প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ‘‘শবর’’ জনজাতির পরিচয় শবর জনজাতির পরিচয় - প্রশান্ত রক্ষিত

শবর জনম কথা -
(ক) সৃষ্টির প্রথমে মহাদেব তার লোকজনদের কৃষিকাজ শেখাতে চেয়েছিলেন। তাই লাঙ্গল তৈরী করে তার ষাঁড়টিকে জুড়লেন, কিন্তু ঘন বনে চাষ। চাষ করা অসম্ভব বুঝেই ‘শবর’ নামে একজনকে সৃষ্টি করেন। তাকে বন কেটে পরিষ্কার করার জন্য একটি কুঠার দিলেন। মহাদেব অন্যত্র কাজে গেলেন। শবর জঙ্গলের গাছপালা কাটতে কাটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল, খিদেও খুব পেয়েছিল; তাই মহাদেবের বাহন ষাঁড়টির মাংস কেটে সেগুন পাতায় খেয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে রাখল। মহাদেব ফিরে এসে জঙ্গল পরিষ্কার দেখে খুব খুশি হয়ে শবরকে জঙ্গলের ফল, মূল, ঔষধি সব রকমের গাছ চিনিয়ে দিলেন। কিন্তু ষাঁড়টিকে খুঁজতে গিয়ে এক পাশে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় মৃত পড়ে থাকতে দেখতে পেলেন। মহাদেব ষাঁড়টির গায়ে একটু জল ছিটিয়ে দিতেই সে প্রাণ ফিরে পেল ও মহাদেবকে সব কথা বলল। মহাদেব তখন রেগে গিয়ে ‘শবরকে’ অভিশাপ দিলেন এই বলে যে, শবর জাতি চিরকাল বন-জঙ্গলেই বাস করবে এবং নিদারুণ কষ্টে তাদের জীবন কাটবে। লোককথা তাই কচি সেগুন পাতা ঘসলে রক্তের মতো লাল রস বার হয়।
(খ) ঐতরেয় ব্রাহ্মণ গ্রন্থে আছে যে, শবরেরা ঋষি বিশ্বামিত্রের পুত্রদের বংশধর। ঋষি এই ব্রাহ্মণ বালককে পোষ্যপুত্র রূপে গ্রহণ করায় ছেলেদের সাথে মতবিরোধ হয়। ক্রুদ্ধ হয়ে ঋষি, নিজের ছেলেদের অভিশাপ দেন যে তাদের বংশধররা সমাজে পতিত বলে গণ্য হবে। তারাই শবর জাতি।
(গ) ধলভূম গড়ের শবররা বলে আমরা শব্বর বুড়হা-শব্বর বুড়হীর বংশধর।
(ঘ) উড়িষ্যার শবররা বিশ্বাস করে তারা ‘‘বসু শবরের বংশধর’’।
বৈদিক যুগে ও পুরাণে শবর —
    ঋগ্বেদে পুরুষোত্তম এবং দারু-ব্রহ্মের কথা পাওয়া যায়। এই থেকে মনে হয় যে, ইতিহাসের আলো যেখানে পৌঁছায়নি, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই কোন না কোনভাবে জগন্নাথদেবের প্রচলন ছিল। উড়িষ্যার অধিবাসীরা ভগবান বিষ্ণুকে চক্রধরমাধব, ললিতমাধব, শবরীমাধব, নীলমাধব প্রভৃতি রূপে পূজা করত। নীলমাধব ছিল ‘জারা শবর’ বংশের দেবতা এবং তাকেই সকল দেবতার শ্রেষ্ঠ বলা হত। শবরেরা তাঁকে ‘জগনাইলো’ বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের অধীশ্বর বলত এবং শবর গ্রামে এখনও এই জগনাইলো নামই ব্যবহার করা হয়। সম্ভবতঃ ‘‘জগনাইলো’’ থেকেই জগন্নাথ নামের প্রচলন হয়েছে।
    পৌরাণিক যুগের বিভিন্ন পুরাণে শ্রীক্ষেত্রের মাহাত্ম্য এবং মন্দির তৈরীর কথা রয়েছে। এছাড়াও উড়িষ্যার প্রাচীন পণ্ডিতদের লেখা পুঁথি এবং প্রচলিত কিংবদন্তী থেকেও জগন্নাথদেবের সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যায়। যদিও এইসব লেখা এবং প্রচলিত কাহিনীর মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য রয়েছে, তবু এইসব একত্রিত করে একটি মনোজ্ঞ বিবরণ পাওয়া যায়। রামায়ণে আছে, একসময় সুগ্রীব ও বালি দুই ভাইয়ের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বাধে। সেই সময় রামচন্দ্র ভুল করে বিনা কারণেই বালিকে বধ করেন। সীতাকে উদ্ধার করে রামচন্দ্র যখন অযোধ্যায় ফিরে আসেন এবং সবাই আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন তখন বালি-পুত্র অঙ্গদ রামকে, তার পিতাকে বধের কারণ জিজ্ঞেস করলে তার উত্তরে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং অঙ্গদকে তার প্রতিশোধ নেবার কথাও বলেন। তাই পরের জন্মে রামচন্দ্র যখন পৃথিবীতে শ্রীকৃষ্ণরূপে আসেন তখন বালিপুত্র অঙ্গদ জন্ম নেয় শবর কূলে ‘জারা শবর’ নামে। একদিন জারা শবর শিকার করে ক্লান্ত হয়ে এক কদম গাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন সেই গাছের ডালে বসে ছিলেন ‘শ্যামা-পাখি’ রূপে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। জারাও তাকে ভুল করে পাখি ভেবে তীর নিক্ষেপ করে। মাটিতে পড়ে গেলে শ্রীকৃষ্ণরূপ দেখে ‘জারা শবর’ অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলে শ্রীকৃষ্ণ পূর্বকথা স্মরণ করিয়ে বললেন, তুমি ভুল করোনি। আমিও এমনই ভুল করে তোমার পিতাকে বধ করেছিলাম। তার জন্যই আজ তোমার হাতে আমাকেও মরতে হল।
    দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শাক্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ‘বসু শবর’ ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পিতা বাসুদেবের জাতি ভাই। যদু বংশ ধ্বংস হয়ে যাবার পর, জারা শবরের বাণে যখন শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগ হয়, তখন তার শরীর কিভাবে সৎকার করা হবে, এই নিয়ে পান্ডব এবং শবরদের মধ্যে মতান্তর উপস্থিত হয়। অর্জুন এবং জারা শবর তখন শ্রীকৃষ্ণের দেহ বহু দূরে এক সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে গিয়ে সৎকার করেন। সম্ভবতঃ পুরীর ‘কৈলি বৈকুন্ঠ’ (কৈবল্য-বৈকুন্ঠ) ছিল শ্মশানক্ষেত্র। সেখানে শবরেরা শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় ‘ইন্দ্রনীল’ মনিটি পেয়ে, শ্রীকৃষ্ণের চিহ্ন হিসাবে ইন্দ্রনীল মাটির পূজা করতে থাকে। ইন্দ্রনীলমনি থেকেই নীলমাধবের পূজার প্রচলন হয়। শ্রীকৃষ্ণের দেহ যখন সৎকার করা হচ্ছিল, তখন সেই অর্ধদগ্ধ দেহটিকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবার জন্য দৈববাণী শোনা গেল। সেই অর্ধদগ্ধ কৃষ্ণদেহ সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে দারুরূপে পুরীর রোহিনী কুন্ডে এসে লাগে। এদিকে জারা শবর না জেনে, হরিণ মনে করে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি বাণ নিক্ষেপ করেছিল; এই দুঃখে এবং আত্মগ্লানিতে জারা শবর হন্যে হয়ে শ্রীকৃষ্ণের দেহাবশেষ খুঁজতে থাকে এবং রোহিনী কুন্ডে এসে দারুরূপী শ্রীকৃষ্ণের দেহপিন্ড পায়। জারা শবর ঐ দারু নিয়ে গিয়ে অতি গোপনে আদিবাসীদের নিয়মানুযায়ী তাদের অতি প্রিয় শ্রীকৃষ্ণের পূজা করতে থাকে। সম্ভবত দারু এবং ইন্দ্রনীলমনি একই সঙ্গে রেখে পূজা করত।
    বহু বছর কেটে গেছে; জারা শবরের পর তার পুত্র বিশ্ববসুও পরমভক্তির সঙ্গে সেই দারুব্রহ্ম নীলমাধবের পূজা করতে থাকে। এদিকে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত। তিনি লোকমুখে নীলমাধবের সংবাদ পেয়ে শবর গ্রাম থেকে তাঁকে এনে নীলগিরিতে প্রতিষ্ঠা করতে সংকল্প করলেন। নীলমাধব যে কোথায় রয়েছে বাইরের কেউই তা জানত না। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তার মন্ত্রী বিদ্যাপতিকে নীলমাধবের সন্ধানে পাঠালেন। বিদ্যাপতি শবর গ্রামে গিয়ে শবর রাজা বিশ্ববসুর কন্যা ললিতাকে বিয়ে করেন। প্রথমে রাজি না হলেও জামাতা-কন্যার মিলিত অনুরোধে শর্তাধীনে ‘নীলমাধব’ দর্শনে রাজী হলেন। পথে চোখ বেঁধে নিয়ে গেলেও বিদ্যাপতি লুকিয়ে সরিষা ছড়াতে ছড়াতে যান। বর্ষায় তা থেকে চারা-ফুল হলে তা দেখে পুনর্বার একা গিয়ে নীলমাধবের দর্শন করে আসেন। পত্নী ললিতাকে নিয়ে বিদ্যাপতি দেশে ফিরে যায়। বিদ্যাপতি রাজাকে নীলমাধবের সংবাদ জানালে, ইন্দ্রদ্যুম্ন সৈন্য নিয়ে এসে বিশ্ববসুকে গ্রেফতার করে। সেই সময় আকাশবাণী হয়। বিশ্ববসু শবরকে ছেড়ে দাও, সে আমার সেবক। ইন্দ্রদ্যুম্ন শবরদের সাহায্যে সেই দারু প্রচুর জাঁকজমকের সঙ্গে নীলাচলে নিয়ে যান এবং সেই দারু থেকে, এখন আমরা জগন্নাথের মন্দিরে যে তিনটি বিগ্রহ দেখি, ঠিক সেই রকমের তিনটি মূর্তি তৈরী করান। বিশ্বকর্মা স্বয়ং বৃদ্ধ ছুতারের বেশে রাজার কাছে এসে মূর্তি তৈরীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কথা ছিল যে, যতদিন মূর্তি সম্পূর্ণ তৈরী না হবে ততদিন মন্দিরের দরজা খোলা হবে না। কিন্তু রাজা অধৈর্য্য হয়ে সেই কথা না মেনে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মন্দিরের দরজা খুলে ফেলেন। ফলে তিনটি মূর্তিই অসম্পূর্ণ অবস্থায় পাওয়া যায়। রাজা অর্ধনির্মিত সেই তিনটি মূর্তিই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে, জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম-রূপে পূজা করতে থাকেন। ১২ বছর পর পর নবকলেবরের সময় পুরানো মূর্তি থেকে ‘ব্রহ্মকে’ নূতন মূর্তিতে স্থানান্তরিত করা হয়। জনশ্রুতি আছে শ্রীকৃষ্ণের ইন্দ্রনীলমনিটি, যেটি শবরেরা পূজা করত, সেটিই ব্রহ্মরূপে নবকলেবরের সময় নূতন দারুতে স্থানান্তরিত করা হয়, তা কেউ জানে না; কারণ যিনি ‘ব্রহ্মকে’ পুরানো মূর্তি থেকে বের করে নূতন মূর্তিতে স্থাপন করেন, তার চোখ তখন বাঁধা থাকে।
    মন্দিরে মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথ দেবের কাছে চারটি প্রার্থনা করেন —
    প্রথমতঃ শবর রাজা বিশ্ববসুর বংশধরেরা দৈত্যপতি নামে অভিহিত হবে এবং জগন্নাথদেবের অদর্শনকালে (স্নানযাত্রার পর থেকে রথযাত্রা পর্যন্ত) ও রথযাত্রার সময় তার সেবা-পূজা করবে।
    দ্বিতীয়তঃ বিদ্যাপতির শবর পত্নী ললিতার বংশধরেরা সুপকার নামে পরিচিত হবে এবং বংশানুক্রমে তারা জগন্নাথদেবের ভোগ রান্না করবে।
    তৃতীয়তঃ বিদ্যাপতির ব্রাহ্মণ পত্নীর বংশধরেরা জগন্নাথ দেবের পূজারী হবে। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে যখন তার চতুর্থ প্রার্থনার কথা জিজ্ঞাসা করা হল, তখন তিনি বললেন যে, তার সঙ্গে সঙ্গেই যেন তার বংশ লোপ পেয়ে যায়; কারণ তার বংশধরেরা হয়তো পরে গর্ব করে বলবে যে, এই মন্দির ও বিগ্রহ তাদেরই পূর্বপুরুষেরা তৈরী করেছিল। জগন্নাথদেব সন্তুষ্ট হয়ে রাজার চারটি প্রার্থনাই পূর্ণ করেছেন। প্রার্থনানুযায়ী এখন পর্যন্ত মন্দিরের বিভিন্ন কাজ সেই সেই বংশের লোকেরাই করে থাকে।
প্রাচীন সাহিত্যে শবর —
