বিপন্ন ভাষা সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ আরো গতিশীল হয়েছে। People’s Linguistic Survey of India (PLSI) -র কাজ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই Global Language Status Report (GLSR) -এর কাজ শুরু হয়েছে। মূলতঃ আফ্রিকার কিছু দেশে এই কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্বায়নের বিষ নিঃশ্বাস ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীগুলির বাচিক পরম্পরাকে কিভাবে বিপন্ন করে তুলেছে তা আফ্রিকা মহাদেশের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করে দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের রাজ্যে উত্তরবঙ্গের চা বাগান এলাকায় ন’টি ভাষা সংকটজনকভাবে বিপন্ন — একটি ভাষা অবলুপ্ত। অসুর, শবর, মগর, জলদা, কয়া, ধুলিয়া, রাউতিয়া, থারু ও হাজং ভাষাভাষীদের আজ দূরবীণ দিয়ে খুঁজতে হবে চা বাগান এলাকায়। তুন্ডু ভাষাটি তো চিরতরে হারিয়ে গেছে। এই ভাষার শেষ প্রতিনিধিরা অন্য কোনো শক্তিশালী ভাষার মধ্যে মিশে গেছে। উত্তরবঙ্গ জুড়ে ঘাতক ভাষার রক্তচক্ষু ছোট ভাষাগুলির অস্তিত্ব সংকট তীব্র করে তুলেছে। বাংলা, নেপালি ও রাজবংশী ভাষা অন্য অনেক ছোট ভাষার প্রয়োগের পরিসরকে ক্রমশঃ সংকুচিত করে ফেলছে। এমনিতে চাকরিবাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই মাতৃভাষা ব্যবহারে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে অবহেলা, উপেক্ষা ও তাচ্ছিল্য। প্রাথমিকে ছোট ভাষাগুলিকে পাঠদানের ব্যবস্থাও সেভাবে চালু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অন্আদিবাসী শিক্ষক-শিক্ষিকারা নির্বিচারে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে ফেলেন। তাই শৈশব থেকেই মাতৃভাষার সাথে সংযোগ ছিন্ন হচ্ছে। অপরিচিত ভাষা কণ্ঠস্থ করতে হচ্ছে — আত্মস্থ হচ্ছে না। সর্বোপরি, মাতৃভাষা কোনো কাজের নয় — এই জাতীয় এক অশ্রদ্ধা শিশুমনে প্রবেশ করানো হচ্ছে। তাই আজ গ্রামে মাছানি পালার আয়োজন হলে ব্যাঙ্গালোরের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী নিশিকান্ত মাহাতো বাড়ির বাইরে বের হন না — কি হবে এসব অকাজের অতীত অভ্যেস জাগিয়ে তুলে ? এর চেয়ে কিছু আর্থিক সাহায্যের কথা ভাবুন না ? কুড়মালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য সম্বন্ধে নতুন প্রজন্মের এই অনীহা সার্বিকভাবে ভাষা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে তুলেছে। অন্যদিকে ললিতা শবর পালা পশ্চিমবঙ্গের লোধা শবর ভাষাগোষ্ঠীর শিল্পীরা যথাযোগ্য নিপুণতায় মঞ্চে ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না। অথচ ললিতা শবরের পৌরাণিক প্রেক্ষাপট, শবর জনজাতির বিশেষ মর্যাদা, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সাথে একাসনে উপাসনার অধিকার অর্জন করা — এসব কিছুই পালাগানের আঙ্গিকে পরিবেশিত হওয়া প্রয়োজন। তার জন্য দরকার মননঋদ্ধতা ও পরিশীলিত আবেগের মেলবন্ধন। ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার অভাব, অভিনয়রীতির অনুশীলনের অভাব ও সামগ্রিকভাবে নান্দনিক চেতনার অনুপস্থিতি সংকট গভীরতর করে তুলেছে।
এসবের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন ভাষা আন্দোলনের কর্মীরা। Linguistic Human Right (LHR) -এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে যাঁরা নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মুন্ডারি ভাষার রামচন্দ্র সিং মুড়া, লোধাশবরের প্রহ্লাদ কুমার ভক্তা, মাহালি ভাষার শত্রুঘ্ন মাহালি, ধিমাল ভাষাগোষ্ঠীর গর্জন মল্লিক ধিমাল, গারো জনজাতির বেনেডিক্ট সাংমা এবং আরো অনেকে। যুক্ত হয়েছেন মহাশ্বেতা দেবীর আদর্শে গড়ে ওঠা অনেক অন্আদিবাসী মানুষজনও। খেড়িয়া শবরের প্রশান্ত রক্ষিত, বিরহড় ভাষার শিবশঙ্কর সিং বা হাজং ভাষার গবেষক দীপক কুমার রায়।
কুড়ুখ ভাষার বিদগ্ধ লেখক বিমল কুমার টোপ্পোর লেখা এই সংখ্যায় রয়েছে। আছে রাভা ভাষা ও সংস্কৃতির বিশদ আলোচনা — করেছেন সুশীল রাভা। কুড়মালি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষজনের ভাষা চেতনা অত্যন্ত উন্নত ও সুসংহত। কিরীটি মাহাত, অনাদিনাথ মাহাত ও শিরিপদ বংশীরারদের নিরলস ভাষাচর্চা ও জাতিগত উৎস সন্ধানের বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া মূলস্রোতের ভাষাবিদদের কাছেও এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।
এই সংখ্যার এক বড় প্রাপ্তি ড. সুহৃদ কুমার ভৌমিকের গ্রন্থ পর্যালোচনা। আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্যের জগতে এক কিংবদন্তী গবেষক ও পণ্ডিত সুহৃদবাবু এই প্রথমবার জনজাতি দর্পণের পাতায় লিখেছেন। এছাড়াও উত্তরবঙ্গের অগ্রগণ্য লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ শ্রী প্রমোদনাথ একটি মননশীল গবেষণাপত্র পেশ করেছেন সামগ্রিকভাবে উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতি চর্চার বিষয়ে।
