সূর্যদেব পূর্বদিকে উদিত হন।
পশ্চিমে অস্ত যান।
তাঁর পরিভ্রমণে কোনও অনিয়ম চলবে না। ব্যাঘাত চলবে না।
সব কিছুর জন্য অপেক্ষা করা চলে, সময় কিন্তু কারো জন্য অপেক্ষা করে না।
বিন্ধ্য পর্বত কিন্তু এসব নীতি ও সত্য বাক্য শুনতে রাজি নয়। আদি অন্ত কাল থেকে সূর্য দেব সুমেরু পর্বতকে পরিভ্রমণ করে চলেছেন – এক ঘেয়ে, এক পথে, একই ভাবে।
বিন্ধ্য পর্বতের অভিলাষ হলো, সূর্যদেব এবার তাকেও পরিভ্রমণ করে জগত সংসারের তাবৎ কানুন চালু রাখুন।
সূর্যদেবের কাছে কোনও অনুরোধ নয়, বিন্ধ্য পর্বত সোজা তার মাথা সটান তুলে সূর্যদেবকে আদেশ করলো তাকে প্রদক্ষিণ করতে।
বেশ বিরক্ত ও বিব্রত হলেন সূর্য দেব।
বোঝাতে গেলেন বিন্ধ্য পর্বতকে যে, প্রকৃতির এই মেপে দেওয়া পথ পরিক্রমায় কোনও বিকল্প হয় না। তার নিত্যদিনের পথ যতই একঘেয়ে, একই রকম লাগুক না কেন, এইটেই প্রকৃতি-নির্দিষ্ট পথ।
বিন্ধ্য পর্বতের তখন ক্ষমতার নেশা লেগেছে। সে তার শরীর আরো প্রসারিত করতে শুরু করলো। এতটাই সে উচ্চে ঊঠে যাবে যে সূর্যদেবের পরিক্রমা স্তব্ধ হতে বাধ্য।
সোরগোল পড়ে গেল ত্রিলোকে। বিশেষ করে দেব মহলে। দেব্রাজ ইন্দ্রের কাছে দূত প্রায় ঊর্ধশ্বাসে সংবাদ আনল যে সৃষ্টিতে প্রলয় এলো বলে।
ইন্দ্র ও অন্য দেবতারা ভীত ও বিস্মিত হয়ে দেখলেন, বিন্ধ্য পর্বত কোনও শুভানুধ্যায়ীর কথাই শুনছে না। সে ক্রমে এক অনতিক্রম্য এমন এক উচ্চতায় যেতে চলেছে, আজ আর রক্ষে নেই সূর্যদেবের।
অথচ, এক দন্ড তো দূরের কথা, এক লহমাও সূর্যের কক্ষ পথ অবরুদ্ধ হলে অনিয়ম ও অজ্ঞানতায় ডুবে যাবে ত্রিলোক। সূর্যদেবের পথ পরিক্রমা প্রকৃতি নির্দিষ্ট। দেব দানব মানব, কোনও ঐশ্বরিক শক্তি, কেউই তার ব্যতিক্রম ঘটাতে পারে না।
অগস্ত্য মুনির নিয়মিত নিদ্রা ভঙ্গ হয় ব্রাহ্ম মুহুর্তে। কয়েক লহমা পর শয্যা ত্যাগ করেন তিনি।
আজ নিদ্রা ভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে কেমন এক অস্বস্তি, এক বিরাগ উপস্তিত হলো। মন যেন কু ডাকল তাঁর।
আশ্চর্য হয়ে অগস্ত্য ঋষি ভোরের আকাশের দিকে তাকালেন। এখনো কয়েক দন্ড বাকি। তারপর পূব আকাশ রাঙিয়ে সূর্যদেব উদিত হবেন রাজপাটে।
আলো আঁধারির মধ্যে আচমকা অগস্ত্য মুনি দেখলেন দেবতাদের বেশ কয়েকজন অত্যন্ত সাগ্রহে ছুটে আসছেন তার কুটিরের দিকে।
ত্রিকালজ্ঞ মুনি আসলে অভিশপ্ত এক দেবতা। আগত দেবতাদের কপালে স্বেদ বিন্দু দেখে বিস্মিত হলেন।
দেবতারা কেউ কর জোর করলো তার সামনে এসে। আবার কেউ সাষ্টাঙ্গে প্রনাম করলো তাঁকে।
অগস্ত্য মুনি শুধু শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলেন, কী হয়েছে?