    শবর জাতি তথা সম্প্রদায় তথা গোষ্ঠী হিসাবে এরা খুবই প্রাচীন। বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতম রচনা ‘‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’’ গ্রন্থে শবরগণের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় (৮/৩/৫)। অসুর রাক্ষসদের সমসাময়িক হিসাবে খৃষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দী থেকে খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে রচিত আদিকাব্য ‘রামায়ণে’ মহর্ষি বাল্মিকী আমাদের ‘‘শবরীর প্রতিষ্ঠা’’-র কথা শুনিয়েছেন। আবার ঐ যুগেই মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ রচিত মহাকাব্য মহাভারতেও শবরদের কথা উল্লেখ করেছেন। মহাভারতের যুগে শবরদের এক পূর্বসুরী ‘‘জরাসুর’’ শ্রীকৃষ্ণের হন্তারক ছিলেন।
    খৃষ্টীয় প্রথম শতকের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক প্লিনির ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে, দ্বিতীয় শতকের গ্রীক পণ্ডিত টলেমির ভাষ্যে শবরদের বিশেষ উল্লেখ আছে। সহস্র বৎসর আগের সহজিয়া বৌদ্ধ সাহিত্য সম্ভার ‘চর্য্যাপদে’ (দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর সংকলিত) জনৈক ‘শবরপাদ’ নামে এক সিদ্ধাচার্য ও দেবী ‘পর্ণশবরীর’ কথা বলা হয়েছে। চর্য্যাপদের ২৮ ও ৫০ সংখ্যক গীতি ‘শবরপাদানাম্’ নামে চিহ্নিত। এই শবরপাদের প্রণীত দুটি গীতিগ্রন্থও আছে ‘‘মহামূদ্রজ্রগীতি’’ ও ‘‘চিত্তগুহ্য গম্ভীরার্থ গীতি’’, এখানে যে পর্ণ শবরীর কথা বলা হয়েছে তাঁর প্রসঙ্গেও জানা যায়। যে তিনি শবরদের মতোই ব্যাঘ্রচর্ম ও পত্র বল্কলে ভূষিতা এবং বজ্রকুন্ডলধারিনী, অপস্মারদলনী, আর একজন শবর দেবীর কথা জানা যায়, যার নাম জাঙ্গলী, ইনি সর্প ও সঙ্গীতের দেবী, বীনাবাদিনী। ‘স্কন্ধপুরাণের’ কাশী খণ্ড, দন্ডীর ‘দশকুমারচরিত’, বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’, কবি বাকপতির ‘গোউড়বাহ’ প্রভৃতি রচনায় শবরদের কথা আমরা জানতে পারছি। 
    ‘মীমাংসা দর্শনের’ ভাষ্যকারের নাম শবরস্বামী, প্রবাদ আছে জৈনদের থেকে দূরে থাকবার জন্য তিনি শবরদের বেশ ধরে শবর বসতিতে বাস করেছিলেন।
    বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ থেকে জানা যায় — হর্ষবর্ধন তার হারিয়ে যাওয়া বোন রাজ্যশ্রীর অনুসন্ধানে বন থেকে বনে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তখন তিনি ‘নির্ঘাত’ নামে এক শবর যুবকের সন্ধান পেয়েছিলেন। বিন্ধ্যপর্বতের শবর সেনাপতির ভাগ্নে সে, নির্ঘাত অরণ্যভূমির গাছ-পাতা সব চিনত। তাকে মনে হত পাহাড়ের চলমান তমালবৃক্ষ (জঙ্গ মমিব গিরিতট-তমালপাদপম্) কিম্বা বিন্ধ্যপর্বতের গলন্ত লৌহসার (অয়ঃ সারমিব গিরেবিন্ধ্যস্য গলন্তম্)।
    ‘কাদম্বরীতে’ বাণভট্ট শবর সৈন্যদের ভয়ঙ্কর মৃগয়া-অভিযানের বর্ণনা করেছেন। একটি বৃদ্ধ শবর কেমন করে নির্দয়ভাবে শুকপক্ষীদের হত্যা করেছিল (জীর্ণ শবরঃ পিবন্নিবাস্মাকমায়ুংষি) তারও বিবরণ আছে সেখানে। আরও জানা যায় যে শবর রমনীরা ফুলে ফুলে নিজেদের সজ্জিত করতে ভালবাসত (শবরসুন্দরী - কর্ণপূর রচনোপযুক্ত পল্লবস)।
    একাদশ শতাব্দীতে সোমদেবরচিত ‘‘কথাসরিৎ সাগরের’’ একটি কাহিনীতে শবরদের উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজা শ্রীদত্ত তার হৃত স্ত্রীর অনুসন্ধানে বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তখন তিনি এক শবরগোষ্ঠীপতির দেখা পান। শবরাধিপতি রাজাকে তাঁর গ্রামে নিয়ে যান। পথশ্রমে ক্লান্ত রাজা সেখানে অচিরে ঘুমিয়ে পড়েন এবং জেগে দেখেন তিনি বন্দী হয়েছেন। এইভাবে কয়েকদিন থাকার পর শবরপতির এক দাসী তাঁকে বলেন যে শবরপতি কিছুদিনের জন্যে বাইরে গেছেন (কার্যাসিবদ্ধসহ স হি ক্কাপি প্রয়াতঃ শবরাধিপঃ, ১০/১৪১) এবং তিনি ফিরে এসে রাজাকে চন্ডিকার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবেন। শবরের দাসী রাজার মুক্তির একটি উপায় বলে দিলেন। রাজা দাসীর কথা শুনে ‘শবরপতির’ কন্যাকে গান্ধর্বমতে বিয়ে করলেন (সুন্দরী নাম শবরাধীপতেঃ সুতা) এবং শবরের স্ত্রী তাকে স্নেহবশত মুক্ত করলেন। শ্রদ্ধেয় শশীভূষণ দাসগুপ্ত মহাশয় তার ‘বাংলা ও বাঙালী’ প্রবন্ধে বিশ্বভারতী পত্রিকায় লিখেছেন— আর্য জাতির যে কিছু কিছু লোকের আগমন ঘটিয়াছিল বাংলাদেশে তাহাদের ভিতরে কোল জাতিই ঐতিহাসিকের চোখে প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। আজকের দিনেও আমাদের জাতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে কোল উপাদান একটা প্রধান অংশ গ্রহণ করিয়াছে। এই আদিম কোলগণের ভিতরে শবর, পুলিন্দ, ডোম, চন্ডাল প্রভৃতি এই চর্য্যার যুগে সমাজের একটি বৃহৎ অংশ অধিকার করিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। চর্য্যাগুলির ভিতরে সেইজন্যই তাহারা এত প্রধান হইয়া দেখা দিয়াছে।
শবরদের বিষয়ে নৃ-তাত্ত্বিকদের মতামত —
