দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নীলা গ্রামের গাজন উৎসব - শ্যামল কুমার প্রামাণিক

    দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নীলা গ্রামের অবস্থান ডায়মন্ডহারবার মহকুমার রামনগর থানার অন্তর্গত। তার পশ্চিম দিক দিয়ে হুগলি নদী বয়ে চলেছে সমুদ্রের দিকে। এই গ্রামে প্রধানত কৃষিজীবী নিম্নবর্গীয় পৌণ্ড্র সমাজের মানুষের বসবাস। এদের অধিকাংশই অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত। তবু এখানে সারা বছর ধরে বিভিন্ন লোকোৎসব উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয়। এই সকল লোকোৎসবগুলির মধ্যে বর্ষশেষের গাজন উৎসব, চড়ক ও নীল পূজা উল্লেখযোগ্য।
    বর্ষশেষের এই মহোৎসব নিম্নবর্গীয় জনসমাজে জনপ্রিয় স্মরণাতীত কাল থেকে। কৃষিবর্ষচক্রের বর্ষবিদায়ের স্মারক এই গাজন উৎসব। প্রধানত চৈত্র মাসের শেষ তিন দিন নীলা গ্রামে গাজন উৎসব পালিত হয়। মধ্যযুগে বৌদ্ধধর্মের অবলুপ্তির কালে বৌদ্ধরা হিন্দু ধর্মের সান্নিধ্যে আসে। সম্ভবত বৌদ্ধ তান্ত্রিকেরা হিন্দু ধর্মের মধ্যে আসার পর বাংলাদেশে গাজন ও চড়ক উৎসবের সূচনা হয়। এজন্যই হয়ত গাজন ধর্মের গাজন নামে পরিচিত। পরে তা শিবের গাজন নামে অভিহিত হয়।
    দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় পৌণ্ড্র জনসমাজে গাজন জনপ্রিয়তম। এক সময় পৌণ্ড্র জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে ছিল। পরে এরা হিন্দু ধর্মের মধ্যে আসে। নীলা গ্রামে পৌণ্ড্র জনসমাজে আমার জন্ম। ছোটবেলায় দেখেছি গ্রামে বর্ষশেষের শিবের গাজন উপলক্ষ্যে এক আনন্দধারা বয়ে যেত। গ্রামের পূর্ব দিকে শিবের মাটির ঘর। অনেকটা ফাঁকা জায়গার মাঝখানে একটা প্রাচীন বটবৃক্ষ। গ্রামের যুবক, যুবতী ও বয়স্ক ব্যক্তিরা গাজন, চড়ক ও নীলপূজায় গভীর উৎসাহ-উদ্দীপনায় অংশগ্রহণ করেন। এই উৎসবের প্রধানত দুটি দিক। একটা হল ব্রত, উপবাস, কৃচ্ছ্রসাধনের। অন্যটি হল শিবমাহাত্ম্য প্রচারমূলক আনন্দোৎসবের দিক। নাচ-গান-অভিনয়-সঙযাত্রা, রূপসজ্জা সহকারে শিবমাহাত্ম্য প্রচারমূলক বিনোদনই হল গাজন উৎসবের বিশেষ অঙ্গ।
    নীলা গ্রামে চৈত্রমাসের শুরুতেই শিবের গাজন উপলক্ষ্যে সাড়া পড়ে যায়। বিভিন্ন জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়া ঘরছাড়া শ্রমজীবী মানুষ গাজন উৎসবে যোগ দিতে ভিটেয় ফেরে। মূলত গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষেরাই গাজন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। অনেকে ফাল্গুন সংক্রান্তির দিন থেকে শিবের নামে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। এঁরা হলেন এক মাসের শিব-সন্ন্যাসী। মূল গাজন উৎসবের সূচনা হয় চৈত্র মাসের ২৬ তারিখ থেকে। গ্রামের শিবঠাকুরের মাঠ ভক্ত সমাগমে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই গাজন উৎসব চলে চৈত্র-সংক্রান্তির চড়ক পূজার দিন পর্যন্ত।
