গাছটা - ডা.গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘরে বসে বসে বোর হয়ে গেছি।
লকডাউনের বাজারে শুধু কাজকর্ম নয়, আমাদের ফেমাস আড্ডাঘরটাই বোধহয় আর রইল না। কাঁহাতক আর ঘরমোছা, বাসন মাজায় দিন কাটে! টিভি খুলতেই ভয়, দু মিনিট চ্যানেল সার্ফ করলেই প্রেসার বেড়ে যায়।
হোয়াটস্ অ্যাপে হাজার একটা খবর, সত্যি মিথ্যে বোঝা দায়! খবরের কাগজ তো ঘরে ঢোকাতেই ভয়, এই বুঝি এক কাঁড়ি করোনা ভাইরাস ঢুকে পড়ল ঘরে!
কি করি, কি করি ভাবতে ভাবতে ভাবতেই ফোনটা ক্যাঁওম্যাও করে বেজে উঠল----
কি মক্কেল, বাড়িতে আছো, না চড়তে বেরিয়েছো?
সতুদার বাজখাঁই গলার আওয়াজে রাগ ধরে যায়---
বেরোবো মানে? তুমি না, সত্যি! বেরোনোর উপায় আছে এখন?
ফোনের উল্টো দিকে সতুদার বিখ্যাত ফিচেল হাসির শব্দ আসে,
আহাহ্ হা, চটিস ক্যানে বাপধন আমার, আমি তো তোর ভালোই চাই, তাইতো খোঁজ নিচ্ছি! তোদের তো আর ওসবের পাট নেই!
না,না, আমি তোমায় করব করব ভাবছিলাম ফোন...
সামলাতে যাই একটু ।
সতুদা অর্থাৎ সত্যেন চাটুজ্যে হলেন আমাদের আড্ডার প্রাণপুরুষ এ কথা এদ্দিনে সবাই জানে । সেই সতুদা এবং তাঁর দলবল সকলেই শহরে অথচ অতিমারীর আতঙ্কে কেউ কারও মুখ অবদি দেখতে পাচ্ছি না!
এমন খারাপ সময় কি আর এসেছে আগে?
লৌকিকতা করে সতুদা কে বলি---
তা তুমি, বৌদি সব ঠিক ঠাক আছো তো? সাবধানে থেকো, বয়েস টাতো হচ্ছে!
---'এই তোদের এক জ্বালা, সাবধানে থেকো, সাবধানে থেকো! আরে আমরা কি কচি খোকা? যতটুকু থাকার ততটা সাবধানেই আছি, তবে তোদের দেখতে পাচ্ছি না বলে একটু যা কষ্ট! আদারওয়াইস দুর্দান্ত একটা সময় কাটাচ্ছি এটুকু বলতেই পারি!
সতুদার কথায় ধন্ধ লেগে যায়, বলে কি লোকটা! জগৎশুদ্ধু লোকে হাঁফিয়ে উঠল আর ওনার বাক্যি দ্যাখো!
সত্যি রে, সত্তর বছরে পৌঁছেও যে এমন একটা চমৎকার ছুটি পেয়ে যাব ভাবিনি! মেয়ে টা তো আটকে রইল বিদেশে! আর আমরা বুড়ো বুড়ি রান্না বান্না ঘরকন্না পড়াশুনা লেখা লিখি নিয়ে দারুণ বিশ্রামের একটা সময় পেয়ে গেছি!
--তার মানে এই করোনা কে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলছ?
আমি বেশ বিহ্বল ।
--দুর ক্ষ্যাপা, ভয় তো পাবিই, নিয়ম কানুন ও মানবি, কিন্তু যতটুকু তোর কন্ট্রোলে তার বাইরে ভেবে আর কি করবি?
দিনের মধ্যে দশবার টিভি খুলছিস, সোস্যাল মিডিয়ায় যা মশলা পাচ্ছিস বুঝে না বুঝে ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছিস, লোককে জ্ঞান দিয়ে ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছিস, আর কি, ঘরে বসে ভেরেন্ডা ভাজছিস! লকডাউন উঠে গেলেও সেই একই কাজ করে চলবি, তাই না?
ওরে গর্দভ, এই লকডাউনটা না হলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো একটা বৈজ্ঞানিক সূত্রই আবিষ্কার হতো না সেটা জানিস?
সতুদা র বমবার্স্টিং স্পেলে দিশেহারা আমি,
কি ই যে বলো না!!
বটে, বটে, সত্যেন চাটুজ্যে বাজে বকছে বলছিস? নিউটনের আপেল পড়ার গপ্পো টা জানা আছে?
চেনা পড়া মনে পড়ার মতো বলে ফেলি,
হ্যাঁ হ্যাঁ, ঐতো সেই নিউটনের মাথায় আপেল পড়ল আর মাধ্যাকর্ষণের তত্ব আবিষ্কার হয়ে গেল!
