দেবাদিদেব মহাদেবের জন্ম-কথা

কোনও বেদ, পুরাণ বা কোনও ধর্মগ্রন্থে ভগবান শিবের জন্ম নিয়ে কোথাও কিছু লেখা নেই। দেবাদিদেব মহাদেব নিয়ে মূল যে কথাটি আমরা হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে পাই, তা হলো, ভগবান শিব নিরাকার।
অর্থাৎ শিবের কোনও আকার নেই, তাই কোনও রূপও নেই। বরং এটাই বলা যায়, কোনও আকার, কোনও জ্ঞানের আধারে মহাদেবকে রাখা যায় না। শিব অনন্ত ও বিশাল।
শিবের জন্ম নিয়ে খুবই কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনি রয়াছে।
নিরাকার, অনন্ত দেবাদিদেব সৃষ্টির নির্মাণ করার জন্য ভগবান বিষ্ণুর সৃষ্টি করেন।
এবং ভগবান বিষ্ণুর নাভি থেকে উৎপত্তি হলো ভগবান ব্রহ্মার।
কিন্তু সৃষ্টির অত্যন্ত আদিকালে এই দুই দেবের ধারণা ছিল না – তাঁরা কোথা থেকে এসেছেন বা তাঁদের জন্ম কীভাবে হয়েছে।
দুজনেই প্রবল পরাক্রান্ত ও শক্তিশালী। দুজনেই নিজের নিজের ভাবনায় প্রবল অহংকারী। এবং ফলত, দুজনেই একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীও। অতি সামান্য বিষয় নিয়েও দুজনের মধ্যে শুরু হয়ে যেত অবান্তর ও নাছোড় তর্ক।
তর্কের বিষয় শেষ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হতো – কে বেশি শক্তিশালী, তা নিয়ে। কে শক্তি, সামর্থ্যে বড়।
শুধু মুখের তর্ক নয়, নিজেদের শক্তি জাহির করতে ও নিজেকে সর্ব শক্তিমান প্রমান করতে ভগবান বিষ্ণু ও ভগবান ব্রহ্মার মধ্যে শুরু হয়েছিল এক দী-র্ঘ সময়ের যুদ্ধ।
দশ হাজার বছর চলল দুই প্রবল শক্তির যুদ্ধ। যেহেতু কেউ কারো থেকে কম নয়, এই যুদ্ধের কোনও ফয়সালাও হলো না। হওয়ার কথাও নয়।
অতঃপর দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর নিজের সৃষ্টির এই পরিনতি দেখে আসরে নামলেন।
এক সুবিশাল পাথরের আকারে ভগবান শিব দুই যোদ্ধার মাঝে এসে উপস্থিত হলেন। ওই প্রস্তর খন্ড সাধারণ নয়। এক অগ্নির প্রকাশ দেখা গেল ওই প্রস্তর খন্ডে। এক উজ্জ্বল আভা।
বিষ্ণু ও ব্রহ্মা নিজেদের লড়াইএর মাঝে এমত একটি প্রস্তর খন্ডের আচমকা উপস্থিত হওয়ায় কিঞ্চিৎ চমকিত হলেন।
দুই ভগবানকে আরো চমকিত করে আকাশবানী হলো – এই প্রস্তর একটি লিঙ্গের প্রতীক। তোমরা দুই যোদ্ধা পরস্পর লড়াই করছো, কে বেশি শক্তিশালী তা প্রমাণ করার জন্য।
এখন এই যুদ্ধের অন্ত হওয়া প্রয়োজন। সেজন্যই এই প্রস্তর খন্ড তোমাদের সামনে স্থাপন করা হলো। এই প্রস্তর খন্ড তথা লিঙ্গের প্রতীকের আদি ও অন্ত দুই জনকে গনণা করতে হবে। যে যোদ্ধা আদি অথবা অন্ত তথা প্রস্তর খন্ডের শুরু ও শেষ স্পর্শ করতে পারবে, যুদ্ধে সেই জয়ী হবে। সে-ই হবে শ্রেষ্ঠ।
আকাশবানী শুনে, নিজেদের বিবাদ থামিয়ে দুই যোদ্ধা দুই দিকে রওনা হলেন।
ভগবান বিষ্ণু গেলেন প্রস্তর খন্ডের নীচের দিকে – তার অন্ত রূপ অন্বেষনে।
এবং ভগবান ব্রহ্মা গেলেন আদির খোঁজে, অর্থাৎ প্রস্তর খন্ডের উপরের দিকে।
বছরের পর বছর কেটে গেল। ভগবান বিষ্ণু অন্তের খোঁজে চলেছেন তো চলেছেন। কিন্তু প্রস্তর খন্ডের অন্ত অর্থাৎ শেষ কিছুতেই খুজে পেলেন না।
