গাঙের ত্রিমুনির মুখ, এক পারে মোল্লাখালি, লদির আরাক পারে উত্তর ডাঙা, উত্তর পারে কচুখালি ঘেরপাড়ার নিমাই পাটনি ওরফে নিমাই গাইন, এই গাঙের খ্যার মাঝি। এপার ওপার লৌকো বেয়ে পারাপার করে। সেই বেনবেলায় চাড্ডি পান্তা খাইয়ে বেরুয়েছে, লৌকোয় বুসে, নিমাই-এর ঘুমের ঝিমনি আসটোলো। দক্ষিণ পারের নোকের ডাক শুনে শরীলির আড়িমুড়ি ভাঙয়ে বুটে হাতে লৌকোয় হাঁক মারে।
— পারে কেডা যাবে, লাইবে আইসো।
— খ্যা রাখ, আমি গাং ভেড়িরতে লাইবে আসটিছি। ওপারে যাবার লোকের গলার চিক্কোর শুনে পাটনি লৌকোয় লগি মাইরে রাখে।
দূরে একজন লোক, এক হাটু নোনা পাঁক ঢেলে লৌকোর দিকে আগিয়ে আসে, একে তো নোনা পাঁক, তার আবার গরাণ গেমেয় বাইন গাছে শুলো, ধানী ঘাসের মধ্যে দে এগুতে থাকে। লোক পাঁক ঠেলে খ্যার লৌকোর কোল দরজায় বুসে নোনা জলে পা ধোয়। নিমাই লৌকো ছেড়ে দেয়।
পাটনি, লোকটাকে বলে,
— ওই উত্তর ডাঙা পারের লোক পার হবার জন্নি ডাকে। ত আমার তো লেয়ম মানতি হবে। এই ত্রিমুনির বিদ্যে নদীর খ্যা, আমি মোল্লাখালি আগে যাব তারপর উত্তর ডাঙা, তারপর কচুখালি। নৌকোয় হির্সনে পাতা আছে। তুমি এট্টু দাঁড় বাইয়ে দাও, আর আমি হাত আর পা দে গোড়া বুটে টানি, উজুনের জল ঠিলে, নৌকো নেয়াতি হচ্ছে তো। লোকটা লৌকোর বাঁকের ওপর বুসে, দাঁড় টানতে থাকে। লোকটা বলে —
— এডা তোমাক লেতাই পাটনির খ্যা ছেল, লেতাই কোমনে গেবারিল? তুমি কবে খ্যা ডাইকে নিলে ?
নিমাই উত্তর দেয়,
— হ্যাঁ এডা অনেক কাল ধুরে লেতাই পাটনির খ্যা ছেল। তা বুড়োডার কতা মুনে উঠলি মনডা বড্ড খারাপ হুয়ে যায়। লোকডার কত বয়স হুয়েছেল, তবু খ্যা বন্ধ করিনি। বড্ড আস্তে আস্তে লৌকো চালাতো। তিন পারের লোক বড্ড হাঁকাহাঁকি করতো আর বোলতো লেতাই পাটনির ধর্ম্মের খ্যা, লেতাই ভবতরীর মাঝি। লৌকো টা ছেল ভাঙা চোরা, নৌকোর বাঁক গোছাতে কোল দরজা, সব ভাঙা, চরের এঁটেল মাটি দে, কোন রকম তালিতুলি দে এপার ওপার কোরতো, লোকের গালাগালি খিস্তী, খেউড় শুনতো তবু কোনদিন লৌকা বন্ধ করেনি। কারণ ও তো জাতমাঝি ঈশ্বর পাটনিটির বংশধর। তারপর সাইকুলান অ্যালো, আয়লা ঝড় অ্যালো, গাঙে কি ঢেউ, আমাক কুলনী পাড়ার গাঙের বাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি জলে বুড়ে গেল। সেই রাত্রিতে ওর লৌকো কোথায় ভাইসে গেল কোন উদ্দিশ প্যালোনা। এপার ওপার সবার ঘাটে ঘাটে চিক্কোর মাইরে ডাকলো তবু লৌকোডা কোন উদ্দিশ পালো না। এর জন্নি মনের দুঃখে বিবাগী হুয়ে চুলে গেল, কেউ উদ্দিস পালো না। তারপর একদিন মোল্লাখালির আশু মাস্টার বলল —
— নিমাই গাইন তোর তো বড্ড অভাব। তো আমাগো ইসকুলে তো ঐ পারে হেতালবাড়ী, ওই ধনা কেরির লৌকোয় নে পার কর।
— তা কি কুরে হয়, আমি তো আর পাটনি না, তা অভাব হুয়েছে বুলে খেয়া চালাব। আমার বাপ, ঠাকুদা জঙ্গল কেটে এই গাঁ আবাদ কুরেছে। চাষবাস করেছে, আমি সেই বাঁকা লাঙলের মুটে ছাইড়ে যাব, পাটনি গিরি কুরে এই ছোট কাজ কুরলে নৌকে আমাকে ছি ইছি কুরবে না—
নিমাই উত্তর দেয়।
তবু আশু মাস্টার বলে —
— নারে আর জাত বিচার বলে কিছুই নেই। সবাই সব কাজ করছে। দেখিসনি আমাদের ঐ মোল্লাখালির হাটে বামন লোক জুতোর দোকান কুরেছে। নুনো নাপতির মেয়ে কাজলির নে প্যালিয়ে গেল, ঝুড়ো রপ্তানের ছেলে পাগল রপ্তান। তারপর কদিন বাদে গ্রামে এসে বলে কালিঘাটে তে বে করেছে। ওরা কালিঘাট চেনে? তোর পেটে ভাত নি, বড্ড উপোস কাপোসে দিন যায় তার উপর অপারেশন হুয়েছি, বউটা অন্য লোকের সঙ্গে নষ্ট, পুই পালকগুলে কেমনে মানুষ করবি। সেই থেকে আমি লেতাই পাটনির খ্যার মাঝি। নিমাইয়ে কথা শুনে লৌকোয় বসা লোক বিমর্ষ হয়ে আপন মনে বলতে থাকে।
— আর জাত বেচার বলে থাকলো না, এই পোদ কিনা পাটনির কাজ কুরছে। এরপর শুনতি হবে নদীর চরে এই পোদের ছ্যামড়া ছুরি দে গরুর চামড়া কাটতি লেগেছে। ভাটার টানে আস্তে আস্তে লৌকো টা মোল্লাখালির পারে পৌঁছুতেই লোকটা পারনির পয়সা দিয়ে হাঁটু চরে নেমে পড়ে। জলজঙ্গলের দেশে, দলিত খেটে খাওয়া মানুষের, নৌকো পারা পারের বেদনা, নোনা গাঙের চরের প্রান্তে বার বার প্রতিধ্বনিত হয় বোবা কান্নায়।
লেখক পরিচিতি — নিরঞ্জন মন্ডল, প্রাক্তন ব্যাঙ্ক আধিকারিক, গল্পকার, কবি ও প্রাবন্ধিক। ফোন - ৯৪৩৩৫ ৬১০৮৬