উত্তরবঙ্গের রাভা-সমাজে ধর্মীয় সংস্কার ও সামাজিক উত্তরণ - সুশীল কুমার রাভা

    উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে রাভা একটি অন্যতম প্রাচীন জনজাতি। এই জনজাতির লোকেদের ভাষা-সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচিতি সচরাচর ‘রাভা’ নামে অভিহিত করা হলেও নিজেদের স্বতন্ত্র মাতৃ ভাষায় পরিচয়-জ্ঞাপনের সময় অবলীলায় ‘কোচ’ কথাটি উচ্চারিত হয়ে থাকে। সেই সূত্রে গোষ্ঠীর লোকেদের প্রকৃত পরিচয় ‘কোচ’। ‘কোচ’ কথার অর্থ -  ‘আদি’। বংশপরম্পরা ভাবে প্রবাহিত ধারায় গোষ্ঠীর লোকেরা এই পরিচয়টিই বহন করে নিয়ে আসছেন। বস্তুত-স্বভাষায় আত্ম পরিচয় জ্ঞাপনে বলা হয় - ‘আঙ্ কোচা’ অর্থাৎ আমি কোচ। গোষ্ঠী পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলা হয় - ‘কোচা জŠতি’ অর্থাৎ কোচ জাতি। ভাষা পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলা হয় ‘কোচা-ক্রৌ’ অর্থাৎ কোচ ভাষা। এভাবে প্রতিটি বিষয়ে চিহ্নিত বা পরিচয় করার ক্ষেত্রে ‘কোচ’ কথাটি উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সরকারী নথি-পত্রে এদেরকে ‘রাভা’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে রাভা নামটি এই গোষ্ঠীর পদবী মাত্র। কালক্রমে একটা জাতি বা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন বৃটিশ সরকারের সৌজন্যে ভারতবর্ষে প্রথম আদমসুমারীর কাজ শুরু হয়। প্রথম দিকে কিছুটা ভুল ত্রুটি থাকার জন্য পুর্নসংশোধন-সংযোজন করে প্রতি দশ বছর অন্তর জনগণনা বা আদমসুমারী করার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সূত্রে ১৯০১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে (তৎসময় বাংলা) কোনো রাভা ছিল না বা পাওয়া যায়নি। ওই সময় শুধু ‘কোচ’ নামক জনসংখ্যা ছিল ১০৭৬৯৬ জন। পরবর্তী ১৯১১ সনের জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ৭২২ জন ‘রাভা’ পাওয়া যায়। সেই সূত্রে প্রশ্ন আসে তাহলে কি রাভারা পরবর্তী কোনো সময় বাইরে থেকে এসেছিল ? এইরূপ ধারণাও সম্পূর্ণ অমূলক। কারণ রাভাদের পূর্ব পুরুষগণ বহুকাল পূর্বের থেকেই উত্তরবঙ্গ তথা পশ্চিমবঙ্গের বিশেষত কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলায় বসবাস করে আসছেন। কোচবিহার রাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষেত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ১৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে মোঘল সেনাপতি তথা বাংলার সুবেদার মীরজুমলা কোচবিহার রাজ্য আক্রমণ করেন। ওই সময় কোচ নৃপতি মহারাজ প্রাণনারায়ণ মোঘল সৈন্যদের পরাক্রম অনুমান করতে পেরে পরাজয় নিশ্চিত ভেবেই পালিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী রংপুরে আশ্রয় গ্রহণ করে আত্মগোপন করে থাকেন। ফলে মীরজুমলা বিনাবাধায় কোচবিহার রাজ্য ও রাজধানী দখল করে এক বছর কাল কোচবিহারে অবস্থান করেন। ওই সময়েই কোচবিহার রাজ্য ও প্রজাকূলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বস্তুত মীরজুমলার শোষণ-পীড়ন ছাড়াও প্রজাদেরকে জোর করে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। ওই সময় কিছুসংখ্যক ‘কোচ’ প্রজা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও অধিকাংশ প্রজাই অস্বীকৃতই থাকেন। ফলে শুরু হয় অকথ্য অত্যাচার ও নিপীড়ন। সেই সময়েই অত্যাচার ও নিপীড়নের ভয়ে নিরিহ প্রকৃতির কিছু কোচ-প্রজা পালিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বনাঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বস্তুত সেই সময় কোচ রাজ্যের অধিকাংশ পরগণাই ছিল বনজঙ্গলে ঘেরা, যা শিকারবিলাসী মহারাজগণের মৃগয়া কানন বলে খ্যাত ছিল। ১৯১১ সনে ওই সব বনাঞ্চলে বসবাসকারী ‘কোচ’ অধিবাসীদেরকেই