আমাদের পুরাণ কথায় রয়েছে গনেশের মুখের গড়ন নিয়ে ব্যাখ্যা। কেন এক দেবতার মুখের আকার হলো হাতির মতো – তা নিয়ে বহু লেখা রয়েছে।
তবে দেবতার দিকে তাকিয়ে আমরা যখন প্রণাম করছি, তখন সামনে দেখছি হাতির মুখ। এতে এটাই প্রমাণ হয় যে, হাতি বা ভালো বাংলায় হস্তি দর্শন আমাদের কাছে অতীব শুভ।
হ্যাঁ, গনেশ ঠাকুরের মুখের গড়ন থেকেই আমাদের লোক বিশ্বাসে এটা প্রচলিত যে, কোন শুভ কাজের আগে হাতির দর্শন হলে কাজটি সুন্দর ভাবে সমাপ্ত হয়। যেন তখন আমরা মনে করি, গণেশ ঠাকুরের আশীর্বাদ রয়েছে আমাদের মাথার উপরে।
এই জাতীয় ধারণাকে অন্ধ বিশ্বাস বলে উড়িয়ে না দিয়ে যদি কারন খোঁজার চেষ্টা করি, তবে অনেক চমকপ্রদ ব্যাখ্যা আমাদের সামনে উঠে আসবে।
গরু হিন্দু সমাজে অত্যন্ত আদরণীয় প্রানী। এতটাই যে, আমরা বলি গোমাতা। গরুর দুধ ছাড়া আমাদের সমাজ অচল। এছাড়া চাষাবাদে ট্র্যাক্টর কালের নিয়ম মেনে এখন এসেছে। আগে বলদ দিয়ে হতো ধান গমের চাষ। অর্থাৎ এক কথায় গরুর তূল্য আদরণীয় প্রানী হিন্দু সমাজে নেই।
একই সঙ্গে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় চিরকাল আদরণীয় স্থান পেয়ে এসেছে ঘরের অতিথিরা। অতিথিকে নারায়নের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়, অতিথি নারায়নঃ ভব।
সুতরাং কারো বাড়ির সামনে যদি কোনও কারণ ছাড়াই কোনও গরু বা বাছুর দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে লোক বিশ্বাস, ঘরে নারায়ন তূল্য অতিথি অর্থাৎ কাছের কোনও মানুষ আসবেন।
গরুর দুধ থেকেই তৈরি হয় দই। অর্থাৎ অত্যন্ত পুষ্টিকর ও বলবর্ধক।
আমাদের খাদ্য তালিকায় এই দইএর স্থান সর্বোচ্য স্তরে।। কোনও শুভ কাজে গেলে আমরা দইএর ফোঁটা দিই। কোনও শুভ অনুষ্ঠানের খাদ্য তালিকায় দই থাকবেই। (এখন আইস্ক্রিম থাকে, কোনও ভাবেই সেটা দইএর বিকল্প নয়)। আর সবচেয়ে বড় কথা দই নিয়মিত খেলে আলাদা করে এক শক্তি জোগায়, এ তো সকলের জানা।
সুতরাং দই মানেই ভাল খবরের লক্ষণ।
আমাদের একটা কথা আছে, ঘুম থেকে উঠে যেন শুভ কোনও জিনিস দেখি, অন্য কিছু না পেলে নিদেন নিজের মুখ দেখি। অনেকে ঘুম ভেঙে আগে নিজের মুখ দেখে আয়নায়। কারণ সারাদিনের ভাল খারাপের দায় সে নিজের ওপরেই রাখতে চায়।
ঠিক দইএর মতোই আরও দুটি খাদ্য দ্রব্যের মধ্যে আমরা শুভ কিছু খুঁজে পাই।
একটি হলো, হলুদ। আমাদের পুজোর উপাচারে হলুদের ফোঁটা থাকে। বিবাহ অনুষ্ঠানে হয় গায়ে হলুদ। এছাড়া, হলুদের মধ্যে যে প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, তা অনন্য।
সেই রকমই মাছ। বিশেষ করে জোড়া মাছ। জোড়া মাছ এতটাই পয়া বলে ধরা হয় যে খেলা পাগল বাঙালির মাঠেও রয়েছে তার উপস্থিতি – ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবের জয়ের উৎসব জোড়া ইলিশ ছাড়া অসম্ভব।
তাছাড়া হিন্দু বিবাহ অনুষ্ঠানে মাছের অত্যন্ত সমাদর।
এগুলি সবই হিন্দু কালচারে শুভ লক্ষণ। যেমন কোনও বিবাহিতা সুলক্ষণাযুক্তা মহিলার হাতে যদি ফুল দেখতে পাওয়া যায় কোনও শুভ কাজের যাত্রা পথে, তবে লোক বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই যাত্রা সফল ও সুন্দর হয়।
না, এগুলিকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এগুলি কেউ মান্য করতে বলেও না। কিন্তু এগুলির উপস্থিতি আমরা শুভ বলি, কারন আমাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংস্কারে এগুলি অত্যন্ত আদরের, সম্মানের।