অরণ্যজীবি শবরসমাজ প্রকৃতির পূজারী। আকাশ, বাতাস, পাহাড়-পর্বত, অরণ্য, দিক, কিছু বৃক্ষ এবং জঙ্গলের পশু এদের আরাধ্য দেবতা। প্রকৃতির সাথে জীবন সংগ্রামে নিরাপত্তার কথা ভেবে ভয় ও ভক্তিতে প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ এদের দেবতা হয়েছে। বিশ্বাস থেকে ধর্ম ও বিভিন্ন প্রথাচার তৈরী হয়েছে।
সহজিয়া বৌদ্ধ সাহিত্য সম্ভার ‘চর্য্যাপদে’ দেবী পর্ণ শবরীর কথা বলা হয়েছে। ইনি ব্যাঘ্রচর্ম ও বৃক্ষপত্র পরিহিতা, যৌবন রূপিনী, বজ্রকুন্ডল ধারিনী; এবং পদতলে তিনি অগণিত রোগ ও মহামারী মাড়াইয়া চলেন। ধ্যানেই বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি ডাকিনী, পিশাচী এবং মারী সংহারিকা। মনে করা হয় যে, আদিতে তিনি শবরদেরই আরাধ্যাদেবতা ছিলেন; পরে কালক্রমে তাঁর পরিচয় হল ‘সর্ব-সবরানাম্ ভগবতী’।
বাঙ্গালীর ইতিহাস-এ ডঃ নীহার রঞ্জন রায় শবরগণের প্রসঙ্গে— ‘‘বাঙ্গালীর আদি ধর্ম’’-তে লিখছেন — মনসার সাথে নাম করিতে হয় জঙ্গলবাসী, শবর কুমারী রুপিনী বৌদ্ধ জোঙ্গলী-দেবীর। এই দেবী বীনাবাদয়িত্রী এবং মনসার মত তিনিও সর্পবিষ মোচয়িত্রী। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, বৈদিক সরস্বতীও অন্যতম রূপে সর্পবিষ মোচয়িত্রী এবং সেক্ষেত্রে তিনিও শবর কন্যা।
বজ্রযানী বৌদ্ধ সাধনায় শবরদের যে একটা বিশেষ স্থান ছিল, চর্য্যাগীতির অনেকগুলি গানই তার প্রমাণ।
কথিত আছে “নীলমাধব” ছিল জারা শবর বংশের দেবতা এবং তাকেই সকল দেবতার শ্রেষ্ঠ বলা হত। শবরেরা তাঁকে ‘জগনাইলো’ - বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের অধীশ্বর বলত এবং উড়িষ্যার শবর গ্রামে এখনও এই জগনাইলো নামই ব্যবহার করা হয়। সম্ভবতঃ জগনাইলো থেকেই জগন্নাথ নামের প্রচলন হয়েছে।
(এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে বর্তমানে আমরা পুরুলিয়ার শবর জাতির লোক বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করি)
শবরজাতির লোক বিশ্বাস-দেবদেবী, পূজাপার্বন— ১লা মাঘ শবরদের বছর শুরু এবং এটাই এদের প্রধান ও প্রাচীন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘‘আখ্যান’’ বা ‘‘এখ্যান যাত্রা’’। প্রত্যেক শবর পরিবারের আঙ্গিনাতে (উঠোনে) মাটির তৈরী চৌকো একটি মঞ্চ বা থান থাকে। তার সামনে বসে প্রতি শবর পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ ঐ দিন সকাল থেকে উপবাসে আরাধ্য দেবতা, অপদেবতা, পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে মোরগ বলি দেন এবং শবর রীতি অনুযায়ী পূজা-অর্চনা করেন। ঐখানেই বলির মোরগটা কেটে, চালগুড়ি দিয়ে পিঠে তৈরী করে তা প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করে, উপবাস ভঙ্গ করে। সারাদিন ধরে সকলে মিলে উৎসব পালন করে। ঐদিন সকলেই একটু হলেও কোনো কাজ শুরু করে যথা ক্ষেতে মাটি কাটা, নতুন ঘরের ভিত খোঁড়া প্রভৃতি। এটা নতুন কাজে নামার শুভদিন হিসাবে বিশ্বাস করে।
কালিপূজার সময় বাঁধনাপূজা করে। এই পূজাকে ‘গরয়া’ বা ‘গুসাই রায়ও’ বলে। কালিপূজার কিছুদিন আগে থেকেই ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করে দেওয়াল-মেঝেতে নতুন মাটি ও গোবরের প্রলেপ দেয়া, বাইরের দেওয়ালে প্রাকৃতিক রং দিয়ে নানা ফুল, নক্সা আঁকে।
