জ্যোতিষ বিশ্বাসী বহু মানুষের অন্যতম অভিযোগ হল ‘রত্ন প্রতিকার’ নিয়ে বিভ্রান্তি। পেশাদার জ্যোতিষী হিসাবে মানুষের মতামত আমার কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে বিষয়টা নিয়ে গভীর ভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করেছি। সহকর্মী, জ্যোতিষী বন্ধু ও প্রাজ্ঞ জ্যোতিষীদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বিষয়টা একাধিক বার পর্যালোচনা করেছি। সেখানেও দেখেছি ‘নানা মুনির নানা মত’। বিভ্রান্তির মাত্রাটা কমার বদলে আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন কি শাস্ত্রকারদের মধ্যেও মতপার্থক্য লক্ষ্য করার মতো। এ প্রসঙ্গে ‘জাতক চন্দ্রিকা’ ও ‘জাতক পারিজাত’ –এর মতপার্থক্য তারই অন্যতম উদাহরণ। ফলত সমস্ত বিষয়টা স্বাধীনভাবে অনুধাবন করা আবশ্যক বলে মনে হয়েছে। রত্ন প্রতিকারে বিভ্রান্তির মূল কারণ দুটি-
(১) প্রতিকারের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির অভাব
(২) সুনির্দিষ্ট ব্যবহারিক প্রয়োগ কৌশল। প্রতিকারের মূল নিয়মটি যুক্তিনিষ্ঠ, স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হলে, ব্যবহারিক প্রয়োগও যুক্তিনিষ্ঠ, স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হতে বাধ্য।
বিভিন্ন জ্যোতিষী বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রত্নের ব্যবস্থাপত্র দেন। ফলে একই মানুষের হাতে একাধিক (৬-৭টি) রত্ন ধারণ করতে দেখা যায়। মানুষের ভাগ্য একটাই, দৃষ্টিকোণের ভিন্নতার কারণে নয়টা রত্নও অনেক সময় কম পড়ে যায়। মনে রাখতে হবে, একসঙ্গে সবকটা গ্রহ কখনও শুভ বা অশুভ হতে পারে না। বর্তমানে যে সমস্ত ধারা রত্ন প্রতিকারে বহুল প্রচলিত সেগুলি হল-
(১)হস্তরেখা, (২)সংখ্যাতত্ব, (৩)সান সাইন, (৪)কৃষ্ণমূর্তি পদ্ধতি, (৫)পাশ্চাত্য জ্যোতিষ (৬)লাল কিতাব, (৭)বৈদিক জ্যোতিষ মতে রাশি, লগ্ন, নক্ষত্র অনুসারে, শুভ-অশুভ গ্রহ অনুসারে মারক, বাধক, দুঃস্থান পতি, নীচস্থ গ্রহ, গোচর ও দশা-অন্তর্দশা, হোরারি জ্যোতিষ (প্রশ্ন জ্যোতিষ) ইত্যাদি। এছাড়া আরও রয়েছে- (৮) ট্যারো রিডিং (৯) ফেস রিডিং ইত্যাদি আরও অনেক পদ্ধতি।
এতগুলি বিচার ধারার মধ্যে কোনটি যথার্থ ও বিধিসম্মত তা বিচার করা বেশ জটিল ও কঠিন। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই জেনে রাখা ভালো যে ভবিষ্যৎ দর্শন শাস্ত্রের যতগুলি ধারা আছে, তার মধ্যে জ্যোতিষ শাস্ত্র একমাত্র নির্ভরযোগ্য, পূর্ণাঙ্গ ও বহু শাখা যুক্ত বটবৃক্ষ স্বরূপ। অন্য শাখাগুলি অপূর্ণ, আংশিক ও লতানে গাছের মতো, যা জ্যোতিষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। সেকারণে যারা শুধু হাত দেখেন বা সংখ্যাতত্ত্ব বিচার করে ভাগ্যবিচার করেন তারা যথার্থ জ্যোতিষী নন। তাদের বিচার ও ফলাদেশ সঠিক নয় এবং বিজ্ঞানসম্মতও নয়। সেকারণে মূল আলোচনা জ্যোতিষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব।
