গ্রন্থসমীক্ষা - ডঃ নীলাদ্রিশেখর দাশ

    উত্তরবঙ্গের ভাষা ও স্থাননাম (আঞ্চলিক শব্দকোষ সহ)। সম্পাদনা- রতন বিশ্বাস। প্রকাশ কাল- জানুয়ারি ২০১৭। প্রকাশক- অমর ভারতী, কলকাতা। দাম—৯৫০ টাকা। পৃষ্ঠা—৮০০ পাতা। সমালোচক—নীলাদ্রিশেখর দাশ।
    উপভাষার সমীক্ষা ও পর্যালোচনা আধুনিক বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের একটি অন্যতম প্রধান আলোচনার ক্ষেত্র। এই প্রেক্ষিতে বর্তমান বইটির উত্তরবঙ্গের ভাষা ও স্থাননাম (আঞ্চলিক শব্দকোষ সহ) কথা আলাদা করে উল্লেখ করার 
বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। কারণ, সম্পাদক রতন বিশ্বাস মহাশয় একক প্রচেষ্টায় যেভাবে বহু পরিশ্রমে এই বইটি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন তার জন্য আমরা তাঁর কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। বহু ভাষাবিজ্ঞানী ও ভাষাদরদী উত্তরবঙ্গে প্রচলিত ভাষাগুলিকে সঠিকভাবে জানা ও বোঝার জন্য নানা দিক থেকে, নানা আঙ্গিকে ভাষাগুলিকে বিস্তারিত নমুনা সহযোগে বিশ্লেষণ করেছেন এবং তাঁদের সেই সমস্ত বিশ্লেষণ ও আলোচনার ফলাফল এই সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে।
    আলোচ্য বইটির তিনটি পর্ব। প্রথম পর্বে রয়েছে উত্তরবঙ্গের ভাষা সম্পর্কে প্রায় ৪৬টি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ এবং প্রতিটি প্রবন্ধেই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ভাষার স্বরূপ ও স্বাতন্ত্র্য বেশ যত্ন করে আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে উত্তরবঙ্গের স্থাননাম। পাঁচটি স্বাতন্ত্র্য প্রবন্ধে কোচবিহার, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, গৌড়বঙ্গ এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের স্থাননামের ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় পর্বে রয়েছে আঞ্চলিক লোকায়ত শব্দকোষ। এখানে ৫৭টি ভাষার লোকায়ত শব্দের তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। পরিশিষ্ট পর্বে রয়েছে উত্তরবঙ্গের সাতটি জেলার ভাষাসমূহের ভাষাবংশ ও অবস্থানগত বিষদ বিবরণ, লেখক পরিচিতি এবং নির্ঘন্ট।
    আমার বিশ্বাস, কোনো ভাষার সার্বিক উন্নতি ঘটাতে চাইলে সেই ভাষার সার্থক আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা একান্ত দরকার। না হলে সেই ভাষার সার্বিক উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে না। কারণ কোনো ভাষার স্বভাব, চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, গঠন, ব্যবহার ইত্যাদি বুঝতে গেলে সেই ভাষার বিভিন্ন ভাষিক উপাদানগুলিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নাই। এই প্রেক্ষিতে শ্রী রতন বিশ্বাস মহাশয় তাঁর কাজের দ্বারা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে সমগ্র বাংলাভাষীকে কৃতজ্ঞতার জালে আবদ্ধ করেছেন। তবে গ্রন্থ সমালোচনার অংশ হিসাবে বইটিকে কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কথাও বলবো। আমার বিশ্বাস এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা যদি সম্পাদক মহাশয় পরবর্তী সংস্করণে কাটিয়ে উঠতে পারেন, তাহলে এই কাজ আধুনিক বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান ও উল্লেখযোগ্য কাজ হিসাবে স্বীকৃতি পাবে। 
    কোনো ভাষা বা উপভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলে ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব ও পদ্ধতি জানলেই চলে না। উদ্দিষ্ট ভাষার প্রতি যদি গবেষকদের মমত্ব ও ভালোবাসা না থাকে, তাহলে তাঁদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে বলা চলে না। এক্ষেত্রে স্বীকার করতে অসুবিধে নেই যে প্রতিটি প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট লেখকের উদ্দিষ্ট ভাষাটির প্রতি গভীর দরদ ও ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। ফলে বহু ক্ষেত্রেই পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা সচেতনতার সাথে জয় করা সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্যটি এখানে উল্লেখ্য সেটি হল লেখকদের দায়বদ্ধতা। প্রবন্ধ লিখতে বসে তাঁরা কোনো দায়সারা কাজের বাহানা নিয়ে কাজে শেষ করেননি। বরং বেশ গুছিয়ে প্রতিটি বিষয় যত্ন সহকারে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় অনুসরণ করে প্রবন্ধে উপস্থাপনা করেছেন। প্রায় প্রতিটি লেখকই জানিয়েছেন কীভাবে তাঁরা বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, এবং বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করে প্রবন্ধ লিখেছেন। এর আগে উত্তরবঙ্গের ভাষাগুলি নিয়ে বেশ কিছু কাজ আমাদের নজরে এসেছে, কিন্তু একসঙ্গে এতগুলি ভাষাকে একই মলাটের মধ্যে বাঁধার চেষ্টা আগে কেউ করেছেন কিনা আমার জানা নেই। আর কেউ করে থাকলেও তাতে বর্তমান বইয়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা একেবারেই কমে না।