এছাড়াও শবররা এলাকা ভিত্তিক গ্রামে গ্রামে নানান প্রাকৃতিক দেব-দেবীকে পূজা করেন—পাহাড়দেবতা, দলমা, ধারবুরু, বাঁকুয়া, ধেনকুয়া, পোড়াপাহাড়, বুড়হা-বুড়হী-পাহাড়, খুনডুংরি, রাইগোঁসাইয়ের থান। আবার এলাকা ভিত্তিক শবর গ্রামের বাইরে বেশ কিছু গাছ এবং গাছ-এর জায়গাটিকে এরা ‘গরাম’ থান বলে। এইসব থানে শবররা পায়রা, মুরগী বলি দেয়, নিজের নিজের মানসিক ব্রত অনুযায়ী। নতুন ঘরের চালা তৈরীর সময় প্রথম খোলা বা টালি একটা গরাম থানে উৎসর্গ করে। এরা বিশ্বাস করে তাহলে ঐ ঘরে কোন বিপদ হবে না, গরাম দেবতা রক্ষা করবে।
আবার পশুকেও এরা পূজা করে, তাকে ‘বাঘুত’ পূজা বলে। অনেক শবর পরিবারের উঠোনে এই ‘বাঘুৎ থান’ আমি দেখেছি। অকড়বাইদ্ গ্রামে অর্জুন শবরের উঠোনে চার পা মেলা বাঘের মূর্তি আছে, যা অর্জুনদা এবং তার বংশের বড়রা এখানে পূজা করে। শবর সমাজে এই লোকবিশ্বাস আছে যে, ‘বাঘুত’ পূজা করলে পশু থেকে কোন আঘাত বা পশুদ্বারা অপমৃত্যু হবে না।
একই গোত্রে এদের বিবাহ হবে না। তবুও ভালোবাসা করে বিবাহ করলে “তেপথে গিয়ে তীর দিয়ে দাগ কেটে অলক্ষণ কাটান করা হয়, নচেৎ অপঘাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কারও মৃত্যু হতে পারে এই বিশ্বাস আছে।
জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু প্রতিটি ক্ষেত্রে লৌকিক-অলৌকিক বিশ্বাসে বিভিন্ন স্ত্রী আচার ও নিয়মানুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে।
অন্তঃসত্ত্বা নারীর সন্ধ্যাকালীন সময়টা অপদেবতার ভয়ে বাইরে একা না যাওয়া। সাধভক্ষণ করা। সন্তান জন্মানোর পর ৯ দিনে নখ, চুল, দাড়ি কাটা, স্নান করে শুদ্ধ হওয়া।
বিবাহের লগনধরা থেকে শুরু করে ছামড়া-ভাসান পর্যন্ত নানা আচার অনুষ্ঠান পালন করে। বিবাহে তীর-ধনুক, টাঙ্গী, তাবলা, তরোয়াল, কাজল, সিন্দুর, আতপচাল, সিধা, মহুল গাছের ডাল ব্যবহার প্রতিটি ক্ষেত্রে কোনো মন্ত্র নয় গানের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়।
মৃত্যুতে বর্তমানে শবরেরা মৃতদেহ কবর দেয়, আবার কোথাও কোথাও জ্বালানোও হয়।
কালিকা পুরাণে শারদীয়া দুর্গা পূজার দশমী তিথিতে ‘শবরোৎসব’ নামে এক উৎসবের পালন হয়।
নৃতত্ত্ব পন্ডিত শ্রী অতুল কৃষ্ণ শুর মহাশয় ১৯-০৬-১৯৮৬-র বর্তমান পত্রিকায় সপ্তম পৃষ্ঠায় বাঙ্গালী সভ্যতা কতো প্রাচীন প্রবন্ধে বলেছেন, যে প্রাচীনকালে আদিবাসীদের (শবর) সভ্যতা এতো প্রভাবশালী ছিল যে, আজকের দিনেও ব্রাহ্মণ শাসিত সমাজ সে প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দুর্গাপূজার সহিত সংশ্লিষ্ট নব পত্রিকার পূজা, চড়ক, গাজন, লক্ষ্মী পূজার ঝাঁপি, বৃক্ষপূজা, বৃষকাষ্ঠ, আনুষ্ঠানিক কর্মে কলা, হরিদ্রা, সুপারি, পান, সিন্দুর ঘট, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, আলপনা, গোময় প্রভৃতির ব্যবহার অষ্ট্রিক ভাষাভাষী গোষ্ঠী তথা শবর লোকাচারের দান। হিন্দু দেব-দেবীকে এরা মেনে চলছে।
