গ্রন্থ সমালোচনা — শ্রীসুহৃদ কুমার ভৌমিক (গ্রন্থ সমালোচক)

    অধ্যাপিকা শ্রীমতী ছন্দা ঘোষালের লেখা বিশাল শবর সম্প্রদায়ের ‘‘পাহাড়ি খাড়িয়া’’ নামে পুস্তকটি আলোচনার জন্য আমার নিকট আসিয়াছে। লেখিকা Austro-Asiatic কোলগোষ্ঠীর একটি প্রাচীন শাখা ‘খাড়িয়া’ জনজাতির উপর চমৎকার বিবরণ দিয়াছেন। তিনি পাহাড়ি খাড়িয়াদের কিছু কিছু গ্রামে গিয়া যে অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়াছিলেন— তাহারই ভিত্তিতে লেখা এই বিবরণ। খুবই সুখপাঠ্য এবং যাঁহারা নৃ-বিজ্ঞানের নহেন তাঁহারাও পড়িতে আগ্রহী হইবেন।
    ভারতের প্রাচীনতম জনজাতি Austro-Asiatic গোষ্ঠীর এই আদিম শাখাটি বর্তমানে Primitive tribe নামে চিহ্নিত এবং বিচ্ছিন্নভাবে নানা স্থানে আছেন এবং কোথাও কোথাও Hindu Method of Tribal Absorption অনুসারে — বৃহৎ ভারতীয় তথা হিন্দু সমাজের কোনোও স্তরে প্রবেশাধিকার না পাইয়া ইসলাম ধর্মগ্রহণে বাধ্য হইয়াছেন।
    এক সময় আমি খাড়িয়া জন-জাতির প্রতি উৎসাহী হই এবং বেশ কিছুদিন কাজ করিবার পর Ethno-Linguistic Study of the Kharias নামে একটি বৃহৎ প্রবন্ধ Bulletin of the Cultural Research Institute-এ (Vol. XIV No. 1-2) ১৯৮০ খৃষ্টাব্দে প্রকাশ করি। ইহার কিছুদিন পরে ১৯৮২-৮৩ খৃষ্টাব্দে ডাল্টনগঞ্জ যাই ও কোয়েল নদীর তীরে তীরে যে সমস্ত খাড়িয়া পল্লী ছিল সেগুলিতে সাইকেল করিয়া অনুসন্ধান চালাই। ডাল্টনগঞ্জের জনপ্রিয় সমাজসেবক, বন্ধুরা মুক্তির (Bonded labour) প্রধান আন্দোলনকারী, রামেশ্বরম আমার সমস্ত প্রকার সুবিধার কথা ভাবিয়া তাঁহার বাড়িতে আশ্রয় দিয়া সাহায্য করিয়াছিলেন। তিনি সাংবাদিক ছিলেন। ‘ইস্যুমান’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকার তিনি সম্পাদক ছিলেন এবং তাঁহার বাড়িতেই আশুপ্রেস নামে একটি বিরাট পাঞ্জাবী চিত্তাল মেশিনের প্রেস ছিল।
২.    বারানসী কলেজের অঙ্কের অধ্যাপক এবং সাব ডেপুটি কালেক্টর ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে ‘Introduction to the Kharia language’ নামক পুস্তকটি তৎকালীন Bengal Secretariat Press হইতে ছাপা হয়। ঐ পুস্তকে কোয়েলের তীরে তীরে যে সমস্ত Kharia-settlement-এর উল্লেখ আছে সেই সমস্ত স্থানে আমি যাই — প্রায় এক শত বৎসরে খাড়িয়া ভাষার কি পরিবর্তন ঘটিয়াছে — তাহা দেখিবার জন্য। মাইলের পর মাইল সাইকেল করিয়া খাড়িয়া ভাষার নমুনা ত দূরের কথা কোনো খাড়িয়া পল্লীও পাইলাম না।
    তাহাদের ভাষা সম্বন্ধে গগনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শতাধিক বর্ষপূর্বে বলিয়াছিলেন, “Most of them do not know Hindi. Only those who now and then attend the courts can speak and understand Hindi a little.”
