবাদের সুগভীর অভিজ্ঞান। তাঁর কবিতা পড়লে মনে শান্তি,স্বস্তি ফিরে আসে। আমরা এই লঘু জীবনে মহাজীবনের স্বাদ পাই। তিনি বলেছেন - ' বাক্যের গঠনের জন্য ঢুঁড়তে হবে লোকভাষার সরল লাবণ্য ও অমোঘতা, নগর ভাষার কৌণিকতা, চতুরালি ও দীপ্তি। অনুধাবন করা দরকার সুদূর সন্তদের অবিচল ভাষা এবং সমাজ বহির্ভূত জীবনের উঞ্ছভাষা। এক কথায়, বাক্য তথা ন্যূনতম প্রকাশ ভঙ্গিমার জন্য যেতে হবে স্বর্গ মর্ত্য পাতালে। চেতন ও অচেতনে এ সমস্ত জমে ওঠার পর আরম্ভ হবে কবি সত্তার নিজস্ব কাজ। '
তিনি যে এ ব্যপারে নিজে সিদ্ধকাম ছিলেন তাঁর ছোটো একটা কবিতায় টের পেয়ে ছিলাম আমরা -

' রাত্তিরে মারা যাবার পর বোঝা গেল রাত্রি কী দীর্ঘ
কোটি কোটি মাইল রাত্রির মধ্যে যাবার পরও
রাত্রি ভোর হয় না। '

তিনি মনে করেছেন এ পৃথিবী শুধু মানুষের নয়।
যত কীট পতঙ্গ পশু-পাখি বৃক্ষ সবার। এ গভীর মমত্ববোধ তাঁকে কবিতা লিখতে প্ররোচিত করেছিল।

'গেরস্তেরা ঘুমবার পর রান্নাঘর থেকে টলতে টলতে
বেরিয়ে এল ইঁদুর। তাকে বিষ দেওয়া হয়েছে।
এখন বিষই বয়ে নিয়ে যাবে তাকে বিষই তার ব্যথাবধির কানে তারকব্রহ্ম নাম শোনাবে'  ভাবুন, এই লাইন কটির কথা।
হয়তো তাই সুধীর দত্ত বলেছেন, ' মণীন্দ্র গুপ্ত আর ব্যক্তিমানুষ নন -- মানব, অন্নময়কোষভেদী প্রাণলোকের সমষ্টি পুরুষ। তিনিও তো দেখতে পারেন --
স্তব্ধতার ধুলোর রাস্তায় পড়ে আছে কতযুগ মরা পাখিদের
হর্তুকির মতন শুকনো মাথা
কিংবা
আমি প্রাগৈতিহাসিক নই,দৈত্য নই,কবি নই, -- কীট
নিষ্ঠুরতা,স্বাধীনতা,উদাসীনতার ঐ পরুষ পাহাড়চূড়া থেকে
আমি স্বেচ্ছা নির্বাসিত, নত নেমে আসি বুকে হেঁটে
আর, যত নিচে নামি-গায়ে লাগে ফুলের পরাগ,
জলস্রোত, উপত্যকা, মৌপোকাদের গ্রাম, সংসার পৃথিবী ভালোবাসা।
এমনই সব নির্ভার কবিতা ছড়িয়ে রয়েছে এক কাব্যগ্রন্থ থেকে অন্য কাব্যগ্রন্থে। তাদের নাম এরকম - আমরা তিনজন, নীল পাথরের আকাশ, আমার রাত্রি, মৌপোকাদের গ্রাম, লাল স্কুলবাড়ি, ছত্রপলাশ চৈত্যে দিনশেষ, শরৎ মেঘ ও কাশফুলের বন্ধু, নমেরু মানের রুদ্রাক্ষ, টুংটাং শব্দ নিশব্দ, বনে আজ কনচের্টো, মৌচুষি যায় ছাদনা তলায়, একশিশি গন্ধহীন ফ্রেইগ্রানস, বাড়ির কপালে চাঁদ।

অক্ষয় মালবেরির তিনটি খন্ড তো বাংলা ভাষার অক্ষয় সম্পদ। লিখেছেন প্রবন্ধ, উপন্যাস, শিল্পকলা নিয়ে। সম্পাদনা করেছেন 'পরমা' । এই পত্রিকা পরবর্তী কালের সম্পাদকদের কাছে হয়ে উঠেছে গভীর আস্থার প্রাণকেন্দ্র। তাঁরই সম্পাদিত গ্রন্থ ' আবহমান বাংলা কবিতা ', 'একবছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা '। অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন কবিতার জন্য। সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন - ১৯৭২-৭৬ এই পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর 'একবছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা ' সম্পাদনা করেছেন মণীদ্র গুপ্ত ও রঞ্জিত সিংহ। বাংলা কবিতার ইতিহাসে এ-জাতীয় কাজ দৃষ্টান্তমূলক অবশ্যই। কবিতাকে গভীর ভাবে ভালো না বাসলে সত্যিই এত পরিশ্রম সম্ভব নয়।
মন,প্রাণ,জীবন, যৌবন সবই তিনি কবিতার জন্য ঢেলে দিয়েছেন। সঙ্গীত সাধক অমিয়নাথ সান্যালের সাক্ষাৎকার নিজের পত্রিকায় প্রকাশের জন্য কলকাতা থেকে ছুটে গেছেন কৃষ্ণনগর। আমার মতো বামনকে চিঠি দিয়ে 'ফিনিক্স' পত্রিকায় কবিতা না লিখতে পারার অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। কোনো বড় পত্রিকায় না লিখেও আজীবন অন্য কবিদের সমীহ আদায় করেছেন। ফলে মণীন্দ্র গুপ্ত বাংলা কবিতার এক অনন্য আকাশকে চিনিয়ে দিলেন। সর্ব অর্থেই তিনি প্রণম্য। জীবনানন্দের পর দু-একজনকে বাদ দিলে তিনি এক ব্যাপ্ত মনীষা যার বকুল ফুলের সুগন্ধে আমোদিত হচ্ছি আমরা, বাঙালি পাঠকেরা। তিনি জনপ্রিয় কবিতা লিখে পাঠক মন জয় করতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন ' মানসিক ক্রমবিকাশের ইতিহাস মনীষা বিচ্ছুরিত ' হোক তাঁর কবিতায়।