চৈত্র-বৈশাখে শিবপূজা, গাজন, ভক্তা হওয়া। শ্রাবণ মাসে মনসা পূজা, আশ্বিন-কার্তিক মাসে কালীপূজার রাত্রে অমানিশি জাগরণ পালন, পরের তিনদিন বাঁধনা পরব যা গরুর বিয়ে এবং গরুকে খুঁটিতে বেঁধে গরু খুঁটা করা হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে মকর পরবে টুসু ঠাকুরকে চৌত্তলে করে নদীতে বা পুকুরে ভাসিয়ে চান করা, পিঠে খাওয়া উৎসব পালন প্রভৃতি মেনে চলার কারণে অরণ্যজীবি শবররা অরণ্য হারিয়ে আরণ্যক লোকাচার হারাতে বসেছে।
শবররা ডাইনি বিশ্বাস করেন না তবে এখনও কিছু কিছু গ্রামে রোগ ব্যাধি সারাতে ঝাড়ফুঁক-এর প্রচলন আছে।
শবর জন্ম-সংস্কার — শবর মহিলা অন্তঃসত্ত্বা হলে নানারকম বিধিনিষেধ পালন করতে হয়। ঐ নারী সংসারে সমস্ত কাজ করলেও সন্ধ্যাকালীন সময়টা তাকে একা বাইরে যেতে দেয় না- অপদেবতার ভয়ে। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সাত মাস বা নয় মাসে সাধ খাওয়ানো হয়। এই অনুষ্ঠানে সাধ্যমতো মহিলার চাহিদানুযায়ী ভালো খাবার খেতে দেন। পারলে নতুন কাপড়ও দেওয়া হয়। স্ত্রীর বাপের বাড়ীর লোকেরাও এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয় ও সাধ খাওয়ায়।
প্রসব করার পর নাড়ীচ্ছেদনের কাজটা যাকে ‘ধাই বুড়হি’ বলে তা শবর সমাজেরই কোন কোন বৃদ্ধ করে থাকেন। বাঁশের ছিলা, ঝিনুক, মসৃণ পাথর দিয়ে আবার বর্তমানে নতুন ব্লেড দিয়েও নাড়ি ছেদন করে থাকেন। এটাকে ‘লাড় কাটা’ বলে। তিনদিন ধরে ‘ধাই বুড়হি’ আগুনে, বাচ্চা ও প্রসূতি মাকে সেঁক দেয়। তিনদিনের দিন আগুনের ছাইগুলি একটি ভাঁড়ে ভরে বাড়ির একটা পুরোনো ঝাঁটাতে ঝাঁট দিয়ে বাড়ির দূরে কোন ঝোপ-ঝাড়ে রেখে আসে একে ‘পাঁসবাড়া’ বলে। সেদিন থেকে বাড়ির অন্যরাও বাচ্চা এবং প্রসূতিকে ছুঁতে পায়। সাত বা নয় দিনের দিন ভোরবেলায় ছেলের বাবা এক ঘটি জল পুকুর বা নদী থেকে নিয়ে এসে নিজের বাড়ির থানে রাখবে। প্রথমে দাদু বা দিদিমা একটা মুরগী বলি দেয় ধর্ম ঠাকুরের নামে এবং বলে (ছাউ কাঁদাকাঁদি না করয়, কুককুর পূজা দিতনু)। ঐ দিন শিশুটিকে ও প্রসূতিকে চান করিয়ে শুদ্ধ করা হয় যাকে এরা ‘গাধা’ বলে। ছটি গোটা আতপচাল, দূর্বাঘাস, কাজল, মেথি ও সিন্দুর নিয়ে ঘটির জলে ফেলে দেখা হয় তা ডুবছে কি না—যদি চালগুলি ডুবে যায় তাহলে শিশুর জলে ডোবার ভয় থাকে। স্নান হয়ে যাবার পর প্রসূতি নিজে শিশুর বাঁধা নাড়ীটি নিয়ে পুকুরের জলে পুঁতে আসে। ঠাকুমা সম্পর্কের কেউ শিশুটিকে স্নান করিয়ে শুদ্ধ করে শিশুর বাবার কোলে দেয়। শিশুর বাবা ঘরের ভিতর থেকে দরজার কাছে শিশুটিকে নেয়। ঐ দিন সকলে নখ, চুল, দাড়ি কেটে শুদ্ধ হয়।
জন্মের একুশ দিনে আবার সকলে নখ কেটে স্নান করে শুদ্ধ হয়। সেদিন শিশুটির নাড়ির তিনদিকে লোহার দা গরম করে ছুঁইয়ে দেয়। এটাকে দাঁ-চিনহি বলে, সামর্থ অনুযায়ী বাড়ীতে ভোজ হয়।
শবর বিবাহ সংস্কার — শবর ভাষায় বিবাহকে “বিহা” বলে। শবরদের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে বিহা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। পাত্রপক্ষ বা আত্মীয়-স্বজনদের থেকেই সর্বপ্রথম বিহার প্রস্তাব পাত্রীপক্ষের বাড়িতে যায়। একই গোত্রে এদের বিবাহ হয় না তবুও ভালবাসা করে বিয়ে করলে তেপথে গিয়ে ‘তির’ দিয়ে দাগ কেটে অলক্ষণ কাটান হয় নচেৎ অপঘাতে কারও মৃত্যু হতে পারে এই বিশ্বাস আছে। বিবাহের পর মেয়েরা স্বামীর গোত্রের অধিকারী হয় এবং সেই অনুযায়ী সেখানকার সামাজিক নিয়ম মেনে চলে। শবর সমাজে বর্তমানে তিন রকম বিবাহের চল আছে, — ‘বিহা’, ‘সাংহা’ এবং ‘ভনবাসা বিহা’। নৃতাত্ত্বিকদের বিবরণ থেকে আর এক বিবাহের প্রথা জানা গেলেও বর্তমানে শবর সমাজ থেকে তা লোপ পেয়েছে তা হল—‘শিকার বিহা’।