    ২৬ চৈত্র গৃহী মানুষ চুল-দাড়ি কামিয়ে গঙ্গা অথবা পুকুরে স্নান সেরে শিবের মাটির ঘরের সংলগ্ন মাঠের গাজনতলায় ভিড় করে। সন্ন্যাসীদের মধ্যে কোন একজন বয়োঃজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে গ্রামবাসীরা মূল সন্ন্যাসী হিসাবে নির্বাচিত করেন। মূল সন্ন্যাসী হবেন অবশ্যই বলশালী ও নিষ্ঠাবান। শিবের গাজনে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের ভূমিকা গৌণ। অবশ্য নীলা গ্রামে অবর্ণ হিন্দু সমাজের পুরোহিত অর্থাৎ কোন এক পতিত ব্রাহ্মণ মূল সন্ন্যাসীর গলায় গেরুয়া উত্তরীয় পরিয়ে দেন। এরপর মূল সন্ন্যাসী পুরোহিতের আসনে উপবিষ্ট হয়ে অন্যান্য সমবেত ব্রতচারীদের গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দেন। গ্রামের মহিলারাও ব্রতচারী সন্ন্যাসিনী হন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর আবার গঙ্গাস্নানের পালা। স্নান সেরে সকলে ফিরে এসে শিবালয়ের চারিদিক প্রদক্ষিণ করতে করতে ‘হর হর ব্যোম ব্যোম’ ধ্বনি দিতে থাকেন। এরপর মন্দির দ্বারে সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় গাজন বন্দনা —
        প্রভু যোগনিদ্রা কর ভঙ্গ
                সেবকেশ
        দেখ, রঙ্গ পরিহাস।
    গাজন বন্দনার পর শুরু হয় চড়ক গাছ খোঁজার পালা। চড়কগাছ সংগ্রহের পর বৃষকাষ্ঠ খুঁজে আনা হয়। ২৬ চৈত্র থেকে গাজন উৎসব পালিত হয়। গ্রামের ভক্তজন সমাগমে গাজনতলা সরগরম থাকে। দিনে রাতে পূজা অনুষ্ঠানের সময় ছাড়া বসে গাজনের আসর। বিভিন্ন গ্রামের গাজন দল আসে পালাগান গাইতে। গাজন দলের অনেকেই শিব-সন্ন্যাসী, অন্যান্যরা শিবের ভক্ত। গাজনের আসর থেকে গ্রামবাসীদের উদ্দেশে ধ্বনিত হয় আসরে যোগদানের আহ্বান —
            তোর দেখবি যদি আয়
            হরগৌরী এসেছে আজ গাজন মেলায়।
    কোন গাজনের দল আবার গান ধরেন —
            শিবের গাজন গাইতে এলাম তোমাদের এই পাড়াতে
            শিব-সন্ন্যাসী, পূজারিণী ত্রিশূল নিয়ে হাতেতে।
    গাজন গানের সূচনাকে বলা হয় বন্দনা পর্ব। শিব বন্দনা দিয়ে শুরু হয় গাজন গানের পালা। শিব আরাধনার একটি গান হল —
            কৈলাস হতে পৃথিবীতে এলেন প্রভু ভোলানাথ
        সবাই মিলে আয়গো তোরা করি গিয়ে প্রণিপাত।
    আর একটি বন্দনাগান হল —
        ওঁ নমঃ নটরাজ জটাধারী নীলকন্ঠ
        তোমার চরণ করে স্মরণ করে বাজাই এ মঙ্গল শঙ্খ।
    বন্দনাগানের সমাপ্তির পর শুরু হয় গাজন পালা। লোকনাট্যের আঙ্গিকে রচিত এক একটি কাহিনীতে পাঁচ ছয় থেকে দশ বারো জন অভিনয় করেন। পালাগানের বিষয় পৌরাণিক কাহিনী থেকে গার্হস্থ্য ও সামাজিক জীবনের চালচিত্র। প্রেম-ভালোবাসা, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন, আর্থ-সামাজিক সমস্যা, ইতিহাস চেতনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এসব পালাগানের বিষয়।
    পৌরাণিক পালার কাহিনী সাধারণত হর-গৌরী বিষয়ক। এখানে উমা যেন সাধারণ পরিবারের কন্যার মতো নিজের বিবাহিত জীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনায়। অনেক সময় ভিখারী বর শিবের সঙ্গে ঝগড়া করে বলে —
                ‘পাগলা ভোলা দাওনা বিদায়
                করব না আর তোমার ঘর।’
    শিব তার উত্তরে বলেন —
                ‘শোন কথা গিরিসূতে, যাবে তুমি কোন্ চুলোতে
                তুমি আমার নয়নতারা, আমি তোমার নটবর।’
    ২৭ চৈত্র ভোরবেলা উঠে বৃষকাষ্ঠের পোড়া ছাই গায়ে মেখে সঙ সেজে আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের গাজনতলার উদ্দেশ্যে সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীর দল বেরিয়ে পড়ে। তাদের সঙ্গে চলে গ্রামের বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। সঙ্গে থাকে ঢাকী-ঢুলির দল। ভিন গাঁয়ের গাজন সন্ন্যাসীদের আগমন বার্তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। অতিথি গাজন সন্ন্যাসীদের গ্রামের গাজনতলায় আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ণ করা হয়। গাজনের পালাগান চলে।