প্রথম রাভা নামে চিহ্নিত করা হয়। বিশেষত পার্শ্ববর্তী অসম রাজ্যে বসবাসকারী একই ভাষা সংস্কৃতি ও রীতিনীতি বহনকারী রাভাদের সঙ্গে তুলনা করে উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলে বসবাসকারী কোচদেরও রাভা নামে চিহ্নিত করা হয়। ফলে একই ভাষা সংস্কৃতি বহনকারী পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কোচরাও ক্রমান্বয়ে রাভা পরিচয় গ্রহণ করেন। এই রাভা পরিচয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় ১৯৪৭ সনে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের পর।
    উল্লেখ্য, স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকার পূর্বোত্তর ভারতে বসবাসকারী মঙ্গোলীয়ান বংশোদ্ভূত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের নিরিখে তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতি নির্ণয় এবং নিবন্ধকরণের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করেন। সেই কমিশনের উদ্যোগে ১৯৪৮ সনের শেষাংশে নিম্ন অসমের তৎকালীন অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলার ধুবরী মহকুমা (বর্তমান জেলা) শহরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দলনেতাদেরকে দলগত আলোচনা ও পর্যালোচনার জন্য সভা আহ্বান করা হয়। ওই সময় অসম মেঘালয় সহ পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ করে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি জেলায় বসবাসকারী মঙ্গোলীয়ান বংশোদ্ভূত গোষ্ঠীগুলির প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সেই সময়েই অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার কুমারগ্রাম ব্লকের অন্তর্গত মধ্যকামাখ্যাগুড়ি গ্রামের অধিবাসী তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বর্গীয় দেবেন্দ্রনাথ দাস (তিনি দেবেনবাবু নামেই বেশী পরিচিত ছিলেন)-এর নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল ওই সভায় অংশগ্রহণ করেন। প্রতিনিধি দলে দেবেনবাবু ছাড়াও ‘মেচ’ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বর্গীয় রুদ্রসিংব্রহ্ম (তিনি মেচ মাষ্টার নামে বেশী পরিচিত ছিলেন) সহ রাভা সম্প্রদায়ের দক্ষিণ কামাখ্যাগুড়ি গ্রামের অধিবাসী স্বর্গীয় ভোতরা দাস, স্বর্গীয় অমৃত দাস এবং আরো কয়েকজন। উক্ত সভায় দুইদিন ব্যাপী আলোচনা ও পর্যালোচনা হওয়ার পর, কমিশনের পক্ষ থেকে উপস্থিত দলনেতাদের কাছ থেকে মতামত এবং নিবন্ধকরণের জন্য লিখিত আবেদন চাওয়া হয়। ওই সময়েই মেঘালয়ের রাভাদের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন বেঙ্গলের দলনেতা স্বর্গীয় দেবেন্দ্রনাথ দাস (রাভা) মহাশয়।
    তিনি উত্তরবঙ্গ তথা পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী রাভা ও একই ভাষা-সংস্কৃতি বহনকারী ‘দাস’ পদবীধারী লোকেদেরকে তপশিলী উপজাতি (এস.টি.) -এর অন্তর্ভুক্তি করার জন্য আবেদন জানান। ফলে সেই আবেদনের ভিত্তিতে ১৯৫১ সালে উত্তরবঙ্গের রাভারা তপশিলী উপজাতির স্বীকৃতি পান। ফলত তপশিলী উপজাতি হিসেবে সরকারের প্রদেয় বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায় ‘দাস’ পদবীধারী কোচরা ক্রমান্বয়ে রাভা পরিচয় গ্রহণ করেন। বস্তুত রাভা পরিচয়ের প্রবণতা প্রত্যুত্তর বৃদ্ধি পায় ১৯৭৭ সনে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে। কারণ ওই সময় বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েই ভূমিসংস্কার সহ ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে তপশিলী উপজাতি প্রার্থীদের আসন সংরক্ষণ এবং চাকুরী ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কর্মসংস্থান বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষত ১৯৭৮ সনে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে রাভাদের একাধিক ব্যক্তি পঞ্চায়েত সদস্যসহ পঞ্চায়েত প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ও জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সময় বিশেষ করে — আটের দশকে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি জেলার বেশ কিছু শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত রাভা, ছেলেমেয়ের সংরক্ষিত কোটায় সরকারী আধা-সরকারী সংস্থায় চাকুরী হয়েছিল। ফলত স্বাভাবিক ভাবেই রাভা পরিচয় গ্রহণ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
ধর্মীয় সংস্কার ও সামাজিক উত্তরণ —
    পরিবর্তিত রাভাদের ধর্মীয় সংস্কার ও সামাজিক উত্তরণ শুরু হয় পঞ্চদশ শতকের মধ্যবর্তী সময় থেকেই। ওই সময় রাভাদের পূর্বসুরি কোচগণ আর্য-সংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে, সর্বপ্রাণবাদ প্রকৃতি ধর্ম পরিহার করে বৈদিক সংস্কারে সংস্কারকৃত হয়ে সনাতন হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করেন। বস্তুত এই প্রবণতা শুরু হয় পঞ্চদশ শতকে ‘কোচ’ রাজা বিশ্বসিংহের রাজত্বকাল থেকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৫২২ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বসিংহ আর্য-সংস্কৃতির রেনুতে প্রভাবিত হয়ে মিথিলা ও বেনারস থেকে মৈথিলী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের নিয়ে এসে কোচদের সর্বপ্রাণবাদ প্রকৃতি ধর্ম বর্জন করে বৈদিক মতে মন্ত্র উচ্চারণ করে আর্য সংস্কারে সংস্কারকৃত হয়ে হিন্দু ধর্মগ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহন করেন। ওই সময়েই বিশ্বসিংহ রাজকীয় মর্যাদায় রাজচিত সম্মানে সংস্কারকৃত হয়ে সিংহাসনে আরোহণ করার জন্য বৈদিক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ শান্তিসিঞ্চন ও উৎসর্গ করার সময় বিশ্বসিংহকে ‘কোচবংশী’ না বলে ‘রাজবংশী’ নামে আখ্যায়িত করেন। ফলে তখন থেকেই বিশ্বসিংহ রাজবংশী নামে পরিচিত হন। সেই সময় কিছু ঘনিষ্ট রাজকর্মচারী রাজার দৌলতে সংস্কারকৃত হয়ে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে রাজবংশী পরিচয় গ্রহণ করেন। ফলত রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের একটা ঘনিষ্ট আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরী হয়। সেই সূত্রেই ওইসব রাজকর্মচারিগণের উত্তরসুরিরা পরবর্তী সময়ে অনেকেই নিজেদেরকে রাজার বংশধর বলে দাবী করে থাকেন।
    মহারাজা বিশ্বসিংহ ঋকবেদ অনুসারে বয়োসন্ধিকালে বানপ্রস্থ গ্রহণ করে হিমালয়বাসী হওয়ায়, তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মল্লদেব - নরনারায়ণ নাম ধারণ করে ‘রাজবংশী’ পরিচয় নিয়েই সিংহাসনে আরোহন করেন। ওই সময় তিনিও পিতার পথ অনুসরণ করে মিথিলা-বেনারস থেকে একাধিক বৈদিক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত নিয়ে এসে, রাজদরবারে মহাপণ্ডিত-সভা গঠন করেন। ওই পণ্ডিত সভার পরামর্শেই মহারাজা নরনারায়ণ রাজকার্য পরিচালনা করতেন। জানা যায়, তখন থেকেই রাজপরিবারে হোম-যজ্ঞ ও বড়দেবীর পূজা প্রচলন শুরু হয়। নরনারায়ণের রাজত্বকালেই শৈবশাক্ত বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব অহম-রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে নরনারায়ণের আশ্রয়প্রার্থী হন এবং কোচ রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে শৈবশাক্ত বৈষ্ণব ধর্মের মাহাত্ম প্রচার করতে থাকেন। কোচবিহারের মধুপুর ধামটি তারই নিদর্শন।