‘বিহা’তে বরপক্ষকে কন্যা-পণ দিতে হয়। পাঁচ শিকা, দেড় টাকা থেকে বর্তমানে একশত থেকে দুশো টাকাতে দাঁড়িয়েছে। এই ‘বিহা’ ধুমধামের সাথে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদের কোনো শাস্ত্রীয় মন্ত্রপাঠ বা পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না কিন্তু প্রতি আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গান ও নাচ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কথাবার্তা আদান-প্রদান ও কন্যাপণ ঠিক করার জন্য আত্মীয়র সাথে মেয়ের বাড়িতে পাত্রপক্ষের অভিভাবকেরা যান এবং পাকা কথা সেরে ফিরে আসেন। দিন দেখে পাত্রীপক্ষের লোকেরা পাত্রপক্ষের বাড়িতে যান যাকে ‘লগনধরা’ বলে। এখান থেকে শুরু হয় মেয়েদের সমবেত হয়ে গান গাওয়া। পাত্রের বাড়ি থেকে মহুল পাতা ভাঁজ করা এবং পাত্রীর বাড়ি থেকে আমপাতা ভাঁজ করা, যতদিন পরে বিয়ে হবে ততগুলি বাঁশের কুচি বেঁধানো নিয়ে পাত্রীপক্ষ ফিরে এসে বাড়িতে আলপনা দেওয়া বাগুর থানে তা রাখে— মেয়েরা সমবেত হয়ে পাত্রীর মনের ব্যথার কথা গান গেয়ে শোনায়—
সূর্য অস্ত যাবার লগ্নে দুই বাড়িতেই একটি থালায় করে ধান-দুর্বা উলুধ্বনি করে সব মেয়েরা এই ‘লগন বাঁধা’ ঘরের ভিতরে নিয়ে যায়। এই অনুষ্ঠানকে বলে, “লগন চুমানো”। মেয়েরা গান ধরে এইসময়।
এরপর থেকে বিহার দিন পর্যন্ত পাত্র-পাত্রীকে প্রতিদিন তেল-হলুদ মাখানো হয় এবং দিনে ১টি করে বাঁশের কুচি লগন বাঁধা থেকে খুলে পাতার অন্য জায়গায় বিঁধে রাখা হয়। এই লগন বাঁধা নদী অথবা পুকুরের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। হলুদ কোটা ও হলুদ মাখানোর সময় গান গাওয়া হয়।
পাত্রীর জামাইবাবু রোদের মধ্যে উঠোনের ছামড়াতলায় আলপনা দিচ্ছে তাকে মসকরা করে গান গাওয়া হয়।
বিহার দিন সকালবেলা দুই বাড়িতেই ছামড়া তৈরী করা হয়। চারটে শাল খুঁটি দিয়ে শাল, আম, জাম পাতা দিয়ে ছাউনি তৈরী করা হয় উঠোনের মাঝখানে। মহুয়া এবং সিধা গাছের ডাল মাঝখানে পুঁতে তার সামনে আলপনা দেয়, তাকেই ‘আঁইখ পুরিম’ বলে। মেয়েরা গান গাইতে গাইতে আলপনা দেওয়া শেষ করে।
বাড়ির দরজায়, উঠোনে এবং সদর দরজার রাস্তায় আমপাতা সহ ডাল, বনের ফুল, শালুক ফুল দিয়ে বনমালা তৈরী করা হয় যা আমড়ী বা খড়ের দড়ি দিয়ে টাঙানো হয়। এই বনমালা মঙ্গলের চিহ্ন। বর্তমানে ফুল ছাড়াও রঙিন কাগজও বনমালা হিসাবে টাঙানো হচ্ছে। বরকনের বাড়িতে পাত্র-পাত্রীকে ছামড়া তলায় খেজুর পাতার চাটাইয়ে বসিয়ে সামনের দিকের মাথার পাঁচটা চুল বেছে, ঐ চুলে আস্তে আস্তে সরষের তেল ঢালা হয়। চুল চুয়ে প্রথম তিন ফোঁটা তেল মাটিতে পড়তে দেবে, পরের তিন ফোঁটা তেল পাত্র-পাত্রীর হাতে পড়লে সকলে মিলে ‘হরিবোল’ বলে পাত্র-পাত্রীর মাথায় দিয়ে দেয়। এই আচারটি দুইপক্ষের দাদুরা ও জামাইবাবুরা করে থাকে। একে বলা হয় “চুড় বাছা”। এরপরে দুই বাড়িতেই বৌদি শুরু করে সারা শরীরে তেল হলুদ মাখাতে। একে একে সকলে ঐ তেল হলুদ মাখায়, কেউ কপালেই শুধু দেয়, সম্পর্ক অনুযায়ী এই আচার চলে, একে “গাঁইডা হুড়িৎ” বলে। গানের সঙ্গেই চলতে থাকে এই গায়ে হলুদ মাখানো।
