দেবরাজ ইন্দ্রকে ভগবান বিষ্ণুর শিক্ষা

স্বর্গের দুই বহু আলোচিত দেবতা ইন্দ্র ও মদনদেব। আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় আখ্যানে এই দুই দেবতাকে দেখা যায় সতত ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত। ষড়যন্ত্রের কারন আর কিছুই নয়, দেবরাজ ইন্দ্রকে সব সময়েই নিজের আসন টলোমলো হওয়ার আশঙ্কায় কাঁপতে দেখা যায়। আর নিজের ছলাকলা বা রিপুর তাড়না দিয়ে ত্রিলোকের দেব-মানব-অসুর, বিভিন্ন জনকে উত্তেজিত করতে ব্যস্ত দেখা যায় মদনদেবকে। অবশ্য অনেক সময়ই বিফলে যায় এই দুই দেবতার উৎপাত।
তেমনই এক উৎপাতের সম্মুখীন হতে হয়েছিল ছদ্মবেশী ভগবান বিষ্ণুকে।
যখনই কোনও দেবতা, নর বা কোনও অসুর কঠোর কোনও তপস্যায় বসেছে হিমালয়ে বা অন্যত্র, তখনই দেখা গেছে দেবরাজ ইন্দ্র অহেতুক ভয়ে কম্পমান। অবশ্য সব সময় ভয়টা অহেতুকও নয়। দেবরাজের ওই সম্মানজনক পদে অনেক অসুরেরই লোভ থাকা স্বাভাবিক। তারা তো চাইবেই ইন্দ্রকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। অন্তত সবক শেখাতে। ভগবান বিষ্ণু বা ব্রহ্মা বা স্বয়ং শিবকে তুষ্ট করে অনেক দেবতা বা অসুর বর চেয়েছে অমরত্বের। সেটা হাতানো হয়ে গেলে, স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম আক্রমণের লক্ষ্য হয় স্বর্গরাজ্য। আর তার প্রধান পুরুষ ইন্দ্র।
সুতরাং ইন্দ্রের ভয়কে সব সময় অমূলক বলাও যায় না। তবে অনেক সময়ই মদনদেব বা ইন্দ্রকে ঠকতে হয়েছে তপস্যা ভঙ্গ করতে গিয়ে। যাকে বলে নিজেদের নাক কাটা গেছে তাদের।
এ ক্ষেত্রেও তাইই হয়েছিল।
নর ও নারায়ণ – দুই ঋষি কঠোর তপস্যা শুরু করতেই ভ্রু কুঁচকে যায় ইন্দ্রের। বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ দেবতা মদন দেবের সঙ্গে শলা করতে থাকেন তিনি।
কারা এই দুই ঋষি? ???
কী জন্য তাঁরা এমন কঠোর তপস্যা করতে শুরু করেছেন হিমালয়ের কোলে বদরিকা আশ্রমে?
ইন্দ্র যথারীতি শলা করলেন মদনদেবের সঙ্গে। তাঁকে প্রায় আদেশই দিলেন, ছলাকলা করে ঋষিদ্বয়ের তপস্যা ভঙ্গ করতে।
মদনদেব তাঁর অনুচরদের তৎক্ষণাৎ আদেশ দিলেন তাঁকে অনুসরণ করতে। বদরিকা আশ্রমের দিকে যেতে হলে হিমালয়ের গভীর অরণ্যানী অতিক্রম করেই যেতে হবে। গভীর অরন্য মদনদেবের চরণধুলিতে চঞ্চল হয়ে উঠলো হঠাৎই ।
কিন্তু তপস্যারত দুই ঋষিই তো যে সে নয়। তাঁরা স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর অন্য রূপ। তাঁরা টের পেলেন পুরো ব্যাপারটা। তাঁদের চিত্তচাঞ্চল্য হলো না। বরং বেশ বিরক্ত হয়ে নারায়ন চোখ মেলে সামনে দেখতে পেলেন অনিন্দ্যকান্তি মদনদেবকে।
ঋষির চেহারা ও ক্রোধ প্রকাশের ধরণ দেখে মদনদেব মুহুর্তে বুঝে গেছেন, ভুল জায়গায় আঘাত করতে এসেছেন তিনি। কিন্তু ইতিমধ্যে তাঁর বিখ্যাত কামবাণ নিক্ষেপ জরে বসে আছেন প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবং বাণ বিফলে গেছে।