    আসলে ডাল্টনগঞ্জ অঞ্চলের লোকের ভাষা ছিল সাদরি বা নাগপুরিয়া। বাংলা ভাষার সংগঠনে প্রাথমিক স্তরে এই অঞ্চলের ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বাঙলা বিভাগের পূর্বে ডাল্টনগঞ্জ বঙ্গেরই অংশ ছিল। খাড়িয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে গোপালনের প্রতি আগ্রহ ছিল। মাত্র এক শত বৎসেরর মধ্যে তাহারা খাড়িয়া নাম বাদ দিয়া গোপালনের সাহায্যে জীবিকা অর্জন করে ও গোয়ালা হিসাবে পরিচিত হয়।
    একসময় উহারা দুগ্ধজাত দ্রব্য — মাখন, ঘি, ছানা, দধি ইত্যাদি বিক্রয় করিয়া যাদব হিসাবে পরিচিত হয়। আবার মেদিনীপুর অঞ্চলে যে সমস্ত খাড়িয়া এই জীবিকায় যোগ না দিয়া নানা ভাবে এই শিকার-জীবনকে ধরিয়া রাখিল তাহারা খাড়িয়া নামে পরিচিত হয়। মেদিনীপুর অঞ্চলে মুসলমান ও খেড়িয়া (খাড়িয়া) সমার্থক হওয়ায় বুঝা যায় ইহাদের একাংশ নানা কারণে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে।
    অধ্যাপিকা ছন্দা ঘোষালের ‘‘পাহাড়ি খাড়িয়া’’ নামক পুস্তক পাঠে (Hill Kharia) আমার বহু পুরাতন স্মৃতি মনে পড়িল। তবুও যদি কোনো উৎসাহী পাঠক পাহাড়ি খাড়িয়াদের সান্নিধ্যে আসিতে চান, তাহা হইলে ঘাটশিলার নিকট মুনিডুংরি পাহাড়ে আদিম বৈশিষ্ট্যযুক্ত পাহাড়ি খাড়িয়াদের সাক্ষাৎ পাইতে পারেন। হাজার বছরের পূর্বে, পুরাতন দিনের মত এখনও ঐ শবর রমণীরা কাঁচ ফুলের মালা গলায় পরে। গাঢ় কৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশগুচ্ছের কবরী ভাগ ফুল ও ময়ূরের পেখমকে আশ্রয় দিয়া পুষ্প ও কলাপের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে ইহার উল্লেখ আছে।
            উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসই শবরী বালী।
            মোরঙ্গী পিচছ পরিহন শবরী গিবত গুঞ্জরী মালী।।
উঁচু উঁচু পাহাড়। শবর রমণীরা সেখানে ঘুরিয়া বেড়ায়। তাহাদের খোঁপায় শোভা পায় ময়ূরের পাখা আবার গ্রীবাদেশ গুঞ্জার মালার দ্বারা আবৃত।
    প্রায় ৩০/৪০ বৎসর পূর্বের ঘটনা। পুরুষেরা জ্বালানি কাঠ, শালপাতার থালা বিক্রয় করিয়া দিনান্তে ফিরিয়া আসে। আমাদের পাহাড়ি প্রান্তরে দেখিয়া কয়েকটি শবররমণী নামিয়া আসিল। তাহাদিগকে দেখিলাম কিনা সেদিকে তাহাদের ভ্রুক্ষেপ নাই। আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হইবার পূর্বে ঐ রমণীরা অতি ক্ষিপ্র গতিতে আর একটি পাহাড়ের ঢালে মিলাইয়া গেল। কোথায় ওয়ার্ডসওয়ার্থের লুসি গ্রে! আমার সহযোগী বন্ধু ছবি তুলিবার অবকাশও পাইল না।
পাহাড়ি খাড়িয়াদের ভাষা