“গাঁইডা হুড়িৎ” শেষ হলে দুই বাড়িতেই পাত্র-পাত্রীকে স্নান করিয়ে “গাধলু ধয়িচ” আচার করে ঘরের ভিতর নিয়ে যায়। বিহার পরবর্তী অনুষ্ঠানের জন্য মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বৌদি এরপর আকন্দ ফুলের মালা পরিয়ে দেয়, গান হয় — ‘ফুলের মালা পিরসনারে রয়না যাবেক জাতের কুল।’
বৌদি সম্পর্কের দুজন বিবাহিত স্ত্রীলোক দুটি মাটির কলসী কাঁখে নিয়ে পুকুর বা নদীর দিকে অন্য স্ত্রীলোকদের সাথে যায়, সামনে সামনে কয়েকজন তীর ধনুক, টাঙ্গী, তাবলা বা তরোয়াল, কাজল, সিঁদুর, আতপচাল, দুর্বা, মেথি ও ডিম নিয়ে যায়। কলসীর মুখ কাপড়ে ঢাকা থাকে, গান গাইতে গাইতে মহিলারা সহ বাচ্চারা যায় আনন্দ করতে করতে এবং ঘাটে পৌঁছে প্রথমেই “পাঁড় মাকর” পূজা করে জল নেওয়ার অনুমতি নেওয়া হয়। সঙ্গে থাকা দুর্বা ও সামগ্রী দিয়ে পূজা সমাপ্ত হলে কলসীতে জল ভরে উলুধ্বনি দিয়ে ফিরে এসে ছামড়া তলায় যেখানে ডাল গাড়া হয়েছে সেখানে রেখে দেয় এবং মেয়েরা নাচতে থাকে এবং অভিভাবকের কাছে কিছু পাওনা দাবী করে, এই আচার অনুষ্ঠানকে “পাঁড় সওয়া” বলে। পাত্র-পাত্রীর মা বা বৌদি মেয়েদের হাতে চিড়ে, গুড় পারলে মিঠাই দেয়। এরপর পাঁচজন বিবাহিত পুরুষ পাঁচটি শালপাতায় বসে এবং তাদের মাঝে বৌদি একটা শালপাতায় একটি সুপারী, ভেজা আতপচাল, সুতোতে গোটানো বাঁশের তৈরী লাটাই দেওয়া হয়। এরা তীরের সাহায্যে সুপারীটা ছিদ্র করে এবং পাঁচজন মিলে পৈতে তৈরী করতে থাকে। এদিকে পাত্র-পাত্রীর জামাইবাবু-বৌদি ঘরের ভিতর থেকে কোলে করে বা হাত ধরে বাইরে এনে যেখানে কলাপাতার উপরে তীর গাঁথা এবং জোয়াল রাখা আছে সেখানে দাঁড় করায়। পাত্র-পাত্রী জোয়ালের উপর পা রেখে বসে। শালপাতার থালাতে সিঁদুর রাখা থাকে, সেই সিঁদুর মাটিতে, কলাপাতায় ও তীরে তিন ফোঁটা করে দেয় এবং কোলাকুলি করে। কলাপাতা ও তীরকে প্রথম বিয়ে করা হয়।
পাত্র-পাত্রী উঠে দাঁড়ালে জামাইবাবুর হাতে জলভর্তি ঘটি ও আমপল্লব ও শালপাতা থাকে তা মাথায় রেখে তিনদিকে জল ঢেলে দেয় এবং সকলেই উলুধ্বনি ও গান করে পাত্র-পাত্রী আবার ঘরের ভিতর চলে যায়। বৌদি কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বের করে আনে, জামাইবাবু চোখ টিপে ধরে পৈতে তৈরী করে পাঁচজন গোল করে দাঁড়িয়ে থাকে, তার উপর থেকে এবং নীচ থেকে ঢোকে ও বার হয়, ভিতরে এলে পাঁচজনে মিলে পৈতে পরিয়ে দেয়। আবার গান শুরু হয়।
পায়ের কড়ে আঙুল থেকে কান পর্যন্ত সাত নতি সুতো লাটাই থেকে নিয়ে বাঁধা হয়। তারপর সেই সুতোতে তেল হলুদ মাখিয়ে একটি আমপাতা-মহুলপাতায় আতপচাল, দুর্বাঘাস দিয়ে ডান-বাম হাতে বেঁধে দেয়, একে “কাঁকন বাঁধা” বলে। এরপর দুই বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া পর্ব শুরু হয়। প্রতিবেশী বা বাড়িতেই পাত্র-পাত্রী খায়। একে “থুবড়া পেজ খাম” বলে। অর্থাৎ আইবুড়ো ভাত খাওয়া। গানের শেষ নেই, চলতেই থাকে... এবারে বিহা করতে যাওয়া। বরের পোষাক পরে গলায় আকন্দ ফুলের মালা পরে পাত্র বাবার কোলে বসে, বাবা বসে ঘরের চৌকাটে। ছেলের হাতে তিনটি আমপাতার বোঁটা দেওয়া হয়, ছেলে বোঁটাগুলি এক এক করে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে বাবাকে দেয়, বাবাও তিনবার চিবায় এবং তিনবার জিজ্ঞাসা করে “ফুৎক কুথি যাবাক”? ছেলে তিনবার উত্তর দেয়, “কামিড় আনত যামি”। ছেলের দুই হাতে চাল দেওয়া হয়। ছেলে তার চাল মাথার উপর দিয়ে পেছনে ফেলে, মা থাকেন পেছনে তিনি তার আঁচলে সেই চাল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন। এবারে জামাইবাবু ছেলেকে কোলে করে বা হাত ধরে বাইরে গ্রাম দেবতার কাছে নিয়ে যায়। এসময় বরযাত্রী সকলে থাকে এখানে দাঁড়িয়ে। পাত্র প্রাকৃতিক গ্রাম দেবতা, পাহাড়, গাছ, নদী-নালাকে প্রণাম করে কনের বাড়ীর দিকে যাত্রা করে। পাত্রপক্ষরা বাজনা বাজাতে বাজাতে পায়ে হেঁটে স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে কনের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে অপেক্ষা করে, এখানে বরযাত্রীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ দুটি শালপাতায় সিঁদুর দিয়ে নখে করে একটু ছিঁড়ে। সকলেই একটু করে ছিঁড়ে এবং ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যায়। এর কারণ দুষ্টু আত্মাকে আর সাথে আসতে দেওয়া হয় না। কনে বাড়ির কাছে এলে সেখান থেকে মেয়ের বাবা বা বড় কেউ এসে পাত্রদের সাথে আনা শালপাতার ঠোঙায় চাল, চিড়ে, হলুদ থাকে, যাকে “ফাঁবড় হাঁড়ি” বলে। এটা নিয়ে বরকর্তার সাথে কোলাকুলি করে ফিরে যায়। এরপর মেয়েরা গান করতে করতে আসে এবং ছেলে ও বরযাত্রীদের ছামড়া তলায় নিয়ে যায়। এখানে মেয়ের বাবা একটা ঘটিতে জল, আমপল্লব নিয়ে বরের মাথায় জল ছিটিয়ে দেয়। বরও মেয়ের বাবার মাথায় আমপল্লব দিয়ে জল ছিটায়। এবারে বরের মাথায় সুপারী ছোঁয়ানো হয় একে “গুয়াটিকা” বলে।
এ সময় মেয়েরা গানের মাধ্যমে মসকরা করে এবং কৌতুক করে। পাত্রর সাথে পাত্রীর ভাই (শালা)-এর কোলাকুলি হয়, পাত্র শালার মাথায় গামছা বা ধুতি জড়িয়ে দেয়। এরপর প্রতীকী পাত্রকে তেল-হলুদ ছোঁয়ানো হয়। কাপড়ের উপরে বসিয়ে বা হাতে করে পাঁচজন মিলে পাত্রীকে ঘর থেকে ছামড়া তলায় পাত্রের কাছে তুলে নিয়ে আসে এবং ছামড়া তলায় ঘুরতে থাকে, পাত্রও পেছন পেছন তিনবার ঘোরে। এরপর পাত্র-পাত্রী সামনা সামনি নিজের নিজের বাবা বা অভিভাবকের কোলে বসে, কনের মুখ শাড়ীর আঁচলে ঢাকা এবং দাঁত দিয়ে চেপে রাখে। পাত্র সেই ঢাকা আঁচল খুলে দেখে। আঁচল সরানোর পর বর মাটিতে তিনবার সিঁদুর ছোঁয়ায় কনেও তাই করে। বর ডান হাতের কড়ে আঙুলে সিঁদুর নিয়ে কনের কপালে ছোঁয়ায়, কনেও বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে নিয়ে বরের কপালে ছোঁয়ায়। এরপর বর বেশী সিঁদুর নিয়ে কনের কপাল থেকে সিঁথির উপর সিঁদুর ঘষে দেয় —এদিকে মেয়েরা গান করে — এরকম পর পর বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান চলতে থাকে— বর-বউ তিনবার উঠবোস করে। এরপর মেয়ের মা-কাকিমারা থালায় সাজানো প্রদীপ, ধূপ, ধান, দুর্বা, গোবর, আতপচালের মণ্ড এবং কাঁঠাল পাতা নিয়ে আসে। কাঁঠাল পাতা দুটি প্রদীপের শিখায় ঠেকিয়ে মেয়ে জামাইয়ের গালে ঠেকায় এবং একটা নিজের মাথা দিয়ে পেছনে এবং অন্যটি মেয়ে-জামাই-এর পেছনে ছুঁড়ে দেয়। পাত্র-পাত্রীকে তিনবার আকন্দফুলের মালা বদল করানো হয়। ছামড়া তলায় মেয়ে-জামাইকে গুড় জল খাওয়ায় মেয়ের মা-কাকিমা, জলধারা দিয়ে ছামড়া ঘোরায় মেয়ের বাবা-মা এবং কোলে নিয়ে নাচ করে মহা আনন্দে, এতে অনেকেই নাচে ও আনন্দ করে। এরপর বাবা-মা কোলে করে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে চাটাই-এ বসতে দেয় এবং দুজনকে খাবার দেওয়া (চিড়ে-গুড়) হয় — একে অপরের পাতায় চিড়ে গুড় তিনবার দেয়। এবারে মেয়ের মা-বাবা পাত্রর মান ভাঙায় ধুতি বা কোনো দ্রব্য দিয়ে। উঠোনে এই সময় বাজনা-বাদ্যি নিয়ে নাচ শুরু হয়। এতে দুপক্ষের লোকেরাই নাচে।
এবারে বরপক্ষ-কনেপক্ষ মহানন্দে ভোজ খাওয়া হয়। ভোর হতেই বিষাদের পালা কনে বিদায় পর্ব শুরু হয়—
যথারীতি মেয়েকে তার বাবা শুধায় “মুনু কুথি যাবাক”? মেয়ে উত্তর দেয় “কামিড় খাটিত যাম” এরকম তিনবার বলে। নববধূ ও বরকে নিয়ে যাত্রা করার আগে বরের ডান হাতের চেটোর উপর বধূর হাত রাখে এবং দুটি শর কাঠি আঙ্গুলের ফাঁকে তিনবার ঢোকানো হয় এবং পাত্রপক্ষ গোত্র জিজ্ঞাসা করে, দুপক্ষই তাদের গোত্র বলে সামনের গাছের দিকে তাকায়। যদি ঐ সময় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে তবে বুঝতে হবে এই বিয়েতে কোনো দোষ হয়েছে। ডাল না ভেঙে পড়লে বিহা ঠিক হয়েছে। বর-বধূকে ছেলের বাড়ি একই রীতিতে বরণ করে নেয় এবং শুরু হয় বৌ-ভোজের তোড়জোড়। শবর সমাজে বিবাহের আচার-অনুষ্ঠানগুলি বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় “আরণ্যক সভ্যতা”কে তারা কতো নিবিড়ভাবে ধরে রেখেছে। আবার শবর সমাজে একাধিক বার বিবাহের প্রচলন আছে, অবশ্য বিশেষ কোনো কারণ (যথা-সন্তান না হওয়া) ছাড়া এক স্ত্রী বর্তমান থাকতে কোনো শবর পুরুষ পুনরায় বিবাহ করে না। বিধবা, বিপত্নীক, বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছে এমন স্ত্রী-পুরুষ নিজেদের পছন্দমত পুনর্বার বিবাহ করে। সেই বিবাহকে “সাঙ্গা” বলে। প্রথম বা দ্বিতীয় বিবাহের পর মৃত্যু বা ছাড়াছাড়ি হলে নারী বা পুরুষ স্বাধীনভাবে জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে তার সাথে সংসার করতে পারে। সেখানে শবর সমাজের কোনো বিধিনিষেধ নেই। এই বিবাহগুলি শবর সমাজের উদারতার এক দৃষ্টান্ত। এক গোত্র বা ভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে ভালবাসা করে বিবাহ করলে সমাজ বাধা দেয় না। কিন্তু সামাজিক কাজের আচারে তাদের অংশগ্রহণ করা মানা। কুমারী মেয়ের সন্তান হয়ে গেলেও সেই সন্তান নিয়ে সে সমাজে স্বচ্ছন্দে বাস করতে পারে। আবার সন্তান সহ কাউকে বিয়েও করতে পারে। সাঙ্গা প্রথা শবর সমাজে “নারী স্বাধীনতা”র এক জীবন্ত উদাহরণ যা আধুনিক সমাজ ভাবতেও পারে না। বিয়েতে পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে সিঁদুর পরানোর রীতির মধ্যে আমরা জানতে পারি যে এই সমাজে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা বিদ্যমান। বিবাহ সংক্রান্ত গোষ্ঠিগত কিছু কিছু অলঙ্ঘনীয় মূল রীতিনীতিতে শবর সহ পুরুলিয়ার বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়, সে সকল ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোষ্ঠির দ্বারা ছোট গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয় না। এ সমস্ত প্রথা খুবই প্রাচীন, যেমন- এক গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ, কন্যাপণপ্রথা, বিবাহ বিচ্ছেদ, বিধবা-পুনর্বিবাহ রীতিনীতি এবং কিছু আরণ্যক সংস্কার। অরণ্যের গোষ্ঠিজীবন ছিল রক্ষণশীল। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও আরণ্যক সংস্কৃতি এখনও টিকে আছে। পাহাড়, নদী, বাঘকে পূজা করা, তীর ধনুক, টাঙ্গীকে পূজা করা এটা অরণ্য- জীবনচর্চার নিদর্শন। এরা গানের মাধ্যমে জীবনের সুখ-দুঃখের কথা ফুটিয়ে তুলে চলতে-ফিরতে গান রচনা করেন।
শবর মৃত্যু ও সৎকার সংস্কার — শবরদের কেউ মারা গেলে, যদি বিবাহিত মহিলা হয় তাহলে তার স্বামী হাতের লোহাটি খুলে নেয় এবং তারপর হলুদ-তেল মাখানো হয়। মৃতদেহটি বাইরে বার করে, যেখানে মারা যায় তার চার কোন থেকে একটু করে মাটি খুঁড়ে ও উনুনের ছাই নিয়ে পুঁটলি করা হয়। এরপর খাটিয়া বা বাঁশে বেঁধে দুজন মিলে শ্মশান-এ নিয়ে যাওয়া হয়। শবরদের মৃতদেহ পোড়ানোও হয় আবার মাটিতে পোতা ও কবর হয়। নিজেদের শ্মশানে নিয়ে এসে একটা লাঠি দিয়ে দেহটি মাপ করার পর ঠিক ঐ মাপের গর্ত খোঁড়া হয়। বিশ্বাস করে গর্তটি তার থেকে বড় করলে ঐ মাপের অন্য কেউ মারা যেতে পারে। তিনটি কেঁন্দ গাছের ডাল আনা হয়। গর্তের মধ্যে বিছানাপত্র পারলে নতুন কাপড়ও পাতা হয়, তার উপর মৃতদেহটি শোয়ানো হয় চিৎ করে। তখন মৃতদেহের শরীরে পুরোনো বা নতুন কাপড়ের কৌপিন শুধু থাকে। এরপর ঐ কেঁন্দ ডাল বা পাতা একটি মাথায়, একটি মাঝে ও একটি পায়ের নীচে দেওয়া হয়। আবার একটা কাপড় ঢাকা দিয়ে, আস্তে আস্তে মাটি দেওয়া হয়। উঁচু করে ঢিপের মতো করে মাটি দিয়ে তার উপরে পাথর, কাঁটা গাছের জাল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, যাতে জীব-জন্তুতে মৃতদেহের কোন ক্ষতি না করতে পারে। শ্মশান যাত্রীরা সকলেই বাঁধ বা নদীতে স্নান করে গাঁইতি কোদাল, কুঠারের বাঁট বা হ্যান্ডেল খুলে ফেলে দেয় এবং নিজের নিজের বাড়ি ফিরে যায়। মৃতের পরিবারের লোকেরা ১০ দিন নিরামিষ খায়। নুন খেলে ভেজে খায়। চান করলেও তেল-সাবান মাখে না। যিনি মুখাগ্নি করেন তিনি দশদিন হাতে একটা যে কোন লোহা নিয়ে থাকেন। লোক বিশ্বাস আছে তাহলে ভূত-প্রেত তাকে ছুঁতে পারে না।
তিনদিনের দিন মৃতদেহটা ঠিক সংরক্ষিত আছে কিনা দেখে তেল-খৈইল করা হয়। পাঁচ দিনের দিন শ্মশানযাত্রীরা একটি মুরগী নিয়ে পুকুরে বা নদীর পাড়ে সকলে বসে এবং কাঁধে একটু করে আতপ চাল রাখে। যিনি মুখে আগুন দিয়েছেন তিনি মুরগীটি হাতে নিয়ে প্রত্যেকের কাঁধের আতপচালগুলি খাওয়ান এবং তারা প্রত্যেকে কেন্দ ডাল নিয়ে মুরগীটাকে ছোঁয়ায় এবং শেষে মুরগীটাকে আছড়ে মেরে দিয়ে ছাল ছাড়িয়ে পুড়তে দেয়। মুরগী পোড়া ও মদ খেয়ে চান করে আত্মীয়রা বাড়ি ফেরৎ যায়। ঘাট থেকে ফেরার পথে কোন কাঁটাযুক্ত ডাল, কাঁটা বেগুন, বাবলা কাঁটা ভেলা রেখে দেয় ও আগুনে সবাই পা সেঁকে তাপ নিয়ে বিপদমুক্ত হয়ে আসে। যদি সামর্থে কুলায় তো সকলেই ঐ বাড়ীতে সেদিন ভাত খায়।
দশদিনে সকলে ঘাটে উঠে অর্থাৎ পুকুর বা নদীর ঘাটে একটি গর্ত করে সেখানে একটি করে শালদাঁতন দিয়ে স্নান করে সকলেই ঘাটে উঠে।