“নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান।
বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান।।”
‘ভারতবর্ষ’ এটি একটি দেশ যেখানে যুগে যুগে বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন জাতির প্রবেশ ঘটেছে এবং ভারতমাতা দু-হাত তুলে তাদেরকে কোলে তুলে নিয়েছে। বিভিন্ন জাতিরাও আমাদের ভারতবর্ষ দেশকে নিজের মাতৃভূমি বলে গ্রহণ করে নিয়েছেন। পৃথিবীতে ভারতবর্ষ আজ জাতি, ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ বলে পরিচিত।
‘ভারতবর্ষ’ বিশাল এই দেশের পশ্চিমবঙ্গ একটি অন্যতম অঙ্গরাজ্য। আমাদের এই অবিভক্ত বঙ্গদেশেও কালে কালে নানান জাতি ধর্মের মানুষের সমাগম ঘটেছে। যেন মনে হয়, পুরো ভারতবর্ষের বাস এই বাংলায়। এই বৃহৎ বাংলাদেশে আদিকাল থেকে বাস করে আসা নানান জাতিদের মধ্যে অন্যতম জাতি হল মেচ বা বড়ো জাতি। এই বড়ো জাতি আজকের নয়। সন তারিখ দিয়ে প্রামাণিক তথ্য দিতে না পারলেও তারা যে আর্য জাতির পূর্বে এসেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। ক্রমশ আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত বড়োদের জীবনধারণ নানা বাধা বিপদের মধ্য দিয়ে নদীর জলধারার মতই এগিয়ে গেছে এবং আজ পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে।
প্রাচীনকালে বড়োরা বসবাস করতো হিমালয়ের উত্তরে ‘বোদ’ নামক দেশে, যা পরে তি-বেদ — তিব্বদ এবং আজ তিব্বত নামে পরিচিত। অতীতে এই ‘বোদ’ নামক দেশে সম্ভবত খাদ্য, বাসযোগ্য ভূমির অভাব বা বিভিন্ন রকম প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়ে তারা নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। ভারতবর্ষে প্রবেশ করবার সময় এই জাতি একটি পথ দিয়ে আসেনি। তাদের একটি দলের আগমন ঘটে বর্তমান অসম রাজ্যের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীর বরাবর। অপর একটি দল এসেছিল কাশ্মীর রাজ্যের লাদাক-এর পথ ধরে এবং অন্য একটি দল প্রবেশ করেছিল সিকিম রাজ্যের বর্তমান কালের নাথুলা পাশ দিয়ে। এই তিনটি পথ দিয়ে এই তিনটি দল প্রবেশ করেছিল। এই দলগুলি হল — মেচে, কোচে, লাপচে। মেচ নামে যে দলপতি ছিলেন তার নাম অনুসারে তার দলের নাম মেচ। এই দলগুলি এদেশে এসে যে যে স্থানে বাস করা শুরু করলো সেই স্থানগুলির নাম এই দলের নাম অনুসারে হয়। যেমন — মেচরা যে নদীর তীরে এসে বসবাস করে সেই নদীর নাম হয়েছে মেচি নদী, কোচদের বাসস্থান কোচবিহার ইত্যাদি। পরবর্তীকালে এই জাতি ক্রমশ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বর্তমানে মেচ অর্থাৎ বড়ো জাতিকে পশ্চিম বাংলায় প্রধানত তিনটি জেলা, যথা—জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং এবং কোচবিহারেই দেখা যায়। বড়োদের এই বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে দেখা গেল নানা পরিবর্তন। বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে আমরা তাদের খাদ্যপ্রণালী, জীবনধারা, জীবিকা, বেশভূষা ধর্মাচার সাংস্কৃতিক পটভূমি ইত্যাদি বিষয়গুলি সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করতে পারি।