তবু ভালো! আপেলটা তোর মাথায় পড়লে কি হতো জানি না, ইন ফ্যাক্ট, ওটা নিউটনের মাথায় পড়ে ছিল না পাশে, সেটাও জানি না, তবু নিউটনের পিতৃদেবের ভাগ্যি ভালো যে তুই কথাটা মনে রেখেছিস! যদিও আমি নিশ্চিত এর সাথে লকডাউনের কি সম্পর্ক,এ প্রশ্নটা তুই আমায় করতে চলেছিস!
মুখের কথাটা সতুদা কেড়ে নেওয়ায় একটু ভেবলে গেলেও দমি না আমি ও---
সে উত্তর তো তুমিই দেবে দাদা!
সতুদা মোটেই রাগ করে না, বরং বলে,
ইংল্যান্ডে প্লেগ রোগটা একসময় খুব জ্বালিয়েছে বুঝলি! মোটামুটি ফোরটিনথ সেঞ্চুরি থেকেই  এমন! সেভেনটিন্থ সেঞ্চুরির মাঝামাঝি যেটা হলো ,সেই বিউবোনিক প্লেগে লাখখানেক লোক মারা গিয়েছিল, নিউটন তখন কেমব্রিজের ছাত্র। হিসেব মতো বয়সটা বাইশ তেইশ ।
নিউটনের লেখা পড়ায় এমনিতেই খানিকটা দেরী হয়েছিল । জন্মের আগেই বাবা মারা গেছেন । নিউটনের জন্মের কিছুকাল পরে মা আবার বিয়ে করায় দিদিমা র কাছে উলসথ্রপে বড়ো হতে থাকেন নিউটন । তাঁর যখন তেরো চোদ্দ বছর বয়স,তখন মা ফিরে এলেন এবং জমিজমা দেখাশোনার কাজে লাগিয়ে দিলেন ছেলে কে । লেখা পড়া গেল বন্ধ হয়ে । যে লোকটা পৃথিবীর লেখা পড়া র গতি বদলাবে ভবিষ্যতে, ভেবে দ্যাখ তার কিই হাল করলেন মাতাঠাকুরাণ! তবে, স্কুলের হেডমাস্টার মশাই এবং এক মামার হস্তক্ষেপে আবার লেখাপড়া চালু হতে পেরেছিল শেষমেশ!
যাই হোক, নিউটন যখন পড়াশুনোর হদ্দমুদ্দো করছেন, সে সময় আবার শুরু হয়ে গেল প্লেগে র প্যানিক, কেমব্রিজেও তার ঢেউ এসে লাগল । কিই আর করবেন, দিদিমার কাছে গ্রামের বাড়িতেই ফিরে গেলেন নিউটন !
মনমেজাজ নিশ্চয়ই তাঁরও ভালো ছিল না সেদিন । পরীক্ষা কবে হবে জানা নেই, কলেজ কবে খুলবে কেউ জানে না, নানান খারাপ খবর আসছে চারদিক থেকে। তবু জিনিয়াস রা বোধহয় এজন্যই জিনিয়াস,সারাদিন পড়াশুনাতেই মেতে উঠে অঙ্কের খানদুয়েক তত্ব আবিষ্কার করে ফেললেন । বাইনোমিয়াল থিওরেম আর ক্যালকুলাস তত্ব!
ভেবে দ্যাখ! আর এই সময়ই আপেলের ঘটনা । এমন নয় যে নিউটন কোনও দিন দেখেননি যে আপেল গাছ থেকে পড়তে! কোনও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই ওভাবে ঘটে না, কিন্তু চিন্তার স্রোতে একটা চমক তো লাগিয়ে দেয়! তাইই হয়েছিল এখানেও।
ঘটনার সত্যতা নিয়ে আমারও সংশয় ছিল, তবে ভলতেয়ারের বিবরণেও যখন পেয়ে গেলাম তখন নিশ্চিন্ত হলাম । নিউটনের ভাগ্নী বার্টন, তার স্বামী কনডুইট, জীবনীকার এবং বন্ধু পেম্বারটনের লেখাতেও আছে আপেল গাছের কথা!
একটানা শুনে আমি মুগ্ধ ।তবু না জিগ্যেস করে পারি না---
গাছটা আছে এখনও?
সতুদা আবার হাসতে থাকেন,
আরে সে গাছ থাক বা না থাক, সকলেই এখন একটা করে গাছ দেখিয়ে বলে, এই দ্যাখো সেই আপেল গাছ, ট্রিনিটি কলেজ, উলসথ্রপ ম্যানর সবাই করে এটা ।
এই লেভেলের একজন সেলিব্রিটি না! আসল গাছটা কোথায় কে জানে!!
শোন, এবার ফোনটা রাখি! পাক্কা বিশ মিনিট তোর সাথে বকছি, লকডাউন উঠলে আয় একদিন সবাই বরং! তদ্দিন নিজেদের ফিট রাখ, ফিজিক্যাল, মেন্টাল, বোথ!
নিউটন হওয়ার দরকার নেই, নিজের মতোই কিছু করে যা না!
স্বভাব মতোই ফস্ করে ফোনটা কেটে দেয় সতুদা । কানে এখনও সেই ফিচেল হাসিটা বাজছে।