    মহারাজা নরনারায়ণ পিতার পথ অনুসরণ করে সিংহাসন ত্যাগ করার পর, তাঁর একমাত্র পুত্র লক্ষ্মীনারায়ণ ১৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দে পুনঃসংস্কার হয়ে সিংহাসনে আরোহন করেন। ওই সময় লক্ষ্মীনারায়ণ মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব প্রদত্ত শৈবশাক্ত বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, শংকরদেবের প্রধান শিষ্য আতা-দামোদরদেবের নিকট বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ‘রাজবংশী’ পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন। সেই সময় রাজার অনুগত কিছু উচ্চপদের রাজকর্মচারী বা পাত্র-মিত্র, যেমন - মন্ত্রী, কটোয়াল, দেওয়ান, নার্জিদেও প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ রাজার দৌলতে সংস্কারকৃত হয়ে শৈবশাক্ত বৈষ্ণবধর্মে অঙ্গীভূত হয়ে ‘রাজবংশী’ পরিচয় গ্রহণ করেন। সেই সময়ে বিত্তশালী কিছু কোচ-প্রজা রাজার আনুগত্য পাওয়ার আশায় শৈবশাক্ত বৈষ্ণব ধর্মে অভিভূত হয়ে ‘দাস’ পদবী ধারণ করে ‘রাজবংশী’ পরিচয় গ্রহণ করেন। ‘দাস’ কথার অর্থ সেবক। শৈবশাক্ত বৈষ্ণব মতে ভগবান বা প্রভুকে সেবা করা মানেই দাস। সুতরাং শৈবশাক্ত বৈষ্ণবমতে যারা সংস্কারকৃত হয়ে রাজবংশী পরিচয় গ্রহণ করেছেন তারা প্রত্যেকেই ‘দাস’ পদবী ধারণ করেন। ফলত তখন থেকেই কোচরা বিভাজিত হতে শুরু করেন। বিশেষত ওই সময় রাজার অনুগত বিত্তশালী কিছু সমাজপতি তথা জোতদার-জমিদারগণ কৌশল করে রাজার আদেশ বা হুকুম বলে ফরমান জারি করে সাধারণ কোচ-প্রজাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে সংস্কারকৃত হতে বাধ্য করেন। সেই সময় যারা সংস্কারকৃত হতে গরিমষি করতো তাঁদেরকে সমাজচ্যুত করে নানা ভাবে সামাজিক চাপ তৈরী করা হতো। সেই ভয়ে অধিকাংশ কোচ-প্রজাই সংস্কারকৃত হতে বাধ্য হন। অনেকে সংস্কারকৃত না হয়েও সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার আশায় ‘দাস’ পদবী ধারণ করে ‘রাজবংশী’ পরিচয় গ্রহণ করেন। ওই সময়েই রাজার অনুগত জোতদার-জমিদারগণের প্ররোচনায় সমাজপতিগণ কোচদের ‘চিরায়ত-মাতৃভাষা কোচ-ক্রৌ’ অর্থাৎ কোচ ভাষা এবং ‘আলেক আচার’ অর্থাৎ কলা কৃষ্টিসহ নিকৃষ্টমানের খাদ্যসামগ্রী যেমন মদ, মুর্গী, শুয়োর ও স্বল্প পরিধেয় বস্ত্র লুফুন/কেমলেত, কালায়, কাম্বাং ইত্যাদি অর্থাৎ মহিলাদের হাঁটুর উপরে পরিধেয় বস্ত্র ‘লুফুন/কেমলেত ও বুকে বাঁধা এক ফালি বস্ত্র কাম্বাং’ এবং পুরুষদের লজ্জানিবারণের জন্য পরিহিত ‘নেংটি’ (স্ব-ভাষায় কালায়) বর্জন করার নির্দেশ বা ফরমানজারি করেন। সেই সময়েই কোচদের চিরায়ত মাতৃভাষা ‘কোচ ক্রৌ’ বর্জন করে কামরূপের নিম্ন অঞ্চলে প্রচলিত অসমীয়া বাংলা সংমিশ্রিত কথ্য ভাষা (ভাষাবিদদের মতে কামরূপি উপভাষা) গ্রহণ করেন। জানা যায়, তখনও পর্যন্ত কোচদের চিরায়ত মাতৃভাষা রাজপরিবারে প্রচলিত ছিল। ওই সময় রাজপরিবারের পক্ষ থেকে ধর্মগুরু শ্রীমন্ত শংকরদেবের আশ্রমে নানা উপহার সামগ্রী উপঢৌকন (উপহার) পাঠানো হত। এই উপহার তালিকায় স্বর্ণ মুদ্রা সহ ভাত খাওয়ার জন্য একটি রূপোর থালাও দেওয়া হয়েছিল। সেই থালাতে ‘কোচ’ ভাষায় (কোচাক্রৌ) লেখাছিল ‘মায়সানি থাল’ অর্থাৎ ভাত খাওয়া থাল। (শব্দার্থ—‘মায়’ মানে ভাত, ‘সানি’ মানে খাওয়া, ‘থাল’ মানে থালা) শোনা যায়, ‘সেই মায়সানি থাল’ নাকি এখনও অসমের নলবাড়ির বড়দুয়ারে শ্রীমন্ত শংকরদেবের প্রধান মন্দিরের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে।