    ঊনবিংশ শতাব্দীর সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক-পুরাতাত্ত্বিক মেজর জেনারেল স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম, ১৮৭২ খৃষ্টাব্দের চিটিয়া নাগপুরের কমিশনার এডওয়ার্ড ট্যুইট ডালটন, ১৮৯১ খৃষ্টাব্দের ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের হিউবার্ট হিউয়েট রিশলে প্রভৃতি পন্ডিতগণ শবরগোষ্ঠী সম্বন্ধে বহু অনুসন্ধান করে যুগে যুগে তার ধারাবিবরণী দিয়ে গেছেন। শবরেরা সর্বত্রই নিম্নশ্রেণীর অন্ত্যজ বলে তারা অভিহিত করে গেছেন। আবার প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ জি. এ. গ্রীয়ারসন ১৯০৬ সালে ‘লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, ভল ৪.’ -এ লিখেছেন কোল বা মুন্ডাজাতীয় উপজাতিগুলি এদেশে এসেছিল দক্ষিণ-পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও মালয় উপদ্বীপ অঞ্চল থেকে — অবশ্য যদি ভারতের মূল ভূ-খন্ড এদের আদি বাসভূমি না হয়। এই ভাবনার কারণ ভাষাগত সাদৃশ্য। ভারতের মুন্ডা বা কোলারিয়ান আদিবাসীদের ভাষার সঙ্গে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলির ও মালয় উপদ্বীপের আদিবাসীদের ভাষার মূলে কিছু সাদৃশ্যের উপর নির্ভর করে অনুমান করেছেন, কোলারিয়ানরা ভারতের প্রাচীনতম অধিবাসী।
    ১৯১৬ সালে মানব জাতিতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ আর. ভি. রাসেল ‘ট্রাইবস এন্ড কাষ্ট অফ সেন্ট্রাল প্রভিন্সেস অফ ইন্ডিয়া’ ভল-১. -এ শারীরিক ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রেখে ভারতের অমিশ্র আদিবাসীদের প্রধানত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন — দ্রাবিড়ীয় ও কোলারিয়ান (কোল ও মুন্ডা পরিবারভুক্ত)। শবরেরা এই কোলারিয়ান বা মুন্ডা পরিবারভুক্ত উপজাতিগুলির মধ্যে অন্যতম উপজাতি হিসাবে পরিচিত।
    পরবর্তীকালে ১৯৪৪ সালে ভেরিয়ার এলউইন তাঁর বই (দি অ্যাবোরজিনালস) -এ বৃহত্তর অর্থে কোলারিয়ান উপজাতিগুলিকে প্রোটো-অষ্ট্রোলয়েড জাতিসমূহের অর্ন্তভুক্ত করেছেন।
    ভারতে আর্য সভ্যতার আরম্ভকাল থেকে সাহিত্যে শবরদের যে জীবন চিত্রিত হয়েছে, সেখানে পুরাকালে এদের জীবনযাত্রার বাস্তব পরিচয় ফুটে উঠেছে যা আমরা আগে দেখেছি। আধুনিক কালের নৃ-তাত্ত্বিকগণ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এই পরিচয়কে বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছেন বৈদিক যুগেই শবরেরা আদিম জীবন অতিক্রম করে একটি পরিপূর্ণ সামাজিক জীবন-যাপন করত। এদেশে পাওয়া প্রাচীন ধ্ৱংসপ্রাপ্ত স্তুপ, পাথর, পোড়ামাটির ফলক প্রভৃতি থেকে তাদের সাংস্কৃতিক জীবন কতো উন্নত মানের ছিল তাও জানা যায়।
    উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে নৃ-বিজ্ঞানী, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিকগণ প্রাচীন সাহিত্যের ইতিহাসের উপাদানগুলিকে অবলম্বন করে ভাবতে শুরু করলেন এই শবরেরা কারা ? ভারতের আদিবাসী হিসাবে এদের প্রকৃত পরিচয় কি ? প্রাচীন ভারতের কোন কোন অঞ্চলে এদের বসবাস ছিল ? বর্তমানের শবর এবং পৌরানিক ‘শবরেরা’ কি একই উপজাতি ? আর্যগণ, সকল অরণ্যবাসী অনার্যদের ‘শবর’ নামে চিহ্নিত করত কি না ?
    এ বিষয়ে আলেকজান্ডার কানিংহাম তার (রিপোর্ট অফ ট্রুর ইন দ্যা সেন্ট্রাল প্রভিনসেস এন্ড লোয়ার গানজেইটক ড্যোব ইন ১৮৮১-৮২) তে বললেন ‘‘অল দ্যা এভিডেন্স লেন্ডস টু সোউ দ্যাট্ দি শবরস ওয়ের দ্যা ডোমিনেন্ট রেস অফ অ্যাবোরিজিনাস’’। আবার তিনি প্রাচীন সাহিত্যে এখনকার প্রধান উপজাতিগুলির উল্লেখ না দেখে বললেন যে, সাঁওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ, কোল, ভীল, জুয়াং, হো প্রভৃতি কোলারিয়ান উপজাতিগুলি সম্ভবত সামগ্রিকভাবে শবর নামে পরিচিত ছিল। এর ফলে আমরা অনুমান করতে পারি আদি মানুষেরা বর্তমানের মতো এত বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল না। সে সময়ে ‘শবরেরা’ একটি সমৃদ্ধ অনার্য জাতি হিসাবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে শবর এবং অন্যান্য জাতিগুলি ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। এরাই হল সাঁওতাল, কোল, মুন্ডা, ভূমিজ, হো ইত্যাদি। এদের মধ্যে একটি শাখায় ‘শবর’ এই মূল নামটি থেকে যায়। শবররা ক্রমশ সমৃদ্ধি হারাতে থাকে এবং অন্যান্য শাখাগুলি উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
    এর উপর আছে আর্যদের অনার্য জাতিগুলির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিরামহীন চেষ্টা শবরদের সংরক্ষিত নিজস্ব ভাষার যৎসামান্য দুর্লভ সূত্র ধরে জাতিতত্ত্বের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলেও বর্তমানের শবরদের পর্যবেক্ষণ করে অতীতের সামগ্রিক পরিচয়ে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই।
    এখনও স্বাতন্ত্র্য বজায় আছে এমন শবরদের খুঁজে বের করার জন্য ফ্রেড ফাওচেট, এর্ডগার থারস্টন, সতীন্দ্র নারায়ণ রায়, জি. ভি. সীতাপতি, ভেরিয়ার এলউইন নানা প্রদেশের পাহাড়-বনাঞ্চলে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন এবং শুধুমাত্র ওড়িষ্যার পাহাড়-অরণ্যের গভীরে এক শ্রেণীর শবরের সন্ধান পান, যারা পরস্পর খুবই বিচ্ছিন্ন এবং এদের সাংস্কৃতিক জীবনের পরিধিও সংকীর্ণ।
    নৃ-বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে নানান অঞ্চলভেদে অন্তত ঊনত্রিশটি ‘শবর’ শব্দের ভিন্ন উচ্চারিত রূপের সন্ধান পেয়েছেন। যথা— শবর, শবরা, শাহারা, শারা, শওন, শওর, শাওরা, শাওউরো, শার, শাউর, শাউরহ, শভর, শভরা, শভরালু, শভ, শাওআর, শায়ার, শোবোর, শোরি, শোয়িরি, শোরা, শোটরা, শোওউরা, শৌরাহ, শোয়ারা, শুরি, শুয়িরি, সব্বর, সবর।
