তর্পণের কাহিনিঃ কর্ণের পিতৃপুরুষকে অন্ন-জল দান

মহাভারতের কর্ণ চরিত্রের যে বিপন্নতা ও বেদনা, তা চিরকাল সব বয়সের সব পাঠককে ছুঁয়ে যায়। অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর – কিন্তু তাঁর যথোপযুক্ত সম্মান পাননি।
কেন পান নি – এই প্রশ্নের মধ্যাই লুকিয়ে রয়েছে অন্য উত্তর।
বীর কর্ণের জন্মের কাহিনিটি আগাগোড়া ধোঁয়াশা। তাঁর পিতৃ পরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে – অপদস্থ করার চেষ্টা হয়েছে।
অতঃপর মহাভারতের যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিক দিনে মহাবীর কর্ণর পরাজয় ও মৃত্যু ঘটে। যার পিছনে ছিল তার অভিশপ্ত হওয়ারও এক কাহিনি। (সে কাহিনি পৃথক, এখানে আলোচ্য নয়)
এই দিনটির আগের রাত্রি ছিল মহাবীর কর্নের জীবনে সম্ভবত সেরা রাত। যদিও তা উপভোগ করার উপায় ছিল না।
সেদিনের যুদ্ধ শেষে কৌরব পক্ষ মুগ্ধ ও আশান্বিত কর্ণের বিক্রমে। আর ঠিক ততটাই মুহ্যমান পান্ডবেরা। কারণ কর্ণ যে একাই একশো হতে পারেন, তার নমুনা যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে।
অতঃপর এক কূটনীতির লড়াই হলো।
সন্ধ্যার আঁধারে কর্নের অস্থায়ী ঠিকানায় উপস্থিত হলেন কুন্তি।
সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর প্রথম তাদের মুখোমুখি পরিচয় ও কথা।
কর্ণ জানতে পারলেন, তাঁর জীবন কাহিনিতে আদতে কোথাও কোনও ধোঁয়াশা নেই। আদতে তিনিও পান্ডব পক্ষ। পঞ্চপান্ডব তার পাচটি ছোট ভাই। কুন্তি তার জননী। স্বয়ং সূর্যদেব তাঁর পিতা।
রাজকুমারি কুন্তি দুর্বাসা মুনির কাছ থেকে পুত্রেষ্ঠি মন্ত্র আশীর্বাদ স্বরূপ পেয়েছিলেন। তখনও তার বিবাহ হয় নি। মন্ত্রটি কৌতূহল বশে উচ্চারন করে সূর্যদেবকে আহ্বান করেন।
মন্ত্রের শক্তিতে সূর্যদেব উপস্থিত হন। কিন্তু কুমারি হলেও মন্ত্রের শক্তি ও সম্মান রক্ষা করতে সূর্যদেবের সঙ্গে মিলিত হয়ে তার গর্ভ সঞ্চার হয়। পরে জন্ম হয় কর্ণের।
লোকনিন্দার ভয়ে কুন্তি সেই পুত্রকে একটি বেতের ছোট্ট জায়গায় রেখে অজানার উদ্দেশ্যে ভাসিয়ে দেন।
ভীষ্মের সারথি অধিরথ ও তার স্ত্রী রাধা দেবী তাকে লালন করেন।
যুদ্ধের ক্লান্ত সন্ধ্যায় স্বয়ং জন্মদাত্রী মা কুন্তি এসে তার জন্ম পরিচয় অবগত করার পর দিন অস্ত্র প্রয়োগের কৌশল ভুলে যাওয়ার অভিশাপে কর্নের মৃত্যু হয়।
অতঃপর দেবলোকে নতুন অতিথি হিসেবে আগমন ঘটে মহাবীর কর্নের। কিন্তু অন্ন জলের পরিবর্তে তাকে আহারের জন্য দেওয়া হয় স্বর্ণ।
বিস্মিত কর্ণকে কারণটি জানান দেবরাজ স্বয়ং।
দেবরাজ ইন্দ্র বলেন, হে বীর। দাতা কর্ণ হিসেবে তুমি মর্ত্যে পরিচিত ছিলে। তুমি প্রচুর স্বর্ণ দান করেছো। কিন্তু কখনই পিতৃপুরুষের উদ্দেশে অন্ন ও জল দান করো নি।
কর্ণ শান্ত স্বরে জানান, হে দেবরাজ, আমি আমার মৃত্যুর মাত্র আগের রাত্রে আমার জন্ম পরিচয় অবগত হয়েছি। আমি সুযোগ পাইনি, সময়ও তো মেলেনি যে পিতৃ পুরুষকে অন্ন-জল প্রদান করবো।
দেবরাজ বুঝলেন, ভুল হয়ে গেছে।
তখন কর্ণকে পনেরোটি দিবস ও রাত্রের জন্য, মর্ত্যে প্রেরন করলেন দেবরাজ ইন্দ্র।
এই পনেরো দিন অর্থাৎ এক পক্ষকাল ধরে কর্ণ তাঁর পিতৃ পুরুষকে অন্ন-জল দিলেন।
কর্ণের মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে অন্ন-জল দেওয়ার এই যে পনেরোটি দিন, এই পক্ষের নাম স্মরনীয় হয়ে রইল পিতৃপক্ষ নামে।