অষ্টসিদ্ধি।
কঠোর তপস্যার পর ভগবান কৃপাদৃষ্টি দিলে অষ্টসিদ্ধি লাভ হয়। এই অষ্টসিদ্ধির প্রথম সিদ্ধির নাম ‘অণিমা’। এই সিদ্ধিতে ইচ্ছে করলেই নিজেকে অনুর মতো ক্ষুদ্র বা একেবারে অদৃশ্য করে রাখা যায়। এবং ওই রকম অদৃশ্য হয়ে যত্র তত্র ভ্রমণ করতে পারা যায়।
গন্ধর্বরাজ পুস্পদন্ত ছিলেন অতিশয় শিব ভক্ত। কঠোর তপস্যার পর শিবের কৃপায় অষ্টসিদ্ধি লাভ করলেন একদিন।
অতঃপর পুস্পদন্তের প্রিয় বিষয় হয়ে উঠলো নিয়মিত ‘অনিমা’ সিদ্ধির চর্চা করা। অর্থাৎ নিয়মিত প্রায় অদৃশ্য হয়ে আকাশ পথে ভ্রমণ তার কাছে যেন নেশার মতো হয়ে উঠলো।
আকাশ পথে সূক্ষ্ম দেহে তথা অদৃশ্য হয়ে ভ্রমনের মধ্যে এক বিশেষ আমোদ রয়েছে। পুস্পদন্ত নিজে কারো নজরে থাকছেন না, অথচ, ভূলোকের সব কিছুই তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন।
‘অনিমা’ সিদ্ধি প্রাণ ভরে উপভোগ করতে শুরু করলেন।
আকাশ পথে একদিন দেখতে পেলেন কাশীরাজের পুস্প বাগান। পুস্পে পুস্পে এক অপূর্ব মৌতাত। অদৃশ্য পুস্পদন্ত বাগানের একেবারে উপরে নিজের অস্তিত্ব অদৃশ্য রেখে দেখতে পেলেন, সেই অপরূপ বাগানে যত ফুল রয়েছে, সকালের দিকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে বাগানের মালী ও কাশীরাজের রাজকন্যেরা তুলে নিয়ে যায়। সেই সব পুস্পের কিছুটা দিয়ে গাঁথা হয় মালা। বাকিটা পূজার উপাচারে চলে যায় অন্দর মহলে।
বাবা বিশ্বনাথের মন্দির রয়েছে রাজপ্রাসাদের অদূরে। ওই মন্দিরে রাজা স্বয়ং যান পূজা দিতে। আর রানি তো রোজই পূজা দিতে যান প্রত্যূষে। আর বলাই বাহুল্য, পুস্পদন্তের নিজস্ব এমন অপূর্ব শিব মন্দির রয়েছে নিজেরই গৃহে।
পুস্পদন্ত মহাদেব শিবের বড় ভক্ত। কাশীরাজের বাগানের ফুল দেখে তার মনে মহাদেবের কথাই প্রথম মনে হলো। আহা, এই বাগানের এত হরেক ফুল, এমন অপূর্ব এই ফুলগুলির ঘ্রাণ, আর কী অপূর্ব এক একটি ফুলের গড়ন। দেখলে মনে হয় স্বয়ং ঈশ্বর অবস্থান করছেন প্রতিটি পুষ্পে।
অদৃশ্য পুস্পদন্ত নেমে এসেছেন পুস্প শোভিত বাগানে পরের দিন অতি প্রত্যূষে। মালি বা রাজপ্রাসদের কন্যেদের পুষ্প সংগ্রহের সময় এখনো কিছুটা দেরি।
পুস্পদন্ত কাল বিলম্ব না করে সমস্ত ফুল আহরণ করলেন তার নিজের ফুলের সাজিতে। আজ তিনি পরম তৃপ্তিতে মহাদেবকে পূজার অর্ঘ্য সাজিয়ে দেবেন।
এদিকে ফুল তুলতে এসে মালীরা হতবাক। রাজকন্যেরা। কোনও গাছে ফুল নেই।
রাজার কাছে খবর গেল। কাশীরাজ বেশ বিস্মিত ও পরে ক্রুদ্ধ হলেন। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন বাগান থেকে ফুল চুরি করে নিয়ে যায় – এমন কে দুঃসাহসী?
