বানাসুরের শিবলিঙ্গ

একেবারে বাল্য থেকেই তার এই ভাবে প্রত্যহ শিব লিঙ্গ তৈরি করার অভ্যাস। অথচ পরিচয়ে সে এক অসুর। অসুর কূলে জন্ম ও বৃদ্ধি। কিন্তু স্বভাবে কোথাও নেই তেমন ক্রোধ ও নৃসংশতা।
বাণাসুর।
বান অসুর – এই নামেই তার পরিচয়।
প্রথম প্রথম কেউ সেভাবে খেয়াল করেনি। কিন্তু সময় বয়ে যায় দ্রুত। অথচ বছরের পর বছর কেউ যদি নিষ্ঠা সহকারে একই কর্ম করে যায়, সবার কৌতূহল ঘিরে থাকে তাকে।
বানাসুর প্রত্যহ প্রাতে অত্যন্ত নিষ্ঠা নিয়ে নির্মাণ করে শিব লিঙ্গ। অসুর হয়েও সে মহাদেবের ভক্ত। নিজে একজন দক্ষ শিল্পীও।
ফলে তার নির্মিত শিব লিঙ্গগুলি শিল্প সম্মত তো বটেই, শাস্ত্র বিচার ওইগুলি তৈরি করার জন্য উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতো।
প্রতিদিন একটি শিবলিঙ্গ নির্মানের পর মহা ধুমধাম করে তার পূজা করতো বানাসুর। আর তারপরে সেই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করতে যেত কাছে দূরে অসুর রাজ্যেই কোথাও না কোথাও।
প্রথম প্রথম নিকট জনেরা জানতো তার এমত খেয়ালের কথা।
ক্রমে বৃদ্ধি পেল শিবলিঙ্গের সংখ্যা। বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করলো সে সব লিঙ্গ। ত্রিলোকের নর, দেব ও অসুরেরা জানতে পারলো, তার মহাদেবের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধার কথা।
এবং দেবলোকের এমন ধারণাও হলো, বানাসুরের শিব আরাধনা আসলে মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে কোনও বর প্রাপ্ত করার কৌশল।
বানাসুর কিন্তু শাস্ত্রমতে শুভ লক্ষণ যুক্ত শিবলিঙ্গ নির্মাণ ছাড়া কিছুই ভাবে নি।
সে কখনও মহাদেবের দর্শন অভিলাষীও হয় নি।
শুধু অসীম ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় রোজ নির্মাণ করে গেছে শিবলিঙ্গ একটি একটি করে। এবং যথাবিহিত পূজার পর তাকে প্রতিষ্ঠা করেছে রাজ্যের কোথাও না কোথাও।
এক দুই বা পাঁচ দশ বছর নয় – অতিক্রান্ত হলো শত বর্ষ।
অল্পে সন্তুষ্ট শিব নিজেও বিস্মিত ও কৌতূহলী তার এমন ভক্তের কর্মে। প্রতিদিন এই অসুর তার শুভ লক্ষণ যুক্ত শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে ও পূজা করে। কিন্তু কখনও কোনও বর প্রাপ্তির কথা তো বলে না।
এমন অভূতপূর্ব সাধনা ও ভক্তি মহাদেব কখনও দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না।
সম্ভবত এই প্রথম বার ভক্তের কোনও তপস্যা বা আহ্বান ব্যতিরেকেই বানাসুরের সম্মুখে প্রকট হলেন দেবাদিদেব।
বানাসুর তার শিল্প মন্ডিত শিবলিঙ্গের নির্মানে ব্যস্ত ছিল।
মহাদেব শিব তাকে বললেন, বান, তোমার এমন অপূর্ব কর্মে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি। তুমি কী কোনও বর চাও? আমি মুহুর্তে তা পূরণ করবো। তুমি বলো।
কোনও ধন সম্পত্তি নয়, নয় কোনও অমরত্বের প্রার্থনা, নয় কোনও ব্যক্তিগত অভিলাষ – মহাদেবকে চমকিত করে বানাসুর বলল, প্রভূ, আপনার দর্শন পেয়েই আমার সব কিছু পাওয়া।
মহাদেব বললেন, তুমি প্রতিদিন আমার একটি করে সুলক্ষণ যুক্ত লিঙ্গ নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করছো। আমি তোমায় কিছু দিতে চাই।
আবেগে বানাসুরের চোখে জল এলো। অবশ্যই তা আনন্দাশ্রু।
বানাসুর বলল, প্রভু, শাস্ত্র মতে শুভ লক্ষ্ণণ যুক্ত শিবলিঙ্গ নির্মানে আমাকে অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। আমার ক্লেশও হয়। আপনি যদি একান্তই কৃপা করতে চান, তবে শাস্ত্র মতে শুভ লক্ষন যুক্ত কিছু লিঙ্গ আমাকে দিন। আপনার ভক্তরা ওই শিবলিঙ্গের পূজা করলে যেন তাদের মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয় প্রভু।
এমন অসামান্য ভক্ত মহাদেব কখনও দেখেননি, যে বারংবার বলা সত্ত্বেও নিজের জন্য কিছুই প্রার্থনা করল না।
মহাদেব বললেন, বেশ, বানাসুর। আমি তোমায় যথেষ্ট সংখ্যক শিবলিঙ্গ আমার কৈলাশ ধামে নির্মাণ করে তোমায় পাঠাবো। আমার একান্ত ইচ্ছা, তোমার নামেই ওই লিঙ্গগুলির পরিচয় হোক ত্রিলোকে।
মহাদেব কিছুদিনের মধ্যেই চৌদ্দ কোটি শিবলিঙ্গ নির্মান করালেন স্বর্গে। নন্দী ভৃঙ্গী ওই বিপুল পরিমান শিব লিঙ্গ পৌঁছে দিয়ে গেল বানাসুরের কাছে।
অতঃপর বানাসুর শুরু করলো তার বর প্রাপ্ত লিঙ্গের বিভিন্ন পবিত্র স্থানে প্রতিষ্ঠা। তিনকোটি কালিকাগর্তে, তিনকোটি শ্রীশৈলে, এক কোটি কন্যকাশ্রমে, এক কোটি নেপালে রক্ষা করল।
পরবর্তী সময়ে নদীর স্রোতে কিংবা গহীন অরণ্যের কোনও না কোনও গুহায় বা বৃহৎ বৃক্ষের পাদদেশে অসংখ্য শিব লিঙ্গ প্রাপ্ত করেছে মানুষ। স্বপ্নাদেশে প্রাপ্ত হয়েছে অসংখ্য শিবলিঙ্গ।
আসলে বিভিন্ন লক্ষণ যুক্ত শিবলিঙ্গ আছে। কিন্তু প্রকৃতির মাঝে এই যে বানাসুর শিবলিঙ্গ, এই লিঙ্গের পূজার্চনায় সুখ, সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি প্রাপ্তি হয় ভক্তজনের। মহাদেব তার অসুর ভক্তের নাম চিরকালীন করে গেলেন তার এই অপূর্ব অসামান্য উপহারে।