    পুস্তকের শেষাংশে খাড়িয়াদের ভাষা বিশ্লেষণ ও শব্দ ভাণ্ডারের যে দৃষ্টান্ত লেখিকা দিয়াছেন সেগুলি খাড়িয়া ঠার হিসাবে পরিচিত। বাঙলা ভাষা-বলয়ের মধ্যে বিভিন্ন আদিম জনজাতি তাহাদের বসবাসের সীমানার বাহিরে বৃহত্তর সমাজের মানুষের সহিত যোগাযোগের জন্য বাঙলা বলিতে বাধ্য হয় এবং তাহাদের ব্যবহৃত ভাষায় বাঙলাও পরিবর্তিত হইয়া যায়। ঠিক এই পদ্ধতিতেই ভারতের বিভিন্ন জনজাতি, সংস্কৃত ভাষানুযায়ী বহু প্রাকৃত ভাষার সৃষ্টি করিয়াছিল এবং ঐ প্রাকৃত ভাষাগুলিতে বিচিত্র প্রাচীন জনজাতির উপাদানগুলি লক্ষিত হয়।
    এখানে প্রাচীন খাড়িয়া ভাষার সামান্য দৃষ্টান্ত দিতেছি। দেখা যায় পাহাড়ি খাড়িয়াদের যাহারা এখনও সমতলে নামে নাই, তাহাদের শব্দ ভাণ্ডারে এসব অনেক শব্দ আছে যেগুলি আদিম মুণ্ডা ভাষার তুলনায় প্রাচীন। 
দৃষ্টান্ত —  বিলোম — পাকা, পাকানো, ফল ইত্যাদি। সাঁওতাল ভাষায় বেলে।
ঢিলা — ঢিলা, বাঙলা ঢিলে ঢালা। সাঁওতালি ও মুণ্ডাতে ঢিলŠ।
লাঁডাঁ — হাসা, সাঁওতালি — লাঁদা।
খাড়িয়া ভাষায় ‘ইসিন’ শব্দের অর্থ গরম জলে ফুটানো। কিন্তু সাঁওতালিতে ইসিন শব্দের অর্থ — রান্না করা।
রাগম — ক্রোধান্বিত হওয়া। সাঁওতালিতে আলম রাগা-এর অর্থ রেগে যাওয়া।
খাড়িয়া ভাষায় সেবাল শব্দের অর্থ মিষ্টতা। সাঁওতালিতে সিবিল।
    শব্দে মধ্যবর্ণাগম বা infix খেরওয়াল ভাষাগোষ্ঠীর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাঁওতালিতে এই বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যবহারে মধ্য বর্ণাগম বা infix অর্থের রূপান্তর ঘটায়। যেমন- ঞেল — ঞেপেল = দেখা, দেখাশোনা দŠল — মারা। দŠল - দŠপŠল = মারামারি করা। খাড়িয়া ভাষায় সোরে অর্থাৎ শেষ করা। ‘ব’ infix হওয়ায় সোবরে অর্থাৎ শেষ করা। সাঁওতালি ও মুণ্ডাতে ‘সাবাড়’ হিসাবে গৃহীত অর্থাৎ শেষ করা।
    ভাষা ও শব্দের নৈকট্য লক্ষ্য করিলে বুঝা যায় বৃহৎ অস্ট্রো-এসিয়াটিক গোষ্ঠীর সাঁওতালি ও মুণ্ডা ভাষার লোক হইতে খাড়িয়ারা অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল।
    খাড়িয়া ভাষা সাঁওতালি ভাষার তুলনায় মুণ্ডা ভাষার নিকটবর্তী। পূর্বে যে নিঃসঙ্গ ও আদিম পরিবেশ ছিল এখন তাহা নাই — ধারণা হয় নিকটবর্তী কোনো শক্তিশালী ভাষার মাধ্যাকর্ষণের ফলে শক্তিশালী ভাষাটির বলয়ের মধ্যে মিলাইয়া যাইবে।
গ্রন্থ — পাহাড়ি খাড়িয়া। গ্রন্থকার — ছন্দা ঘোষাল। প্রাপ্তিস্থান — ভূর্জপত্র; তাঁতিগেড়িয়া, মেদিনীপুর। প্রজ্ঞাবিকাশ, ৯/৩, রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা-৯। নয়া উদ্যোগ, ২০৬ বিধান সরণী, কলকাতা-৬। প্রকাশক - শ্রীলিপি। মূল্য - ২৫০ টাকা।  
 


লেখক : আদিবাসী তথা সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যের বলিষ্ঠ লেখক ও গবেষক