জীবনাচার - মেচ বা বড়োদের জীবনপ্রণালী অতি সাধারণ। বড়োরা প্রথম জীবনে ছিল গোষ্ঠীভুক্ত। তাদের গোয্ঠীতে একজন দলপতি বা সর্দার থাকতো। দলপতিদের নির্দেশ তার দলের লোকজন মেনে চলতো। আদিতে বড়োদের সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজে মেয়েদের স্থান ছিল সমাজের সব থেকে উচ্চ স্থানে। কিন্তু ভারতে প্রবেশ করার পর এদের সমাজ ক্রমশ পরিবর্তন হতে হতে মাতৃতান্ত্রিক থেকে আজ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তন হয়েছে। তথাপি আজও এদের সমাজে ছেলে ও মেয়েদের সমতুল্যভাবে সম্মান দেওয়া হয়। বর্তমান কালেও দেখা যায় বড়ো সমাজে কোন ব্যক্তি সমাজ বিরুদ্ধ কাজ করে থাকলে তা প্রশাসনিকভাবে না করে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে ফেলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
বড়ো সমাজ নগর সমাজ থেকে দূরেই বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই দেখা যায় আজও তারা শহরাঞ্চল থেকে দূরে গ্রামে, নদীতীরে, পাহাড়-এর পাদদেশ, পর্বতাঞ্চল, অরণ্য অঞ্চলে বসবাস করে। তবে বড়োরা আধুনিকতার স্পর্শে কর্মসংস্থানের তাগিদে বিভিন্ন নগরসভ্যতায় পা বাড়াচ্ছে। এদের জীবনের নানারকম চাহিদায় বিজ্ঞানের ছোঁয়া লেগেছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করেই তারা বাইরের জগতের সাথে মেলবন্ধন করে চলেছে। আজ আর অসুখ হলে বাড়িতে নয় শহরে গিয়ে চিকিৎসালয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে, শিক্ষা গ্রহণ করছে, কর্মে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে।
জীবিকা - প্রাচীনকাল থেকেই বড়োরা অরণ্যে ভ্রমণ করে বনজ দ্রব্য যা পেত তাই শিকার করতো ও খেত। কিন্তু ভারতে প্রবেশ করার পরে ধীরে ধীরে এই দুটি প্রধান জীবিকা ছাড়াও কৃষির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। বর্তমানে কৃষিকাজই তাদের প্রধান জীবিকা হয়ে দাড়িয়েছে। কৃষিজ ফসলের মধ্যে এরা ধান, পাট, গম, ভুট্টা, কার্পাস তুলা, এন্ডি চাষ, পঞ্চমুখী কচু, শিমলা আলু, আদা, হলুদ, ধনে পাতা, লাফা, মেষ্টা চাষ, পালং, কুন্দরি (তেলাকুচা), মুলা, কালো নুইনয়া, বোরলি ধান, ভাদই ধান ইত্যাদি। এই জাতির সাধারণত আতপ চালের ভাত বেশি পছন্দ। বড়োরা আদিকাল থেকে নানান ধরনের পশুপালন করে থাকে। যথা - গরু, মহিষ, শুকর, ছাগল, মুরগী, হাঁস, পায়রা ইত্যাদি নানান পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তবে বর্তমানে কৃষিকাজই এদের আর্থ-সামাজিক শক্তি।
অতীতকালে এই বড়োজাতি কার্পাস তুলা, এন্ডি চাষ করে তার থেকে সুতো বের করে বয়ন শিল্পে পারদর্শী ছিল। এরা নিজেদের পোশাক নিজেরাই তৈরী করে পড়তো, এবং তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। আজ আর এসব দৃশ্য দেখা যায় না বললেই চলে। আধুনিকতার করাল গ্রাসে আজ তাদের শিল্প এবং জীবিকা হারাতে বসেছে। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার কারণে হাতে বোনা বড়োদের বস্ত্রের কদর আজকের বাণিজ্যিক বাজারে হয়তো আর নেই। দেশ স্বাধীন হবার পূর্বে ইংরেজরা বড়োদের বহু জমি দখল করে নিয়ে চা-বাগিচা তৈরী করেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিক এনে বাসস্থান গড়িয়েছে এবং এর ফলে জনসংখ্যাও বেড়ে গেছে। তবে বর্তমানে বড়োরা কৃষিকাজ ছাড়াও বাগিচা ফসলের দিকে এগোচ্ছে। যথা—সুপারি চাষ, চা-বাগান তৈরী, রাবার চাষ, সেগুন চাষ ইত্যাদি।