    বলা বাহুল্য, তৎসময় সমাজপতিগণ সেই ভাষাই বর্জন করতে ফরমান জারি করেছিলেন। বস্তুত ওই সময় সমাজ পতিগণের নির্দেশ সত্ত্বেও যারা চিরায়ত মাতৃভাষা ‘কোচা-ক্রৌ’ ও নিম্নরুচির পরিধেয় বস্ত্র সহ নিকৃষ্টমানের খাদ্যসামগ্রী বর্জন করতে পারেননি, তাঁদেরকে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করে নীচুজাত ‘গারো’ বলে অভিহিত করা হত। ‘গারো’ কথার অর্থ নির্লজ্জ বা অসভ্য। নির্লজ্জের মতো স্বল্পপরিসরের পোষাক ‘লুফুন/কেমলেত ও কালায়’ (নেংটি) পরে থাকতো বলেই তথাকথিত হিন্দু ও রাজবংশী সমাজ তাঁদেরকে অবজ্ঞা করে ‘গারো’ বলে অভিহিত করতো। ওই সময় সংস্কারকৃত হয়েও যারা প্রাচীন অভ্যাস ও প্রবাহিত মাতৃভাষা ‘কোচা-ক্রৌ’ ভুলতে না পেরে নিজেদের মধ্যে গোপনে কথোপকথন করতো এবং চুরিচামারি করে মদ, মুর্গী, শুয়োর ইত্যাদি ভক্ষণ করতো, তাঁদেরকে সমাজ চরম ভাবে আর্থিক দণ্ড দিতো। সেই আর্থিক দণ্ড ধার্য করা হতো ছয় আনা থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক কুড়ি টাকাও ধার্য হতো বলে প্রবীণদের বংশানুক্রমে স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়। সেই সময় অভিযুক্তরা ঘটি-বাটি ও জমি জিরাত বন্ধক রেখেও আর্থিক জরিমানা দিতে বাধ্য হতো। অনেকে প্রাচীন অভ্যাসজনিত কারণেই একাধিকবার সমাজকে আর্থিক দণ্ড দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সাধারণত নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারগুলিই বেশী এইরূপ জরিমানার শিকার হয়েছিলেন। ফলে ওইসব পরিবারগুলো ক্রমশ গরীব থেকে আরো গরীব হয়ে গিয়েছে। ফলত তাঁদের সঙ্গেই মধ্যবিত্ত ও কিছু কায়েমি স্বার্থ ভূ-স্বামীদের কারসাজিতে সামাজিক বৈষম্য প্রত্যুত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই বৈষম্যের প্রবণতা আরো তীব্রতর হয় ঊনবিংশ শতকের প্রথম দশকে পদার্পণ করে।
    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ রাঢ়ী ব্রাহ্মণ ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র সেন-এর জ্যেষ্ঠা কন্যা সুনীতি দেবীকে বিয়ে করে কোচবিহারে ব্রাহ্মী সমাজ গড়ে তোলেন। ফলত খুব স্বাভাবিক ভাবেই শৈবশাক্ত বৈষ্ণব ধর্মে অঙ্গীভূত ‘দাস’ পদবী ধারী রাজবংশী সমাজের সঙ্গে একটা বৈষম্য শুরু হয়। বিশেষত ব্রাহ্ম সমাজের লোকেরা ‘দাস’ পদবী ধারী রাজবংশী সমাজের লোকেদেরকে ‘শূদ্র’ বলে গণ্য করতো। ফলে ব্রাহ্মী সমাজ আর রাজবংশী সমাজের মধ্যে একটা দ্বন্দমূলক বৈষম্য শুরু হয়। এই বৈষম্যতার কারণেই তৎসময় পঞ্চানন দাস এক প্রকার বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। সেই সময় তিনি রাজবংশী জাতিসত্ত্বা প্রতিষ্ঠা এবং স্বতন্ত্র সমাজ সংস্কারের উদ্যোগী হন। বস্তুত সেই সময় পঞ্চানন দাস মিথিলা ও বেনারসে গিয়ে মৈথিলী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সঙ্গে বেদদর্শনে যুক্তি সাপেক্ষ মতাদর্শগত আলোচনা করে রাজবংশী সমাজে স্বতন্ত্র সংস্কার আনতে সহমত আদায় করেন। ফলে তিনি বেনারস থেকে ফিরে এসেই ১৩১৯ বঙ্গাব্দ ২৭শে মাঘ (১৯১০) তার কয়েকজন অনুগামীকে সঙ্গে নিয়ে কোরতোয়ার—বার্নিশঘাটে মাথা মুন্ডন করে উপবিত হন এবং পৈতা সংস্কারের মধ্য দিয়ে ক্ষত্রীয়ত্ব গ্রহণ করেন। এই ক্ষত্রীয় সংস্কারকে বলা হতো ‘ভঙ্গ-ক্ষত্রীয়’ অর্থাৎ জাত ক্ষত্রীয় নয়, সংস্কারকৃত ক্ষত্রীয়। সহজ করে বলা যেতে পারে উপক্ষত্রীয়। ওই সময় পঞ্চানন দাস শৈবশাক্ত বৈষ্ণব ধর্মের প্রবাহিত ‘দাস’ পদবী বর্জন করে ‘বর্মন’ পদবী গ্রহণ করেন। ‘বর্মন’ কথার অর্থ ব্রহ্মজ্ঞান। ‘শূদ্র’ থেকে বেদচর্যায় উত্তীর্ণ হয়ে ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করার জন্যই ‘বর্মন’ পদবী গ্রহণ করা হয়। এই পদবী পরিবর্তনের পঞ্চানন বর্মা কর্তৃক একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। প্রবাদটি এই রকম —
        ‘‘বাবুরাম বাবুর ব্যাটা - বাবু পঞ্চানন,
        দাস কাটিয়া আজি থাকি হইলং বর্মন’’
    এই প্রবাদটি পার্শ্ববর্তী রংপুর অঞ্চলে একটু অন্যভাবে — কিছুটা অনুযোগের সুরে প্রচলিত রয়েছে। যেমন—    ‘‘ববুরাম বাবুর ব্যাটা-বাবুপঞ্চানন
                    তাঁয় আসিয়া হামাক করিলেন বর্মন’’