প্রাচীন ভারতবর্ষে শবর বসবাসের মানচিত্র —
    সময়ের বিবর্তনে প্রাচীন ভারতের পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, জনপদের নাম ও পরিচয় পরিবর্তিত হয়ে গেলেও, ইতিহাসের সূত্র ধরে প্রাচীন সাহিত্যে উল্লিখিত শবরদের বসবাসের এলাকাগুলি চিহ্নিত করা গেছে। শুধু তাই নয় উৎকীর্ণ লিপি, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, পাথরের অস্ত্রশস্ত্র এবং ব্যবহারিক জিনিসপত্রের সূত্র ধরে শবরদের বসবাসের আঞ্চলিক মানচিত্র তৈরী করতে পেরেছে।
    পশ্চিমে চর্মনবতী (চম্বলনদী), পূর্বে মহানদীর উত্তরভাগ অঞ্চল এবং বাঘেলখন্ডের মালভূমি, দক্ষিণে রেবা (নর্মদা) ও গোদাবরী নদীর উত্তর ভাগ এবং উত্তরে গঙ্গানদীর মধ্য প্রবাহের দক্ষিণাঞ্চল— এই সীমারেখার মধ্যবর্তী বিস্তৃত ভূ-খন্ডে শবরেরা এক সময় বাস করত। বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণী এবং বুন্দেলখন্ড মালভূমি এই অঞ্চলেই অবস্থিত।
    কানিংহাম তাঁর প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে লিখেছেন মহানদীর উৎস থেকে চল্লিশ মাইল নিচে দক্ষিণ তীরে প্রাচীন গ্রাম সিরপুর এবং বেত্রবতী (বেতোয়া) নদীতীরে অবস্থিত ভিলসার (বিদিশা) অর্থাৎ মধ্য ভারতে শবরদের অস্তিত্ব এবং আধিপত্য ছিল।
    নৃ-বিজ্ঞানী আর. ভি. রুসেল অন্যান্য পুরাতাত্ত্বিকদের সাথে একমত হয়ে বললেন যে পুরাকালে ভারতবর্ষের মধ্যভাগের অরণ্য অঞ্চলের বিস্তৃত ভূ-খন্ডে প্রভাশালী শবরেরা বাস করত।
    রামায়ণের শবরীর বাসস্থান ছিল দন্ডকারণ্যের দক্ষিণে পম্পাসরোবরের তীরে। আবার তাপসী শবরীর সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রের যেখানে দেখা হয়েছিল সেই ‘মাতঙ্গ আশ্রম’ মহানদীর তীরে অবস্থিত বলে মনে করা হয়।
    দক্ষিণ ভারতীয় শিলালিপি (৫ নং ১৩১২) থেকে জানা যায় যে বিন্ধ্যপর্বতের উভয়দিকে — উত্তরে গঙ্গা এবং দক্ষিণে গোদাবরী পর্যন্ত অঞ্চলে শবররা বসতি স্থাপন করেছিল এবং পরবর্তীকালে তারা আরও দক্ষিণে তাদের বসতি বিস্তার করেছিল।
    আবার পুরাণের কাহিনী অনুসারে আমরা জানতে পারছি শবররা বিন্ধ্য পর্বতমালায় বসবাস করত (মৎস্যপুরাণ ১১৪/৪৪-৪৫; মাকন্ডেয় পুরাণ ৫৭/৪৭, ৫৮/২২; ব্রহ্মপুরাণ ২৭/৫৪-৫৭, স্কন্ধপুরাণ (কাশীখন্ড), বৃহৎসংহিতা ১৪/৮-১০; ৯/১৫, দন্ডীর দশকুমাররচিত, বাণভট্টের হর্ষচরিত, কবি বাকপতির গৌউড়বাহ থেকে জানা যায় যে বিন্ধ্যপর্বতের পশ্চিমাঞ্চল শবরদের অধিকারে ছিল।
    চর্য্যাপদের এক জায়গায় কবি বলছেন —
    বরগিরি সিহর উতঙ্গ মুনি
    সাবরেঁ জহি কি আবাস (কাহ্নপাদের দোঁহা-২৫)
শবররা বাস করত বড় বড় পাহাড়ের শিখরে।
    সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীর পর থেকে মধ্য ও মধ্য-পশ্চিম ভারতে শবররা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অরণ্য পথ ধরে বুন্দেলখন্ড মালভূমি ও বিন্ধ্যপার্বত্য অঞ্চল থেকে পূর্ব ভারতের দিকে সরে আসে। উপজাতি জনসংখ্যা গণনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, এক সময়ে শবর অধ্যুষিত মধ্য ও মধ্য-পশ্চিম আজ প্রায় শবর শূন্য।
    এ পর্যন্ত শবর জনসংখ্যা গণনার দিকে তাকালে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শবরদের বাসস্থানের চিত্রটি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
    ১৮৯১ সালে আর. এইচ. রিসলের (ট্রাইবস এন্ড কাস্ট অফ বেঙ্গল, ভল-২ ১৮৯১, পি.১২৮) থেকে জানা যায় উড়িষ্যা, বিহার ও বাংলার কয়েকটি জেলায় শবরদের বাসস্থান ছিল যথা— কটক, পুরী, বালাসোর, সিংভূম, মানভূম, মেদিনীপুর।
    ১৯১১ সালে বৃটিশ সরকারের তত্ত্বাবধানে শবর জনসংখ্যা গণনায় তৎকালীন মধ্য ও সংযুক্ত প্রদেশসমূহে, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি এবং উড়িষ্যা রাজ্যের জেলাগুলিতে ছয় লক্ষ শবরের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল।
    ১৯৬১ সালে ভারতে শবরদের বসবাসের স্থানগুলি ছিল যা আমরা (এনাক্সচার টু দ্যা ট্রাইবল ম্যাপ অফ ইন্ডিয়াঃ) এনথ্রোপলজিক্যাল সারভে অফ ইন্ডিয়া, কলকাতা, ১৯৭১ থেকে জানতে পারছি। যথা -
অন্ধ্রপ্রদেশ— চিত্তুর, পূর্ব গোদাবরী, গুন্টুর, নেলোর, শ্রীকাকুলাম, বিশাখাপত্তনম, পশ্চিম গোদাবরী।
বিহার— হাজারীবাগ, পাটনা, রাঁচী, সহর্ষ, সাঁওতাল-পরগণা, শাহাবাদ, সিংভূম।
মধ্যপ্রদেশ— বস্তার, বিলাসপুর, ছতরপুর, দ্রুগ, দতিয়া, পান্না, রায়গড়, রায়পুর, সিওনি।
ওড়িষ্যা— বালাসোর, বাউধখোন্দমলস্, বোলানগিরি, কটক, ধেনকানল, গঞ্জাম, কালাহান্ডী, কেয়নঝড়, কোরাপুট, ময়ূরভঞ্জ, পুরী, সম্বলপুর, সুন্দরগড়।
পশ্চিমবঙ্গ— পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর। এছাড়াও জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ির চা বাগান তথা নদীয়া জেলায় শবররা বসবাস করে।