পরের প্রত্যূষেও একই ঘটনা ঘটলো।
বাগানে এসে মালিরা দেখলো, একটিও ফুল নেই।
কাশীরাজ রাজসভায় প্রকাশ্যে মন্ত্রীকে সহাস্যে জিজ্ঞেস করলেন, আমার রাজত্বে কী এতই দুর্দিন এসে গেল হয়ে মহা মন্ত্রী, মানুষ পুষ্প পর্যন্ত চুরি করতে শুরু করেছে।
মন্ত্রী পরামর্শ দিলেন, এক প্রহরী রাখা হোক, দুষ্ট চোরটিকে হাতে নাতে পাকড়াও করার জন্য।
কিন্তু এক বা একাধিক প্রহরী কেন, স্বয়ং সেনাপতি সরেজমিনে এসেও কিছুই করতে পারলেন না। অদৃশ্য পুস্পদন্ত মহা আনন্দে মহাদেবের জন্য পুষ্প সংগ্রহের নেশায় মেতে রইলেন।
কাশীরাজ এবার পড়লেন মহা দূর্ভাবনায়। ফুল চুরির মতো তুচ্ছ বিষয় রাজ্যে চর্চার বিষয় হয়ে উঠলো। কারণ ততদিনে এই রটনা হয়ে গেছে, কোনও মায়াবী ব্যক্তি এসে উপস্থিত হয়েছেও রাজ্যে। যে অদৃশ্য এবং সে নিয়মিত পুষ্প বাগান তছনছ করছে। না, কোনও গাছের ক্ষতি সে করে না। কিন্তু একটি ফুলও সে ছাড়ে না। সমস্ত ফুল তুলে নিয়ে যায়। তাকে ধরা যায় না।
অতঃপর কাশীরাজ কাশীর সিদ্ধ যোগীদের শরন নিলেন। রাজ্যে এমন অভূতপূর্ব উৎপাত তিনি কখনও দেখেন নি।
সিদ্ধ যোগীরা পরের দিনই যোগ সাধনায় বসে টের পেলেন রাজা পুস্পদন্তের অস্তিত্ব। কিন্তু কী করে এই অদৃশ্য ব্যক্তিকে প্রতিহত করা যায়?
কাশীরাজ বা কাশীর সিদ্ধ যোগীরা কেউই জানেন না যে, পুস্পদন্ত অষ্টসিদ্ধি লাভ করা এক যোগী। কিন্তু এই অদ্ভুত ঘটনাটি তাদের বিচলিত করে রেখেছে।
কাশীর যোগীরা নিদান দিলেন, মহারাজ, আপনি নিজ হস্তে বাবা বিশ্বনাথের পবিত্র নির্মাল্য ও অভিষেকের জল নিয়ে বাগানে ছড়িয়ে দিন। এতে ওই মায়াবী যখন বাগানে উপস্থিত হবে, তখনই ওর শক্তি হারাবে। এবং ওই পুস্প-তস্কর দৃশ্য হবে ও ধরা পড়বে।
তাই হলো। রাজা বাবা বিশ্বনাথের পবিত্র নির্মাল্য ও অভিষেকের জল ছড়িয়ে দিলেন বাগানময়।
এবং পরের প্রতূষে রাজা পুস্পদন্ত বাগানে ফুল তুলতে গিয়ে ‘অনিমা’ শক্তি হারিয়ে ফেললেন। তখন তিনি সাধারণ আর দশটা মানুষের মতো প্রকাশ্য। তার যোগ শক্তির ক্ষয় হলো, তবে তা সাময়িক ভাবে ।
কাশীরাজার স্বয়ং সেনাপতি পুস্পদন্তের সম্মুখে উপস্থিত। আশপাশে সৈন্যরাও বিস্মিত হয়ে রাজবেশি অত্যন্ত সুদর্শন গন্ধর্ব রাজ কে দেখছে।
কিন্তু চৌর্য বৃত্তি তো ক্ষমাহীন অপরাধ। তাই সেনাপতি এগিয়ে এসে বললেন, হে রাজন, আমি জানি না আপনি কে? আমি নিরুপায়, আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।
পুস্পদন্ত বিপদ আন্দাজ করে তৎক্ষণাৎ শিব স্তব শুরু করলেন বেশ উচ্চগ্রামে। অপূর্ব সুললিত সে স্তব। তেমনই অসামান্য তার গলার সুর।
রাজ সেনাপতি, অন্য সৈন্যরা তো বটেই, মহাত্মা যোগীরাও সেই স্তব পাঠ শুনতে পেলেন। তারা প্রথমে বিস্মিত ও পরে মোহিত হয়ে গেলেন। প্রত্যেকে বিভোর হয়ে গেলেন এমন অভূতপূর্ব কন্ঠের স্তবে।
তারা বুঝলেন, কোথাও কিছু অন্য ঘটনা রয়েছে। এ চোর কোনও সাধারণ ব্যক্তি নয়, মহাদেবের এক পরম ভক্ত।
অন্যদিকে মহাদেব শিব বিচলিত হয়ে পরিস্থিতি বুঝতে পারলেন। তিনি বিশ্বনাথ, তিনিই মহাদেব। তিনি তৎক্ষণাৎ পুস্পদন্তের যোগ শক্তি ফিরিয়ে দিলেন।
মুহুর্তে সকলের চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন পুস্পদন্ত।
কাশীরাজ বিস্মিত ও বিমূঢ়। তবে তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এলেন কাশীর অন্য যোগী মহাত্মারা। তারা কাশীরাজকে বললেন, হে মহারাজ, এই ফুল চোর কোনও সামান্য ব্যক্তি নন। স্বয়ং মহাদেবের বরপ্রাপ্ত এক সাধক। এই সাধক অষ্টসিদ্ধি লাভ করেছে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, ফুল চুরি করে সে শিবের পদেই অর্পণ করছে।
কাশীরাজ শান্ত হলেন। এবং পরের দিন থেকে দেখা গেল, বাগানের মাত্র একটি ফুল নিয়ে যাচ্ছেন অদৃশ্য শিবভক্ত সাধক।
পুস্পদন্ত আকাশ পথে নেমে এসে একটিই পছন্দ মতো পুষ্প সংগ্রহ করে ফিরে যেতেন।