ধর্মীয় ভাবধারা — আমরা সকলেই জানি, আদিম কালে মানুষ প্রকৃতির রোষ থেকে নিস্তার পেতে প্রকৃতিকে নানান রূপে আরাধনা করা আরম্ভ করেছিল। বড়ো জাতিসমূহ এর ব্যতিক্রম নয়। বড়োদের ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপের স্বকীয়তা প্রাচীন কাল থেকেই বর্তমান। প্রাচীনকাল থেকে বড়োরা তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র ধর্ম ‘বাথৌ’ ধর্মকে আরাধনা করে আসছে। বা (পঞ্চ) + ‘থৌ’ (তত্ত্ব) = বাথৌ (অর্থাৎ পঞ্চতত্ত্ব — ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম্) এই অনুসারে বড়োরা বিশ্বাস করে পৃথিবী ও তার প্রাণী জগৎ এই পাঁচটি তত্ত্বের সাহয্যেই চালিত হয়। সেইমত এই জাতি এই প্রাকৃতিক দেবতাকে দৃঢ়বিশ্বাসে পূজা করে আসছে। এই জাতি মূর্তি পূজাতে বিশ্বাসী নয়। তাদের গৃহের অঙ্গনের উত্তর-পূর্ব কোলে একটি গোল বেদি তৈরী করে তাতে সিজৌ অর্থাৎ মনসা গাছ পুঁতে তাকে পূজো করে। এই দেবতাকে ঘিরেই তাদের জীবনে নানান ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ আবর্তন করছে। আজও কিছু কিছু স্থানে এদের মধ্যে বলি প্রথা চালু রয়েছে। তাদের মধ্যে পূজোর সময় শুকর, মুরগী, পায়রা, পাঁঠা, মহিষ ইত্যাদি প্রাণীর বলি হয়ে থাকে। তবে আজ এই সব বলি প্রথা বিলুপ্ত হতে বসেছে। এদের মধ্যে প্রায় চব্বিশ রকমের দেবতাকে মেনে চলা হয়। এইসব দেবতাদের মধ্যে প্রধান পুরুষ দেবতা হলেন বড়াই বৌবৌ এবং প্রধান সৃষ্টিকর্তা পিতা এবং মৌহনাও বুড়ৌই হলেন শক্তির দেবী, লক্ষীর দেবী, ধন সম্পদের দেবী।
কালের গতিতে আজ বড়োদের ধর্মীয় আচার-আচরণের মধ্যে এসেছে অনেক পরিবর্তন। যুগে যুগে বিভক্ত রাজনৈতিক কারণে, বিভিন্ন জাতির প্রভাবে বিভিন্ন ধর্মের সঙ্গে মিলনের ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে বড়ো সমাজ। অন্যদিকে তাদের ধর্মীয় রীতিনীতির পরিবর্তনও ঘটেছে। ঘটনাক্রমে, প্রথমত আর্যদের সাথে সংগ্রাম ও মিলন, আবার পরবর্তী সময়ে ‘বৌদ্ধ’ ধর্মের সহিত সংমিশ্রণ, একসময় ‘ইসলাম’ ধর্মের প্রভাব পড়েছে অনেকাংশে। খ্রীষ্টধর্মের প্রভাবও পড়েছে ব্যাপকভাবে, যা আজও প্রচুরভাবে লক্ষ্য করা যায়। যুগের হাওয়া বদলের সাথে সাথে বড়োদের বাথৌ ধর্মের মধ্যেও অনেক শাখা-প্রশাখা বেরিয়ে গেছে মতান্তরের কারণে। কোথাও আব্রু নাম নিয়ে, কোথাও উল্টাপানি, কোথাওবা গুরুমা রূপামনি-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বড়োরা ধর্মীয় ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ হচ্ছে। আবার বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লক্ষ্য করা যায় যে, উত্তর প্রদেশের গুরুদেব শিবনারায়ণ ব্রহ্মচারী এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে গুরুদেব কালীচরণ ব্রহ্ম উত্তর-পূর্ব ভারতে তথা বাংলায় বড়োদের মধ্যে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব ঘটিয়ে বড়ো সমাজকে ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন।
