শবরমেলার যে চেহারাটা আমরা আজ দেখি, তেমনটি এক বছরে হয়নি। এ মেলার পেছনে আছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও এর প্রয়োজন বোধ। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ সরকার, পরাধীন ভারতে বহু অরণ্য আদিবাসীগোষ্ঠী এবং কিছু তপশীলি সংখ্যালঘু জাতিকে ‘অপরাধ প্রবণ’ বলে ঘোষণা করে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন পুরুলিয়ার খেড়িয়া-শবর, মেদিনীপুরের লোধাশবর ও বীরভূমের ধিকারো। পঞ্চাশের দশকে ‘অপরাধ প্রবণ’ শব্দগুলি তুলে নিয়ে এদের ‘বিমুক্ত’ গোষ্ঠী আখ্যা দেওয়া হল। পুরুলিয়ার শবর বা মেদিনীপুরের লোধাদের ‘বিমুক্ত’ বলা চলে না। কেননা এই অরণ্যচারী ও অরণ্যজীবী মানুষরা সমাজ ও পুলিশের চোখে তখনও বিমুক্ত ছিল না। প্রহসন এই, যেন ওরা বহু প্রজন্ম কারাগারে না থেকেও বন্দী আছে। তা ওরা জানে। সব শিকল চোখে দেখা যায় না। ওরা বিচ্ছিন্ন টোলায় থাকে। ১৯৬৮ সাল হল পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া-শবর কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠা বছর। সেই বছর থেকেই শুরু হয় ‘ডাল পরব’। এই পরবের মাধ্যমে শবর সমাজকে জোটবদ্ধ করার প্রয়াস শুরু হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে সমাজ উন্নয়নের জন্য সাংগঠনিক ক্রিয়া হিসাবে ‘বাৎসরিক শবর সাধারণ সভা’ মেলার আকার নেয়। ‘ডাল পরব’ ১৯৮৩ সাল থেকে ‘শবর মেলা’ নামে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। মেলার প্রধান উদ্দেশ্য হল সমস্ত শবর সমাজকে একত্রিত করা। একত্রিত করে একে অপরের মধ্যে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে শবর সমষ্টির স্বার্থে সমিতির চিন্তা ভাবনাকে প্রতিটি শবরের মধ্যে প্রতিফলিত করা। এজন্য মেলার আঙ্গিকের হিসাবে রাখা হয় বিবিধ প্রদর্শনী স্টল। এই স্টলগুলোতে থাকে শবর হস্তশিল্পসহ জেলার সমস্ত হস্তশিল্প সামগ্রী, কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন সামগ্রী, স্বাক্ষরতা ও শিক্ষা বিষয়ক প্রদর্শনী, স্বাস্থ্য যথা—ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, পোলিও, স্যানিটেসন, যক্ষ্মা, টিবি, কুষ্ঠ বিষয়ে সচেতনতা, আইনী সহায়তা কেন্দ্র সহ প্রদর্শনী, ভূমি আইন, বনাধিকার আইন-২০০৬। বর্তমানে শবর সমাজের অবস্থান এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন কর্মসূচীর কাজের অগ্রগতির নমুনা ও পরিসংখ্যানগত তথ্য দেওয়া হয়, যা থেকে অন্য সদস্যরা উৎসাহিত হয়।
শবর মেলা হয় সাধারণত দুর্গাপূজার পরে ও কালীপূজার আগে। কৃষিপ্রধান গ্রাম সমাজে ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বা না করে যে সব মেলা হয়ে থাকে তা প্রায়শই বর্ষার পর থেকে শুরু হয়ে চলে বসন্তকাল পর্যন্ত। এখানে যাদের মেলা, সেই শবররা পূজোর আগে পর্যন্ত নিযুক্ত থাকে ক্ষেতের কাজে। নিজেদের জমি নেই, কিন্তু জমি তো আছে কারো। আর সেই জমিতে কাজ করারও লোক লাগে। বনজীবন বিচ্যুত শবররা জীবিকার জন্যে অন্যের জমিতে খেটে আসছে। আবার কালীপূজার পর হয় ‘বাঁধনা’। পরবের মাঝামাঝি সময়টা বেছে নেওয়া হয়েছে শবরমেলার জন্যে। এ মেলা খেড়িয়া-শবরদের মেলা নয় শুধু। সব জায়গার আদিবাসীদের, অন-আদিবাসীদের ক্রমবর্ধমান সমাগমে ও অংশগ্রহণে শবরমেলা বহুমানুষের মিলনমেলা হয়ে উঠেছে। মেলবার জায়গাই তো মেলা। আমাদের দেশে যত মেলা আছে তার সবগুলোর মূল সব এখানেই মেলে। অগণন মানুষজন আসবেন, পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হবেন, বিনোদনমূলক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রসগ্রহণ করবেন, বিকিকিনি চলবে নানা পসরার। এর মধ্যে স্থানীয় চেহারা বদলে যায়, যাদের জন্যে তারা হারিয়ে যায়। শহরাগত মানুষদের দুদিনের হুল্লোড়ের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কখনও বা ঐ ধরনের মেলায় যাওয়াটা একটা Status Symbol-এর মধ্যে পড়ে যায়। শবর মেলায় আসার আগে এইরকম অনেক কিছুই মনে হতে পারে...।
পুরুলিয়া শহর থেকে বাস বা অন্য কোনো গাড়িতে করে রাজনওয়াগড় সমিতি প্রধান কার্যালয় বত্রিশ কি.মি. — তার মধ্যে শবরমেলার উপস্থিতি বা অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না। তবে তারপর থেকেই রাস্তার দুধারে বর্ষা-উত্তর পুরুলিয়ার টাঁড় জমি, স্থানে স্থানে সবুজ সমাচ্ছন্ন, সাদা পদ্ম, লাল শালুকে ভরা পুকুর, ডোবা, দূরে আকাশের গায়ে পাহাড়। মাটি কোথাও ধূসর, কোথাও বা কালচে। ছোটো ছোটো পাথর টিলা, উঁচু-নিচু রাস্তা। এরই মধ্যে দেখা যায় এপাশ ওপাশ থেকে দলে দলে মেয়ে পুরুষ চলছে। পরনে সম্ভবত তাদের সব থেকে মহার্ঘ শাড়ি, জামা, কোলে কাঁখে ছেলে-পুলে। কালো চেহারায় তেল চকচকে চুলে, লাল নীল গোলাপি হলুদ নানা রংয়ের জামাকাপড়ে তাদের এই আসা চারপাশের প্রসারিত ক্ষেত-মাঠ-আকাশের পটভূমিতে আশ্চর্য রং তৈরী করে। হাঁটাতে কোনও ক্লান্তি নেই, মুখের হাসিটিও অম্লান। কোথাও যেন বোঝা যায় এরা পরম আকর্ষণে কোথাও চলেছে। বোঝা যায় এদের সকলের গন্তব্যস্থল রাজনওয়াগড়, ‘শবর মেলা’। ধামসা, মাদল, নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচ করতে করতে চলেছে তাদেরই মেলায়।
শনিবার দুপুরে মেলার মূল অধিবেশন শুরু। এই মেলা তারাই পরিচালনা করে, যাদের জন্য এই মেলা। পুরো মেলা তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। সকলের থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত তারাই করে। আবার মঞ্চে উঠে সমিতির কার্যক্রমের বিবরণ তারাই দেয়, জানায় নানা অভাব অভিযোগের কথা। সমস্ত বিবরণী তিনজন দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক লিপিবদ্ধ করে। মেলায় আগত বিশেষ বিশেষ অতিথিদের প্রাসঙ্গিক বক্তৃতা যার মাধ্যমে শবর উন্নয়নের সামগ্রিক ক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বর্তমান পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ে ও সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। প্রধান উদ্দেশ্য থাকে সব বিষয়ে শবর নর-নারীর অংশগ্রহণ, মতামত প্রকাশ ও তাদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা। শুরু হয় সারারাত শবরদের সহ মানভূমের সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শবর ভাষায় নাটক, গান, নৃত্য।
রবিবার সারাদিন চলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, পুরুষ ও মহিলাদের তীরন্দাজি প্রতিযোগিতা।
দুপুর ২টা থেকে ‘সমিতির বাৎসরিক সাধারণ সভা’। বিগত বৎসরের কার্যক্রমের লিখিত রিপোর্ট পাঠ করেন সম্পাদক। তার উপরে চলে আলোচনা এবং অনুমোদন। কোষাধ্যক্ষ পড়ে শোনান আয়-ব্যয়ের হিসাব যা অডিট করানো হয়। আলোচনার পর অনুমোদন। আগামী বৎসর সমিতি কি কি কাজ কোথায় কোথায় করবেন তার আলোচনাতে সকলে এক এক করে অংশগ্রহণ করেন এবং তা লিপিবদ্ধ করা হয়। বিকেল ৫টায় দ্বিতীয় দিনের অধিবেশন শুরু হয় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান দিয়ে। প্রতি বছর কৃতি ছাত্রছাত্রী, কর্মী ও বিশেষ ক্ষেত্রের মানুষকে সম্বর্ধিত করা হয়। পুরস্কার বিতরণের পর প্রতি বছর ‘শবর মাতা’ মহাশ্বেতা দেবী তার বক্তব্য রাখেন। সকলের কাছে এই ‘নিঃশব্দ বিপ্লবে’ যোগ দিতে আহ্বান জানান। মেলার বিশেষত্ব হল — এত লোক আসছে, থাকছে, খাচ্ছে — কোন অদৃশ্য সূত্রে সকলেরই সব ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। তাদের ভাষা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের রাজনীতি সেখানে তারা আজও অকৃত্রিম। সব কিছু ছাড়িয়ে যেটা চোখে পড়ে তা হল স্বনির্ভর হয়ে ওঠার, নিজের জোরে বেঁচে থাকার একটা অদম্য চেষ্টা। শবরমেলা তাদের সেই জীবন সংগ্রামের একটা ছবি।