করম ঠাকুর - রামচন্দ্র সিং

    পুইতু হাড়াম-পুইতু বুড়ী খুব অপ্রতিকুল অবস্থায় পৃথিবীতে বসবাস করতে আরম্ভ করল। দিনন্তর খরা, বন্যা, শীত আর ভয়ঙ্কর প্রাণীকুলের আনাগোনায় জীবন বিপন্নবোধ  করছে। এমন অবস্থায় বোধ হয় অদৃষ্ট শক্তিকে স্মরণ করে দিনযাপন করে। এইভাবে থাকতে থাকতে পুইতু হাড়াম পুইতু বুড়ী ধীরে ধীরে বড় হতে পুইতু বুড়ীর কোলে দুটি সন্তান জন্মালো। সেই সন্তান ধীরে ধীরে বড় হল। এদিকে পুইতু হাড়াম পুইতু বুড়ী সন্তানের বড় হওয়াকে প্রতিকুল অবস্থার সহায় বোধ করল। ক্রমে ঐ ছেলে দুটির নাম ধনেশ্বর আর লক্ষীশ্বর। ধনেশ্বর ও লক্ষীশ্বর মা-বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে বড় হল। লক্ষীশ্বর বেশির ভাগ সময় বাবা-মার কাছে কাছেই থাকতে ভালোবাসে। আর ধনেশ্বর একা একা থাকতে ভালোবাসে। পুইতু হাড়াম-পুইতু বুড়ী ও ধনেশ্বর এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে আর একজনের খোঁজ পায় এবং আলাপচারিতা হয়। যার সাথে আলাপ হয় সেই লোকটি ছিল নিঃসন্তান দম্পতি। সে ওদেরকে বলে যে — এই এলাকায় আমি ও আমার স্ত্রী ঠাকুর ও ঠাকুরাণীর দয়ায় খুব ভালো আছি। আমার এখানে কোনো রকমের কোনো দুঃখ কষ্ট নেই। তোমরাও ভালোভাবে এখানে থাকতে পার। ওরা পরিচয় দিয়ে বলল, আমার নাম সীবঃ রাজা। আমি এই সুন্দর জঙ্গলের ফল খাই, এইখানে বসে তপস্যা করি। আদি পিতা মাতা আমায় স্বপ্নাদেশ দিয়েছেন ফুলের বাগান বানাতে। ফুলের বাগানে যেদিন ফুল ফুটবে সেদিন আমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে।
    পুইতু হাড়াম পুইতু বুড়ী জায়গা দেখে খুব পছন্দ হলো। পুরনো জায়গার তুলনায় এখানে খুব নিরাপদ মনে হল। তাই তারা সীবঃ রাজার কাছাকাছি জায়গাতে থাকতে শুরু করল। সীবঃ রাজার কথায় পুইতু হাড়াম পুইতু বুড়ী খুব খুশী হল। সীবঃ রাজার সহানুভূতি দেখে পুইতু হাড়াম পুইতু বুড়ীর তার প্রতি অনেক আন্তরিকতা বেড়ে যায়। তাই সীবঃ রাজা যা বলে তারা তাই করে। সীবঃ রাজার অনুরোধে তারা সুন্দর একটা ফুলের বাগান বানাল এবং সেটার পরিচর্যা যত্ন সহকারে করতে লাগল। ক্রমে ক্রমে ঐ বাগানে নানা ধরনের ফুলগাছে ফুল ফুটে বাগান চারিদিক ফুলময় হল। দিনের বেলায় ফুল দেখতে পাওয়া যায় না। এমন ফুলের বাগান সারা বছর সেখানে নানারঙের নানা রকমের ফুল তার সৌরভ ছড়ায়। সুগন্ধে দিগ্বিদিক ভরে যায় ফুলের অপূর্ব শোভায় ও সুগন্ধে। নানা রকমের পাখির কলতান ও প্রজাপতিদের রঙ্গীন ডানায় স্বর্গের অপ্সরীরাও ঐ বাগানে ফুলের লোভে নেমে আসে। স্বর্গের সাতবহিনী (অপ্সরী) -রা রাতের বেলা স্বর্গরথে করে নেমে আসে বাগানে। ইচ্ছে মতো ফুলের সাজে সজ্জিত হয়ে স্বর্গে ফিরে যায়। ফলে পুইতু হাড়াম পুইতু বুড়ী সীবঃ রাজার কাছে পূজার ফুল পাঠাতে পারে না। সীবঃ রাজা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ফুলের সুন্দর গাছ থাকা সত্ত্বেও কোন অজানা কারণে ফুল দিনের বেলা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পুইতু হাড়াম পুইতু বুড়ীকে তার যুবক ছেলে লক্ষীশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে রাত্রিবেলা পাহারা দেওয়ার যেন ব্যবস্থা করে, তাহলে বাগানের রাত্রিবেলার অবস্থাটা জানা যাবে। সেইমত পুইতু হাড়াম ও তার পুত্র লক্ষীশ্বর রাত্রিবেলা পাহারা দিতে গিয়ে দেখল অপূর্ব শোভিত রথে নেমে এল সাতবহিনী (অপ্সরী)। বাগানে নেমেই ফুল তুলে অপূর্ব সাজে সজ্জিত হল এবং রথকে সাজিয়ে স্বর্গমুখী হয়ে রথে উড়ে গেল। সীবঃ রাজাকে পুইতু হাড়াম ও লক্ষীশ্বর সমস্ত কথা জানাল এবং ঐ রথকে আটকে রাখার পরামর্শ দিল সীবঃ রাজা। কিন্তু একদিন সীবঃ রাজা নিজেই গিয়ে বাগানে পাহারা দিতে থাকল; সঙ্গে পুইতু হাড়াম ও লক্ষীশ্বর থাকল। যখন মধ্য রাত্রি হয় তারা দেখে আলোক উজ্জ্বল রথগাড়ী আসছে। কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই সাত-সাতবার ডিগবাজী খেল, ফলে সীবঃ রাজার পক্ষে রথগাড়ীর কাছে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। তিতিবিরক্ত হয়ে লক্ষীশ্বর ও পুইতু হাড়ামকে যে কোনো উপায়ে অবিলম্বে রাতে আসা রথগাড়ী আটক করতে বলল। সীবঃ রাজার কথা মতো পিতা পুত্র রাত্রিবেলা ঐ রথগাড়ীর কাছে যেতেই পুইতু হাড়াম ও লক্ষীশ্বর ডিগবাজী খেল। এমন এক অলৌকিক শক্তিকে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না ভেবে তারা শোকাতুর। একদিনতো ঘরের সবাই নিরুপায় হয়ে কাঁদতে থাকল। সেই পথ দিয়ে ঠাকুর ঠাকুরাণী যাচ্ছিলেন। কান্নার কারণ জানতে চাইলে সবিস্তারে