বিষকন্যা যোগ –  ভৌমদোষের থেকেও ভয়ঙ্কর

ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতিতে বিয়ে নিছক একটি সামাজিক রীতি, সংস্কার বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। বিয়ে  একটা পবিত্র বন্ধন তথা “দেহ-মন-আত্মার” মিলন। তাই, অগ্নি সাক্ষী রেখে, আত্মীয়-পরিজন ও গুরুজনদের উপস্থিতিতে, অভিভাবকদের আশীর্বাদ পুষ্ট মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দু’টি নর-নারীর যৌথ জীবন যাপনের পূর্ণ স্বীকৃতি।  বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে, প্রজ্ঞাবান জ্যোতিষ শাস্ত্রকাররা “যোটক বিচার” তথা “বিবাহ বিচার”-এর বিধান দিয়েছেন। সংবেদনশীল অভিভাবকেরা ছেলে-মেয়দের বিয়ের আগে যোটক বিচার করান। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখি-বিবাহ বিচ্ছেদ,হতাশ ও ব্যর্থ দম্পতির ছড়াছড়ি,এদের অনেকেরই যোটক বিচার করে বিয়ে হয়েছিল। তাহলে এই হাহাকার কেন?
কারণ- যোটক বিচারের সীমাবদ্ধতা, আধুনিক ভোগবাদী জীবন শৈলী এবং পাত্র-পাত্রীর মধ্যে প্রকৃতিগত সাম্যের অভাব। অনেকে আবার জ্যোতিষে খুব একটা আস্থাশীল নন। কাজ চালান গোছের একটা কম্পিউটার ম্যাচিং করিয়ে নিয়ে সময় ও অর্থ বাঁচান। এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে করিয়ে দিই-‘’কৃত্রিম বুদ্ধি নির্ভর যান্ত্রিক ব্যবস্থায় গাণিতিক ও যৌক্তিক বৈধতা গুরুত্ব পায়; সূক্ষ্ম মানবিক বিশ্লেষণটি অধরা থেকে যায়। যোটক বিচারে পাত্র-পাত্রী উভয়ের প্রকৃতিগত সাম্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় যোটক বিচার পণ্ডশ্রম মাত্র বলেই মনে করি।
প্রচলিত অষ্ট কুট বিচার চন্দ্ররাশি কেন্দ্রিক। পাত্র-পাত্রীর জন্মরাশি, নক্ষত্র ও নক্ষত্রপাদ সংখ্যা এই তিনটি বিষয় দ্বারা সমগ্র যোটক বিচার সীমাবদ্ধ এবং লগ্ন ও ভাব বিচার উপেক্ষিত। ফলে লগ্ন কেন্দ্রিক সামগ্রিক ভাব-বিচার করা হয় না। এছাড়া, সুস্থ বিবাহ ও বিবাহিত জীবনের জন্য আবশ্যিক শর্তগুলো যেমন- প্রকৃতিগত সাম্য, দাম্পত্য ও শয্যা-সুখ ,সন্তান, আয়ু, ভাগ্য, কর্ম ও আয় ইত্যাদি পর্যালোচনা করা হয় না।  অন্যদিকে বিবাহের পক্ষে অন্তরায় অশুভ যোগ ও অন্যান্য দোষ, যেমন- আকস্মিক মৃত্যু, ভাগ্য বিপর্যয় ও দারিদ্র দোষ ইত্যাদি বিচার  করা হয়ে ওঠে না। এছাড়া বিবাহের পক্ষে অশুভ অন্যান্য যোগ আছে কিনা, তা অজানা থেকে যায়। অজান্তে যার ফল ভোগ করে আমাদের ছেলে মেয়েরা।