তবে বর্তমানকালে বিভিন্ন জাতির মতো বড়োরাও মূর্তি পূজাকে সাদরে গ্রহণ করে নিজগৃহে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারাও দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষী পূজা, বিশ্বকর্মা পূজা, গণেশ পূজা, মনসা পূজা, শিব পূজা করতে মূর্তি ব্যবহার করছেন। এতে যদিও বড়ো সমাজ ধর্মীয় ব্যাপারে সমৃদ্ধ হচ্ছে, তথাপি হারাতে বসেছে বড়োদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি। মূল বাথৌ ধর্মের যে নিষ্ঠা তাতে আর বড়ো জনগণ আকর্ষিত হচ্ছেন না। সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় যারা শহরে গিয়ে বসবাস করছেন তারা প্রায় নিজস্ব ধর্মকে বিস্মৃতির জগতে ঠেলে দিচ্ছেন। আর গ্রহণ করছেন অন্যান্যদের ধর্মকে, আচার আচরণকে।
সাংস্কৃতিক পটভূমি — বড়ো সমাজ সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। বলতে গেলে সংস্কৃতির অঙ্গন হল বড়ো সমাজ। বড়োরা সারা বছর ধরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নৃত্য-গীত আনন্দে মেতে থাকে। তারা অর্ধপেট খেলেও বছরের সর্বদাই তাদের ঠোঁটের আড়ালে হাসি লেগেই থাকে। যথা - বৈশাখ মাসে বৈশাগু, ঘেরাই উৎসব, মাছ ধরতে নৃত্যগীত, ধান বুনতে, কাটতে নৃত্যগীত, বসন্ত-এর আগমনকে শুভেচ্ছা জানাতে বাগরোম্বা নৃত্য, ঘেরাই নৃত্য ইত্যাদি। বড়ো সমাজে প্রধানত বছর শুরু হয় বসন্ত কাল দিয়ে। বড়োদের সমাজে শিশু জন্ম হবার পর, বিয়ের বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে তাদের প্রধান আনন্দদায়ক পর্ব হল নৃত্য-গীত। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আজ পর্যন্ত বড়োরা তাদের নিজের জাতিসত্তাকে অন্য সম্প্রদায় থেকে স্বতন্ত্র ভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করে চলেছে।
আধুনিক সভ্যতা যান্ত্রিক মানসিকতায় পরিপূর্ণ হবার কারণে আজ প্রত্যেকেরই সময়ের বড় অভাব। এর প্রভাব বড়োদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। সময়ের গতিকে ধরবার জন্য তারা ছুটে চলেছে। আজ আর এত সময় নেই নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার। এমনভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বড়ো সমাজের নৃত্য-গীতের মধ্য দিয়ে আনন্দ খোঁজার পথই একদিন বন্ধ হয়ে যাবে।