সমস্ত কথা তারা ঠাকুর ঠাকুরাণীকে বলল। ঠাকুর ঠাকুরাণী তখন শুনে উপায় বলে দিলেন যে, যদি কোথাও কোনো ব্রাহ্মণ কন্যা থাকে যে বারো বছর উপোস করে আছে, সেই কন্যা পৃথিবীর যাবতীয় নোংরা জল এনে বাগানের চারিদিকে ছিটিয়ে দিলে বাগানের ফুল আর কেউ চুরি করতে পারবে না। এমন বারো বছর উপোস করা ব্রাহ্মণ কন্যা ও তার মাকে পাওয়া গেল যে, মা যদি ভাত রান্না করে মেয়েকে ভাত নামাতে বলে, আবার মেয়ে যদি ভাত রান্না করে মাকে উনান থেকে ভাত নামাতে বলে। এই রকম করে করে মা মেয়ে কেউই আর রান্না করা ভাত বারো বছর ধরে খেতে পারে নি। দুজনেই উপোসে দিন কাটাচ্ছে। ঐ মা মেয়েকে এনে লক্ষীশ্বর ও তার বাবা মিলে পৃথিবীর যত নোংরা জল ছিল সব জল ঐ কন্যাকে দিয়ে সীবঃ রাজার ফুলের বাগানে ছিটিয়ে দিল। আগের রাতের মতো এদিনও রাতে সাতবহিনীরা রথে করে ফুলের বাগানে নেমেছে। নিজেরা সেজেছে তাদের রথগাড়ীকেও সাজিয়েছে। আর স্বর্গের পথে উড়ে যেতে চাইল কিন্তু রথের চাকা আর ঘুরল না। সাতবহিনীরা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে কী করবে ভেবে পায় না। সাতবহিনীরা বাগানে চারিদিকে খুঁজে বেড়াতে লাগল কোনো লোকের সাহায্য নেওয়া যায় কিনা। খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেল লক্ষীশ্বর নামক এক যুবককে আর এক তপসী সীবঃ রাজা নামের ব্যক্তিকে। সাতবহিনীরা জানতে চাইল কীভাবে রথ উড়ে যাবে স্বর্গের পথে। এর জন্য তাদেরকে সাহায্য করা এবং বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যা চাইবে তাই দেবে। সীবঃ রাজা ও লক্ষীশ্বর শুনে শীঘ্রই নিকটস্থ ঠাকুর রাজা ও ঠাকুর রাণীর কাছে সাতবহিনীর বিপদের কথা বললেন। ঠাকুর ঠাকুরাণী সীবঃ রাজা ও লক্ষীশ্বরকে বললেন যে, এমন ব্রাহ্মণ কন্যা চাই যে শুচি ও পবিত্র। সীবঃ রাজা ও লক্ষীশ্বর ভাবল সেই ব্রাহ্মণ কন্যার কথা। সেই ব্রাহ্মণ কন্যা ঠাকুর ঠাকুরাণীর কথা মতো ধূপ, ধূনা, মেথি, চন্দন জ্বালিয়ে বাগান শুদ্ধ ও পবিত্র করল। তারপর সাতবহিনীর রথ স্বর্গের পথে পাড়ি দিল। কিছুদূর যাওয়ার পর তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছিল বর দেওয়ার জন্য। তারা ফিরে এসে সীবঃ রাজা ও লক্ষীশ্বরকে জানতে চাইল কী বর নেবে। সীবঃ রাজা ও লক্ষীশ্বর দুজনেই পুত্র সন্তানের বর চাইল। সাতবহিনী উভয়কেই বর দিয়ে স্বর্গের পথে উড়ে চলে গেল। লক্ষীশ্বর বাবা মাকে সংসারের কাজে খুব সাহায্য করে, তাই সীবঃ রাজার বাগানের কাজে প্রতিনিয়ত লেগেই থাকে। কিছুদিনের মধ্যে সীবঃ রাজার বাড়ীতে যেমন পুত্র জন্মালো তেমনি লক্ষীশ্বরের সংসারে আলো করে দুজন পুত্র সন্তান জন্মেছিল। তাদের নাম রেখে ছিল কর্মা ও ধর্মা। সীবঃ রাজা যেমন সুখে স্বাচ্ছন্দে দিন কাটাত তেমনি পুইতু হাড়াম ও পুইতু বুড়ী নাতিদেরকে নিয়ে সীবঃ রাজার সান্নিধ্যে খুব সুখে শান্তিতেই দিন কাটাচ্ছিল।
    এমন সুখ শান্তির সংসারে লক্ষীশ্বরের পুত্র কর্মা ও ধর্মা ধীরে ধীরে বড় হল, সংসারের সমস্ত কাজকর্ম বুঝতে শিখল। বাবা লক্ষীশ্বরকে দুই ভাই সংসারের কাজে সাহায্য করে। দুই ভাইকে বিয়ে করিয়ে দিল লক্ষীশ্বর। কর্মা মনে মনে ভেবে বাবা লক্ষীশ্বরকে বলল যে, সে বাইরে কোনো কাজের সন্ধানে যাবে এবং সংসার বড় হওয়ায় অর্থ কিছু রোজগার করে নিয়ে আসবে। এই কথা বলে কর্মা বাইরে অর্থের সন্ধানে যেতে কর্মদক্ষতায় ও নিষ্ঠায় অর্থ রোজগার ভালোভাবে হতে লাগল। অর্থবান হওয়ায় কর্মা হাতি, ঘোড়া কিনল, ঘরে রোজগারের জন্য লোক রাখল। দীর্ঘদিন বাইরে থাকার ফলে ঘরে ফেরার মন হল। অর্জিত ধনদৌলত, হাতি, ঘোড়া, স্ত্রী এবং সঙ্গীসাথী সঙ্গে নিয়ে জাঁকজমক করে ঘরে কর্মা ফিরছে। কিছুদূর আসার পর ভাই ধর্মার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠল। পীঠের ভাই গাঁইটের সোনা, লোকজনকে বলল যাও ভাই ধর্মাকে খবর দাও সে যেন আমাকে নিয়ে যেতে আসে। কর্মার লোকজন গিয়ে দেখে ঘরের খামারে গোবরের লাতা দিয়ে আলপনা এঁকে দুটি ডাল পুঁতে চারপায়া মাঞ্চির উপর ডালাতে করে বালি, রবিশস্য অঙ্কুরোদগম বীজ রয়েছে এবং সেবিকাগণ চারিদিকে ঘিরে বসে আছে। সোম রস (ইলি) পান করে মাদল ধমসা বাজিয়ে খুব খুশিতে নাচ গানে বিভোর হয়ে আছে। এ খবর কর্মার সঙ্গীরা দেখে এসে কর্মাকে বলল। কর্মা পুনরায় সঙ্গীদের পাঠাল ধর্মার কাছে যেন ভাইকে নিয়ে যেতে আসে। এমন সংবাদ ভাই ধর্মাকে যেন বলে। সঙ্গীরা যথাযথ সমস্ত কথা বললেও ওদের কথায় কেউ কর্ণপাত করে নি। ফলে তারা ফিরে এসে সেই কথাই শোনালো।