    বইটিতে প্রদত্ত প্রমাণ ও উদাহরণ কাজে লাগিয়ে আমরা সহজেই উত্তরবঙ্গের ভাষাগুলির ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাগর্থতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও সন্দর্ভ সংক্রান্ত বহু মূল্যবান তথ্য পেয়ে যাই, যার ফলে এই ভাষাগুলির স্বাধীন ভাষিক অস্তিত্ব বুঝে নিতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না। সংক্ষেপে বলা যায়, বইটির আলোচ্য বিষয় বহুধাবিস্তৃত। সূচীপত্র দেখলেই বোঝা যায়, বইটিতে বিভিন্ন ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, শবার্থতত্ত্ব, শব্দভাণ্ডার, আগন্তুক শব্দ, বাক্যতত্ত্ব, বাক্যনির্মাণ, শব্দকোষ, জনজীবন কোনো কিছুই বাদ পড়েনি। এতগুলি বিষয়কে এক সূত্রে বেঁধে এক মলাটের মধ্যে পরিবেশন করা সহজ ব্যাপার নয়। এর জন্য যথেষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান ও সম্পাদকীয় দক্ষতা লাগে। শ্রীবিশ্বাস এই কাজটি এখানে দক্ষতার সঙ্গেই করতে পেরেছেন। তাঁর ধন্যবাদ প্রাপ্য।
    অন্য দিকে সীমবদ্ধতার কথা বলতে গিয়ে বলা দরকার যে, বহু লেখকই তাঁদের প্রবন্ধের শেষে প্রয়োজনীয় সূত্র নির্দেশ দেননি। গবেষণা ও বিশ্লেষণমূলক কাজে এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ। আমার অনুরোধ বইটির পরবর্তী সংস্করণে সম্পাদক মহাশয় যেন এদিকে একটু নজর দেন। এতে কিন্তু বইটির গ্রহণযোগ্যতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এর সঙ্গে এও মনে রাখতে হবে যে লেখার মধ্যে অন্য লেখকের বক্তব্য উল্লেখ করার সময় সেটি উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখতে হবে এবং তার ঠিক পরেই প্রথম বন্ধনীর মধ্যে লেখকের নাম, বইয়ের প্রকাশ সাল ও পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্লেখ করতে হবে। সিরিয়াস লেখায় বিষয়বস্তু বা বক্তব্য যাচাই করার সূত্র উন্মুক্ত রাখতেই হবে। একটু সচেতন হলেই লেখকেরা এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
    আমার মতে এই বইতে প্রদত্ত সমগ্র আলোচনা তিনটি আলাদা বইতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার ছিল। প্রতিটি পর্বই আলাদা বই হিসেবে জন্ম নেবার দাবি রাখে। পাঠক হিসেবে আটশো পাতার একটি বিশাল বই নিয়ে পড়তে গিয়ে বেশ অসুবিধাই হয়েছে। সেটা একটা দিক। আর বিষয়বস্তুগুলি যখন আলাদা বিবেচনার দাবি রাখে তখন সেগুলিকে এক মলাটের মধ্যে পুরে সেগুলির জ্ঞানতাত্ত্বিক গুরুত্ব কমানোর প্রয়োজন দেখি না।
    এবং বিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমি বলতে চাই বর্তমান বইটি সম্পাদকের একটি অনন্য সাধারণ কাজ। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি উত্তরবঙ্গের এতগুলি ভাষা সম্পর্কে বিস্তারিত না হোক, একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে দিতে পেরেছেন। চাই এই বইটির সার্বিক প্রচার হোক, বাংলার মানুষ বইটি পড়ুন এবং জানুন কী অসীম ঐশ্বর্য্যে বাংলার ভাষা ভূগোল সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র্য। আমরা চাই এমন গবেষণামূলক কাজ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত ভাষার উপরেই হোক। এই সমস্ত ভাষার সমস্ত প্রকার ভাষিক সম্পদ যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হোক, সেগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হোক, এবং তার ফলশ্রুতিতে বাংলার সমস্ত ভাষা ও উপভাষা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ হোক ও ভালোবাসা প্রগাঢ় হোক। রতনবাবু এই কাজটির কথা একবার ভেবে দেখতে পারেন। কারণ তিনি এই ধরনের কাজে তাঁর প্রশ্নাতীত যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।