    পঞ্চানন বর্মার ক্ষত্রীয়করণ আন্দোলন মূলত রংপুর অঞ্চলেই প্রথম প্রভাবিত হয়। বস্তুত ওই সময় কতিপয় ভূ-স্বামী ও জোতদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে রংপুরে তিনি প্রথম ক্ষত্রীয় সোসাইটি গড়ে তোলেন। সেই ক্ষত্রীয় সোসাইটির মাধ্যমেই রংপুরে ক্ষত্রীয়করণ আন্দোলন সংগঠিত হয়।
    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ধর্মীয় মতভেদ ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে পঞ্চানন বর্মা কোচবিহার রাজের রোষানলে পড়ে যান। ফলে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাঁকে কোচবিহার রাজ্যত্যাগ করতে হয়। ওই সময়েই রংপুরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে, কতিপয় জোতদার-জমিদারকে প্রভাবিত করে ক্ষত্রীয়করণ আন্দোলন সংগঠিত করতে সামর্থ হন। বস্তুত সেই সময় মূলত নিম্নবিত্ত-প্রান্তিক কৃষক ও সমাজের শ্রমজীবি মানুষজনকে প্রভাবিত করে উপবিতের মাধ্যমে ক্ষত্রীয়করণ করা হতো। ফলত অনেকটা অনুযোগের সুরেই প্রবাদটি বলা হয়েছে।
    এই ক্ষত্রীয়করণ আন্দোলন ক্রমশ প্রভাবিত হয়ে তৎকালীন কোচবিহার রাজ্যসহ জলপাইগুড়ি ও নিম্ন অসমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া যতই অগ্রগতি ঘটেছে, পরিবর্তিত রাভাদের সঙ্গে রাজবংশী সমাজের সামাজিক বৈষম্য ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত তৎকালীন কোচবিহার রাজ্য ও ডুয়ার্সের জলপাইগুড়ি জেলার কিছু অংশে এই বৈষম্যের প্রবণতা ব্যাপক প্রভাবিত ছিল। উল্লেখ্য, রাজবংশী সমাজের লোকেরা ক্রমেই স্বতন্ত্র ক্ষত্রীয় সংস্কারে প্রভাবিত হয়ে, উপবিতের মাধ্যমে পৈতা ধারণ করে ক্ষত্রীয়ত্ব গ্রহণ করেন। বিশেষত ২৭শে মাঘ ছিল ক্ষত্রীয়করণের বিশেষ দিন। বস্তুত ওই দিনটিতেই পঞ্চানন বর্মা বার্নিশ ঘাটে উপবিত হয়ে ক্ষত্রীয়ত্ব গ্রহণ করেন। ফলে ২৭শে মাঘ দিনটিকে ক্ষত্রীয় জন্মদিন বলে গণ্য করা হয়। ওই সময় অঞ্চলভিত্তিক ক্ষত্রীয় সমিতি গঠন করে সমাজপতিরা সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতো। ফলে সামাজিক বৈষম্যের প্রবণতা আরো তীব্রতর হতে থাকে। সেই সময় অক্ষত্রীয় রাজবংশীদেরও ক্ষত্রীয় সমাজের লোকেরা ‘ঝাড়ুয়া’ বলে তিরস্কার করতো। ঝাড়ুয়া কথার অর্থ অপবিত্র বা নিয়মনিষ্ঠাহীন। ফলে অক্ষত্রীয় রাজবংশীরা তিরস্কারের ভয়ে অনেকেই উপবিত হয়ে ক্ষত্রীয় সংস্কার গ্রহণ করেন। ফলত অসংস্কারকৃত কোচ বা রাভাদের সঙ্গে রাজবংশী সমাজের সামাজিক বৈষম্য আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে। ওই সময় রাভাদেরকে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করে নীচুজাত ‘গারো’ বলে অভিহিত করা হতো। বস্তুত সেই প্রবণতা থেকেই আজও অনেকাংশে রাভাদেরকে গারো বলেই অভিহিত করা হয়।
    এইরূপ সামাজিক বৈষম্যের কারণেই পরিবর্তিত রাভারা বিতশ্রদ্ধ হয়ে ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে (১৯৩০) বৈদিক মতে সমাজ সংস্কারের ডাক দেন। এই সংস্কার আন্দোলন প্রথমে শুরু হয় কোচবিহার জেলার (তৎ সময় কোচবিহার স্টেট) তুফানগঞ্জ মহকুমার বোচামারী গ্রামে। ওই সময় গ্রামের মাতব্বর ভোলা রাভা, ধুতুরামরাভা সহ আরো কয়েকজন মাতব্বরের নেতৃত্বে অসম-নলবাড়ি থেকে আনিত কামরূপী কলিতা ব্রাহ্মণ পুরোহিত স্বর্গীয় ধারেশ্বর দেবশর্মা এবং ওই কলিতা ক্ষৌরকার স্বর্গীয় সিদ্ধ শীলশর্মা কর্তৃক মাথা মুন্ডন ও প্রায়শ্চিত্তকরণ করে কামরূপী বৈদিক মতে সংস্কারকৃত হয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মে অঙ্গীভূত হন এবং ‘দাস’ পদবী গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ মাঘ মাসের শুক্লাপক্ষের এক পুণ্যতিথিতে বোচামারী গ্রামের ধর্ম গোলার নিকট (বর্তমানে যেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি আপার প্রাইমারী বিদ্যালয় আছে) খোয়েড়, পলাশ ও শিশু গাছবেষ্টিত ছায়া আবৃত স্থানে জমায়েত হয়ে গণপ্রায়শ্চিত্তকরণের মাধ্যমে সংস্কারকৃত হয়ে সনাতন হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন। ওইদিন প্রায়শ্চিত্তকরণে নিবেদিত ধাতবকাঞ্চন অর্থাৎ তামার লাল পয়সা এক থেকে দেড় কিলো জমা হয়েছিল বলে জানা যায়। (তথ্য দাতা—হীতেন অধিকারী (রাভা), ওই সময় তিনি ১৩ বছর বয়সের কিশোর ছিলেন। বিগত ৯ই মার্চ ২০১৫ তারিখে তিনি পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর)।