শবর আকৃতি — শবর দেখতে ঠিক কালো নয়, রঙটা ধূসর কালো। বুনো হাতির মতো ধুলি-ধূসরিত শরীর। লম্বায় সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় ফুট, মাথা গোল, নাক ছোটো ও চ্যাপ্টা। চোখ ছোট ছোট উজ্জ্বল। দৃষ্টি খুব প্রখর ও সচকিত চঞ্চল। রাত্রিতে সাধারণের চেয়ে এদের দৃষ্টিশক্তি অনেক বেশী। ঠোঁটের পাতা মোটা। কাঁধ মাংস পেশীবহুল। হাত লম্বা, বলিষ্ঠ লোহার মত শক্ত। হাতের তালু ভীষণ শক্ত, আঙুলগুলো বেশ মোটা মোটা। বুক ভীষণ চওড়া, মাংসপেশীতে ভরাট। পেট শরীরের সঙ্গে সাটানো। সারাদিন মাঠে-ঘাটে ঘোরাঘুরি করে বলে পায়ের পাতা বেশ শক্ত, চওড়া ও সমান।
শবর চরিত্র — স্বল্পভাষী, ভীরুস্বভাব, মমত্বহীন জীবন, সৌন্দর্যহীন জীবনযাত্রা, অধৈর্য স্বভাব, আকাঙ্খাহীন জীবন, আরামপ্রিয়, ভোজনবিলাসী, স্বাধীনচেতা পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশী সক্রিয় ও বুদ্ধিমতী। এরাই পুরুষগুলোকে পরিচালনা করে। শবররা একসঙ্গে চলাফেরা করে না। সন্তান স্নেহ এদের মধ্যেও আছে কিন্তু ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে বিয়ে করে পৃথক হয়ে যায়। নিঃসঙ্গ বিচ্ছিন্ন মনোভাব শবর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। চাহিদা-প্রয়োজন খুব কম। ঠকলেও প্রতিবাদী নয়। অসামাজিক কাজে অনেকেই লিপ্ত। শবরদের সামাজিক জীবন শিথিল ও এলোমেলো। জীবনের নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলার ক্ষেত্রে এরা উৎসাহহীন। শবর টোলাগুলিতে শুধুমাত্র শবররাই বসবাস করলেও অনাহার-ক্লিষ্ট পরিবারগুলির মধ্যে পরস্পরকে নিয়ে সম্পর্কের উত্তাপ অনুভব করতে বড় একটা দেখা যায় না। যে জোগাড় করতে পারে সে খায়। পাশেই অনাহারে থেকে যায় অন্য পরিবার। যে খেতে পেয়েছে পাশের অভুক্ত পরিবার নিয়ে তার কোনো দুর্বলতা প্রকাশ পায় না; আর যে অনাহারে আছে তার কোনো রাগ-ঈর্ষা-দুঃখ-অভিমান-প্রত্যাশা কিছু নেই। বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া প্রতিটি পরিবার পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। কেউ মারা গেলে তার ক্রিয়াকর্ম সব করে কিন্তু শোকে ভেঙ্গে পড়ে না।
    শবর চরিত্রের একটা সুন্দর দিক আছে, একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। এরা খুব সরল। এটাই শবরদের চারিত্রিক সৌন্দর্য্য। এরা নিজের ইচ্ছামত কাজ করতে চায়। কোন নিয়ম মানে না। অভাব থাকলেও মদ, হাঁড়িয়া এরা খায় ও নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নিজেদের জীবনের কোন আকাঙ্খা নেই। বসবাসের জায়গাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কোন চল এদের নেই। এরা সঞ্চয়মুখী নয়। প্রয়োজনের বেশী কাজ করতে অভ্যস্ত নয়। তাই অভাব থেকেই যায়। চাষের চেয়ে শিকার করা, মাছ ধরার কাজে বেশী খুশী ও মন থাকে।
    এরা সভ্য সমাজকে এড়িয়ে চলতে চায়। সভ্য মানুষকে ভয় করে। আমাদের তথাকথিত সভ্যতাকে এরা ঠিকমতো বিশ্বাস করে না। এছাড়া আমাদের সামাজিক অসামাজিক ভেদ রেখাটাকে এরা ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি। অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে যতটা সম্ভব দূরত্বে এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। দলবদ্ধভাবে বনজ দ্রব্য সংগ্রহ, শিকার, মাছ ধরার কাজ করে থাকে। নিজ গোষ্ঠীর বাইরের লোকের সাথে কম মেলামেশা করে।
শবর গৃহ— পুরুলিয়া জেলায় প্রবাদ আছে ‘‘খেড়ার কাঁধে মুধুন’’ (ঘরের দুটি চালের যুক্ত হওয়া প্রধান কাঠ) অর্থাৎ এমনিই ঘর যে যখন ইচ্ছা মুধুন কাঠটি কাঁধে নিয়ে অন্যত্র গিয়ে আবার সেখানে ঘর তৈরী করে নিতে পারে। কিছু বাঁশ ও জঙ্গলের কাঠ দিয়ে চালার কাঠামো বানায়; জঙ্গলের লতা দিয়ে সেগুলো বাঁধে এবং পাতা ও বড় ঘাস দিয়ে ঢাকা/ছাউনি তৈরী করে। জঙ্গলের ভেতরে বসবাসকারী শবররা চারিধারে রোলা দিয়ে দেওয়াল বানায়, অন্যরা মাটির ছো দিয়ে দেওয়াল তৈরী করে। জানালাবিহীন একটি প্রবেশ দ্বার যাতে কোন কপাট থাকে না, থাকে খড় ও বাঁশ দিয়ে তৈরী একটা টাঁঠি (যা দেওয়ালের সাথে যুক্ত থাকে না এটাই কপাটের কাজ করে) সরিয়ে পাশে রাখা যায় আবার দরজার মুখে দিয়ে পেছন থেকে একটা লাঠি দিয়ে সেঁটে দেয়।
    ঘরগুলির মাপ সাধারণতঃ ৬ হাত বাই ৫ হাত বা তার থেকে কিছু বড়।
    যাদের একটু অবস্থা ভালো, লোকসংখ্যা বেশী এবং কিছু গৃহপালিত পশু থাকে তাদের ঘরও বড় হয়, মাটির দেওয়াল খড় বা খোলার ছাউনি থাকে বারান্দায় পশুপক্ষি রাখার জায়গা, অন্য পাশে রান্নার উনুন। বেশীর ভাগ শবরেরা রান্না করে বাইরে উঠোনে, বর্ষাকালে বারান্দায়। বর্তমানে এলাকার সহজলব্ধ অনুযায়ী এবং সরকারী ‘‘ইন্দিরা আবাস যোজনা’’র ফলে ইঁট/পাথরের দেওয়াল, সিমেন্ট প্লাস্টার যুক্ত ও টিনের ছাউনিওয়ালা ঘরে বসবাস করছে। কিছু জায়গায় পায়খানা থাকলেও শবররা তা ব্যবহার করে না।