  অশুভ যোগ হিসাবে “ভৌমদোষ” তথা মাঙ্গলিক দোষ বহ চর্চিত। এর সঙ্গে রাক্ষস গণ জুড়ে যাওয়ায় বিভ্রান্তির মাত্রাটা আকাশ ছোঁয়া হয়ে  ওঠে। এ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে বলি, ভৌমদোষ থাকাটাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রতি-প্রসব বা খণ্ডন যোগ আছে কিনা, তা ভাল ভাবে বিচার করে দেখা দরকার। শাস্ত্রে ভৌমদোষ খণ্ডনের একাধিক যোগ আছে, সেই সঙ্গে যদি দেখা যায় -
(ক) মঙ্গল রাজযোগ কারক গ্রহ (নীচ-ভঙ্গ রাজযোগ সহ),
(খ) মঙ্গলের  বিয়ের আগেই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে,
(গ) উভয়ের রাশিচক্র দীর্ঘায়ু যোগ প্রবল ও বলবান, 
(ঘ) শুভ মঙ্গল আত্ম কারক বা অমাত্য কারক হয়েছে, 
(ঙ) মঙ্গল ও সপ্তম ভাব - যদি নাক্ষত্রিক, দৃষ্টি, প্রেক্ষা বা শুভ গ্রহের অবস্থান ও সম্বন্ধে আবদ্ধ, তাহলে ভৌমদোষ ফলপ্রসূ হবে না।  সামান্য কিছু সমস্যা ও বাধা-বিঘ্নের মধ্যে দিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক বিবাহিত জীবন অতিবাহিত হবে।
   জ্যোতিষ শাস্ত্রের ‘স্ত্রী-জাতক’ অধ্যায়ে বিয়ের পক্ষে অশুভ একাধিক যোগের কথা বলা হয়েছে, যা ভৌমদোষের থেকেও ভয়ঙ্কর এবং প্রায় অনালোচিত। যেমন- বিষকন্যা যোগ, বহুগামিতা, অস্বাভাবিক যৌনাচার ইত্যাদি। বিবাহ বিচারে সহজে চোখ এড়িয়ে যায় এবং অনালোচিত প্রধান যোগটি হল বিষকন্যা যোগ। শাস্ত্রে বিষকন্যা যোগে জন্ম হওয়া 
   কন্যাকে বিষ-তুল্য পরিত্যাজ্য বলা হয়েছে। ভৌমদোষ না থাকলেও এই যোগ প্রবল অশুভ ফলদায়ী হয়। 
বিষকন্যা যোগ কখন হয়?
বিষকন্যা যোগ তিন ধরনের হতে পারে-
(১) বার, তিথি ও নক্ষত্র সমন্বয়ে
(২) বিশেষ তিথি ও নক্ষত্র সমন্বয়ে,
(৩) জন্ম ছকের ভাব কেন্দ্রিক অশুভ গ্রহাবস্থান ও সমন্বয়ে,  
প্রথম প্রকার বিষকন্যা যোগ- এই যোগ গড়ে ওঠে যখন -(১)শনিবার, দ্বিতীয়া তিথি এবং অশ্লেষা  নক্ষত্রে কারো জন্ম হয়।       
(২) রবিবার দ্বাদশী তিথি এবং শতভিষা নক্ষত্রে কারো জন্ম হয়,
(৩) মঙ্গলবার,সপ্তমী তিথি এবং বিশাখা নক্ষত্রে কারো জন্ম হয়,
দ্বিতীয় প্রকার বিষকন্যা যোগ –
এই যোগ গড়ে ওঠে যখন-(১) শুক্লা বা কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে চিত্রা নক্ষত্রে কারো জন্ম হয়, 
তৃতীয় প্রকার বিষকন্যা যোগ - 
এই যোগ মূল জন্ম ছকের ভাব-কেন্দ্রিক গ্রহাবস্থান অনুসারে গড়ে ওঠে। (১) লগ্নে শনি, পঞ্চমে রবি এবং নবমে মঙ্গল অবস্থান করলে, (২)লগ্নে শুভ ও অশুভ গ্রহ উভয়েই থাকবে এবং ষষ্ঠে দুটি অশুভ গ্রহ থাকবে।

বিষকন্যা যোগের অশুভ ফল কি হয় ?
এই যোগে জন্ম হওয়া জাতিকার অন্যান্য সদ্‌গুণ থাকা সত্বেও অকাল বৈধব্য, সন্তান-হানি, স্বামী পরিত্যক্তা, কুলটা ও দুরাচারিণী হয়। একাধিক অবৈধ প্রণয় ও নিষিদ্ধ  সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া লাগামহীন ব্যভিচার, বিলাস-ব্যসন, উদ্দাম জীবন যাপন করে। বংশ, মান-মর্যাদা ও কুল-শীলের হানি ও অধোগমনের কারণ হয়।

বিষকন্যা যোগ কখন ভঙ্গ হয় ?
জন্মেছকে বিষকন্যা যোগ থাকলে, গুরুত্ব সহকারে খণ্ডন বা ভঙ্গ যোগ আছে কিনা, বিচার করে দেখা উচিৎ। বিষকন্যা যোগ ভঙ্গ হবে যদি-
(ক) লগ্নের সপ্তম পতি বা সপ্তম ভাব শুভদৃষ্ট বা শুভগ্রহ যুক্ত হয়।
(খ) চন্দ্রের সপ্তম পতি বা সপ্তম ভাব -শুভ দৃষ্ট বা শুভগ্রহ যুক্ত হয়।
(গ) লগ্ন ও চন্দ্র- উভয়েই শুভ গ্রহ যুক্ত হলে বা শুভগ্রহ দৃষ্ট হলে এবং সেই সঙ্গে সপ্তমে শুভ গ্রহের জোড়ালো প্রভাব বা দৃষ্টি থাকলে। 
বর্তমান প্রবন্ধে আলোচ্য জন্মছকগুলির মধ্যে ১,২,৩,৭ নং জন্মছকে বিষকন্যা যোগ পূর্ণভাবে বর্তমান। অন্য ছকগুলিতে আংশিক ও নাক্ষত্রিক যোগ প্রবল থাকায় একই ধরণের ফলাফল ঘটতে দেখেছি। দীর্ঘ দেড় দশকের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে ভৌমদোষ না থাকলেও বিষকন্যা যোগ বহু মানুষের জীবনে বিষময় ফল দিয়েছে। বিশেষ করে যদি চন্দ্র - অশ্লেষা(৯), চিত্রা(১৪), বিশাখা(১৬) বা শতভিষা(২৪) নক্ষত্রে থাকে এবং গ্রহ হিসাবে শুক্র, মঙ্গল ও রাহু যদি জন্মছকের সপ্তম, অষ্টম, দ্বাদশ বা লগ্নে অবস্থান করে অথবা যে কোনও ধরনের অশুভ সংযোগ তৈরি করে। তাহলে, বিষকন্যা যোগ প্রবল ভাবে জীবনে ফলদায়ক হয়। এই প্রসঙ্গে জানাই, হিন্দি সিনেমা জগতের এক মহানায়িকা এবং স্যার আশুতোষ মুখার্জির কন্যার এই যোগ থাকায় বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। জনশ্রুতি, স্যার আশুতোষ মুখার্জির কন্যা কমলা দেবীর তিনবার বিয়ে হয় এবং তিনবারই বৈধব্য বরণ করেন। বিবাহ বিচার করার সময় ভৌমদোষ আছে কিনা না এবং সেই সঙ্গে সমগ্র রাশিচক্রের সার্বিক শুভাশুভ অবস্থা ও গ্রহাবস্থান অবশ্যই বিচার করা উচিৎ।