আমারা বাঙালিরা বলি গনেশ। আমাদের পুজো মরশুম শুরু হয় গনেশের আরাধনা তথা পুজো দিয়ে।
মহারাষ্ট্রে শ্রেষ্ঠ উৎসব গনপতি পুজো। গনপতি বাপ্পা। গনেশের পুজো।
এছাড়াও এই অপূর্ব দেবতার আরো নাম রয়েছে। যেমন বিনায়ক।
আর তাঁর নামের আগে সিদ্ধিদাতা লেখা হয় অসীম ভক্তির সঙ্গেই।
অর্থাৎ সিদ্ধিদাতা গনেশ।
আরো কত দেবতার কাছেই তো আমরা ভক্তি ভরে নিজের চাহিদার কথা বলি। কর্মের সাফল্যের জন্য মানত করি। কিন্তু গনেশ ঠাকুরের নামের আগে একমাত্র লেখা হয় সিদ্ধিদাতা। অর্থাৎ আমার কর্ম সিদ্ধ করে দেবেন গণেশ, গনপতি, সিদ্ধি বিনায়ক।
দেবতা গনেশের মাথা হাতির, শরীর মানবের। মানব হৃদয়ের যা কিছু গুণাবলী, তা যেন দু’কূল ভাসিয়ে রয়েছে সিদ্ধিদাতা গনেশের।
বাঙালিদের যারা বানিজ্য করেন, তারা সাধারণত নিত্য পুজো করেন গনেশের। কিন্তু এই অসামান্য দেবতা এখন সব শ্রেণীর মানুষের হৃদয়ে এমন ভাবে প্রবেশ করেছেন, শুধু ভক্তি দিয়ে তার বিচার করা যায় না।
যেহেতু তাঁর বিগ্রহের মধ্যেই রয়েছে এক অন্যরকম ভাবনা, কাজেই গনেশ ঠাকুরের বিগ্রহে সব সময়ই নান্দনিক দিক দিয়ে অপূর্ব। নানা ভঙ্গীতে, নানান ধাতুতে ও রঙে গনেশ ঠাকুরের মূর্তি সারা বছর পাওয়া যায়।
আর এই খানেই বেঁধেছে গোল। গনেশ মূর্তি ঘরে স্থাপনের সঙ্গে বাস্তু শাস্ত্রের রীতিমতো ব্যখ্যা আছে। তাতে যেমন তেমন গনেশ মূর্তি ঘরে স্থাপন করা যায় না।
গনেশ মূর্তি যারা নির্মাণ করেন, তারা কিন্তু বাস্তু মেনেই নির্মাণ করেন। এর বাইরেও অনেক সংস্থা নিজেদের শিল্পীকে দিয়ে যে বিগ্রহ তৈরি করেন, তা দৃষ্টি নন্দন অবশ্যই, কিন্তু বাস্তু শাস্ত্র তা অনুমোদন করে না।
বাস্তু তত্ত্বের আগে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় গনেশের শুঁড় কিন্তু বাম ও ডান – দুদিকেই বাঁকা থাকে।
কেন দুদিকে বাঁকা থাকে?
তার ধর্মীয় ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে জেনে নিতে হবে গনেশের মাথা কীভাবে হাতির হলো, তার ব্যাখ্যা।
পুরাণ ব্যাখ্যা অনুসারে মা পার্বতীর নিজের ইচ্ছায় গনেশের জন্ম হয়। অর্থাৎ তাঁর জন্মে মহাদেবের যোগ ছিল না।
এ নিয়ে সবচেয়ে কম চারটি মত রয়েছে, চারটি পুরাণে। একটি মতে তাঁকে সৃষ্টি করেন শিব। অন্য মতে শিব ও পার্বতী একত্রে তাঁকে সৃষ্টি করেন। আর এক মতে শিব ও পার্বতী এক রহস্যময় উপায়ে তাঁকে সৃষ্টি করেন। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় মতটিই আমরা বলবো। তা হলো, পার্বতী তাঁর শরীরে মাখা হলুদ থেকে সৃষ্টি করেন অসীম গুণ ও জ্ঞানের অধিকারী সিদ্ধিদাতা গনেশকে।
একদিন স্নানের আগে স্নানঘরের বাইরে মহাদেবের চ্যালা নন্দীকে পাহারায় বসিয়ে রেখেছিলেন পার্বতী। এদিকে শিবকে দেখে নন্দী কী ভাবে বাধা দেয়? সুতরাং শিব ঢুকে পড়েন ভিতরে।
এতে ভয়ানক ভাবে রুষ্ট হন পার্বতী। পরের দিন বা পরবর্তী সময়ে স্নান ঘরের বাইরে পাহারার জন্য পুত্রসম গনেশকে নির্মাণ করেন গায়ে মাখা হলুদ দিয়ে।
মহাদেব অল্প বয়সের গণেশের বিষয়টি জানতেন না। যথারীতি তিনি স্নান ঘরে ঢুকতে এলে বীরের মতো লড়াই শুরু করে দেয় বাল-গনেশ। বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ মহাদেব তখন যোদ্ধা বালকটির মাথাই কেটে দেন।
এ সংবাদে শোকাহত পার্বতী এতই ক্রুদ্ধ হন যে অকস্মাৎ নিজের সমস্ত শক্তিকে সংহত করে জগত ধ্বংসের প্রস্তুতি শুরু করেন।