শিক্ষা - প্রাচীনকালে যে সময় বড়োরা তিব্বত দেশে বাস করতো তখন তাদের নিজস্ব লিপি ছিল কিনা তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে যদি থেকে থাকে তবে হয়তো তারা তাদের লিপি সংরক্ষিত করে রাখতে অসমর্থ হয়েছিল। তাই আজ বড়োদের নিজস্ব লিপি নেই বলা চলে। বর্তমানে বড়োরা তাদের লেখার ও পড়ার জন্য বিভিন্ন ভাষার লিপি ব্যবহার করছে। যেমন - বাংলা, হিন্দি, ইংরাজী, দেবনাগরী, অসমীয়া, রোমান ইত্যাদি। প্রাচীন ও মধ্য যুগে বড়োদের রাজা থাকলেও তাদের নিজস্ব ভাষাকে রাজসভায় স্বীকৃতি না দিয়ে অন্যান্য ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর ফলে বড়োদের নিজস্ব ভাষা আঞ্চলিকতায় সীমাবদ্ধ। তা না হলে আজ চিত্র অন্য কথা হয়তো বলতো। সাধারণত বড়ো সমাজ চিরকাল গ্রাম, জঙ্গল, নদীর ধারে, পাহাড়-পর্বতের পাদদেশে বাস করতো বলে তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো দেরিতে প্রবেশ করেছে।
তবে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে শিক্ষায় ধীরে ধীরে বড়োরা এগিয়ে আসছে। তার আগে পুঁথিগত শিক্ষার আলো তেমন ভাবে প্রবেশ করেনি বললেই হয়। তবে আজও গুটি কয়েক বড়ো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে পেরেছে। ধীরে ধীরে হলেও বড়োরা শিক্ষায় উন্নত হচ্ছে দেখা যাচ্ছে।
খাদ্যপ্রণালী - প্রাচীনকালের মানবজাতির মতই বড়োদের প্রধানত অরণ্যে শিকার করেই খাদ্যসংগ্রহ করতে হত। পরবর্তী পর্যায়ে যখন তারা রান্নাবান্না করে খেতে শিখলো তখন তাদের শিকার জাতদ্রব্য ছাড়াও কৃষিজাত দ্রব্য ও খাদ্য প্রণালীতে প্রবেশ করতে আরম্ভ করলো। বড়োরা সাধারণত আতপ চালের ভাত খেতে বেশি পছন্দ করে। তারা বছরে নানা ধরনের ধান জমিতে ফলিয়ে থাকে। যেমন - বোরনি, পায়জাম, কালো নুনিয়া, ভাদই ধান ইত্যাদি। বড়োরা প্রায় সব ধরনের মাংস খেতে ভালোবাসে। তার মধ্যে বেশি পছন্দ করে শুকরের মাংস। শুকরের মাংস পুড়িয়ে, শুকিয়ে, সেদ্ধ করে ইত্যাদি নানা প্রকারের রন্ধন কার্য করে খেয়ে থাকে। এছাড়া মহিষের মাংস, মুরগী, খরগোশ, বনবিড়াল, কিছু কিছু বড়োরা গরুর মাংসও খেয়ে থাকে। অন্য সব-এর মধ্যে শামুক (গুগলি), কাঁকড়া, এণ্ডিপোকা, কুইচয়া, উলুপোকা (উছিংগ্রা), ইঁদুর, ব্যাঙ, মাছ, বিভিন্ন প্রকার পাখি। এছাড়াও নানান ধরনের বাটা খেতে ভালোবাসে। শাকসব্জির মধ্যে লাফা, রটংশাক, মেষ্টাপাতা, বাঁশের গাজা, শিমলা আলু, ধুন্দল, কুন্দরি, জঙ্গলের শাক ও নানান দ্রব্য খেতে পছন্দ করে।
তবে বর্তমানে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের চাপে বা অন্যান্য কারণের জন্য বড়োরা নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস ভুলে যাচ্ছে অথবা বাধ্য হচ্ছে। বড়োরা বর্তমানে নানান কারণে শহরাঞ্চলে গিয়ে আধুনিক রন্ধনক্রিয়া অনুকরণ করছেন এবং খাচ্ছেন। যার ফলে দেখা যাচ্ছে, বড়ো সমাজের রান্নাঘরে আমূল পরিবর্তন। ভারত সরকার আইনগতভাবে শিকার করবার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। সেইহেতু বড়োদের আজ আর শিকার করে বন্যজন্তু জানোয়ার ও দ্রব্য নিয়ে আসার পথ নেই। তাছাড়া বর্তমান প্রজন্ম নিজস্বতা হারিয়ে আধুনিক খাবারের দিকে পা বাড়াচ্ছে।
