সতী, দক্ষযজ্ঞ এবং দেবাদিদেব শিবের ভয়ংকর প্রলয় নৃত্য – হিন্দু পুরাণ সাহিত্যে অনেক খানি জায়গা জুড়ে রয়েছে। এই পর্যায়টি নিয়ে কত না অসংখ্য উপকাহিনি। সেরকমই এক উপকাহিনি –চাঁদের প্রশান্ত ষোলো কলায় মহাদেব শিবের স্থির হয়ে ওঠার কাহিনি।
দক্ষযজ্ঞ ভণ্ডুল করে মৃত পত্নীর শরীর কাঁধে তুলে মহাদেব শিব তখন প্রলয়ংকর নৃত্য শুরু করেছেন। প্রিয়তমা নেই, সুতরাং এই জগত সৃষ্টির প্রতিও তার আর নেই কোনও মায়া মমতা। ধ্বংস করে দেবেন, বিনষ্ট করে দেবেন – প্রবল সংহার মূর্তি তখন শিবের।
ত্রিলোকে আতঙ্ক ও ত্রাহি রব। দেবতাদের ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভগবান বিষ্ণু নিরুপায় হয়ে হাতে তুলে নিয়েছেন জগতের শ্রেষ্ঠতম অস্ত্র – সুদর্শন চক্র।
পত্নীর মায়ায় আচ্ছন্ন মহাদেবের স্কন্ধে থাকা সতীর দেহ নিখুত লক্ষ্যে তিনি খন্ড বিখন্ড করে ফেলতে শুরু করেছেন। ৫১ টি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে তা ছড়িয়ে পড়লো ধরিত্রীতে।
শিবের অগ্নি সম দৃষ্টির সামনে কারোর যাওয়ার সাহস ও ক্ষমতা নেই। কিন্তু সতীর দেহ যখন তার স্কন্ধ থেকে বিযুক্ত হলো, দেবতারা টের পেলেন, মহাদেবের সংহার মূর্তি কমেছে।
বিভিন্ন পুরাণ কাহিনিতে অতঃপর ৫১ পীঠের মহার্ঘ কাহিনির কথা লেখা হয়েছে।
কিন্তু এই কাহিনির সমাপ্তি এখানেই ঘটেনি।
সতীর দেহ তার শরীর থেকে বিযুক্ত হওয়ার পরেও মহাদেবের ক্রোধ কিছুমাত্র কমল না। তার বুকের মধ্যে তার অপূর্ব পত্নী সতীকে নিয়ে এক হাহাকার – তাকে অস্থির ও চঞ্চল করে রেখেছে অনুক্ষণ। যেদিকে দৃষ্টি দেন মহাদেব, সেই দিকেই তার রোষানলে জ্বলে যায় চরাচর। সমুদ্র শুষ্ক হয়, বন জ্বলে যায় দাবানলে।
এমনকি মহা মহা শক্তিধর সূর্যদেব শিবের ক্রোধানলে হয়ে পড়লেন নিস্তেজ।
দেবতারা প্রমাদ গণলেন। শুধু নিজেদের জন্য নয়। মহাদেবকে ভালোবাসেন না, এমন দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি নেই। তারা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা শুরু করলেন – অন্ত হোক মহাদেবের অস্থিরতার। তিনি তো প্রশান্তির প্রতীক। পুরনো সেই দিব্যকান্তি, তাদের বড়োই প্রিয়।
অগত্যা ভগবান ব্রহ্মা এগিয়ে এলেন সমস্যার সমাধানে। দেবতাদের বললেন, মহাদেব প্রশান্তি হলে তবেই শান্ত হবে জগত। আর তাঁর প্রশান্তির একমাত্র উপায় দেবতাদের অমৃত কলস ও চন্দ্রের প্রশান্ত ষোলোকলা।
কী করতে হবে?
দেবতাদের বললেন ব্রহ্মা, তোমরা চন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করো। তিনি যেন তার অমোঘ ষোলো কলায় উদিত হন। রাতে যে শীতলতা ও আনন্দ তিনি ধরিত্রীকে প্রদান করেন, সেইটে চাই। আর নিয়ে এসো অমৃত কলস।
দেবতাদের প্রার্থনায় ষোলোকলায় সেজে এলেন চন্দ্র। অমৃত কলস নিয়ে এলেন দেবতারা। ব্রহ্মা চন্দ্রকে বললেন, তুমি এই অমৃতে অবগাহন করে অমৃতের মধ্যে প্রশান্তি ও শীতলতা সঞ্জীবন করো।
চন্দ্র অমৃতে অবগাহন করতে লাগলেন। আর সেই কলস নিয়ে সভয়ে দেবতারা গেলেন মহাদেবের কাছে।
ভীষণ চঞ্চল, অভিমানী ও অস্থির শিব কিঞ্চিৎ প্রসন্ন হলেন। দেবতারা ওই পমৃত পান করতে অনুরোধ করলেন মহাদেবকে।
কিন্তু শিব অমৃত পান করার আগে কলসে আঙুল ঢুকিয়ে সুধা তুলতে যেতেই বিপত্তি দেখা দিল। মহাদেবের নখের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হতে শুরু করলেন অমৃতে অবগাহন রত চন্দ্র।
কিন্তু চন্দ্রের দিক থেকে কোনও অনুযোগ, কোনও আর্তনাদ কেউ শুনল না। আত্মত্যাগের এক দৃষ্টান্ত রেখে তিনি সহ্য করতে লাগলেন শিবের নখরাঘাতের যন্ত্রণা।
এইবার যেন সম্বিত ফিরে পেলেন ত্রিলোকের, সমস্ত নর-দানদ-দেবতার, ভগবান বিষ্ণু ও ব্রহ্মার অতি প্রিয়তম শ্রেষ্ঠতম দেব, মহাদেব শিব।
তাঁরই নখরাঘাতে চন্দ্র তথা প্রকৃতির এমন বিপর্যয় তিনি তো হতে দিতে পারেন না।
ভাঙা চন্দ্রকে মহাদেব শিব প্রসন্ন চিত্তে ধারণ করলেন নিজের জটার সম্মুখে। তাঁর শরীর ও মন ততক্ষনে ভরে গেছে প্রশান্তিতে। তার ক্রোধ একেবারেই প্রশমিত হয়ে গেছে। তিনি স্থির ও অচঞ্চল।
মহাদেবের জটায় চন্দ্রের এই অবস্থান – প্রশান্তির প্রতীক হয়ে চিরকালীন রূপকথায় পরিণত হয়ে স্থান পেয়েছে আমাদের অনুপম পুরাণ গাথায়।