    রাভাদের এই সংস্কার প্রক্রিয়া কোচবিহার জেলার বোচামারীর পর, পার্শ্ববর্তী জেলা জলপাইগুড়ি (বর্তমান আলিপুরদুয়ার) কামাখ্যাগুড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ও মহৎব্যক্তি ভৈচালরাভা, দেবেন দাস (রাভা) সহ আরো কয়েকজনের নেতৃত্বে মধ্য ও দক্ষিণ কামাখ্যাগুড়ি গ্রামের রাভাদেরকে সংস্কারকৃত হতে প্রভাবিত করে ওই একই কলিতা ব্রাহ্মণ-পুরোহিত ধারেশ্বর দেবশর্মা ও ক্ষৌরকার সিদ্ধ শীলশর্মা কর্তৃক প্রায়শ্চিত্তকরণ এবং সংস্কারকৃত হয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মে অঙ্গীভূত হন এবং ‘দাস’ পদবী গ্রহণ করেন। এই সংস্কারের প্রবণতা ক্রমেই সম্প্রসারিত হয়ে পার্শ্ববর্তী রাভা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতেও প্রভাবিত হয়। ফলে বোচামারী, কামাখ্যাগুড়ির পর (বর্তমান - আলিপুরদুয়ার ২নং ব্লকের) দক্ষিণ পারোকাটা, ব্রজের কুঠি, বাকলারপাড়, চিকলীগুড়ি গ্রামের অধিবাসীরাও সংস্কারকৃত হন এবং সনাতন হিন্দু ধর্মে অঙ্গীভূত হয়ে ‘দাস’ পদবী ধারণ করেন। এই প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে প্রভাবিত ও সম্প্রসারিত হয়ে কৃষিবলয়ের বিশেষত কোচবিহার জেলার শালবাড়ি, তল্লিগুড়ি, ডুহুড়ীরপাড়, নাগুরহাট, টাকোয়ামারী, রসিকবিল, তুর্কানির কুঠি, বাঁশরাজা, ভান্তিজালাশ, হরিপুর, ভাড়েয়া গ্রাম সহ তুফানগঞ্জ ১নং ব্লকের ধলপাল, গেঁন্দিগুড়ি, ছাটরামপুর, বিলসী গ্রামগুলোতে উল্লেখযোগ্য হয়। উল্লেখিত গ্রামের রাভারা পর্যায়ক্রমে সংস্কারকৃত হয়ে হিন্দু ধর্মে অঙ্গীভূত হন। ফলে ওইসব অঞ্চলের বসবাসকারী রাভারা স্বতন্ত্র মাতৃভাষা ‘কোচা ক্রৌ’ একেবারেই বলতে পারেন না। সেই তুলনায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বনাঞ্চলে বসবাসকারী রাভারা ভাষা স্বকীয়তার দিক থেকে আজও স্বতন্ত্র। তাঁদের মধ্যে চিরায়ত মাতৃভাষা ‘কোচা -ক্রৌ’ এখন্ও তৃণমূল স্তরে অর্থাৎ শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। তবে পরিতাপের বিষয়, স্বতন্ত্র মাতৃভাষা প্রচলন থাকলেও বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত ‘আলেক-আচার’ অর্থাৎ কলা-কৃষ্টি প্রায় বিলোপ হয়ে গেছে। কারণ তাঁরা খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি গ্রহণ করেছেন। খুব অল্প সংখ্যক পরিবার আছেন, তাঁরা এখনও সর্বপ্রাণবাদ ধর্ম পালন করে থাকেন।
    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বনাঞ্চলে বসবাসকারী রাভাদের অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও অন্ধবিশ্বাসে বশীভূত কুসংস্কারে ডুবে থাকা লোকগুলোকে অর্থনৈতিক ভাবে উন্নতি করার উৎসাহিত করে আটের দশকে অসম থেকে আগত স্বগোষ্ঠীর কতিপয় ধর্মযাজক ওইসব অভাবী পরিবারগুলোকে প্রভাবিত করে খ্রীষ্টানধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করেন। বস্তুত ওই সময় ধর্মান্তরিত পরিবারকে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য এক জোড়া হালের বলদ ও ৩০০ টাকা দেওয়া হতো। কোথাও কোথাও দো-চালা টিনের ঘরও দেওয়া হতো। সেই প্রলোভনে প্রলোভিত হয়ে অভাবী-দরিদ্র পরিবারগুলি ক্রমেই প্রভাবিত হয়ে খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। এই প্রবণতা ক্রমেই বনাঞ্চলগুলোতে প্রভাবিত হতে থাকে। ফলে ওই সময়েই ধর্মীয় মতার্দশে মতভেদের কারণেই