গৃহনির্মাণ প্রণালী - আদিম বড়োরাও প্রথম জীবনে এক স্থানের থেকে অন্য স্থানে যাযাবরের মত ঘুরে বেড়িয়েছে। পরবর্তীকালে এই জাতি গৃহনির্মাণে নিপুণতা দেখিয়েছে। বড়োরা গৃহনির্মাণের জন্য যে স্থান নির্বাচন করতো সেখানে তারা জল, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে গৃহনির্মাণ করতো। বড়ো সমাজের বেশির ভাগ বাড়িগুলো প্লেংকিন বা দোতলা বাড়ি এবং তা হয় বাঁশ নয় কাঠ দিয়ে তৈরী। এর প্রধানত দুটো কারণ ছিল, যথা - (১) বন্যা ও ভূমিকম্পের হাত থেকে বাঁচতে। (২) নানান ধরনের পশু, সাপ, পোকামাকড় থেকে রক্ষা পেতে। সাধারণতঃ বড়োদের বাড়ির উঠোনের উত্তর-পূর্বের কোণে নির্মাণ করতো বাথৌ বেদি। তার উত্তরে থাকতো মাইনা ও মন্দির (গৃহদেবীর থান) আর চারপাশে থাকতো খোলা অঞ্চল। এই জাতি সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেই ভালোবাসে। তাই তাদের ঘরবাড়ি সবসময় মাটি গোবর দিয়ে লেপাপাড়া থাকতো, যা ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
বর্তমানে যান্ত্রিক সভ্যতার কারণে বড়োদের এই গৃহনির্মাণের চিত্র আর তেমন রূপে দেখা যায় না। তার বদলে সমাজে ঢুকে পড়েছে সিমেন্ট বালি দিয়ে তৈরী কংক্রীট বাড়ি। একটি শহরাঞ্চলের বাড়ির মধ্যে আজ যা যা লক্ষ্য করা যায় তার অনেক কিছুই লক্ষ্য করা যায় বড়োদের জীবনধারায়।
বস্ত্র, আভূষণ ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি - বড়োরা আদিকাল থেকেই কারুকার্য শিল্পে এবং বয়ন শিল্পে নিপুণতা দেখিয়েছে। এরা নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেরাই তৈরী করতো। এই সম্প্রদায়ভুক্ত নারীরাই নিজেদের বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরী করতো। মেয়েদের পরনের ডোঘনা, ওড়না, পুরুষদের পরবার গামছা বা নেংটি তৈরী করতো নিজস্ব হাতেই। এছাড়াও নানান প্রকার আভূষণও নিজেরাই তৈরী করে পরতো। তাদের নাকের নোলক, কানে বড়ো বড়ো দুল দেখা যেত, হাতে বালা, হাখাই মুঠা, গলায় গলবন্ধ বা জিঞ্জিরি, পায়ে মল, কোমরে কোমরবন্ধ, মাথায় চুলের কাঁটা ইত্যাদি, নানান ধরনের গয়না পরতো বড়ো রমনীরা। বড়োরা নিজস্ব নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেরাই বানাতো। যথা - বাটনা বাটবার জন্য ঠুংখু (অনেকাংশে হামুল দিস্তার মতো দেখতে), ধান, চাল, হলুদ, ডাল ভাঙবার জন্য সাম-গাইন, নানা দ্রব্য কাটবার জন্য বানাতো চাকু বা ছিকা, ডাবা (দা), ডাবিয়া (খুরকি) ইত্যাদি। এছাড়াও বানাতো দেওয়ারী (প্রদীপ), বাঁশের বা কাঠের বিভিন্ন পাত্র, মাছ ধরবার জন্য নানান ধরনের অস্ত্র, জাখৈ, ঘোবাহ, খো, জাল ইত্যাদি।
বর্তমানে এর মধ্যেও পড়েছে আধুনিকতার প্রভাব। আজ আর বড়োদের নিজস্ব গহনা পরতেই দেখা যায় না। বড়োদের পোশাক পরিচ্ছদেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। তাদের ডোখনা বা অন্যান্য পোশাক পরিধান করতে দেখা যায় না। তার পরিবর্তে এসেছে আধুনিক বস্ত্র। এর কারণস্বরূপ হয়তো বলা যেতে পারে এই বস্ত্রগুলি দামেও কম এবং সহজলভ্য বটে। তাই বলাই যায়, বড়োরা আজ বিপন্ন তাদের নিজস্ব বস্ত্র আজ বিলুপ্ত প্রায়, তাদের জাতিসত্তাও আজ ধ্বংসের অভিমুখে।
