গণেশ ঠাকুরের বাম দিকের দাঁতটি ভাঙা। তা নিয়ে যে দুটি পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে, এখানে তা উপস্থাপিত করা হলো।
১
শ্লোকগুলি তাঁর করায়ত্ব। সারাক্ষণ, অনুক্ষণ শ্লোকগুলি তাঁর মস্তিষ্কে আঘাত করতে থাকে। অতঃপর বেদব্যাস ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন।
দেবলোকে সুরম্য সফেদ ভগবান ব্রহ্মার প্রাসাদে বসে ব্রহ্মা বেদব্যাসকে বললেন, তোমার এই দী-র্ঘ শ্রম ও অধ্যবসায়ে যে ভাবনা মনের গহীন কোণে লালন করেছো, আজ তা প্রকাশ করার সময় উপস্থিত। তুমি ঠিকই বলেছো বেদব্যাস, তোমার সৃজনে একজন সঙ্গ দিলে মহাভারতের ওই বিশাল শ্লোক সমূহ প্রকাশ করতে সুবিধাই হবে।
বেদব্যাস করজোড় করে বললেন, ভগবান, আপনি এ ব্যাপারে আমায় দিশা দিন।
ব্রহ্মা বেদব্যাসকে পরামর্শ দিলেন, বুদ্ধিমান রসিক গণেশের স্তব করতে। মহাভারত শ্লোক সমূহ লিপিবদ্ধ করতে গণেশের থেকে উপযুক্ত কেউ নেই।
ভগবান ব্রহ্মার পরামর্শ শিরোধার্য করে গনেশের স্তব করলেন বেদব্যাস। এবং তাঁকে তুষ্ট করে দর্শনও পেলেন। বেদব্যাসের অভিপ্রায়, তিনি শ্লোক নির্মান করে মুখে উচ্চারন করবেন, এবং গনেশ তার অর্থ অনুধাবন করে তা লিপিবদ্ধ করবেন।
তাঁর অভিপ্রায় শুনে স্বভাব রসিক গণেশ বললেন, তথাস্তু। তবে হে পন্ডিত প্রবর, মুহুর্ত মাত্র সময় নষ্ট করা যাবে না। আমি আপনার সৃজন লিপিবদ্ধ করবো ঠিক এই শর্তে। অর্থাৎ আপনার শ্লোক এক মুহুর্ত বন্ধ করা যাবে না। আপনি শ্লোক উচ্চারণ বন্ধ করা মাত্র আমার লেখনী স্তব্ধ হয়ে যাবে।
বেদব্যাস কিঞ্চিৎ অস্থির হলেন এ কথায়। তৎক্ষণাৎ তিনি মনস্থির করে নিলেন। এবং বললেন, প্রভু, আমি প্রস্তুত। তবে আমারও সেক্ষেত্রে একটি শর্ত মান্য করতে হবে আপনাকে। আপনিও এক মুহুর্ত মাত্র সময় লেখনী স্তব্ধ করতে পারবেন না।
যেন প্রতিযোগিতা শুরু হলো।
বেদব্যাস তাঁর সৃজন ক্ষমতার সর্বোচ্য স্তরে নিজেকে উন্নীত করলেন। তিনি শ্লোক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে গণেশ মুহুর্তে তা লিপিবদ্ধ করতে শুরু করলেন।
বেশ কিছু শ্লোক লিপিবদ্ধ হওয়ার পর বেদব্যাস লক্ষ্য করলেন, ধীমান, রসিক, তীক্ষ্ণধী গনেশ তাঁর শ্লোক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তা লিপিবদ্ধ করে ফেলছেন। পরবর্তী শ্লোক নিয়ে তিনি যে কিঞ্চিৎ চিন্তা করবেন, সে অবকাশও থাকছে না। এত দ্রুত লেখনী গণেশের।
অগত্যা এক উপায় ঠাউরালেন বেদব্যাস। তিনি সামান্য জটিল ও দুরূহ শ্লোক নির্বাচন শুরু করলেন এবার। প্রতিটি শ্লোকের অর্থ অনুধাবন করে লিপিবদ্ধ করতে হয়। সুতরাং এবার গণেশের সামান্য সময় বেশি লাগতে শুরু করলো। বেদব্যাস পরবর্তী শ্লোক রচনার জন্য সময় পেলেন।
এদিকে দ্রুত লিখতে গিয়ে গণেশের কলম আচমকা ভেঙে গেল। অথচ সেই মুহুর্তে এক দুরূহ শ্লোক উচ্চারণ করে চলেছেন পন্ডিত প্রবর। শর্ত অনুযায়ী কণা মাত্র সময় নষ্ট করা যাবে না। অন্য কলম সংগ্রহে নেই। তা আনতে সময়ও তো প্রয়োজন।
উপায় একটিই ছিল। তা হলো, নিজের শ্বেত শুভ্র, সুন্দর দন্তটি। সেইটে সামান্য ভেঙে নিলেন গনেষ। মহাভারতের অমৃত সমান কথা রচনায় গণেশ তার ভাঙা দন্ত কলম হিসেবে ব্যবহার করলেন।
আত্মত্যাগের এ এক মহান দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে।
২
ঋষি পরশুরামের ক্রোধ ত্রিভূবনে সবাই জানে। তাঁর কোনও ব্যাপারে অভিপ্রায় হলে সংশিষ্ট মানুষজন, তৎক্ষণাৎ তা মান্য করে। নয়তো ঋষিবরের অভিশাপ বা অস্ত্র তাকে আঘাত করবে।
দেবাদিদেব শিবকে স্তব ও ধ্যানে তুষ্ট করে এক কুঠার পেয়েছিলেন পরশুরাম। অসীম শক্তিশালী সে কুঠারের আঘাতে কত না শত্রু নিকেশ করেছেন তিনি। অগত্যা একদিন ঠিক করলেন কৈলাসে গিয়ে মহাদেবকে তাঁর এই মহান দানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আসবেন।
ঘটনাক্রমে সেই সময় শিব ছিলেন নিদ্রায়। এবং তাঁর নিদ্রায় যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সদর দরজায় পাহারায় ছিলেন মহামতি গণেশ। পরশুরামকে তিনি গৃহে প্রবেশে বাধা দিয়ে বললেন, মহাদেবের নিদ্রাভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।
পরশুরাম তখন কুঠারের বলে নিজেকে অপরাজেয় মনে করছেন। তিনি মহাদেবের সঙ্গে ঠিক তখুনি সাক্ষাৎ করতে চান। কোনও বাধা, কোনও নিষেধ শুনবেন না।
কাজেই তিনি খামোকা এক যুদ্ধ শুরু করে দিলেন গণেশের সঙ্গে। কিন্তু ক্রমেই বুঝলেন, শান্ত শিষ্ট গনেশকে পরাস্ত করা সহজ নয়। অগত্যা, তাঁর শেষ অস্ত্র হিসেবে মহাদেবের আশীর্বাদপুষ্ট কুঠার নিক্ষেপ করলেন গণেশপকে লক্ষ্য করে।
এই কুঠারে গণেশের কিছু হওয়ার নয়। অথচ কুঠারটি যদি বিফলে যায়, সেক্ষেত্রে তার পিতারও অসম্মান। সুতরাং ধীমান গণেশ কুঠারটি গ্রহণ করলেন তার দন্তে।
দাঁত সামান্য ভেঙে গেল।
পুরাণ-সাহিত্যে এ কাহিনিও এক অসামান্য আত্মত্যাগের কাহিনি হিসেবে আমরা মনে করি।