ত্রাহি রব পড়ে যায় ত্রিলোকে। পার্বতী একাই এই ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। ততক্ষণে মহাদেবের কাছে গণেশ পর্বের সব কিছু জ্ঞাত করা হয়েছে। মহাদেব যুগপত লজ্জিত ও অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছেন। পার্বতীর ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবতাদের প্রেরণ করেন সেখানে।
হঠাৎই তৈরি হওয়া এই সংকটে স্বয়ং ভগবান ব্রহ্মা বিষ্ণু তখন দিশেহারা। তারা শান্ত করার চেষ্টা করছেন স্বভাবত শান্ত দেবী পার্বতীকে। পুত্রশোকে তিনি তখন ধ্বংসের প্রতীক হতে চলেছেন।
ভগবান ও অন্যান্য দেবতাদের কাতর আবেদনে মা পার্বতীর অন্তরের স্বভাব শান্তি যেন ফিরে আসে। তবে তিনি দুটি সহজ শর্ত দেন উপস্থিত সকলকে।
প্রথমত, যে কোনও উপায়ে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে তার আদরের পুত্রের। এবং দ্বিতীয়ত, এই পুত্রের অসীম গুণাবলী, স্বভাবের পুরস্কার প্রয়োজন। এবং তা হবে চমকপ্রদ। সুতরাং সমস্ত পুজোর আগে গনেশ বন্দনা করতেই হবে।
মায়ের ইচ্ছা এক কথায় পূর্ণ করলেন ব্রহ্মা বিষ্ণু। কিন্তু ধড়ের থেকে পৃথক হওয়া মাথা স্থাপন সম্ভব হলো না।
মহাদেবের আদেশে এক অনুচর প্রথম সাক্ষাৎ হওয়া যে প্রাণীরর মাথা নিয়ে এলো, তা বলা বাহুল্য হাতির। এই গজমুন্ড বিশ্বস্ততার এক অসামান্য প্রতীক। হাতি যেমন ধীর স্থির শান্ত ও বুদ্ধিমান – গনেশের মধ্যেও তা বর্তমান।
কিন্তু হিন্দু ধর্মের বাস্তু বিচারে গনেশ মূর্তির নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আছে।
গণেশের দেহ যেমন তার মা তথা দেবী পার্বতীর সৃষ্টি, গজমুণ্ড তথা মস্তক বা চৈতন্য তাঁর পিতা মহাদেবের দান। হিন্দু পুরাণে পার্বতী আমাদের সংসারে অন্নপূর্ণা। আর শিব সংসারে এক সন্ন্যাসী যেন, সংসার উদাসীন। গণেশের মধ্যে এই দুই বিপরীত মেরুই রয়েছে।
মূর্তিতত্ব বলছে, শিব থাকেন ডান দিকে, পার্বতী বাম দিকে। আর গনেশের স্থান দুজনের মধ্যেখানে। অর্থাৎ গনেশের শুঁড় যদি ডান মুখী হয়, তবে সেই মূর্তির মধ্যে রয়েছে ঔদাসীন্য। সংসারী মানুষের ঘরে এই উদাসীনতা ভালো নয়।
আর বাম দিকে শুঁড়ের গমন মানে সেই মূর্তি মা পার্বতীর মতো অন্নপূর্ণা হয়ে উঠতে পারে সংসারে। সংসারী মানুষ সুখ ও শান্তি চায়। সমৃদ্ধি চায়। বাম মুখী শুড়ের গনেশ মূর্তি বাস্তু শাস্ত্রে সুখী গৃহ কোণের প্রতিভূ।
এ ছাড়াও গনেশ মূর্তির রঙ বা তাঁর উপবিষ্ট বা দন্ডায়মান মূর্তির বাস্তু-ব্যাখ্যা রয়েছে।
যারা নিজের আত্মার অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকেন সতত, অর্থাৎ জাগতিক অন্য বিষয়ে ততটা আগ্রহী নন, তারা গৃহে রাখেন সিঁদুর রঙা মূর্তি। নচেৎ, গৃহে সুখ শান্তির জন্য প্রয়োজন শ্বেত গণেশ।
গনেশ মূর্তি স্থাপনেরও রীতি আছে। গৃহে উপবিষ্ট গনপতি রাখলে, সুখ শান্তির স্থায়ীত্ব বৃদ্ধি পায়। আবার কর্মক্ষেত্রে এই উপবিষ্ট গনেশ কিন্তু মানানসই নয়। সেখানে কর্ম চঞ্চলতার জন্য প্রয়োজন দণ্ডায়মান গনেশ।
তবে যে মূর্তিই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, বাহন ইঁদুর না থাকলে গনেশ সেই গৃহে স্থির হন না। অপছন্দ হয়ে যায় সেই গৃহ।
তবে অনেকে জানেন না বলে যেখানে যত সুন্দর গনেশ মূর্তি পান, কিনে নিয়ে এসে ঘরে স্থাপন করেন।
গৃহে বা কর্মক্ষেত্রে এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। গৃহে বা কর্মক্ষেত্রে একটিই মূর্তি রাখা বাঞ্ছনীয়।