শবর পোষাক — আগে শবরদের বেশভূষা আদিম অবস্থাকে প্রমাণ করে। পুরুষগুলো সারা দেহ উলঙ্গ, কোমরের নীচে একফালি শতচ্ছিন্ন ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত কাপড়, ভগা, হাঁটু পর্যন্ত মোটা ধুতি বা গামছা পরত। সারা শরীর তেলবিহীন, রোদ, শীত, বর্ষায় এই এদের বেশ ভূষণ ছিল একই। প্রচণ্ড শীতের দিনেও খালি গায়ে স্বাভাবিকভাবে থাকতো। মেয়েদের সাজসজ্জায় কোন সৌখিনতা ছিল না। মাথার চুল রুক্ষ, শুষ্ক, তেলবিহীন, শাঁখা, চুড়ির চালচলন নেই। হাতে শুধু লোহা — সিঁথিতে কখনও সিন্দুর। শিশুরা সব সময় উলঙ্গ, ধূলা-বালি মাখা থাকত।
    বর্তমানে শবরদের পোষাক-পরিচ্ছদে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এখন পুরুষ মহিলারা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের মতো পোষাক পরছে। এখন বড়রা ছাড়াও শিশুরাও পোষাক পরছে ও পরিচ্ছন্ন থাকছে। এর কারণ স্কুল যাবার অভ্যেস এবং অন্যদের সাথে মেলামেশা।
শবর পরিবারের গঠন — আরণ্যক শবরেরা আগে যখন যাযাবর জীবন-যাপন করত তখন শবর শিশু বাবা-মার কাছে পালিত হোত। বিয়ে করেই পৃথক হতে দেখা যেত, বোঝাই যায় এটা খাদ্যাভাবের জন্য। বেশীরভাগ ছেলেরা বিয়ে করে ঘর-জামাই হয়ে থাকত কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে বা শ্বশুর বাড়ীর অন্য কারও সাথে থাকত না। সেখানেও পৃথক থাকত। এটা যে সম্পত্তির লোভে তা নয়। কারণ দুই পরিবার ভূমিহীন এবং হতদরিদ্র এটাও যাযাবর মনোবৃত্তির জন্যে হয়ে থাকত।
    বর্তমানে এর কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বহু শবর পরিবার এখন একান্নবর্তী পরিবার। দাদু-ঠাকুমা, বাবা-মা, ভাই-তার পরিবারসহ বিধবা/স্বামী পরিত্যক্তা বোনকে নিয়ে যৌথভাবে সংসার পালন করছেন।
    শবর পরিবার পিতৃতান্ত্রিক হলেও নারীর প্রাধান্য যথেষ্ট থাকে, দৈনন্দিন জীবনে নারীর ভূমিকা প্রধান।
শবর সংস্কৃতি ও শিল্প — শবর সংস্কৃতি ও শিল্প চেতনা ছিল বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। ভক্তিমার্গ ও সাহিত্য কর্মে শবর জাতির সাবলীল যোগাযোগ গুণী সমাজে যথেষ্ট সমাদৃত। চর্যাপদের এক পদে আমরা দেখতে পাই শবরদের কি নিবিড় সৌন্দর্য্য চেতনা।
    ‘‘উঁচা উঁচা পাবত তহি বসই শবর বালী
    মোরঙ্গী পিচ্ছ পরহিন সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।’’
    তেমনি শবর পুরাণগুলিতে আরণ্যক শবর সংস্কৃতির কথা ধারাবাহিকভাবে আমরা দেখতে পাই। অরণ্যবিহীন হয়ে গেলেও প্রচণ্ড দারিদ্র্যের চাপেও তাদের সংস্কৃতিকে এখনও গানের মধ্যে টিকিয়ে রেখেছে। তাই শবর জীবনে গান একটি মুখ্য সংস্কৃতি। এরা দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ আনন্দের কথা গানের মাধ্যমে ধরে রেখেছে। শবর শবরী চলতে চলতে গান বাঁধে ও গায়। কালের নিয়মে প্রতিবেশীর সাংস্কৃতিক জীবনকেও কিছু ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছে।
    মালডির বুদ্ধেশ্বর শবর গান বেঁধেছেন —
    মালডিহে ঘর হামর, অঞ্চল হেনাক ভান্ডার পুয়াডারে পোষ্টাপিস দরডি,
    কেন্দা হেনাক থানা হে আফিস হামর রাজনোয়াগড়,
    মঙ্গলবারে যাঁউ হে ডানি - টুগা কিঁড়ি হিনি ঘরক হাম যাঁউ হে।।
    বেড়া খঁড়ে হাম মাডু রাঁধি খাও রে
    খাওয়া-দাওয়া হি গেলে ভুইপুরি রুহুরে।
    সাকাড়ে উঠি হিনি রাঁধি বাঁটি খাঁও রে
    খাওয়া-দাওয়া হিঁ গেলে বঁড়ক চুনি যাঁও রে।।
    খেজুর পতর নিহনি আঁড়ু রে।
    আর কতদিন বাঁচবা খ্যাইডা, গাঁয়র মাড়স হামক
    চোর-ডাকাত বনতরে
    সুঁড় সবাই খ্যাইডা ভাই সমিতির কথা ধর রে
    হেন বুদ্ধেশ্বর বনই শুঁড় খাইডা ভাই রে
    কিস কুড়ি বাঁচা যাবাক শুঁড় খাইডা ভাই রে।।
    এই গানে শবরদের নিজস্ব হস্তশিল্প যাকে ‘‘শবর শিল্প’’ বলে সেই শিল্প তৈরী করে জীবন চালনার জন্য শবরদেরকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
    খেজুর পাতা ও কাশীঘাস, পরিত্যক্ত গমের খড়, বাঁশ দিয়ে শবররা হস্তশিল্প করে থাকে যা বংশ পরম্পরায় বাড়ীর প্রয়োজনে এরা করে থাকে। হস্তশিল্পটার নামই শবরদের শিল্পের রুচি ও শিল্পী মানসিকতার জানান দেয়। কালীপূজার সময় শবর পল্লীর দেওয়ালগুলিতে প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে নানান ছবি তাদের শিল্পী সত্ত্বার পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করে।
    শবররা বাদ্যযন্ত্রের সাথে সমবেতভাবে নাচ করে থাকে। ওরা পাতা নাচ, দাঁড়নাচ বলে। বাজনার তালে তালে হাত ধরাধরি করে মেয়েরা গান গাইতে গাইতে গোল হয়ে এই নাচ করে। এতে বহু রকম গান করে —
    কুইলা পাড় ভাই ত্রিমা বাড়্যি, কুকরে শিয়াড়ে টাড়্যাটাড়্যি
    বাঘমুড়ির পাহারে পাখুইর বসয় চাটাড়্যে
    অনাহারে, পাখুরের জীবন গেনাক বিকর‍্যে।।
    হেই দেখ ডুবুইর গাছে ডুবুইর, ডাঙ্গে মারীম কে
    গাছর কেঁদে পারি, ভাসি গা ছাড্যায় নীম
    দাদা রে, বাঁধা ঘাটে চাটাড়্যে সুগীম।।
    ঘুসামাঝা সাইত কুরিম, ডঁডরাটাই সাজায় নীম
    দাদা রে, খাউঅড় খাউঅড় ঘরক ঘুরিম।।
    পীপির না মরই দাদা, নহার বাস ঘরে রে।।
শবর বাদ্য — সঙ্গীত ও নৃত্য প্রিয় শবরদের সুরযন্ত্রকে বলা হয় টুইলা, কেন্দরী, নৃত্যের বাদ্য হল মাদল, ধমসা, ঢোল, ছোটো ছোটো নাগড়া ও আড় বাঁশী। বর্তমানে আরো বাদ্যযন্ত্র বেড়েছে তা হল সানাই, বাঁশী, সাইডড্রাম, ক্যাসিও, ব্যাঞ্জ প্রভৃতি।