ভগবান বিষ্ণু বুঝলেন আকাশবানীর মহাপ্রভু আসলে অনন্ত শক্তিশালী। তিনি বশ্যতা মেনে নিয়ে ফিরে এলেন। করজোড় করে প্রস্তর খন্ডের উদ্দেশে বললেন, হে প্রভু। আমায় ক্ষমা করবেন। আমি অহং-এ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। নিজেকে সবচেয়ে বেশি শক্তিমান মনে করেছিলাম। কিন্তু এখন আমার দম্ভ বিনষ্ট হয়েছে। আমি আপনার অন্তের সন্ধানে খুঁজে বেরিয়েছি। কিন্তু এ আমার সাধ্যের অতীত, আমার প্রণাম গ্রহণ করুন প্রভু।
এদিকে ব্রহ্মার যাত্রাপথ ছিল আদি অর্থাৎ প্রস্তর খন্ডের আরম্ভের দিকে। অনন্ত ওই পাথরের অন্ত যেমন নেই, আদিও তেমনই নেই। আসলে শিবলিঙ্গের সবটাই নিরাকার। কিন্তু ক্ষমতার মোহে ব্রহ্মা ভুলে গেলেন, তিনি এক অনন্ত শক্তির সন্ধান করছেন। যার আদি ও অন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।
কিন্তু ব্রহ্মা একটু চালাকি তথা মিথ্যার আশ্রয় নিলেন। তিনি আদি তথা আরম্ভের সন্ধানে বিষ্ণুর মতোই বছরের বছর চলেছেন। অগত্যা ছলনার আশ্রয় নিয়ে ফিরে এসে বললেন, আমি আরম্ভ খুঁজে পেয়ে গেছি।
তাঁর মতলব ছিল, এইটা বলে তিনি ভগবান বিষ্ণুর থেকে শ্রেষ্ঠ, তা প্রমান করবেন।
কিন্তু হিতে হলো বিপরীত।
অহংকারী ও মিথ্যেবাদী ব্রহ্মা আকাশবানী শুনতে পেলেন, এইটি আসলে শিবলিঙ্গ। এর কোনও আকার হয় না। নিরাকার, অনন্ত। অর্থাৎ এই প্রস্তর খন্ডের না আছে শুরু, না আছে শেষ। তুমি মিথ্যা কথা বলছো।
আকাশবানী শুনে ব্রহ্মার মনে ভীতির সঞ্চার হলো।
আর ঠিক তখুনি আকাশবাণী হলো, আমি ভগবান বিষ্ণুকে আশীর্বাদ করছি ও ভগবান ব্রহ্মাকে অভিশাপ দিচ্ছি। ভগবান বিষ্ণুর পুজা হবে, কিন্তু ব্রহ্মার হবে না।
নিজের অন্যায় বুঝতে পেরে ব্রহ্মা তৎক্ষণাৎ ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। শিব তাঁকে ক্ষমা করে দিয়ে অবশেষে বর দিলেন।
অতঃপর বিষ্ণু ও ব্রহ্মা দুজনেই করজোড়ে সেই বিশাল, নিকষ ও অনন্ত প্রস্তর খন্ডের উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রণাম নিবেদন করে প্রার্থনা করলেন, হে অনন্ত শক্তিশালী, হে নিরাকার প্রভু, আপনি আমাদের মতোই একটি আকারে প্রকটিত হয়ে, আমাদের অভিলাষ পুর্ণ করুন।
তখন সেই প্রস্তর খন্ড থেকে দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর কাল্পনিক অবয়ব স্পষ্ট করলেন। তিনি দুই ভগবানের সামনে প্রকটিত হলেন।
এই অসামান্য কাহিনিতে আমাদের সমগ্র জীবন ধারণ করা রয়েছে। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, আসলে ধারণ করে রয়েছেন সমগ্র প্রাণী জগত।
প্রজাপালক ব্রহ্মা, সাংসারিক বিস্তারের জন্য বিষ্ণু ও সংসারে অমঙ্গল তথা বিষ পালনের জন্য স্বয়ং মহাদেব রয়েছেন। তিনজনের কর্ম পদ্ধতি যেন এভাবেই বিন্যস্ত করে দিয়েছেন দেবাদিদেব। সেখানে কেউই বড় বা ছোট নয়।
মহাদেব সম্পর্কিত কাহিনিতে সবচেয়ে বড় কথাটি হলো, ভগবান শিবের যেমন জন্ম তথা আরম্ভ নেই, তেমনই নেই তার অন্ত। এ জগত নিরাকার – মহাদেব শিবও তাই।
এ জগতে যার জন্ম হয়, তার মৃত্যু হয়। যার শুরু হয়, তার শেষ হয়। কিন্তু ভগবান শিবের শুরু বা শেষ বলে কিছু হয় না।
তিনি অনন্ত।