তার আগেই সবাই ভীত ও কম্পিত স্বরে বলে উঠলো, ঋষিবর, আপনাকে এমন ব্রাহ্ম মুহুর্তে বিরক্ত করতে এসে আমরা লজ্জিত। কিন্তু আমরা অপারগ। আপনি ছাড়া জগতের আসন্ন প্রলয় রোধ করার ক্ষমতা কারো নেই।
আসলে বিন্ধ্য পর্বত অগস্ত্য মুনির অতি বাধ্য ও মনোযোগী এক শিষ্য। দেবতারা তার জন্য তার কাছে শলা করেই এসেছেন।
সব শুনলেন অগ্যস্ত মুনি। এবার তার কপোলেও যেন ফুটে উঠলো স্বেদ বিন্দু।
কাঁধে ফেলে রাখা বস্ত্র খন্ড দিয়ে মুখ মুছলেন তিনি। লহমা দেরি করা যাবে না। সূর্যর্দেব তার পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। আর বিন্ধ্য পর্বত আজ দেখিয়ে দিয়েছে, কেন সে এতো শক্তিশালী। সে এখন এতটাই প্রসারিত যে সূর্য দেবের আদি অন্তকালের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।
দ্রুত পায়ে বিন্ধ্য পর্বতের সামনে গেলেন অগস্ত্য মুনি।
তাকে দেখামাত্র স্বভাব বিনয়ী বিন্ধ্য পর্বত মাথা ঝোঁকালো অচিরাৎ।
দুই পা মেলে দাঁড়ালেন অগস্ত্য মুনি।
বিন্ধ্য পর্বত অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে, মান্য করে তাকে। ঋষি অগস্ত্য প্রকৃৎ প্রস্তাবে বিন্ধ্য পর্বতের গুরু।
গুরু চরণ ছুঁতে গেলেন বিব্ধ্য পর্বত।
মাথা নীচু করে ঋষি অগস্ত্যকে প্রনাম করতে গেলেন বিন্ধ্য পর্বত।
আর ঠিক এটাই তো চাইছিলেন মুনি অগস্ত্য। বিন্ধ্য পর্বত ঝুঁকে পড়তেই সূর্য দেবের পরিক্রমার পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল। অগস্ত্য মুনি ইশারা করলেন সূর্যদেবকে। তিনি যেন প্রকৃতির নিয়ম মেনে আপন লয়েই পরিক্রমা বজায় রাখেন।
অগস্ত্য মুনি মধুর স্বরে বাধ্য ও অনুগত শিষ্য বিন্ধ্য পর্বতকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সব কিছু শুভ তো?
গুরুরচরণ ছুঁইয়ে বিন্ধ্য বলল, আজ্ঞে গুরুদেব।
অগদত্য মুনি বললেন, আয়ুষ্মান ভব। বিন্ধ্য, আমার চরণ যে ভূমি স্পর্শ করে রয়েছে, ভূমির সেই স্থানকে তুমি কতটা পবিত্র মনে করো?
গুরু চরণ স্পর্শে আপ্লুত বিন্ধ্য বলল, পবিত্রতম।
অগস্ত্য মুনি বললন, বেশ, আমি দক্ষিণাবর্তে ভ্রমণে যাচ্ছি একটি উপলক্ষ্যে, আমি যতক্ষণ না ফিরি, তুমি এই ভূমি স্পর্শ করে থাকো – এ তোমার গুরুর আদেশ –
বলে চরণ সরিয়ে নিলেন অগস্ত্য।
এবং তার চরণ স্পর্শ করেছিল ভূমির যে স্থান, সেই স্থান স্পর্শ করে ঝুঁকে রইল বিন্ধ্য পর্বত।
অগস্ত্য মুনি আর কোনও দিন ফেরেন নি তাঁর প্রিয় শিষ্যের কাছে। অর্থাৎ, বিন্ধ্য পর্বতও আর কখনও, কোনও দিন সাক্ষাৎ পায়নি তার গুরুর। সে গুরু চরণ-স্পর্শ করা ভূমিতেই মস্তক ঝুঁকিয়ে রয়েছে।
আর সূর্য দেবের পরিক্রমণ পথে কোনও বিঘ্নও ঘটেনি কোনও দিন আর।
যে যাত্রা অনন্ত পথে যায়, আমরা তাকেই বলি – অগস্ত্য যাত্রা।
এই সুন্দর পুরাণ কাহিনির আধুনিক নীতি বাক্য কী হতে পারে?
১) কৌশলে কার্য সিদ্ধি করে নিতে হয়
২) প্রকৃতি বিরুদ্ধ হওয়া যায় না
৩) বিন্ধ্য পর্বতের সারল্য, গুরুর প্রতি নিষ্ঠা অনুসরণ যোগ্য। কিন্তু তার গুরু প্রীতির সুযোগে তাকে যেভাবে অনন্ত অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য করা হলো, তা কী অনুসরণ যোগ্য?