রত্ন প্রতিকারের মূল নিয়মটি হল গ্রহের “শুভত্ব ও অশুভত্ব”-কে নিয়ে। শুভ গ্রহকে আরও শক্তিশালী ও বলবান করা এবং অশুভ গ্রহকে প্রীত বা তুষ্ট করে অশুভত্বকে হ্রাস বা প্রশমিত করা।যা গ্রহের নৈসর্গিক ‘শত্রু-মিত্র-সম’ অনুসারে করা হয়। প্রাচীন শাস্ত্রকাররা জ্যোতিষের তাত্ত্বিক আলোচনাগুলি ভ-চক্র অনুসারে (Natural Zodiac) অনুসারে আলোচনা ও নির্দেশ করেছেন। কিন্তু ব্যবহারিক প্রয়োগ যেহেতু ব্যক্তির রাশিচক্র অনুসারে করা হয়, সে কারণে জাতচক্র অনুসারে লগ্নের শুভ ভাবাধিপত্য অনুসারে গ্রহের বলাবল ও শুভাশুভ বিচার করাই যুক্তি সম্মত। রাশিচক্রের মূল ভিত তিনটি - লগ্ন, পঞ্চম ও নবম। এর সঙ্গে লগ্নের মিত্র গ্রহকে বিচারের আওতায় ধরতে হবে। শুভ গ্রহ বলতে মূলত লগ্নপতি, পঞ্চমপতি, লগ্নের মিত্র এবং যোগকারক গ্রহকে ধরতে হবে। তাহলে সর্ব্বোচ্চ চারটে গ্রহ পাওয়া যাবে।
অনেকে কৃষ্ণমূর্তি পদ্ধতি অনুসারে রত্ন প্রতিকারে করেন। এ প্রসঙ্গে বলি, কৃষ্ণমূর্তি-জী গ্রহ প্রতিকার মানতেন না এবং অনুমোদনও করেননি। পরবর্তীকালে তার অনুগামীরা প্রতিকার ব্যাপারটা জুড়ে দিয়েছেন। তাদের মতে - লগ্ন, নবম ও একাদশের সাব লর্ড (নক্ষত্রাংশ) যদি বিশুদ্ধ ভাবে শুভ হয়, অর্থাৎ দুঃস্থান, মারক ও বাধক গ্রহের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত না হয় তাহলে প্রতিকার দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একাদশ ষষ্ঠের ষষ্ঠ এবং চর লগ্নের বাধকপতি এবং নবম স্থির লগ্নের বাধকপতি ও দশমের দ্বাদশ, শুভত্ব পায় কি করে ? বোঝা বেশ মুশকিল।
অব্যর্থ রত্ন প্রতিকার মূলত - লগ্ন, পঞ্চম ও নবম ভাবকে কেন্দ্র করে। আর কৃষ্ণমূর্তি মতে, লগ্ন, নবম ও একাদশ এই তিনটি ভাবকে নিয়ে। উভয়ের মধ্যে একটাই মিল লগ্ন-কেন্দ্রিক শুভগ্রহের প্রতিকার করা। সনাতন ও কৃষ্ণমূর্তি পদ্ধতির সমন্বয় করলে চার-পাঁচটি গ্রহের রত্ন প্রতিকার করা যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তব সম্মত হবে। এখন এই দুই ধারার COMBINATION করলে যে SET পাওয়া যায় সেটা হল - (১) লগ্ন, (২) লগ্নের মিত্র, (৩) পঞ্চম, (৪) নবম ও একাদশ। জাতচক্র বিচার করে রত্ন প্রতিকার নির্ধারণের সময় এর সঙ্গে লগ্নের যোগকারক (নির্দোষ) গ্রহকেও ধরতে হবে। এছাড়া সদোষ যোগকারক, রাহু-কেতু ও একাদশ পতি গ্রহকে বিচারে বাদ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে সর্ব্বোচ্চ তিনটে গ্রহের প্রতিকারই যথেষ্ট। রাহু ও কেতুকে বিচারে গ্রহণ করা হয়নি। অভিজ্ঞ জ্যোতিষীরা মনে করলে রাহু ও কেতুর অবস্থানকে বিবেচনায় রাখতে পারেন, সেক্ষেত্রে রাহুকে শনি ধর্মী ও কেতুকে মঙ্গল ধর্মী হিসাবে ধরতে হবে। একাদশ ষষ্ঠের ষষ্ঠ এবং চর লগ্নের বাধক পতি হওয়ায় চর লগ্নের ক্ষেত্রে বিচারে বাদ দেওয়া উচিৎ। নবম পতি স্থির লগ্নের বাধক পতি কিন্তু নবম পতি ভাগ্যপতি হওয়ায় সব ক্ষেত্রেই শুভ কারক। সকল জ্যোতিষী, জ্যোতিষী অনুরাগী, শিক্ষার্থী, গবেষক জ্যোতিষী এবং প্রাজ্ঞ জ্যোতিষীদের কাছে সবিনয় নিবেদন সমগ্র বিষয়টি মুক্ত মনে পর্যালোচনা করুন এবং আপনাদের সুচিন্তিত মতামত জানান। বর্তমান আলোচনার সূত্রটি অনুধাবন করলে, সহজেই জাতচক্র বিচার করে সঠিক রত্ন প্রতিকার করা সম্ভব হবে।