    এবার কর্মার মনে মনে রাগ হল। আমি তার ভাই, এতদিন বাদে বাড়ি ফিরছি। আমার প্রতি তার এতটুকু দয়া নেই। বলেই নিজেই হাতী-ঘোড়া-বলদ সঙ্গী সবাইকে ছেড়ে দিয়ে ধর্মার ব্যাপার স্যাপার দেখতে গেল। গিয়ে দেখে যেমন শুনেছে সেইরকমই ধর্মা দুইটি ডাল ও রবিশস্যের ডালি পূজামণ্ডপের কাছে বসে ধূপ ধূনা দিয়ে পূজোয় ব্যস্ত। এমন অবস্থা দেখে কর্মা রেগে গিয়ে দুটি যে গাছের ডালা পুঁতেছে সেগুলি তুলে সজোরে ছুঁড়ে অনেক দূরে ফেলল। ছুঁড়ে ফেলার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখে এত লোকজন নাচ গান করছিল, তার ভাই ধর্মা বসে পূজা করছিল সেও ওখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। পূজামণ্ডপের পূজার সামগ্রী, লোকজন সবই ওখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। কর্মা ফিরে গেল যেখানে সে সমস্ত লোকজন, গরু, ঘোড়া, হাতী সংগ্রহ করে ছেড়ে এসেছিল। সেখানে গিয়ে দেখে কোন লোকজনও নেই, হাতী, ঘোড়া, গরু কেউ নেই। কর্মা ভাবতেই পারছে না ব্যাপারটা কী হল। এদিকে কর্মার স্ত্রী অনতি দূরেই একাকী বসে আছে। স্বামী-স্ত্রী মনের দুঃখে দুজনে বাড়ী এল। খিদে লাগছে কেউ ওদের খেতে দিচ্ছে না, ঘরে সবাই খাচ্ছে ওদের খাবার বেলা খাওয়ার কুলোচ্ছে না। এইভাবে রাত্রি পোহাল, দ্বিতীয় দিনেও খাওয়ার জুটলো না। লোকেরা যখন কাজ কর্মে বেরিয়ে গেল তারাও ওদের দেখে কাজে বেরিয়ে গেল। যদি কাজ করে খাওয়ার যোগাড় হয়। কাজও জোটে না, ফিরে আসে বাড়ীতে। ভাই ধর্মার বাড়িতে অনেকে খাচ্ছে তারাও তাদের বাড়ীতে খাওয়ার জন্য ক্ষীদের জ্বালায় আসে, কিন্তু দেখল সবার পাতে খাবার দিচ্ছে, কিন্তু তাদের পাতে খাওয়ার দিতে যাওয়ার সময়ই খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। কর্মা ও তার স্ত্রী ধর্মার স্ত্রীকে বলল তুমি সবাইকে খেতে দাও, আমাদের বেলায় তোমার দেওয়া খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। তোমরা চাষের ধান রুয়েছ, সেই রোওয়া ধান তুলে ফেলে দেব। যেই বলা সেই কাজ। কর্মা ও তার স্ত্রী রাত্রিবেলা রোওয়া ধানগুলি তুলে ফেলে দিল। আইল কেটে সমান্তরাল করে দিল। সেই জমিনের পথ দিয়ে ঠাকুর ঠাকুরাণী যাচ্ছিলেন। ঠাকুরাণী শুনেন যে এই বৃষ্টিকালে জমিনে কি যেন শব্দ। ঠাকুর বললেন এই বৃষ্টিতে ব্যাঙেদের বিবাহ ঋতু, তাই তারা নাচ-গান করছে। তাই শব্দ হচ্ছে। শব্দের রকম ফের হতে গিয়ে দেখে নারীপুরুষ দুজন জমিনে কাজ করছে। ঠাকুর বলেন, ‘‘তোমরা যে জমিনের আইল কেটে সমান্তরাল করে দিচ্ছ দেখ কত সুন্দর আইল হচ্ছে। আর যে ধান গাছের চারাগুলি রোওয়া ছিল সেগুলি তুলে ফেলে দিয়েছিলে দেখ কত সুন্দর রোওয়া হয়েছে এবং সবুজে ডগমগ করছে।’’ রাত্রেবেলা কর্মা যখন ঠাকুরের কথামত পিছন ফিরে দেখে যে সত্যই সুন্দর রোওয়া হয়ে আছে। ঠাকুর ওদেরকে বললেন তোমাদের করম বাম হয়েছে অর্থাৎ করম ঠাকুর তোমাদের ভর করেছে। তোমরা করম ঠাকুরের পূজা কর তবেই তোমাদের এই রকম দোষ কাটবে। কর্মা জিজ্ঞাসা করে করম দোষ কাটার উপায় কী ? ঠাকুর বললেন, কর্মা, তুমি রেগে গিয়ে যে করম দাড়া (ডালা) দুটি বহুদূরে (উবদাফুঁড়ে) ফেলে দিয়েছ সেইজন্য তোমাদের এমন দশা হয়েছে। তুমি ওই ঠাকুরকে নিয়ে এসো, যাও তবে তোমার এই দশা কাটবে। কর্মা বলল, ঠাকুর, আমার তো কোনো খাবার জুটছে না, কী খেয়ে ওই ঠাকুরকে আনতে যাব। ঠাকুর বললেন, ঘরের চার কোণে ঝাড়ু মেরে জোড়ো কর — যেটুকু খুদ কুঁড়ো পাওয়া যাবে সেগুলি দিয়ে দুটি লাড়ু তৈরী করবে। নাম দেবে দু’রকমের, একটি হবে ভকলাড়ু (খিদের লাড়ু) আর একটি হবে শষ লাড়ু (তেষ্টার লাড়ু)। খিদা পেলে খিদার লাড়ু খাবে তেষ্টা পেলে তেষ্টার লাড়ু খাবে। কর্মা ঠাকুরের কথামতো লাড়ু দুটি গামছায় বেঁধে করম ঠাকুরকে খুঁজতে বেরল। পথ চলা শুরু হল, বহু পথ। সে এক অজানা পথ, দিন হয়, রাত হয়, পথ চলা শেষ হয় না। এমন করে রাত পোহাল, সকাল হল—কর্মার খিদে পেল, সে দাঁত মেজে খিদের লাড়ু খাবে। শাল গাছের জঙ্গলে শাল খাঁচি দাঁত মাজার জন্য ভাঙ্গতে গেছে, খাঁচি ভাঙ্গছে না, মোচড় দিতে গেল খাঁচি যেন অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্ষীণ সুতোর মতো বেরুচ্ছে কিন্তু ছিঁড়ছে না। এমন অবস্থায় করম ঠাকুরকে স্মরণ করে কর্মা বলছে, হে ঠাকুর আমার কি এতই করম বাম হয়েছে। শাল ডালের দাঁতন কোনো মতেই ভেঙ্গে ছিঁড়তে পারিছ না। শাল গাছ শুনে বলছে, কে তুমি ? কেন এমন কথা বলছ ? কর্মা বলছে, আমার করম বাম হয়েছে, তাই এই খাঁচি দিয়ে দাঁত মাজতে পারছি না। শাল গাছ বলে, হ্যাঁ সত্যইতো কেউ আমার দাঁত খাঁচি ভেঙ্গে মাজতে পারছে না। তুমি যখন করম ঠাকুরের খোঁজে যাচ্ছ, আমার এমন দুঃখের কথাটি বলিও। কর্মা শাল গাছের কথা শুনে বলল তোমার দুঃখের কথাটি আগে বলব। আবার পথ চলা শুরু কর্মার। চলতে চলতে তেষ্টায় বুক ফেটে যাবার উপক্রম, পথের প্রান্তেই সুন্দর এক ঘাট বাঁধানো পুকুর। তার ইচ্ছা হল পুকুরে নেমে জল পান করবে। নেমে আঁজলা দিয়ে জল নিতেই জলপোকা বিজবিজ করছে। জলপান করার ইচ্ছা আর হচ্ছে না। তখন করম ঠাকুরকে স্মরণ করে বলছে, হে করম ঠাকুর, আমার কি এতই করম বাম হয়েছে, জলও পান করতে দিলে না। পুকুর কর্মার মনের কথা শুনে বলছে, ‘কে তুমি ? কোথায় যাবে ?’ কর্মা তার ঘটনার কথা সবিস্তারে বলতে, পুকুর বলল, ‘‘আমার এমন সুন্দর পাড় বাঁধানো পুকুর, এত মিষ্টি জল কেউ পান করেত পারছে না। তুমি যখন করম ঠাকুরের কাছে যাচ্ছ আমার এই দুঃখের কথা যেন আগে বলে দিও।’’ কর্মা মাথা নাড়িয়ে তার কথা আগে বলবে বলে পথ চলতে শুরু করল। বেশ কিছুদূর যাবার পর লভজা (ডুমুর) গাছ দেখতে পেল। সেখানে ডুমুর ফল পেকে লাল হয়ে আছে। কর্মা ভাবল সে ডুমুর ফল খেয়ে তার খিদা নিবারণ করবে। ডুমুরের ফল ভাঙ্গতেই দেখে অসম্ভব পোকা ফলের মধ্যে। ডুমুরের ফল খাওয়া হল না। খিদের জ্বালায় কর্মা বলল, ‘হে করম ঠাকুর, আমার কি এতই করম বাম হয়েছে ?’ ডুমুর গাছ শুনে বলল, ‘এমন কথা বলছ কেন ? তোমার কী হয়েছে ?’ কর্মা বলল, আমার করম বাম হয়েছে, ঠাকুরকে আনতে বেরিয়েছি। ডুমুর গাছ শুনে বলল, আমার এত সুন্দর মিষ্টি ফল, কেউ খেতে পারছে না। তুমি আগে গিয়ে করম ঠাকুরকে আমার দুঃখের কথা বলবে। কেন এই গাছের ফল লোকজন খেতে পারে না। ডুমুর গাছের কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে তার কথা আগে গিয়ে বলবে বলে আবার কর্মা পথ চলতে শুরু করল। পথ চলতে চলতে পথের ধারে একটি ঘর; সেই ঘরে একটি মেয়ে চিড়া কুটছে। কর্মার ইচ্ছা হল সে চেয়ে চিড়া খাবে এবং তার খিদার জ্বালা মিটাবে। কর্মা চিড়া কুটা মহিলাকে চিড়া চাইতে, চিড়া কুটা মহিলা বলে, কি করে চিড়া দিব, আমার পা খানি যে ঢেঁকির সঙ্গে চিটিয়ে আছে। আমি তোমাকে নেমে চিড়া দিতে পারছি না। তখন কর্মা হতাশ হয়ে আবার করম ঠাকুরকে বলছে, হে ঠাকুর এতই কি আমার করম বাম হয়েছে। ঢেঁকিতে চিড়াকুটা মহিলা বলল, কে তুমি ? কোথায় যাচ্ছ ? কর্মা বলল, আমি কর্মা, আমার করম বাম হয়েছে। আমি রাস্তা ঘাটে কোথাও কোনো খাবার খেতে পারছি না।  মহিলা বলল, তুমি আমার দুঃখের কথা আগে গিয়ে বলবে, যে, আমি কাউকে ঢেঁকির চিড়া খাওয়াতে পারছি না। কর্মা মাথা নাড়িয়ে বলল, হ্যাঁ আমি তোমর দুঃখের কথা আগে গিয়ে বলব। আর আমার দুঃখের কথা পরে। এই বলে আবার পথ চলতে শুরু করল। চলতে চলতে পথের ধারে আবার একটি পুকুর দেখতে পেল। পুকুরে দেখে অজস্র ফুল ফুটে আছে, অপূর্ব শোভা দেখাচ্ছে। কর্মার ইচ্ছা হল শালুক ফুল তুলে হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে সে পথ চলবে। কর্মা পুকুরে নেমে শালুক ফুল তুলতে গেল। যতই পুকুরের ভেতরে তুলতে যাচ্ছে, ততই শালুক ফুল আবার পুকুরের ভেতরের দিক সরে যাচ্ছে। শালুক ফুলের আর নাগাল পেল না। হতাশ হয়ে কর্মা বলল, হে করম ঠাকুর, এতই কি আমার করম বাম হয়েছে ? শালুক গাছ শুনে বলল, কে তুমি ? কেন এমন কথা বলছ ? কর্মা বলল, আমি কর্মা, আমার করম বাম হয়েছে, তাই করম ঠাকুরকে খুঁজতে বেরিয়েছি। এমন কথা শুনে শালুক ফুলের গাছ বলল, তুমি যখন ঠাকুরের কাছে যাচ্ছ, তবে আমারও দুঃখের কথা বলবে যে, আমার এই শালুক গাছের সুন্দর ফুল কেউ তুলতে পারছে না। আর কোনো কাজে লাগছে না। কর্মা শুনে বলল, ঠিক আছে, আমি আগে তোমারই কথা বলব, তার পরে আমার কথা। এই কথা বলে কর্মা আবার পথ চলতে শুরু করল। চলতে চলতে গ্রামের সন্নিকটে পৌঁছল এবং এক গোয়ালা গাই-এর দুধ দুইবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, কর্মার মনে হল এই গোয়ালাকে বলে দুধ পান করে তার খিদা ও তৃষ্ণা মিটাবে। এই কথা বলতে গোয়ালা কর্মাকে বলল, এই নাও দড়ি আর বাছুর, যাও গাইকে দুধ দুইয়ে দুধ পান কর। কর্মা গাই-এর নিকট যেতেই গাই গরু শিং দিয়ে মারতে আসছে। পা দুটি বাঁধতে যেতে গাই তার পা দিয়ে লাথি মারছে। অনেক চেষ্টা করল কর্মা কিন্তু কিছুতেই সফল হল না। কর্মা হতাশ হয়ে বলল, হে করম ঠাকুর, এতই কি আমার করম বাম হয়েছে, খিদায় তেষ্টায় দুধ পান করব বলে তাও আমার জুটল না। একথা শুনে গাই গরু বলে, ‘কে তুমি ? তোমার কি হয়েছে ?’ কর্মা তখন বলল, আমি কর্মা, আমার করম বাম হয়েছে। তাই আমি করম ঠাকুরকে খুঁজতে বেরিয়েছি। গাই কর্মার কথা শুনে নিজের দুঃখের কথাটাও করম ঠাকুরকে বলতে বলল। আর এও বলল যে, তার দুধতো কেউ খেতে পারছে না, এমনকি কোনো ঠাকুর পূজোতে নাকি এই দুধ লাগছে না। কর্মা শুনে বলল, ঠিক আছে, সে গাইয়ের দুঃখের কথা আগে করম ঠাকুরকে বলবে। তারপর তার নিজের দুঃখের কথা বলবে। এই বলে কর্মা আবার পথ চলতে শুরু করল এবং পথিমধ্যে একজন বাঁশের ঝাড়ের কাঁটা বোঝা বাঁকে বয়ে পুরো রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে দেখতে পেল। কর্মা কাঁটাবওয়া লোকটাকে সরতে বলল। লোকটি কাঁটা বোঝা নিয়ে সরতেই পারল না। কর্মা যখন পথ পেরুচ্ছে তখন করম ঠাকুরকে স্মরণ করে বলল, হে করম ঠাকুর আমার কি এতই করম বাম হয়েছে। পথ চলতে আমাকে কাঁটা বোঝা দিয়ে পথ আটকানো হচ্ছে। কাঁটাবোঝা বহনকারী লোকটি এই কথা শুনে কর্মাকে বলল, ‘কে তুমি ? তুমি কার নাম বললে।’ কর্মা বলল, আমি কর্মা, আমার করম বাম হয়েছে। কাঁটাবোঝা বহনকারী বলল, আমি কাঁটাবোঝা বয়েই পথে পথে চলেছি কোথাও কাঁটা কাঁধ থেকে নামাতে পারছি না। কাঁধেই কাঁটা বোঝার বাঁক চিটিয়ে রয়েছে। আর এই কাঁটা কারোর বেড়া ঘেরার কাজেও লাগছে না। আমার এমন দুঃখের কথা আগে গিয়ে করম ঠাকুরকে বল। কর্মা বলল, হ্যাঁ, তোমার দুঃখের কথা আগে গিয়ে ঠাকুরকে বলব। তারপর আমার কথা বলব। এমন কথাবার্তা চলার পর কর্মা আবার পথ চলতে শুরু করল। চলতে চলতে রাস্তার এক সহিস ঘোড়াগুলিকে চরাচ্ছে। কর্মার মনে হল অনেক পথ হাঁটার পর তার ক্লান্তি হয়েছে, ঘোড়ার পিঠে চড়লে সে শীঘ্রই করম রাজার দেশে পৌঁছাতে পারবে। কর্মা সহিসকে বলল ওহে, আমি অনেক দূর পথ যাব, তোমার একখানি ঘোড়া দাও না। তখন সহিস বলল, এই নাও। পালহান ও লাগাম নিয়ে ঘোড়ার কাছে গেল। ঘোড়া কর্মাকে কামড় দিতে চাইছে এবং লাথি মারতে চাইছে। কর্মা হতাশ হয়ে বলল, হে করম ঠাকুর, আমার কি এতই করম বাম হয়েছে, এত চেষ্টা করেও ঘোড়াটাকে শান্ত করতে পারলাম না। ঘোড়া কর্মার কথা শুনে বলছে, ‘কে তুমি ? তুমি কার নাম ধরলে ?’ কর্মা বলল, আমি কর্মা, আমি করম রাজাকে খুঁজতে বেরিয়েছি। ঘোড়া এমন কথা শুনে কর্মাকে বলল, আমি কোনো মানুষের উপকারে লাগছি না, কেন আমার এমন দশা, তুমি করম ঠাকুরকে গিয়েই আমার দুঃখের কথা আগে বলবে। কর্মা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে আবার পথ চলতে শুরু করল। চলতে চলতে পৌঁছাল এক বিশাল নদীর ধারে। নদীর ধারে গিয়ে পেরোতে চাইতেই দেখে অনেক কুমীর ঘোরাঘুরি করছে জলে। কর্মা এমন অবস্থা দেখে চিন্তায় পড়ে গেল এবং হতাশ হয়ে ঠাকুরকে জপতে লাগল, ‘হে করম ঠাকুর, আমার কি এতই করম বাম হয়েছে ?’ এ কথা শুনে কুমীর জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কে ? কার নাম তুমি বললে ?’ কর্মা বলল, ‘আমি কর্মা, আমার করম বাম হয়েছে। তাই করম রাজাকে খুঁজতে বেরিয়েছি। কোথায় করম ঠাকুর আছেন ?’ কুমীর বলল, তুমি যখন করম ঠাকুরের কাছে যাচ্ছ তাহলে আমার দুঃখের কথাও বল যে, আমি নদীতে থেকেও কোনো কিছু খেতে পারছি না আর নদীর বুকে সাঁতরে বেড়াতে পারছি না। কর্মা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে কুমীরের কথা ঠাকুরকে আগে বলবে বলে বলল।
    এই কথা কুমীরকে বলার পর কর্মা ভাবছে কী করে এই দরেয়ার মতো নদী পেরোবে। কুমীর কর্মাকে জিজ্ঞেস করল যে সে কী ভাবছে। কুমীর কর্মার ভাবনার কথা শুনে কর্মাকে বলল, তোমার কোনো চিন্তার কারণ নেই, তুমি আমার পিঠে চড়, আমি তোমাকে পার করে দেব। কর্মা কুমীরকে বলল, নদী পারাপারের সময় যদি মাঝনদীতে গিয়ে আমাকে খেয়ে ফেল তাহলে কী হবে ? কুমীর বলল, না, এরকম কাজ সে করবে না। কর্মা বলল, আমরা দুজনে মিলে শপথ করি এস। এই শপথ বাক্য তিনবার মুখে নিতে হবে। আঞ্জা আঞ্জা বড় আঞ্জা, এ আঞ্জা যে অমান্য করবে সে গরুর শিং দিয়ে জল পান করবে। কুমীর আর কর্মা তিনবার করে শপথ বাক্য উচ্চারণ করল। তারপর কর্মা কুমীরের পিঠে চড়ে নদী পার হল। তীরে পৌঁছতে না পৌছতেই কর্মা লাফ দিয়ে নদীর পাড়ে পৌঁছাল। কুমীর কর্মাকে বলল সে যেন তার দুঃখের কথা করম ঠাকুরকে বলে। অবশ্যই বলবে বলে কথা দিল এবং কুমীরকে বলল যে, আমি যতক্ষণ না ফিরছি তুমি আমার অপেক্ষা করবে। এই কথা বলে নদীর পাড়ে উঠে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল এবং খুঁজতে লাগল যে করম ডাল দুটি ছুঁড়ে ফেলে ছিল সেই ডাল দুটি পড়ে আছে। খুব ঘন সংকীর্ণ ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ জঙ্গলের মধ্যে সবুজ ডগমগে অবস্থায় পড়ে আছে। কর্মা অনেক কষ্ট করে করম গাছের গোড়া ঝোপ জঙ্গল সাফ করল। সে খিদে লাড়ু ও তৃষ্ণা লাড়ু (ভকলাড়ু, শস লাড়ু) নিয়ে গিয়েছিল — গামছায় বেঁধে পুঁটলি সুন্দর করে একটি গাছের নীচে রেখে দিল। কর্মা যে দুটি ডাল ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সেই করম ডাল উবদা কুঁড়ে যেখানে ঘন ঝোপঝাড় বেষ্টিত জনাকীর্ণ এলাকায় পড়েছিল। সেখানে ডাল দুটি কর্মা তার গামছা পুঁটলী রেখে সযত্নে খুঁজছে। করম রাজা অনতি দূর থেকে তার এমন অবস্থা দেখে নিকটে গিয়ে বলে কর্মা, তুমি বহুদূর থেকে হেঁটে পরিশ্রান্ত হয়েছ, কিছুক্ষণ জিরিয়ে নাও, তারপর স্নান সেরে আহার করে নাও। আগামীকাল সমস্ত কিছু কথা হবে।
