সিদ্ধিদাতা বিনায়কের মাতৃরূপঃ বিনায়কি

অসুরের নাম অন্ধকা।
নামের মতোই তাকে ঘিরে থাকে অন্ধকার।
এই ভয়ানক অসুরের ইচ্ছে হয়েছিল, সে মা পার্বতীকেই বিবাহ করবে। সহজ ও স্বাভাবিক পথে যে তা হবে না, তা সে মূর্খ হলেও জানে। তার অহংকার তার শক্তি। তার আত্মবিশ্বাস, তার প্রতি ভগবানের দেওয়া বর।
কী সেই বর?
তাকে যদি কেউ অস্ত্রাঘাতে আঘাত করে, তবে তার শরীর থেকে যে রক্তপাত হবে, সে রক্ত ভূমি স্পর্শ করা মাত্র শত শত অন্ধকা-র জন্ম হবে। অর্থাৎ রক্তপাতের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে তার শক্তি।। তার শত্রু ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে আচমকা এই অতিরিক্ত সংখ্যায়।
মা পার্বতীকে বিবাহের ইচ্ছা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধে অগ্নি শর্মা হলেন দেবী। তৎক্ষণাৎ তিনি মহাদেবকে আহ্বান করলেন এই অবাঞ্ছিত উৎপাত থেকে রেহাই পেতে।
মহাদেবের অমিত শক্তিশালী বিশাল ত্রিশূল অসুর অন্ধকার বুক চিরে ফেলল মুহুর্তে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো তার শরীর থেকে।
পার্বতী ও মহাদেব চক্ষু বিস্ফারিত করে দেখলেন, ওই শক্তিশালী ত্রিশুলের আঘাতে ধরাশায়ী হয়েও অট্টহাস্য করে উঠল দানব।
লহমায় তাঁরা টের পেলেন এমন অট্টহাস্যের কারণ।
অন্ধকা-র রক্ত ভূমি স্পর্শ মাত্র কয়েক সহস্র অন্ধকা যেন ঘনিয়ে এলো চরাচরে। আক্ষরিক অর্থে অন্ধকারে ঢেকে গেল দশ দিক।
প্রমাদ গনলেন দুজনেই। তাদেরই বর প্রাপ্ত এই নির্বোধ লোভী দানব।
তাহলে এখন উপায়?
মা পার্বতী উপলদ্ধি করলেন, অন্ধকা-র এমন দৈব আশীর্বাদের কারণ, জগতে প্রত্যেকের মধ্যে গুপ্ত রয়েছে দুই সত্ত্বা। পুরুষ যেমন, তেমনই রয়েছে মাতৃ শক্তি।
আর মাতৃ শক্তির এক অমোঘ ক্ষমতা রয়েছে। স্বয়ং মা কালী রক্ত পান করেন অশুভ শক্তি নাশের জন্য।
মা পার্বতী কণামাত্র সময় নষ্ট করলেন না। স্মরণ করলেন জগতের মাতৃশক্তির।
দেবরাজ ইন্দ্রের মাতৃ সত্ত্বা ইন্দ্রানী, ভগবান বিষ্ণুর মাতৃ সত্ত্বা বৈষ্ণবী, ভগবান ব্রহ্মার মাতৃসত্ত্বা ব্রাহ্মনী ও গণেশ তথা সিদ্ধিদাতা বিনায়কের মাতৃসত্ত্বা বিনায়কির আবির্ভাব ঘটলো সেই যুদ্ধক্ষেত্রে।
এই সংগঠিত মাতৃশক্তির সামনে অন্ধকা অসুরের জারিজুরি বিফলে গেল। কারণ আর এক ফোঁটা রক্তও আর ভূমি স্পর্শ করল না। এক অন্ধকা আর সহস্র অন্ধকায় রূপান্তরিত হতে পারল না।
যুদ্ধ শেষ হলো। মৃত্যু হলো ওই ভয়ানক দানবের।
এই পৌরাণিক কাহিনির এক সংক্ষিপ্তসার পাওয়া যায় মৎস্য পুরাণ ও বিষ্ণু-ধর্মত্র পুরাণ-এ। আজ থেকে অন্তত সাড়ে তিনশো বছর আগেও গণেশের মাতৃরূপ বিনায়কির পুজো করতো অবিভক্ত ভারতের বহু অঞ্চলের মানুষ। ইন্দ্রানী, বৈষ্ণবী ও ব্রাহ্মনীর কথা ও পুজা প্রচলিত থাকলেও সিদ্ধিদাতা গনেশ বা বিনায়কের মাতৃরূপ - বিনায়কির প্রচার ও পূজার প্রচলন ইতিহাসের পাতায় লুপ্ত হয়ে যায়।
তবে এই বিশাল দেশে অসংখ্য দেবস্থান। সুতরাং বিনায়কির খোঁজও পাওয়া যায় বিচ্ছিন্ন ভাবে। রাজস্থানের এক মন্দিরের টেরাকোটায় রয়েছে বিনায়কির খোঁজ। সেই খোঁজ পাওয়ার পর অনেক গবেষণার শেষে পাওয়া যায় অসুর অন্ধকা ও বিনায়কির যুদ্ধের পৌরাণিক কাহিনি। শুরু হয় পুজো। তন্ত্র সাধনাতেও খোঁজ মিলেছিল তার। তবে এক শতকের পর কালের গর্ভে লুপ্ত হয় সেই পুজো ও তন্ত্রের কথা।
এছাড়াও তামিলনাড়ুর এক মন্দিরে বিগ্রপদা গনপতি নামে যে বিগ্রহ পূজিত হন, তিনিই বিনায়কি। যেমন তিব্বতে তার নাম ‘গণেশানি’। জৈন ধর্মে ‘গজাননা’ নামে গনেশের মাতৃ রূপের পরিচয়। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে মাতৃ শক্তির অনেক দেবতা। কিন্তু অত্যন্ত পরিচিত সিদ্ধিদাতা গনেশের মাতৃ রূপ।
বিভিন্ন দেবতার পুজোর একটা কারণ আমরা সব সময়ই পাই – বিনায়কির ক্ষেত্রেই বা তার ব্যতিক্রম কেন হবে।
যারা অশুভ শক্তি তথা কালো যাদু বিশ্বাস করেন, ভয় করেন, তাদের দোষ কাটানোর অব্যর্থ দাওয়াই বিনায়কির আরাধনা। ওড়িশায় হীরাপুর নামের এক জায়গায় এক মন্দিরে তন্ত্র সাধকেরা বিনায়কির আরাধনা করে কালো যাদুর খারাপ প্রভাব মুক্তির কথা বলে।
বিনায়কির আরাধনার দিন হলো বুধবার। শুদ্ধ মনে, সিদ্ধিদাতা গণেশের অপরূপ মাতৃ শক্তির পুজো অনেকের কর্ম জীবনের পথ মসৃণ করে, অনেকের গৃহের কূ-প্রভাব দূর করে, অনেকের অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থাকে শান্ত ও স্থির করে।