জনজাতি দর্পণ-এর পুজো সংখ্যার সম্পাদকীয় লিখতে বসে অনেক কথা মনে ভিড় করে এল। একথা ঠিক মহাশ্বেতা দেবীর প্রয়াণের পরে এবং তার কিছু আগে তাঁর ‘বর্তিকা’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাবার পরে শুধুমাত্র জনজাতি গোষ্ঠীগুলির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, ধর্ম, লোকাচার এবং অন্যান্য আরো অনেক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করার পত্রিকা বর্তমান বাংলায় আর নেই। এছাড়াও ‘বর্তিকা’র সঙ্গে ‘জনজাতি দর্পণ’-এর কিছু তফাৎ রয়েছে যা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ‘বর্তিকা’ মূলতঃ পশ্চিমবঙ্গের জনজাতি গোষ্ঠীগুলির জীবনচর্যা নিয়ে লেখালেখি ও নিরন্তর গবেষণা করত। সেখানে ‘জনজাতি দর্পণ’ সর্বভারতীয় স্তরে জনজাতি সমাজ ও জীবন নিয়ে লেখা প্রকাশ করে ও গবেষণার পরিধিকে বিস্তৃত করে। দ্বিতীয়তঃ ‘বর্তিকা’ ছিল একভাষিক যেখানে ‘জনজাতি দর্পণ’ একটি বহুভাষিক প্রকাশনা। আদিবাসী সংস্কৃতির বহুভাষিকতার ধারাকে সম্মান জানিয়ে এই সংখ্যায় আমরা বাংলা, ইংরেজী ও হিন্দিতে বিভিন্ন স্বাদের লেখা অন্তর্ভুক্ত করেছি। অবশ্য এই তুলনাটা একেবারেই নৈর্ব্যক্তিক বিচারধারার ফসল। এর মধ্যে কোনো ‘anxiety of influence’-এর ধারণা নেই। বাংলায় আদিবাসী চেতনার প্রচার ও প্রসারের জন্য ‘বর্তিকা’র ভূমিকা অনন্য, নজিরবিহীন। আমাদের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ মহাশ্বেতা দেবীর প্রেরণায় একটি বিশেষ রূপ পেয়েছে। জনজাতি অধিকার আন্দোলন তাঁর এক বিরল অ্যাচিভমেন্ট।
এই ধরনের পত্রিকা করার ধারণাটা তৈরি হয়েছিল পিপলস্ লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইণ্ডিয়ার কাজ শেষ হবার পরেই। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি ‘ভাষা পত্র’ নাম দিয়ে একটি সর্বভারতীয় বহুভাষিক ভাষা সম্বন্ধীয় পত্রিকা প্রকাশের ভাবনা শুরু হয়। ২০১৫-র এপ্রিল মাসে গুজরাতের বরোদায় এ নিয়ে নিবিড় আলোচনাও সম্পন্ন হয়। এখানে সর্বভারতীয় প্রকাশনা সংস্থার কর্তাব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করেন। বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারত তথা বিশ্বের ভাষা বৈচিত্র্যের বর্ণনা, স্বদেশে ও বিদেশে অনুষ্ঠিত সেমিনার-কনফারেন্সের খবর, গবেষণা প্রকল্পের বিবরণ, উল্লেখযোগ্য ভাষা গোষ্ঠীগুলির প্রবীণ সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাৎকার গ্রহণ — এমন অনেক ফিচার নিয়ে ‘ভাষা পত্র’ পথ চলা শুরু করবে এমনটাই ভাবা গেছিল।
তারপর অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। নানা কারণবশতঃ ‘ভাষা পত্র’ দিনের আলো দেখেনি। তবে ধারণাগুলো বেঁচে ছিল — ছিল সেগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়ার এক অদম্য বাসনা। তাই জন্ম নিল ‘জনজাতি দর্পণ’। এখানে জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষজন নিজেদের ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে কলম ধরলেন। অনেকে নিজেদের মৌলিক সাহিত্যকর্মের পসরা নিয়ে হাজির হলেন। বিভিন্ন আদিবাসী ভাষার ইতিবৃত্ত, তাদের সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডারের নমুনা — এসব কিছুই একেবারে নতুন রূপে, নতুন স্বাদে পাঠকের কাছে তুলে ধরারই প্রয়াস নেওয়া হয়েছে এই পত্রিকায়।