    কর্মা করম রাজার কথা মতো জিরিয়ে স্নান করতে চলল। দেখল ঘাটে তেল ও নতুন বস্ত্র। স্নান করে নতুন বস্ত্র পরে খেতে গেল। খাওয়ার জায়গাতে খাওয়ার সাজানো আছে। কর্মা খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম নিতে গেল এবং রাত্রি হল। রাত্রে ঘুম আর হচ্ছে না। ভোরবেলা মুরগী ডাকার সময়ে কর্মা করম রাজাকে বলল, হে করম রাজা আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। চল আমার সঙ্গে। করম রাজা বলল, কর্মা, আজ আমি যাব না। ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশী তিথিতে আমি যাব। একাদশীর দুদিন আগে সাত-আট বৎসরের নাবালিকা কন্যা উপবাসে নদী থেকে বালি সংগ্রহ করবে। আর চাষের রবিশষ্য বীজ বালির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে সমস্ত বীজ অঙ্কুরোদগম হবে। দিনে তিনবার করে জল ঐ সংমিশ্রিত বীজডালিতে ছিটাতে হবে। সন্ধ্যাবেলা খামারে গোবর দিয়ে পরিষ্কার করে মিশ্রিত বীজডালিকে ধূপধূনা দিতে হবে।
    বালি সংগ্রহের দ্বিতীয় দিন জাওয়া জাগানো হবে। ঘরের বাহিরে খামারে গোবর দিয়ে পরিষ্কার করে বীজডালি বার করে দিয়ে আসতে হবে এবং গ্রামের মা-বোনদেরকে ডেকে করম রাজার প্রসঙ্গে গানবাজনা করতে হবে।
    তৃতীয় দিন অর্থাৎ পার্শ্ব একাদশীর দিনে দুটি করম ডাল কেটে এনে খামারে গেড়ে তার গোড়ায় আমার নামে পূজা পাঠ করতে হবে।
    পূজার মণ্ডপে শালুক ফুল দিয়ে চারিদিকে সাজিয়ে দেবে। কর্মা বলল, ‘হে প্রভু, হে করম রাজা তুমি যে আমার বাড়ীতে গেছ তা সেটা জানব কী করে ?’ করম রাজা কর্মাকে বলল, আমি যে গেছি দেখবে মিশ্রিত চাষের রবিশষ্য বীজ অঙ্কুরোদগম হবে। শালুক ফুল ফুটবে সতেজে। এগুলি দেখে বুঝবে যে আমি তোমার বাড়ীতে গেছি। তবে আর একটি কথা, তোমার যে ভাই ধর্মা তাকে আলাদা করবে না। সঙ্গে থেকেই পূজা করবে। পিঠের ভাই গাঁইটের সোনার মত ধন।
    কর্মা করম রাজার কাছে এই আদেশ উপদেশ শুনে খাওয়া দাওয়া করে বাড়ী মুখো হল। নদীর ধারে এসে ভাবল এতজন মানুষের আর্তপীড়িতদের কথা তো বলা হল না। আবার কর্মা ফিরে এল করম রাজাকে ওদের কথা বলতে যে কথা বলা হয়নি। করমরাজা বলল, যাও ওদেরকে যে কথাই তুমি বলবে ওই কথাই সত্য হবে। ওতেই ওরা দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। এই আপ্তবাক্য শুনে কর্মা বাড়ীর মুখে রওনা হল। নদীর ঘাটে কর্মা এসে দেখে সেই কুমীর তার দুঃখ যন্ত্রণার কথা বলেছে কিনা তা জানতে চাইল। কর্মা বলল, আগে আমাকে এই নদীটা পার করিয়ে ওপারে নিয়ে চল তবেই তোমার মুক্তির কথা বলব। কর্মা কুমীরের পিঠে চড়ে নদী পেরোল। পেরিয়ে কর্মা কুমীরকে বলল, তুমি কুমীরের জাত, রাজার বেটাবেটীকে খেয়ছ, ওদের শরীরের পরা গহনাগুলি তোমার পেটে রয়েছে, সেগুলি তুমি ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবকে দান কর, তবেই তোমার মুক্তি মিলবে। কুমীর বলল, ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবের দেখা কোথায় পাব ? তুমিই ব্রাহ্মণ, তুমিই বৈষ্ণব। এই নাও সেই সোনা, দানা, সাজপাট বলে কুমীর সব কিছু দিয়ে দিল। কর্মা বলল, যাও তুমি মুক্তি পাবে। এই বলে আবার ফিরতে শুরু করল এবং কিছু দূরে গিয়ে সেই ঘোড়ার দেখা পেল। এক সময় সে তার সাহায্য পায়নি। ঘোড়া জিজ্ঞাসা করল, আমার মু্ক্তির উপায় কী ? কর্মা বলল, ঘোড়া, তুমি রাজার বেটাবেটীকে পিঠ থেকে ফেলেছ এবং পা দিয়ে লাথি মেরেছ। তাই তোমার এমন দশা হয়েছে। তুমি ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবকে দান কর তবেই তোমার মুক্তি। এমন ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবের দেখা কোথায় পাবে ঘোড়া জিজ্ঞাসা করল। অতএব তুমিই ব্রাহ্মণ, তুমিই বৈষ্ণব। এই বলে কর্মার কাছে গিয়ে কর্মাকে ঘোড়ার পিঠে চড়তে বলল। কর্মা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাড়ী ফিরতে লাগল। (সেই সময় বিনতিকার/কাহিনীকার উপবাসী ভক্ত সেবিকাগণকে ঘোড়া সাজে থাকা জিনিসকে স্থানান্তর করতে বলল)।
    ঘোড়ার পিঠে চড়ে কর্মা পথ চলতে চলতেই সেই গাই গরু ও বাছুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। গাই গরু ও বাছুর কর্মাকে জিজ্ঞাসা করল, তাদের দুঃখের কথা করম রাজাকে বলেছে কিনা ? কর্মা বলল, তোমরা গরুর জাত, রাজার বেটাবেটী দুধ দুইতে এসেছিল, তোমরা তাদের দুধ দাওনি। পা দিয়ে লাথি মেরেছ, তাই তোমাদের এমন দশা হয়েছে। তুমি যদি ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবকে দান সামগ্রী দিতে পার তবেই তোমার দেওয়া দুধ ঠাকুরের পূজায় লাগবে এবং বাছুর তোমার দুধ খেতে পারবে। একথা শুনে গাইগরু বলল, ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবের দেখা কোথায় পাব ? তাই তুমিই ব্রাহ্মণ, তুমিই বৈষ্ণব। বলেই গাইগরু দানসামগ্রী কর্মার হাতে তুলে দিল। কর্মা দানসামগ্রী পুঁটলীতে বেঁধে গাই-এর পিঠে রেখে বাড়ীর পথে চলতে শুরু করল। পথ চলতে চলতে পথ প্রান্তে পুকুরের মধ্যে শালুক ফুলের গাছ কর্মাকে জিজ্ঞাসা করল যে তার দুঃখের কথা করম রাজাকে বলেছে কিনা। কর্মা শালুক গাছকে বলল, যে রাজার বেটাবেটী শালুক ফুল তুলতে এসে পুকুরে শালুক নাড়াতে ফাঁসি হয়ে মারা গেছে। তাইতো আজ তোমার এই দশা। কর্মা বললে, তুমি ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবকে দানসামগ্রী দিলে তবেই তোমার মুক্তি। তোমার ফুল ঠাকুরের পূজায় লাগবে। শালুক বলল যে কোথায় পাব ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব, তুমিই ব্রাহ্মণ তুমিই বৈষ্ণব। তুমিই আমার দান গ্রহণ করো। শালুক গাছের সাথে কথোপকথন শেষ করে কর্মা আবার বাড়ীর পথে চলল। চলতে চলতে পথের ধারে ঐ চিড়াকুটা মহিলার সঙ্গে দেখা হল। ঐ মহিলাও কর্মাকে জিজ্ঞাসা করল যে তার দুঃখের কথা করম রাজাকে বলেছে কিনা। কর্মা উত্তরে বলল হ্যাঁ বলেছি, তুমি রাজার বেটাবেটীকে চিড়া নিতে এলে দু’সের ধানে এক’সের চিড়া দিয়ে ওদের ঠকিয়েছ। তাই তোমার এই দশা হয়েছে। যদি তুমি ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবকে দান করতে পার তবেই তোমার মুক্তি। চিড়াকুটা মহিলা বলল, কোথায় দেখা পাব ব্রাহ্মণের, কোথায় দেখা পাব বৈষ্ণবের। তুমি ব্রাহ্মণ তুমিই বৈষ্ণব। চিড়াকুটা মহিলা তার দানসামগ্রী সব কর্মাকে দিয়ে দিল। কর্মা দানসামগ্রী নিয়ে বাড়ীর পথে চলতে লাগল। পথ চলতে চলতে কাঁটা বোঝা বওয়ার লোকটির সঙ্গে দেখা হল। তখন লোকটি কর্মাকে জিজ্ঞেস করল যে, কর্মা ঐ লোকটির কাঁটাবোঝা মাথায় নিয়ে চরার কথা করম ঠাকুরকে বলেছে কিনা। কর্মা করম ঠাকুরকে তার দুঃখের কথা বলেছে বলল। কর্মা এও বলল যে তুমি মাথায় কাঁটার বোঝা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছ এবং তাতে লোকজনের গায়ে পায়ে কাঁটা লাগছে ও ফুটছে, তাই তোমার এমন দশা হয়েছে। তুমি তোমার যা দানসামগ্রী আছে তা যদি ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবকে দান করতে পার তবেই তোমার মুক্তি ঘটবে। কাঁটার বোঝা জমিতে নামাতে পারবে, এক কাঁধ থেকে অন্য কাঁধে পাল্টাতে পারবে। এই কথা শুনে লোকটি বলল কোথায় সে ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব পাবে, অতএব কর্মাকেই তার দানসামগ্রী নিতে বলল। কর্মা তার দানসামগ্রী নিয়ে আবার বাড়ীর পথে রওনা দিল এবং কিছুদূর যাওয়ার পর সেই ডুমুর গাছের সাথে দেখা হয়। ডুমুর গাছ কর্মার সাথে দেখা হওয়া মাত্র তার দুঃখের কথা করম ঠাকুরকে বলেছে কিনা জানতে চাওয়ায় কর্মা ডুমুর গাছকে বলল যে, হ্যাঁ সে তার দুঃখের কথা বলেছে করম ঠাকুরকে। কর্মা বলল যে, তোমার গাছের এই ফল অনেক লোক খেতে আসতো, আর তুমি তাদের ঠেলে ফেলে দিয়েছ এবং অনেকে পা ভেঙ্গেছে। এইভাবে অনেকে মারাও গেছে। এখন তুমি যদি সোনা রূপা কোন ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবকে দান করতে পার, তাহলেই মানুষ তোমার গাছের এই ফল খেতে পারবে এবং তবেই তোমার মুক্তি হবে। হে ঠাকুর, বল কর্মা কোথায় গেলে দেখা পাব ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবের। তুমিই আমার ব্রাহ্মণ, তুমিই আমার বৈষ্ণব। আর এই নাও সোনা দানা বলে কর্মাকে সমস্ত দানসামগ্রী সাজিয়ে বেঁধে দিল।