পশ্চিমবঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে জনজাতি বিষয়ক গবেষণা প্রকল্প ও আলোচনা সভা বিগত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে। নভেম্বরে বিশ্বভারতী ও বারাসাত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে, ডিসেম্বরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ও মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মার্চে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী তথা দলিত ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক একাধিক আলোচনাচক্রে অংশগ্রহণ করার সুবাদে উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে এই বিষয় নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনা যথেষ্ট চোখে পড়েছে। এমনকি মূলস্রোতের ব্রিটিশ ও আমেরিকান ভাষাসাহিত্যের অধ্যাপকেরাও এখন জনজাতীয় ভাষাসংস্কৃতির সংকট নিয়ে পড়াশোনা করছেন। মাইকেলের কথা খুব মনে পড়ছে —
“হে বঙ্গ ! ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন
তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি।”
অনেক তরুণ প্রজন্মের ছাত্র গবেষকরা ক্যামেরা নিয়ে সোৎসাহে প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন। ‘বর্তিকা’-র অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মহাশ্বেতা দেবীর প্রয়াণ — এগুলি প্রাথমিকভাবে আদিবাসী চর্চার জগতে একটা অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু আজ দুবছর পরে সেই গবেষণার জগতে জোয়ার এসেছে। সরকার দরাজ হস্তে অনুদান দিচ্ছেন। রাজবংশী, কামতাপুরি, কুড়ুখ ও কুড়মালি ভাষার রাজ্যস্তরে স্বীকৃতি মিলেছে। জনজাতীয় অ্যাকাডেমি গড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে জনজাতীয় চর্চা সমৃদ্ধ হয়েছে। ‘জনজাতি দর্পণ’ তাই খুশী। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এর পথচলা শুরু হয়েছিল তার প্রভাব শিক্ষাজগতে ক্রমশঃ ডালপালা বিস্তার করেছে। আগামী দিনে আরো বেশী করে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সংরক্ষণের কাজ শুরু হবে ‘আশা রাখি’।
পরিশেষে, সম্পাদকের কলমে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি এই সংখ্যায় লেখা পাঠানো সব গুণীজনকে। প্রকাশনা সংস্থার পক্ষে শ্রী সুকুমার গুপ্ত, শ্রী সমর কুমার আঢ্য ও শ্রী সঞ্জীব মণ্ডলকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য তাঁরা নিরলস শ্রমদান করেছেন। কারিগরি সহায়তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানাই। কৃতজ্ঞতা জানাই Indian Statistical Institute-এর ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক ড. নীলাদ্রিশেখর দাশকে। সেইসঙ্গে আন্তরিক অভিবাদন জানাই ক্ষেত্রসমীক্ষায় বিশেষ সহায়তা প্রদানকারী রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের Library and Information Science-এর অধ্যাপিকা স্নিগ্ধা নস্করকে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট ফিচারধর্মী লেখক সুলগ্না ভট্টাচার্যকে জানাই বিশেষ অভিনন্দন। তিনি পুতনা মুড়ার উপর একটি উল্লেখযোগ্য নিবন্ধ এই সংখ্যায় উপহার দিয়েছেন। আমার বন্ধু ও জনজাতি দর্পণের সহকারী সম্পাদক শ্রী তরুণ সরকার সব বিষয়ে আমার পাশে থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এজন্য তাঁকে অন্তরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই। এঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই সংখ্যা দিনের আলো দেখতে পেরেছে।
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক রঞ্জন চক্রবর্তী ও আমার ইংরাজী বিভাগের সহকর্মীবৃন্দ — অধ্যাপক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. জয়জিৎ ঘোষ, ড. জলি দাস, শ্রী হেমন্ত কুমার ও শ্রী শুভেন্দু শেখর নস্করকে জানাই নমস্কার ও অভিনন্দন। আমার যাবতীয় উদ্যোগ সফল করে তোলার পেছনে তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান অনস্বীকার্য। বিভাগীয় গবেষণা প্রকল্পের প্রকাশনার অভিমুখ ও জনজাতি দর্পণের অগ্রগতি পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠায় সম্পাদক হিসেবে আমি তৃপ্ত। মুদ্রণ প্রমাদ ও কোনো অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য পাঠকের কাছে আগাম মার্জনা চেয়ে নিলাম। পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে আপনাদের সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় রইলাম। বাংলা নববর্ষ আপনাদের সবার জীবনে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসুক এই কামনা করি।
অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
বিদ্যাসাগ'র বিশ্ববিদ্যালয়
মেদিনীপুর—৭২১১০২