ক্রুদ্ধ বিষ্ণু মদনদেবকে দেখে চিনতে পারলেও মদন তাঁকে দেখে চিনতে পারেন নি। চিনতে পারার কথাও নয়। তবে আন্দাজ করতে পেরেছেন সাধারণ কোনও দেবতা বা নর এঁরা নন।
তাছাড়া  এঁরা এত সহজে কামবাণ জয় করে নিলেন – দেখে বুঝে তো বেশ ভয় পেয়ে গেলেন মদনদেব। শিব তথা মহাদেবের রোষে তাঁর ভষ্মীভূত হওয়ার ঘটনা তার বিলক্ষণ মনে আছে। সুতরাং তপস্বী সন্ন্যাসীর ক্রোধের সামনে কিছুটা দিশেহারা হয়েই বদরিকা বৃক্ষের নীচে হাত জোড় করে মদনদেব দাঁড়িয়ে পড়লেন।
বললেন, হে তাপস, মার্জনা করবেন, দেবরাজ ইন্দ্রের অনুচর আমি। তাঁরই আদেশে আপনার তপস্যা ভঙ্গ করতে এসেছিলাম। তবে এখানে সমস্ত রিপু জয় করা আপনিও এক তাপস। আপনি কাম জয় করেছেন। এর অর্থ আপনি ত্রিলোকের সমস্ত বাসনা কামনার ঊর্ধে।  ক্রোধ নিশ্চয়ই আপনাকে শোভা পায় না।’
বিষ্ণু মনে মনে হাসলেন। মদনদেবের এমন তৈল মর্দনের কারণ তিনি অনুমান করতে পেরেছেন। তাঁর একটি ইচ্ছে হলো। তা হলো মদনদেব ও ইন্দ্রের অহংকারে কিঞ্চিৎ আঘাত করা। এঁদের দুজনেরই ধারণা, দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ভোগের বস্তু এরাই শুধু পরিবেশন করতে সক্ষম।
ভগবান বিষ্ণু অতঃপর তাঁর অসীম ক্ষমতার সামান্য প্রয়োগ করলেন। তিনি মদনদেবকে ওই বদরিকা বৃক্ষের নীচে মায়াবলে দেখালেন বেশ কয়েকজন অসামান্যা সুন্দরী রমণীকে।
কামের দেবতা মদনদেব। তাঁর চেয়ে আর ভাল কে বোঝে সুন্দরী রমণীর মায়াজাল! এবং দেবরাজ ইন্দ্রের ধারণা জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী রমনী একমাত্র তাঁরই সভায় শোভাবর্ধন করেন।
এ যে কত বড় ভুল, তা বুঝে গেলেন মদনদেব। ভগবান বিষ্ণু তাঁর অসীম ক্ষমতাবলে যে সালংকারা রমনীদের ওই বৃক্ষের নীচে দেখালেন একের পর একজনকে, তাতে চোখ কপালে উঠে গেল তাঁর।
ভগবান মনে মনে হাস্য করলেন। তিনি এই দুই অহংকারীকে তাঁদের তাচ্ছিল্যই করতে চেয়েছিলেন। সুতরাং এবার বললেন, দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় এমন সুন্দরী রমনী কখনো দেখে নি কেউ। এদের মধ্যে যাকে তোমার সবচেয়ে আকর্ষনীয় মনে হচ্ছে, তাকে বেছে নাও। তাকে তোমাদের স্বর্গবধূরূপে ইন্দ্রের সভায় নিয়ে যেতে পারো।
দেববধূদের অসামান্য রূপ দেখে মদনদেবের অহংকার ততক্ষণে চূর্ণ হয়েছে।
তিনি স্বর্গবধূরূপে যাকে বেছে নিলেন – তিনিই পরে ত্রিলোকের সবচেয়ে সুন্দরী রমনী – ঊর্বশী রূপে স্বীকৃত হয়েছেন।
আর দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় ঊর্বশীর পরিচয় প্রদান করেছিলেন যখন, তখন তার চোখে মুখে ছিল এক দারুণ মুগ্ধতা ও আবতরিকতা। এমন সৌন্দর্য তিনি কখনও দর্শন করেন নি, মদনদেবের এমন সোচ্চার মত প্রকাশে দেবরাজ ইন্দ্রেরও সায় ছিল। কারণ ইতিমধ্যে অহং ভঙ্গ হয়েছিল দেবরাজ ইন্দ্রেরও।