    ২৮ চৈত্রের দুপুর পর্যন্ত চলে সন্ন্যাসীদের বিভিন্ন গ্রামের গাজনতলা পরিক্রমা। বিকালে শুরু হয় ঝাঁপান উৎসব। গঙ্গায় স্নান করতে করতে সন্ন্যাসীরা সমবেত কণ্ঠে বলে —
        জল শুদ্ধ, স্থল শুদ্ধ, শুদ্ধ আপন কায়া    
        ত্রিকোণ পৃথিবী শুদ্ধ, যত শিবের মায়া।
    স্নানের পর বাঁশের উঁচু মাচায় উঠে সন্ন্যাসীরা নিচে পাতা বিভিন্ন কাঁটা গাছের ডালের উপর ঝাঁপ দেন। কখনও বঁটির উপর ঝাঁপ দেন।
    ২৯ চৈত্র নীল পূজার দিন দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শিবঘরে বাতি দেবার নিয়ম। গৃহস্থ মহিলারা সারাদিন নির্জলা উপবাসী থেকে শিবের ঘরে বাতি দেন। বাতিদান পর্ব শেষ না হলে গাজন সন্ন্যাসীরা বিশ্রাম নেন না। ভক্ত সাধারণের বাতি দেওয়ার পর সন্ন্যাসী সন্ন্যাসিনীরা শিবের ঘরে বাতি জ্বালান ও গান গেয়ে ওঠেন —
        ওই যায়রে যায়, আমার ঠাকুর যায়
        ফুল ফুটেছে রাঙা পায় —
        শিব শিব, হর হর, ব্যোম ব্যোম।
    শিবের বাতি দান শেষ হলে সন্ন্যাসীরা প্রথমে বেলপাতা খেয়ে নেন। ভোর রাত পর্যন্ত চলে শিবের নানান গল্প-কাহিনী। ভোরে শুরু হয় চোর চোর খেলা। বিভিন্ন গাছ পালার ডাল কেটে এনে শিবালয় প্রাঙ্গণে কৃত্রিম বন তৈরি করা হয়। এখানে চোর চোর খেলা শুরু হয়। একজন সন্ন্যাসীকে চোর সাজিয়ে তাকে বনের মধ্যে পাকড়াও করে সন্ন্যাসী বলে ওঠেন —
        চোর ধরেছি, চোর ধরেছি, মানিক চোর,
        দেখে যারে পাড়ার লোক।
    সকাল হওয়ার আগেই সন্ন্যাসীরা বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে হাতে হাত ধরে তৈরি করেন মানব-শৃঙ্খল। বৃত্তের মধ্যে থাকে একটি মাটির কলসী। শিবের নামে ধ্বনি দিতে দিতে মূল সন্ন্যাসীর মাথায় শূন্য কলস-সহ সবাই নেমে পড়েন নিকটবর্তী একটি পুকুরের জলে। বৃত্তের মাঝে দাঁড়িয়ে মূল সন্ন্যাসী এক ডুবে শূন্য কলসটি ভরে নেন। তারপর সবাই ফিরে আসেন শিবের মাটির ঘরে। জল ঢালেন শিবলিঙ্গে।
    চৈত্র সংক্রান্তির দিন চড়ক পূজা। গাজন উৎসবের শেষ দিন। এদিন চড়ক গাছের খাকুই-এর উপর একটা বাঁশ বাঁধা হয়। দুজন শিব সন্ন্যাসী বাঁশের আগায় ও গোড়ায় সমান্তরাল ভাবে নিজেদের কোমর বেঁধে চারিদিকে পাক খায়।
    গাজন উৎসবের অন্তিম লগ্নে পালিত হয় ‘আগুন সন্ন্যাস ব্রত’। অগ্নিকুণ্ড জ্বালা হয় কুলগাছের কাঠ দিয়ে। ব্রত সন্ন্যাসীরা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড ডিঙিয়ে বাঁশের হাঙাতে উঠে হাঙার বাঁশ দু-পা দিয়ে জড়িয়ে ধরে মাথা ঝুলিয়ে নিচের অগ্নিকুণ্ডের তাপ গ্রহণ করেন। তারপর হাঙা থেকে নিচে ঝাঁপ দেন। এবার উত্তরীয় খোলার পালা। ব্রত-সন্ন্যাসীরা গঙ্গায় গিয়ে প্রথমেই গলার উত্তরীয় কেটে ফেলেন। তারপর সেই উত্তরীয় পাঁকে পুঁতে রাখেন। মূল সন্ন্যাসী তার উত্তরীয় টুকরো টুকরো করে কেটে সমাগত ভক্তদের দেন। ভক্তদের বিশ্বাস মূল সন্ন্যাসীর এই এক টুকরো উত্তরীয় গৃহে রাখলে পরিবারের মঙ্গল হয়। স্নানের পর সকলে নতুন জামা-কাপড় পরে চিড়ে, দই, মিষ্টি আহার করেন। সেই সঙ্গে সমাপ্ত হয় গাজন উৎসব।
    


লেখক : বাংলা দলিত সাহিত্যের এক অগ্রগণ্য লেখক