পুজো সংখ্যা — যা কিনা আমাদের তৃতীয় সংখ্যা — একটা নতুন বিষয় যোগ করেছে। তা হল ক্ষেত্রসমীক্ষামূলক গবেষণাধর্মী একটি রচনা প্রকাশ। এক্ষেত্রে কিছু বাছাই করা গবেষকের একটি দল পশ্চিমবঙ্গের একটি জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে ক্ষেত্রসমীক্ষা চালিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় জনজাতীয় মাতৃভাষার প্রয়োগের সুযোগ ও সম্ভাবনা এই বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র তৈরি করেছে। এখানে সাক্ষাৎকার ছাড়াও বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়েছে ভাষা সংকটের চরিত্র ও তীব্রতা সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য।
দুর্গাপুজো বাঙ্গালীর সেরা উৎসব। জনজাতীয় সমাজে হিন্দুধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব অনস্বীকার্য। এর ফলে হিন্দু দেবদেবীর উপাসনা আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যেও প্রচলিত হয়েছে। খেড়িয়া শবরের মত প্রকৃতি উপাসক জনজাতি গোষ্ঠীও এখন রামসীতার পূজো করছে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো ও সরস্বতী পূজোর উৎসবে এখন জনজাতি সমাজের নারীপুরুষ নির্বিচারে যোগদান করছে। আমরা এই সংখ্যায় জনজাতি গোষ্ঠীগুলির নিজস্ব পূজোপার্বণ-সংক্রান্ত কিছু লেখা নিয়েছি যেখানে মূলতঃ অতীতের আচারসমূহ ও বর্তমান তরুণ প্রজন্মের প্রবণতার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। সংকটের পরিস্থিতি কতখানি বাস্তব আর লোক উপাসনার পরিবর্তনশীল ধারাগুলি কতখানি সক্রিয় এই সমস্ত বিষয় বেশ কিছু নিবন্ধের মধ্যে ভালোভাবে বিবৃত রয়েছে। অসুর নামে এক অস্ট্রিক গোষ্ঠীর জনজাতি রয়েছে যারা মহিষাসুরের বংশধর বলে দাবি করে। স্বভাবতঃ দুর্গাপুজোয় তাদের কোনো জায়গা। তারা এই উপাসনার পরিপন্থী। এরকম অনেক নতুন তথ্য রয়েছে যা জনজাতি জীবনে গভীরভাবে প্রবেশ না করলে জানা সম্ভব নয়।
এর আগের দুটো সংখ্যায় ভাষাবিপন্নতা নিয়ে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে। জনজাতি গোষ্ঠীগুলির পৃথক পরিসংখ্যানসহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এবারে তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যান্য কিছু দিক তুলে ধরতে চাই। বিশেষতঃ বাংলার গ্রামাঞ্চলে একদা সমৃদ্ধ পালাগানের রীতিনীতি আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
জনজাতি, পালাগান ও সাংস্কৃতিক বিপন্নতা —
কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা
জনজাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে। এদের সাংস্কৃতিক জীবনের হদিশ করতে গিয়ে উঠে এসেছে নানাবিধ নৃত্য, গীত ও নাট্যের আয়োজন। এই সবের মধ্য দিয়ে কথ্যসাহিত্যের ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং স্মৃতি পরম্পরার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন গড়ে উঠেছে। আসলে আদিবাসী জীবনের গোষ্ঠীগত আদানপ্রদানের বিষয়টি এক অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য। মূলস্রোতে যেখানে পরিবারগুলো ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে অণুপরমাণুতে গিয়ে ঠেকেছে সেখানে একটি আদিবাসী গ্রাম যেন একটি বিশাল পরিবার। প্রান্তিক অবস্থান সঙ্ঘবদ্ধ করে আর কেন্দ্রীয় স্থিতি যেন বিক্ষিপ্ত করে, নির্জন করে, অবসন্ন করে। আদিবাসী জীবনের এই যূথবদ্ধতা এক অনুপম প্রকাশ পায় বিভিন্ন পালাগানের মধ্য দিয়ে।
লোধা শবরদের ‘চুড়িয়া-চুড়িয়ানি’ পালার কথায় আসি। সমাজে নারীর অবস্থান ও প্রচলিত প্রথাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার ক্ষমতা দেখে অবাক হতে হয়। মূলস্রোতের পুরুষতন্ত্র লজ্জা পেতে পারে নারীর এই মুক্ত উচ্চারণে। ‘ললিতা শবর’ পালা আবার লোধাদের অবমাননাকর জাতিগত পরিচয়ের বর্তমান মুছে ফেলে এক সুদূর অতীতে ফিরে যাবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। উন্নততর শবর জনজাতি সত্তাকে আঁকড়ে ধরে পৌরাণিক জগন্নাথের উপাসক হিসেবে এক সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় আইডেনটিটির ছাঁচে নিজেদের গড়ে তোলার উদ্যোগ আছে ললিতা-বিদ্যাপতির এই প্রণয় উপাখ্যানে। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও সাম্যবাদী ধর্মচেতনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে ‘ললিতা শবর’ পালা হয়ে ওঠে এক ভিন্নধর্মী ট্র্যাজিক আখ্যান। সাবঅল্টার্ণ ললিতার প্রশ্ন বিদ্যাপতিকে বিদ্ধ করে ও সমৃদ্ধ করে। কেন্দ্র থেকে প্রান্তে জ্ঞানের একমুখী প্রবহমানতার তত্ত্বকে এই পালা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। আদিবাসী মননে উঠে আসা সঙ্গত প্রশ্নগুলি নিরন্তর ঘুরপাক খেতে থাকে — ঈশ্বরের প্রকৃত উপাসক কে? ধর্মাচরণ কি নিতান্তই বংশগতির তত্ত্বাধীন? জাতপাত নির্বিশেষে স্বাধীন ধর্মাচরণের অধিকার কি সামাজিক অপরাধ? ছল বল কৌশল কেন প্রান্তজনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রজনের একমাত্র ভরসা? ‘ললিতা শবর’ পালা এই ধরনের বহু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
অবশ্য অন্য ধরণের এক আর্থসামাজিক ব্যাধি আজ লোধা শিল্পীমহলকে আক্রান্ত করেছে। অর্থগৃধনুতা এক বড় সমস্যা। যথেষ্ট মহলা দেবার মানসিকতা নেই। রয়েছে সচেতনতার অভাবও। ক্ষেত্রসমীক্ষায় গিয়ে দেখেছি আগে থেকে সম্মান দক্ষিণা নিয়ে বোঝাপড়া করাটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ মূল অভিনয়ের দিন সবকিছু যেন অবিন্যস্ত। শিল্পী সংলাপ ভুলে যাচ্ছে। মঞ্চের মধ্যে বসা ব্যাণ্ডের লোকজনের মধ্য থেকে বৃদ্ধ নির্দেশক চীৎকার করে প্রম্পট্ করে চলেছেন। কোথাও বেশভূষায় শৈথিল্য, কোথাও চড়া দাগের অভিনয়। কোথাও আবার ‘গ্রীনরুম’-এর ভেতর ঝগড়াঝাঁটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে ছুটে গিয়ে শান্ত করতে হচ্ছে। কাহিনীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য, আদিবাসী সত্তার উত্তরণের ভাবনা আর গবেষকদের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের দুর্মর বাসনা — এসব হল মুদ্রার একপিঠ। আর এক পিঠে রয়েছে উপার্জনলোলুপ দিকভ্রান্ত কিছু প্রান্তিক মানুষ, রাজনৈতিক দলাদলি আর চূড়ান্ত অপেশাদারি মানসিকতা।
পুরুলিয়ার ঝুমুর শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। শিল্প মাধ্যমে প্রতিবাদ সংগঠিত করা, জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষে সহায়তা করা —এসবই হয়েছে রাঢ় বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের কুড়মি পরিবারের উঠোনে বসে। ব্রাহ্মণ সন্তান ঝুমুরের অমোঘ আকর্ষণে কুড়মি জনজাতির মানুষের সাথে জাতপাত এক করে ফেলেছেন। গুরুশিষ্য পরম্পরার এক নয়া সামাজিক সমীকরণ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি একঘরে হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও ব্রাহ্মণ নির্ভয়ে কুড়মি গুরুর কাছে দিনের পর দিন তালিম নিয়েছেন ঝুমুর গানে নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নির্মাণের আশায়। একান্ত সাক্ষাৎকারে ঝুমুর শিল্পীরা বারংবার অনুরোধ করেছেন কিছু কর্মশালা আয়োজন করার। হতে পারে সরকারী উদ্যোগ, হতে পারে বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দাক্ষিণ্য। কিন্তু শিল্পীর মনে একান্ত ইচ্ছা নাগরিক সংস্কৃতির বলয়ে চলাফেরা করা সেলিব্রিটি লোকসংগীতে শিল্পীরা প্রত্যন্ত এলাকায় আসবেন। ওয়ার্কশপের মাধ্যমে গ্রাম-শহরের সংলাপ চালু থাকবে। একে অন্যের শক্তি ও দুর্বলতার বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন। যেভাবে সাম্প্রতিককালে কিছু ভিন্নধর্মী বাংলা চলচ্চিত্রে ঝুমুর গানের ব্যাপক প্রয়োগ করা হয়েছে সেভাবে প্রান্তিক ঝুমুর শিল্পীরা তাঁদের পরিবেশনায় নাগরিক সংস্কৃতির ছোঁয়া পেতে চাইছেন, পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে নতুন নতুন টেকনিক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে চাইছেন। এককথায়, নিজেদের এই একবিংশ শতকের ডিজিট্যাল বিনোদনের জগতে প্রাসঙ্গিক রাখতে চাইছেন।
এই সেতুবন্ধের কাজটা অনেকখানি করে ফেলতে পেরেছেন বলেই ছৌ নাচের শিল্পীরা আজ বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার লক্ষ্যে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পেরেছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে সেরাইকেলার রাজন্যবর্গ সক্রিয়ভাবে এই নৃত্যশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা না করলে এত পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হত না। অনেক বিদেশী সমালোচক আক্ষেপ করেছেন ছৌ নৃত্যের আদিবাসী চরিত্র অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচারের আলো - অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে আপোষের পথ দেখিয়েছে। তবে এইসব রক্ষণশীল সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে ছৌ নাচ নিজস্ব অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। এমনকি আমেরিকায় এর জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে কারণ এটি আদতে একটি মার্শাল আর্ট ফর্ম। বিদেশীদের জন্য আলাদা করে জাঁকজমক নয় — এটি জাপানি সামুরাই বা চীনের লোকনৃত্য আঙ্গিকের যে বর্ণময় উপস্থাপনা রয়েছে তার সেরাটুকু গ্রহণ করতে চেয়েছে। এই সঙ্গে অসংখ্য সময়োপযোগী কর্মশালার মাধ্যমে সরকারী দাক্ষিণ্যে ছৌ আজ নিজস্ব পরিচয় তৈরি করে ফেলেছে। ময়ুরভঞ্জ ও পুরুলিয়ার ছৌ সেরাইকেলার ধ্রুপদী আঙ্গিকে গড়া নয়। পুরুলিয়ার ছৌ-এর মধ্যে শারীরিক কসরৎ অনেক বেশী — অনেক বেশী এনার্জি আর অ্যাড্রিনালিন! কিন্তু সামগ্রিকভাবে শক্তি আর নৈপুণ্যের এক অনবদ্য মিশেল ছৌ নৃত্য। এর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে আজ বিনোদনের মক্কা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও ছৌ শিল্পীদের নজরকাড়া উপস্থিতি তাদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথাই সগর্বে ঘোষণা করে।
অথচ একই পুরুলিয়া জেলার মাছানি পালাগান আজ চরম অবহেলায় ধুঁকছে। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে নিজস্ব কুড়মি সমাজ। শিক্ষিত ও সচ্ছল মাহাতো পরিবারে মাছানি নিয়ে বিদ্রূপ, পরিহাস চলে — যেন ছোটলোকের আর্ট ফর্ম। অনেক মাঝবয়সি মানুষও কুড়মালি ভাষায় একটা আস্ত কবিতা বা গান স্মৃতিচারণ করে উদ্ধার করতে পারেন না। অথচ জনজাতি কুড়মি সম্প্রদায়ের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ কৃষিজীবী। জমির অধিকার নিয়ে সুদীর্ঘ কাল জমিদার-মহাজনের অত্যাচার, অবিচারের শিকার। এই ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতিতে প্রান্তিক মানুষের অসহায় নিপীড়ন মাছানি পালার মূল উপজীব্য বিষয়। তবে ফোক্ স্যাটায়ার মাছানির এক বড় আঙ্গিক। তীর্যক শ্লেষ ও তীব্র ক্ষুরধার ব্যঙ্গের সাহায্যে সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থার স্বরূপ উন্মোচন করা হয় একেবারে সৎ ও নির্ভীক পন্থা অবলম্বন করে। প্রান্তিক মানুষের মধ্যে প্রতিবাদ প্রতিরোধের জন্ম হয় মঞ্চ থেকেই। অভিনয়ের মাধ্যমে সংগঠিত হয় প্রতিবাদ। নাটকের ভাষা দ্রুত বদলে যায় ঘটনার ঘনঘটাকে আশ্রয় করে। অনেক চটুল জীবনধর্মী গানের এক আশ্চর্য কোলাজ এই মাছানি পালা। লোক-আঙ্গিকে লোকজীবনকে বিবৃত করার এ এক অনন্য প্রয়াস। যদিও নেই কোনো প্রচারের আলো। আছে স্বজনের ঔদাসীন্য আর সরকারি নির্লিপ্ততা। নেই কোনো বিদেশী গবেষকের আনাগোনা। আছে হাতে গোনা স্বদেশী গবেষকদের ছোটখাটো প্রকল্পের নিমিত্ত মাঝে মাঝে আসা-যাওয়া। যদিও সেই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার হাত ধরেই এসেছে কুড়মালি ভাষা ব্যবহারের সুযোগ। একেবারে হালফিলের বাংলা ছবি ‘ডেথ সার্টিফিকেট’-এ ব্যাপকভাবে এই জনজাতির ভাষা ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু মাছানি-র ব্যবহার কোনো গণমাধ্যমে সেভাবে হয়ে ওঠেনি। শিল্পীরা তাই যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই রয়ে গেলেন। ছৌ-এর আন্তর্জাতিকতা থেকে অনেক দূরে — নিজভূমে পরবাসী হয়ে।
এবার কৃতজ্ঞতা স্বীকারের পালাগান শুরু করা যাক। নলেজব্যাঙ্ক পাবলিশার্স ও ডিস্ট্রিবিউটরস-এর কর্ণধারকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই। সেই সঙ্গে এই প্রকাশনা সংস্থার তিন স্থপতি শ্রী সুকুমার গুপ্ত, শ্রী সমর কুমার আঢ্য ও শ্রী সঞ্জীব মণ্ডল — আমাদের যেভাবে সাহায্য করে চলেছেন সেজন্য তাঁদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। এছাড়াও এই পত্রিকার মুদ্রণ, টাইপ সেটিং, প্রচ্ছদ ও অন্যান্য কারিগরি সহায়তায় যে সব মানুষ যুক্ত আছেন তাঁদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। ধন্যবাদ জানাই আমাদের বিশেষ সুহৃদ ও পরামর্শদাতা ড. নীলাদ্রিশেখর দাশ মহাশয়কে। তিনি শুধু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র পাঠিয়েই ক্ষান্ত থাকেন নি। একইসঙ্গে ক্ষেত্রসমীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ‘জনজাতি দর্পণ’-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল করার ব্যাপারে বিশেষ সহায়তা করেছেন। ধন্যবাদ জানাই দুই গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ সুলগ্না ভট্টাচার্য ও সন্দীপ গুড়িয়াকে। তাদের সাহায্য এই পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমার বন্ধু ও সহপাঠী শ্রী মুফতি শামিম শওকত (এস.ডি.ও, বর্ধমান সদর), শ্রী নকুল চন্দ্র মাহাত (এস.ডি.ও, ঝাড়গ্রাম) এবং শ্রী কৌশিক নন্দী (আধিকারিক, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, নবান্ন)-কে বিশেষ অভিনন্দন জানাই ক্ষেত্রসমীক্ষা ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে সরকারী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাই বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রঞ্জন চক্রবর্তী মহাশয়কে তাঁর সুচিন্তিত মতামত ও প্রেরণা প্রদানের জন্য। আশা করি, এঁদের সবার শুভেচ্ছা ও সহযোগিতায় ‘জনজাতি দর্পণ’ আগামী দিনে আরো অনেক পথ পাড়ি দেবে। মুদ্রণ প্রমাদ ও অন্য কোনো অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য পাঠককুলের কাছে আগাম মার্জনা চেয়ে নিলাম। ভবিষ্যতে আপনাদের সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় রইলাম। আপনাদের সবার পুজো ভালো কাটুক এই কামনা করি।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা —
অধ্যাপক দামোদর মিশ্র, ডীন, কলা বিভাগ, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়।
অধ্যাপক তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থ, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরাজী বিভাগ)।
অধ্যাপক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরাজী বিভাগ)।
ড. জয়জিৎ ঘোষ, বিভাগীয় প্রধান, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরাজী বিভাগ)।
শ্রী হেমন্ত কুমার গোলাপল্লী, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরাজী বিভাগ)।
শ্রী মঙ্গলা প্রসাদ রায়, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস অফ ইণ্ডিয়া।