শিকারের অস্ত্রাদি —    তীর-ধনুক, কুঠার, লোহার রড্, টাঙ্গী, তপলা, সাবল, পাখী ধরা ফাঁদ, ইন্দুর ধরা ফাঁদ, জাল, গুলতি। মাছ ধরার ঘুগি খালই, জাল, বর্শা, কাস্তে, কাতু প্রভৃতি।
শবর জীবিকা ও খাদ্যাভাস — আরণ্যক জীবনে অভ্যস্ত শবর সমাজের সাধারণ মানুষের জীবিকার সাথে মিল ছিল না। শবরদের নিজস্ব কোনো কৃষি জমি ছিলনা। কৃষি কাজ এরা জানতো না। কারো জমিতে কৃষি শ্রমিকের কাজও করত না। শবরদের জীবিকার কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম ছিল না। বন জঙ্গলের ফলমূল আহরণ এবং পশু শিকার করাই ছিল এদের জীবিকা। শিকারের মূল দায়িত্ব ছিল পরিবারের পুরুষদের। মহিলারা শিকারের কাজে সহযোগিতা করত। তবে অবসরের সময়ে মহিলারাও বনের বাঁশ, ঘাস, খেজুর পাতার বিভিন্ন ঘরোয়া ব্যবহার সামগ্রী তৈরী করত। তাদের সামগ্রীগুলোর মধ্যে ছিল কুলা, ঝাঁটা, খাঁচী, ঝুড়ি, খেজুর পাতার চাটাই, ঝাড়ু ইত্যাদি। এসব কাজ মহিলা-পুরুষ মিলেই করত। সামগ্রী তৈরীর পর গ্রামের হাটে মাঝে মাঝে তা বিক্রি করতে দেখা যেত।
    শবরদের বেঁচে থাকার উপায় জানতে গেলে আমাদের আরো মনোনিবেশ করতে হয় তাদের সারা বছরের খাদ্য সংগ্রহের তালিকায়।
    বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ় — এই তিন মাস এরা বন জঙ্গল থেকে ফল, মূল, শিকড়, বাউলা ছাড়াও পাখীর বাচ্চা, ঢ্যামনা সাপ, গোসাপ, ব্যাঙ, শামুক সংগ্রহ করে খাদ্য রূপে ব্যবহার করে। ঢ্যামনা সাপ শিকার করতে পারলে তাদের বেশী আনন্দ। এটাই ছিল প্রিয় খাদ্য। সাপের চামড়াটা ছাড়িয়ে দেহটা পাতার তৈরী একটা বড় খোলার মধ্যে রেখে সামান্য আগুনে ঝলসে নেয়। কাঁটা বেছে মাংসটা খেয়ে ফেলে। পরে সাপের চামড়াটা বিক্রি করে দেয়। কাক থেকে যেকোনো পাখীর বাচ্চা খাওয়ার প্রণালীটা একই।
    শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন — এই তিন মাস এরা ধান খেত থেকে নানা জাতের ব্যাঙ, বড় বড় শামুক, বা ঘঙ্গা, মাছ, নদী জোড় থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে। এই সব খেয়ে এই কয় মাস বেঁচে থাকে। খাওয়ার প্রণালী আগের মতই।
    কার্তিক, অগ্রহায়ন, পৌষ — এই তিন মাস এরা ধান খেতের আইল থেকে ইঁদুর ও ইঁদুর গর্তের ধান সংগ্রহ করে। লোহার ছড় বা কাঠের লাঠিতে লোহার ফলা দেওয়া অস্ত্রের সাহায্যে এরা শক্ত শক্ত আইলকে অনায়াসে খুঁড়তে পারে। একেক দিনে ১/২ মন ধান ও সাথে ইঁদুরের মাংস। এ সময় শবর ঘরে মহাভোজ।
    মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র — এই তিন মাস এরা স্থানীয় ফল সংগ্রহ করে খায়। মধু সংগ্রহ করে। মৌচাকের ডিমসহ চাক এদের খাদ্য। মধু সময় সময় বিক্রি করে। এ ছাড়াও বনের পশু শিকারে বার হয়। বনের পশু মানে শিয়াল, হুড়াল, খরগোশ ইত্যাদি শিকার করে এরা খাদ্য রূপে ব্যবহার করে। জঙ্গলের কুক্কুট, ত্রিফলা, লতা, গুল্ম সংগ্রহ করে বাড়িতে ব্যবহার করে।
    আরণ্যক জীবনে অভ্যস্ত শবর সমাজের খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয় যখন থেকে বন উচ্ছেদ শুরু হয়। বনজ সম্পদ ও বন্য পশু-পক্ষীর অভাব দেখা দেয়। কৃষিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে কৃষিক্ষেত্র থেকে গুগলি, মাছ, কাঁকড়া নিঃশেষিত হতে থাকে। বাধ্য হয়ে শবর সমাজ কৃষি শ্রমিকের কাজ শুরু করে এবং বাড়ীতেও হাঁস, মুরগী, ছাগল পালন করে যা এখন শবরদের খাদ্য তালিকাতে অন্তর্ভু্ক্ত হয়েছে।
বিছানাপত্র ও আসবাবপত্র — শবররা সাধারণতঃ খেজুর চাটাই বিছিয়ে ঘুমায়, ক্যাঁথা, চাদর, কম্বল থাকে। অনেকেই দড়ির খাটিয়া ব্যবহার করে। দেওয়ালের পাশে দড়ি বা একটা বাঁশ দু-পাশ থেকে ঝোলানো অবস্থায় বাঁধা থাকে। সেটাতেই বাড়ীর সব কাপড় থাকে সেটাই শবরদের আলনা। বর্তমানে বাক্স, অ্যাটাচি, ব্যাগ ব্যবহার করছে। টেপ রেকর্ডার, রেডিও, সিডি প্লেয়ার, টিভি, ব্যাটারী চালিত, মোবাইল কিছু শবর ব্যবহার করছে।
বাসনপত্র — রান্নার জন্য শবররা মাটির হাঁড়ি-কলসি ও মাটির কড়াই (খাপরি/সরা) ব্যবহার করত। বর্তমানে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি, লোহার কড়াই, জামবাটি, হাতা, খুন্তি, খাবার জন্য স্টীল/কাঁসা/অ্যালুমিনিয়ামের থালা, বাটি, গ্লাস, জল রাখার পাত্র, বালতি, ঘটি, শীলনোড়া, বঁটি ব্যবহার করছে। বর্তমানে প্লাস্টিকের কিছু বাসন ব্যবহার করছে।
যন্ত্রপাতি — চাষের জন্য লাঙ্গল, মই, কোদাল, গাঁইতি, কাস্তে, সাবল, ফাল, ছাতার সিক ভাঙ্গার সুঁচ অন্যান্য কাজের জন্য ছুরি, লোহার ছড়, লাঠি, ভজালি, দা, কুড়ুল, টাঙ্গী থাকে। মাছ ধরার জন্য — জাল, ঘুগি, খালোই, ছিপ, বঁড়সী, কাঁটা-সুতা ব্যবহার করে। তিলাবনির শবররা শবর সমিতির সহযোগিতায় নৌকা, হাল, মাছ ধরার জন্য গোড়াবাড়ীর ড্যামে ব্যবহার করছে। অনেক গ্রামে শবররা ধান ঝাড়াই মেসিন, জল উত্তোলনের জন্য ডিজেল পাম্প ব্যবহার করছে।


লেখক : হেড়িয়া শবর জনজাতি চর্চার স্বনামধন্য গবেষক, ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী