প্রাক-বৈদিক প্রাচীন ভারতের আদিযুগে আদিম জনগোষ্ঠীর মানুষজন তৎকালীন পরিবেশ পরিমণ্ডলের মধ্যে বসবাস করে সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল জীবনধারা তথা এক প্রাচীন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন। বৃহৎ শবর গোষ্ঠী তাঁদের অন্যতম। কালের প্রবাহে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে দ্বন্দ্বে ও আক্রমণে তদুপরি জীবিকার টানে শবরগোষ্ঠী খণ্ড খণ্ড হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থানগত ভৌগোলিক পরিবেশ পরিমণ্ডল বিভিন্ন স্বগোষ্ঠীর মানুষজনদের জীবন জীবিকার উপর গভীর প্রভাব ফেলতে থাকে। ভাষা, বিশ্বাস, সামাজিক নানা প্রথা, আচার আচরণে ভিন্ন ভিন্ন বিবর্তন দেখা দেয়। একই শবরগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন শাখা-প্রশাখাগুলি বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়ে যায়।
     Austro-Asiatic কোলগোষ্ঠীর এই ভারতীয় বৃহৎ শবর গোষ্ঠীর একটি শাখা হল বর্তমানের লোধা-শবরগণ যাঁরা এখন আদিম আদিবাসী হিসাবে সরকারের গণ্য। এই লোধা-শবরগণের বসবাসের একটা প্রধান অঞ্চল হল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পশ্চিম মেদিনীপুর, উড়িষ্যা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পূর্ব সিংভূম জেলা। প্রাচীন পুঁথিপত্র প্রভৃতিতে যথা ঋকবেদ, ব্রাহ্মণ, কথাসরিৎসাগর, রামায়ণ, মহাভারত, কাদম্বরী ও হর্ষচরিতে শবরদের পরিচয় মেলে। তাঁরা যে যথেষ্ট স্বাধীনচেতা ও পরাক্রমশালী ছিলেন তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য ভাণ্ডারে।
    লোধা-শবরদের উৎস অনুসন্ধানে ডঃ সুহৃদ কুমার ভৌমিক মহোদয় কিছু তথ্য আমাদের দৃষ্টিতে এনেছেন। তিনি লিখেছেন— ডঃ লিউভা অসুরদের গবেষনা করে বিশাল এক গ্রন্থ লিখেছেন। তাতে একটি গান অসুরদের মধ্য থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছেন। গানটি কিন্তু অসুরি ভাষায় নয়। মাগহী ভাষায়।
    গানটি হল —    বার ভাইয়া অসুর, তের ভাইয়া লোধা
                বার মাহিনা য়ে পূজা পাঠ (শাস্ত্র) হয় ঠে।
    এর অর্থ হল— আমরা বারভাই অসুর, তেরভাই লোধা — বার মাসই পূজা পাঠ চলছে। ভারতীয় নৃ-বিজ্ঞানের জনক শরৎচন্দ্র রায় মনে করতেন — The words Asur and Lodha appear to refer to one and the same people. অর্থাৎ লোধা এবং অসুর মূলতঃ একজাতিরই দুটি নাম। ঠিক যেন জ্ঞাতি ভাইদের পরিচয়ের মত।
    কোল বা Austric জাতির প্রধান দলগুলি এক সময় অসুর নামেই পরিচিত ছিল। অসুর খুব সম্মানজনক শব্দ। শব্দটির মৌলিক অর্থ শক্তির অধিকারী, নেতা। ঋগ্বেদের প্রথম দিকে সূর্য ইন্দ্র সকলেই অসুর নামে আহ্বান করা হয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্যের নানা গ্রন্থে শবরদের সাহস ও পরাক্রমের পরিচয় রয়েছে। তাঁদের নানা নেতাকে সর্দার, রাজা বা দস্যু হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আসলে তাঁরা শক্তিশালী ছিলেন।
    মানবগোষ্ঠীর অনুসৃত ইষ্ট দেবদেবীর প্রতি বিশ্বাস, আরাধনা প্রণালী, দেহমনের গঠন থেকে তাঁদের অনেকটা পরিচয় মেলে। শবর-অসুর-লোধা গোষ্ঠীর মানুষজনদের ধর্মবিশ্বাস, আচার আচরণ-দেহমনের গঠন ও সামর্থে যথেষ্ট মিল রয়েছে।
    শবর নামযুক্ত যে কয়টি শাখা গোষ্ঠী আছে তাঁরা হলেন —  লোধা-শবর, খেড়িয়া-শবর, বসু-শবর, চিড়ু-শবর, জুয়াং অর্থাৎ পাতুয়া-শবর ও শাওরা প্রভৃতি।
    ভারতের যে চারটি ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী আছে তাদের মধ্যে Austric জাতিই প্রাচীনতম। তারপর দক্ষিণ ভারতীয় দ্রাবিড়, তারপর ভোট চীনীয় (Tibets Burmese and Tibets Chinese) এবং পশ্চিম ভারতের ইন্দোয়ুরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর বিভিন্ন শাখা।
    এখানে আলোচ্য কোলগোষ্ঠীর শাখা লোধা-শবরগণ শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর আক্রমণে ও অত্যাচারে তদুপরি জীবন জীবিকার তাগিদে বিচ্ছিন্নভাবে ভারতের নানাস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। শাসকদের বিদ্বেষ বিশেষতঃ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ শাসকদের নানা নির্মম কালাকানুন যথা I.P.C.-109, I.P.C.-110 ধারা এবং Criminal Tribe Act 1871-এর প্রয়োগ দ্বারা লোধা-শবরদের অযথা গারদে পুরে দিত।
    তখনকার দিনে ভারতীয় দণ্ডবিধির উক্ত 109 এবং 110 ধারায় লোধা-শবর, খেড়িয়া-শবর এবং শবরগণ যখন তখন ধরা পড়ত। এই দুটি ধারাকে B. L. Case বলা হত। 109 ধারার কারনে তারা গৃহহীন। 110 ধারার ফলে তাদের জীবিকার কোন স্থায়ী উপায় ছিল না। এর ফলে শাসকগোষ্ঠীর বুদ্ধিচাতুর্যে এবং আদিম মানুষগুলির ভাগ্যের বিড়ম্বনায় প্রিয় আপন দেশটা গোটা তাদের কাছে জেলখানা হয়ে গেল। পুলিশী নির্যাতন ও ধরপাকড়ের ভয়ে বহু মানুষ নিজ বসবাসের এলাকা ছেড়ে পালিয়ে নিজ জাতির পরিচয় গোপন করে বাঁচতে চেষ্টা নিল। নিজ মাতৃভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলা বন্ধ করল। কারণ ভাষা শুনে জাতির পরিচয়ের সূত্র ধরে পুলিশের খপ্পরে কে পড়তে চায়? জীবিকার তাগিদে সুযোগ সুবিধামত অন্য সম্প্রদায়ের কৃষকদের পাশাপাশি বসবাস শুরু করল। সংখ্যাগরিষ্ঠদের বলিষ্ঠ ভাষা দুর্বল ভাষাভাষীদের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করল। এইভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের শবর গোষ্ঠিগুলির মানুষজন নিজভাষার পরিবর্তে ওই অঞ্চলের চালু ভাষাকে গ্রহণ করল। ক্রমশ তাদের নিজ মাতৃভাষা অতলে হারিয়ে যেতে থাকল। এই হারিয়ে যাওয়া ঢেউয়ের মধ্যেও কিছু কথ্যভাষা লোধা-শবরদের মধ্যে এখনও বেঁচে আছে যাকে আমরা লোধা ভাষা বলি যে ভাষার সাথে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাও মেলে না (বাংলাভাষা তো দূরের কথা) তার স্বতন্ত্র উচ্চারণ ভঙ্গী ও কথ্যভাষার ব্যবহারে।
    পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার লোধা-শবর অধ্যুষিত থানা যথাক্রমে — ঝাড়গ্রাম, জামবনী, লালগড়, সাঁকরাইল, গোপীবল্লভপুর, নয়াগ্রাম, কেশিয়াড়ী, নারায়ণগড়, সবংপিংলা, দাঁতন, ডেবরা প্রভৃতিতে বসবাসকারী লোধা-শবররা তাঁদের যে মাতৃভাষা (লোধাভাষা) ব্যবহার করে চলেছেন তার পরিচয় নিম্নে দেওয়া হল —
বাংলা    লোধা-শবর    বাংলা    লোধা-শবর     
আমি    আমহি    আমরা    আমরা
তুমি    তুঁই    তোমরা    তুরহা
তুই    তুঁই    সে    উ
তিনি    উরহা    তাঁহারা    উরহা
আমি যাব    আমহি যাব    সে আসবে    উ আস্যাক
তারা আসবে    উরহা আসভিন    তাঁরা আসবেন    উরহা আসভিন
তোমরা যাও    তুরহা যাহা    সে গেছে    উ গেছে
তিনি গেছেন    উরহা গেছন    আমরা যাচ্ছি    আমরা যাইঠি
তারা আসছে    উরহা আসেঠে/আসনঠন    তাঁরা আসছেন    উরহা আসনঠন
কাক ডাকছে    কওয়া ডাকেঠে/ডাকেবঠে    গরু চরছে    গরু চরেঠে/চরেবঠে
পাখী উড়ছে    পাইক উডেঠে/উডেবঠে    জল পড়ছে    জল পড়েঠে/পড়েবঠে
বাংলা        লোধা-শবর        
আমি কাজে গিয়েছিলাম    আমহি কাইজে যাথালাই।
আমি কাজে যাচ্ছি        আমহি কাইজে যাইঠি।
আমি কাজে যাব না    আমহি কাইজে যাব নাহিঁ।
লোধা-শবর ভাষায় অনুবাদ —
বাংলা     -     দেখ রাম, কাল তুমি পড়ার সময় বড় গোল করেছিলে।
লোধা-শবর     -    দেখ রাম, কাইল তুঁই পড়হার সময় বেডি গোলহ করথালে।
বাংলা     -     পড়বার সময় গোল করলে, ভাল পড়া হয় না, কেহ শুনিতে পায় না।
লোধা-শবর     -    পড়হার সময় গোলহ করলে, ভাল পড়হা হ্যইক নাই, কেঁহ শুনতে প্যাইক নাই।
বাংলা     -     তোমাকে বারণ করছি, আর কখনও পড়ার সময় গোল করিও না।
লোধা-শবর     -    তকে বারুন করিঠি, আর কভুঁ পড়হার সময় গোলহ করব্যে নাই।
বাংলা     -     নবীন, কাল তুমি বাড়ী যাওয়ার সময় পথে ভুবনকে গালি দিয়েছিলে।
লোধা-শবর     -    নবীন, কাইল তুঁই ঘর যওয়ার সময় বাটে ভুবনকে গাইলহ দিথাল্যে।
বাংলা     -     তুমি ছেলে মানুষ, জাননা কাকেও গাল দেওয়া ভাল নয়।
লোধা-শবর     -    তুঁই ছা মানুষ, জানুস নাইঁ কনহঁ নককে গাইল দিয়া ভাল নাইঁ।
বাংলা     -     আর যদি তুমি কাকেও গালি দাও, আমি সকলকে বলে দেব, কেহ তোমার সঙ্গে কথা কইবে না।
লোধা-শবর     -    আর যদি কনহঁ নককে গাইল দেউস, আমহি সবকে বলঁই দিব, কেঁহ তর সঙ্ঘে কথা কহেক নাইঁ।
    পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে লোধা-শবররা অনেকেই মাতৃভাষা জানলেও নানা কারণে নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় তা ব্যবহার করতে চায় না। 
(১)     পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও আমি দেখেছি তখনকার মেদিনীপুর জেলাতেও লোধা জাতি নামের আতঙ্ক লোধাদের তাড়া করত। আমার যৌবনের দিনগুলিতে বহু লোধা বসতি আক্রান্ত হয়েছে। তারা অনেকেই ক্রুদ্ধ জনতার আক্রমণে নিহত হয়েছে। লোধা পল্লী অনেক ভস্মীভূত হয়েছে, পুলিশ অনেককে গ্রেপ্তার করেছে চুরির দায়ে। যেমন ১৯৬৫ সালে ডালকাটি, ১৯৭৯ সালে নয়াগ্রামের পাতিনায়, ১৯৮৩ সালে ঝাড়গ্রামের চাকুয়া ও সরো গ্রাম — এভাবে অন্তত ২০-২৫টি গ্রামে অনবরত লোধা হত্যা, গৃহধ্বংস, গ্রেপ্তার চলেছে বিংশ শতকের শেষ অবধি। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্তও লোধা নিগ্রহ কম হয়নি। সে কারণে লোধারা সর্বদা আতঙ্কগ্রস্ত। কখন কি হয় ! ভয়ে অনেক পরিবার হুগলী জেলা, নদীয়া, ২৪ পরগণা প্রভৃতি জেলায় গিয়ে বসবাস শুরু করেছে — নিজ জাতি এবং মাতৃভাষা গোপন করে। মেদিনীপুর জেলার বাইরের জেলায় গিয়ে তারা ‘লোধা’ জাতির বদলে ‘মাল’ বা অন্য জাতির পরিচয়ে মাতৃভাষা গোপন করে বসবাস করছে। নিজভাষা লুকোতে লুকোতে তারাও মাতৃভাষা ভুলে গেছে। কিন্তু এখনও তারা মেদিনীপুর জেলার লোধাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রেখেছে। 
(২)     লোধারা মনে করে যে, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ ‘লোধা ভাষায় কথা বলা’ শুনলে ঘৃণা করেন। 
(৩)     তারা মনে করে পরিবারের মধ্যে কথা বলা রপ্ত করলে ছোট ছেলে মেয়েরা বিদ্যালয়ে বা বাজারে লোধাভাষা বলে ফেলে — (ক) বিপদ আনতে পারে, (খ) বাংলা ভাষাও শিখতে অসুবিধায় পড়বে। 
(৪)     বাংলা ভাষায় তারা অভ্যস্ত না হলে, বাজারে, ডাক্তারখানায় বা যে কোন স্থানে অসুবিধায় পড়বে।
    উক্ত কারণগুলির জন্য বহুকাল আগে থেকে লোধারা তাদের মাতৃভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষায় কথা বলা রপ্ত করেছে। মনে হয় লোধাদের মোট জনসংখ্যার ৩০-৪০ শতাংশ লোধা তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে।
    (১) প্রবীণ প্রবীণাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাওয়ায়। (২) মাতৃভাষায় কথা না বলার কারনে, (৩) লোধা ভাষায় কোন বই, পত্রপত্রিকা না থাকার কারণে — লোধা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। লোধাভাষা বিলুপ্তির পথে। কি কি পথ নিলে লোধা-শবর ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের পথ সুগম হতে পারে ?
১।    সরকারের উচ্চপদস্থ শিক্ষক-শিক্ষানুরাগী ও প্রশাসকরা সমবেতভাবে লোধা-শবরদের নিয়ে সভার মাধ্যমে আলোচনা করে বলেন যে — মাতৃভাষায় লোধা-শবররা কথা বললে তা কোন ভয়ের নয়, লজ্জার নয় — বরং তা গর্বের। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছোট ছোট পুস্তিকা ছাপিয়ে বিতরণ করলে ভাল হতে পারে।
২।    কর্তৃপক্ষ যদি লোধা-শবর ভাষায় ছোট ছোট গল্প, কবিতা, নাটকের বই রচনা করে লোধা-শবর মানুষদের মধ্যে, লোধা অধ্যুষিত এলাকার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আগ্রহ আকর্ষণ করে — তাদের বইপত্র বিতরণ করেন। ওই সকল বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নিয়ে উক্ত বিষয়ে প্রোগ্রাম করেন — তা হলে ভাল হয়।
৩।    যেহেতু লোধা-শবর ভাষা বহুলাংশে বাংলা-উড়িয়া ভাষার সংমিশ্রণে স্বতন্ত্র একটা ভাষা, সে কারনে লোধা অধ্যুষিত এলাকার বিদ্যালয়গুলিতে বাংলা বিভাগে দ্রুত পঠন বই হিসাবে লোধা-শবর ভাষায় লিখিত ছোট ছোট গল্প-নাটক-জীবনীমূলক প্রবন্ধ পঠন-পাঠন ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
৪।    আগ্রহী সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থা দ্বারা উক্ত প্রোগ্রাম করানোও দরকার।