    দানসামগ্রী নিয়ে কর্মা বাড়ীর পথে রওনা শুরু করল এবং কিছুদূর যেতে না যেতেই সেই পুকুরের কাছে পৌঁছাতে পুকুর কর্মাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল যে তার দুঃখের কথা করম ঠাকুরের কাছে বলেছে কিনা। কর্মা তার কথা শুনে মাথা নেড়ে বলল যে সে তার দুঃখের কথা করম ঠাকুরের কাছে বলেছে এবং দুঃখের কারণ হিসাবে কর্মা পুকুরকে বলল যে, রাজার বেটাবেটী ও অন্যান্য লোকজন এই পুকুরের জল নিতে ও স্নান করতে এসে ডুবে মারা গেছে। তাই ঐ পুকুরের এমন দশা হয়েছে। পুকুর তখন কর্মাকে বলে যে, তাহলে কী করলে সে মুক্তি পাবে ? তার উত্তরে কর্মা বলল পুকুরকে যে, সে যদি কোনো ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবকে সোনা ও রূপা দান করে তাহলে নাকি সে মুক্তি পাবে। এই সব শুনে পুকুর কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল কর্মাকে যে সে কোথায় ব্রাহ্মণ এবং বৈষ্ণব খুঁজতে যাবে। তাই কর্মাকেই ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব রূপে মনে করে সোনারূপাসহ দানসামগ্রী দিল। কর্মা এবার দানসামগ্রী নিজহাতে গ্রহণ করে বাড়ীর পথে রওনা হল। কিছুদূর যাওয়ার পর সেই শালগাছের সাথে দেখা হল, কর্মা যার কাঠি কিছুতেই ভাঙতে পারছিল না। তখন শালগাছ কর্মাকে দেখা মাত্র জিজ্ঞাসা করল, তুমি আমার দুঃখের কথা করমরাজাকে বলেছো তো। এর উপায় কি বলেছে। তখন কর্মা বলল যে গাছের নীচে মাটিতে রয়েছে আর সেই মাটির নীচে অনেক সোনা দানা রয়েছে, সেগুলি বের করে ব্রাহ্মণ আর বৈষ্ণবকে দানস্বরূপ দিলেই শালগাছের দুঃখ নিবারণ হবে অর্থাৎ তার খাঁচি লোক দাঁতের মাজন হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে। শালগাছের পাতা ও ফুল মানুষের পূজার কাজে লাগবে এবং গাছের গুঁড়ি মানুষের অনেক কাজে লাগবে। এই কথা শুনে শালগাছ কর্মাকে বলে সে কোথায় ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব খুঁজতে যাবে, সে কর্মাকেই ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব মনে করে মাটির নীচের সোনা দানা বের করে দিল এবং কর্মা সেই দানসামগ্রী নিয়ে বাড়ীর পথে রওনা দিল। কর্মা যেখানে হাতী, ঘোড়া, গরু, স্ত্রী নিয়ে ভাই ধর্মার জন্য অপেক্ষা করছিল, সেই জায়গাতে এসে দেখল সে হাতী, ঘোড়া, গরু এবং হারানো ধনসম্পত্তি সবই ফেরত পেল। সব কিছু নিয়ে কর্মা বাড়ী ফিরল। বাড়ীতে ধর্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভাইকে জড়িয়ে ধরল। কর্মা দেখল তার যাওয়া সব জিনিস পত্র ফিরে পেয়েছে এবং রাজকার্য চালানোর জন্য হাতী, ঘোড়া, ধান-চাল ভর্তি ঘর, গাছে সবুজের সমারোহ ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। কর্মা নিজের ভুল বুঝতে পেরে ভাই ধর্মার সঙ্গে করম পূজার জন্য যুক্তি পরামর্শ করল। কর্মা বলল করম পূজার দিন আর  বেশি দেরী নেই। করম ঠাকুর ভাদ্রমাসের পার্শ্ব একাদশীতে আমাদের বাড়ীতে আসবেন এমন দিনটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অতএব সেই দিনটি আসতে আর বেশি দেরী নেই। কর্মা নিজের সাধ্যমতো করম পূজোর আয়োজন শুরু করল। নেমতন্ন করা হল স্বর্গের সকল দেবদেবীকে ও আত্মীয়স্বজনকে। কর্মা ও ধর্মা দুই ভাই মিলে করম ঠাকুরের পূজা ভাদ্রমাসের পার্শ্ব একাদশীতে প্রথম পূজার প্রচলন করেন। সেই থেকে মানবকুলও কর্মা ও ধর্মার পথ অনুসরণ করে পরিবারের অন্ন, সুখ, শান্তি, পুত্র, সাত রাজার ধন মানিক পাওয়ার জন্য আজও করম ঠাকুরের পূজা বাড়ীতে বাড়ীতে করছে।
    বিনতিকার সকল ব্রত উপবাসী মা-বোনকে নিজ নিজ জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াতে বলেন এবং করম ডালের পাতা ছুঁয়ে যে যার মনস্কামনা ঠাকুরের কাছে জানাতে বলেন। মা-বোন সবাই উঠে দাঁড়িয়ে করম ডালের পাতা ছুঁতে ছুঁতে বিনতিকার জিজ্ঞাসা করে — করম ডাল ছুঁয়ে কি পেলে গো। উত্তরে মা-বোনেরা বলে ভাইয়ের করম, আপনার ধরম। মা-বোনেদের ঘর মালিকের সঙ্গে যার যা সম্পর্ক থাকে তারা সেই সেই সম্বোধন করে উপরের উল্লিখিত উক্তিটি উচ্চারণ করবে। মনে মনে কুমারী মেয়েরা ভালো বর, ঘর, সুখ-শান্তির কামনা করে। মায়েরা তাদের পরিবারের জন্য মঙ্গল কামনা করে। বিনতিকারী ব্রত উপবাসী একটি গান সঙ্গীত হিসাবে গান করেন আর এদিকে সঙ্গে সঙ্গে সাজ সাজ মাদলিয়া ও ধমসা বাজিয়ারা সঙ্গত দিতে প্রস্তুত থাকেন। বিনতিকার তার সঙ্গীকে যে হ্যাঁ, বলে তাকে ব্রত উপবাসী মা-বোনরা সকলেই তাদের সাধ্যমত চাল, ডাল, তরিতরকারী আনাজ থলি ভরতি করে দেয় এবং সে পুঁটলী বেঁধে বিনতিকারের সঙ্গে গানের সঙ্গ দেয়।
বিনতিকারের গান —
        জল ধরি আকবি
            কিয়া ভারি সিঁদুর (২)
        আমি শ্বশুর যাইব গে
            করমেকাশে বাতি ধ্বনি ধ্বনি (২)
        ঈশ্বর মহাদেব
            করম গাডয়ে (২)
        আমি শ্বশুর যাইব গো
            করমে কাশে বাতি ধ্বনি ধ্বনি (২)