বড়োরা অতীতে যেমন ছিল আজ আর তাদের সেইরূপে দেখা যায় না। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদে এসেছে আধুনিক ভাবধারা, জীবনধারণে এসেছে আধুনিক মানসিকতা, ধর্মীয় আচার আচরণে খেলাধুলায়, খাদ্য প্রণালীতে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে, শিক্ষায়, সবেতেই এসেছে আধুনিকতার প্রভাব। বর্তমানে বড়োরা আধুনিক ভাবনায় এগিয়ে চলেছে। যান্ত্রিক সভ্যতাকে এই জাতি সাদরে গ্রহণ করেছে। কম্পিউটার চালাতে শিখছে এবং শিক্ষায় এগিয়ে গিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে দেখা যাচ্ছে। বড়োরা বর্তমানে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় গৃহনির্মাণ করছে। প্রায় সকল পরিবারেই শিক্ষার আলো প্রবেশ করেছে। আজ আর বড়োরা জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষি, শিকারের উপর নির্ভর করে বসে নেই। বর্তমানে বড়োদের মধ্যে মানসিক ভাবে, শারীরিকভাবে, বাহ্যিকভাবে অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে।
কিন্তু, দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, আজ বড়োরা আধুনিক ভাবে শিক্ষিত হতে হতে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি শিখতে ও বলতে ভুলে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বড়ো মাধ্যমের কোন বিদ্যালয় না থাকায় অন্যান্য ভাষায় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে গিয়ে পিতা-মাতা আজ আর নিজেদের ভাষা শেখাতে চাইছেন না। এটা বড় চিন্তার বিষয়। কেননা, এইভাবেই যদি চলতে থাকে তবে হয়তো ভবিষ্যতে বড়ো ভাষার অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হবে। আজকাল বড়োরা তাদের প্রাচীন ধর্ম বাথৌ ধর্মের উপর বিশ্বাস না রেখে বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে। আজ আর বড়োদের মধ্যে পূর্বের মত মাছ ধরতে, শিকার করতে, চাষআবাদ করতে গিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে তাদের নৃত্য-গীত করতে দেখা যায় না। আধুনিক সভ্যতার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে বড়ো সমাজের নিজস্ব কৃষ্টি কালচার হারাতে বসেছে।
পরিশেষে বলতে হয়, আধুনিক ভাবে বাঁচার অধিকার সকল মানব জাতিরই আছে, তবে আধুনিক শিক্ষার আলোর পিছনে দৌড়তে গিয়ে নিজের মাটিকে ভুলে যাবার কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। মাটি আঁকড়ে ধরেই আকাশের চাঁদের স্বপ্ন দেখা বাস্তব সম্মত। আজ পিতা-মাতাই পারেন বড়ো সমাজকে বাঁচাতে তাদের সুসম্মত শিক্ষার দ্বারা। কেননা, মাতাপিতার কাছেই সন্তানের প্রথম শিক্ষা হয়ে থাকে। যদি মানুষ নিজের মাতৃভাষাকে সঙ্গে নিয়ে একাধিক ভাষায় শিক্ষিত হয় তবে তার সাথে সাথে নিজের ভাষাও সমৃদ্ধ হয়, কিন্তু যদি নিজস্ব ভাষাকে হারিয়ে দিয়ে একাধিক ভাষাকে গ্রহণ করে তবে সেই ভাষা, সেই মানবজাতি সময়ের নিয়মে হারিয়ে যায়। শেষে, কবি এবং লেখক শ্রদ্ধেয় শ্রী রমেশ চন্দ্র সুবার কয়েকটি পঙতি দিয়ে আমার লেখায় ইতি টানতে পারি —
‘‘এছে খৌজাং, মা এছে গৌদৈ বিমানি রাওআ।
যৌয়ংদৌ ফিসাখৌ বড়ো বিসা বিফাফৌর আ।।
জাই বাহৌহয়া বড়ো রাও, বড়ো হারিমুখৌ।
বড়োনি ছিনায়যি গেজায়া বুঙৌ বিঘৌ।।’’