দক্ষিণ-পরোবনবস্তি রাভাদের মধ্যে দুই ভাগে সমাজ বিভাজিত হয়। বস্তুত ওই সময় বস্তির গাঁও বুড়া তথা বনাঞ্চল রাভাদের সংস্কৃতির পথ প্রদর্শক ও প্রতিকৃত স্বর্গীয় তিলেশ্বর রাভা মহাশয়ের নেতৃত্বে (তিনি বিগত ৩রা জুন ২০১৫তে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর) নেপাল থেকে আগত জনৈক ধর্মগুরু কর্তৃক নেপালী ‘জনযোগী’ ধর্ম গ্রহণ করে হিন্দুদের ন্যায় মন্দিরে পূজার্চনা শুরু করেন। ফলে তখন থেকেই ওই অঞ্চলে এক মিশ্র সংস্কৃতির পরিমন্ডল তৈরী হয়। অস্বীকার করার নয়, বনাঞ্চলের রাভারা ধর্মান্তরিত হওয়ার পর, একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে আবদ্ধ হয়েছেন। বস্তুত এরপর থেকেই তাঁদের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনা বৃদ্ধি পায়। বিশেষত নিয়ম করে গীর্জায় যাওয়া, ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়মুখী করে তোলা, এসবই পশ্চিমী সংস্কৃতি থেকে গ্রহণ করা। ফলে তাঁদের আর্থ-সামাজিক সহ শিক্ষা-সচেতনার মান অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেকেই স্কুল-কলেজ অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ, দক্ষিণ ‘খোয়েড়বাড়ি’ বনবস্তির অধিবাসী শ্রী অনন্ত রাভা এবং গোঁসাই হাট বনবস্তির শ্রী বাবুচরণ রাভা, এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিককালে কৃষি বলয়ের বেশ কিছু ছেলেমেয়েও বিশ্ববিদ্যালয় অতিক্রম করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাড়েয়া গ্রামের 
শ্রী স্বরজিৎ রাভা, পূর্ণিমা রাভা, বারবিশার টুকুমনি রাভা, পূর্বশাল বাড়ি (ভল্কার) রনবীর রাভা, কামাখ্যাগুড়ির শ্রী হৃষীকেশ কোচ রাভা, শালবাড়ি ডুহুড়ীরপাড় গ্রামে মনোজ কুমার রাভা-এর নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও দূরশিক্ষার মাধ্যমে অনেকে এম.এ. পাশ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। আশার কথা ইতিমধ্যে কয়েকজন রাভা ছাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন এবং করছেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণও করেছেন। এটা খুব ভালো লক্ষণ। মূলত ধর্মীয় সংস্কার এবং নগরায়ণের আধুনিক চেতনার প্রভাবেই রাভারা অনেকটা সচেতন। অতীতের ঘৃণা-অবজ্ঞা এবং সামাজিক বৈষম্যগুলো এখন আর নেই বললেই চলে। শিক্ষা সচেতনা ও বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন শুধু একটাই পরিচয় মানব সমাজ। ধন্যবাদ...



তথ্যসূত্রঃ- সমাজের বংশপরম্পরায় বহন করে নিয়ে আসা স্মৃতিচারণ ও শ্রুতিকথা থেকে সংগৃহীত মৌলিক তথ্য।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
১।    সর্বশ্রী নীরেন্দ্র নাথ দাস (রাভা) - ৮০ (বোচামারী, তুফানগঞ্জ, কোচবিহার)
২।    শ্রী রতন চন্দ্র রাভা - ৫৮ (অসম, নলবাড়ি)
৩।    শ্রী অশ্বিনী কুমার বর্মন - ৮২ (কামাখ্যাগুড়ি, তিনি পূর্বে রংপুরের অধিবাসী ছিলেন)
৪।    শ্রী নির্মল বর্মা - ৫২ (তুফানগঞ্জ, কোচবিহার)

সহায়কগ্রন্থ 
১।    ‘ইতি কথায় কোচবিহার’ সম্পাদক - ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ পাল, অনিমা প্রকাশনী, কলকাতা, বঙ্গাব্দ ২০০০

২।    ‘মনীষী পঞ্চানন বর্মা ও অসম’ সম্পাদক - ডঃ দীপক কুমার রায়, প্রকাশনী, শিলিগুড়ি,  বঙ্গাব্দ ২০০৯

৩।    ‘রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতির ইতিহাস’ জলপাইগুড়ি - তৃতীয় সংস্করণ, বঙ্গাব্দ ১৩৮৮

৪।    প্রতিবেদকের প্রবন্ধ - ‘কালের বির্বতনে রাভা জনজাতি’ লোকমানস - পাক্ষিক পত্রিকা, শারদ সংখ্যা, বঙ্গাব্দ ২০০১
৫।    ‘স্মৃতিগ্রন্থ - রসংদিপাসিং’ রাভা উন্নয়ন পরিষদ (আর.ডি.সি.) পশ্চিমবঙ্গ, প্রথম অধিবেশন, বঙ্গাব্দ ২০১২।
 

লেখক : রাভা ভাষা ও সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক