প্রেক্ষাপট —
ইংরেজিতে ‘Post’ শব্দটির উৎস লাতিন শব্দ ‘Postitus’ যার অর্থ স্থির করা বা নির্দিষ্ট স্থানে রাখা (‘to fix’ or ‘to place’) । পঞ্চদশ শতাব্দীতে একজন বার্তাবাহককে (‘Postman’) একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে কিছু বার্তা বা সংবাদ প্রেরণ করার দায়িত্ব দেওয়া হত। তখন থেকে ‘Post’ বলতে সম্পূর্ণ ডাকব্যবস্থা এবং ‘Mail’ অর্থে প্রেরিত চিঠিপত্র-সমূহকে বোঝানো হত। বর্তমানে পৃথিবীর সকল দেশেই ডাক-ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবহন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রয়োগ ব্যবস্থা উন্নততর হচ্ছে। ভারতে কয়েক শতাব্দী যাবৎ ডাক-ব্যবস্থা চলে আসছে। সম্রাট আকবরের আমলে একজন Postal Runner-কে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩৫ কিমি পথ অতিক্রম করে সংবাদ বহন করতে হত যে কাজ অত্যন্ত পরিশ্রমসাপেক্ষ এবং জীবনের ঝুঁকি-বহুল ছিল। Postal Runner-দের অধিকাংশই স্থানীয় Tribal Community থেকে নিযুক্ত হতেন। ভারতের সংবিধান অনুসারে, তপশিলী জাতি (Scheduled Caste-SC), তপশিলী উপজাতি (Scheduled Tribe-ST) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (Other Backward Classes-OBC) মানুষদেরকে দেশজ জনসাধারণের (Indigenous People) অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। ভারতীয় ডাকব্যবস্থায় জনজাতি গোষ্ঠীর অবদান অপরিসীম। ভারতের সকল মানুষের মধ্যে যোগাযোগ নিয়মিতভাবে বজায় রাখার অন্যতম সফল মাধ্যম হল ভারতীয় ডাকব্যবস্থা (Indian Postal System)। ভারতে ডাকব্যবস্থা সাংগঠনিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১লা এপ্রিল, ১৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’ কর্তৃক। ডাক-সঞ্চয় (Postal Savings) এদেশে চালু হয়েছে ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দের ১লা এপ্রিল থেকে। ডাক-জীবনবীমা (Postal Life Insurance — PLI) শুরু হল ১৮৮৪ থেকে। জনজাতি গোষ্ঠী প্রধানত দুই উপায়ে ভারতীয় ডাক-ব্যবস্থার উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে অবদান রেখে চলেছেন — ১. প্রথম উপায় ‘সরাসরি’ (‘Directly’) এবং ২. দ্বিতীয় উপায় ‘পরোক্ষভাবে’ (‘Indirectly’)। ২০১২ খ্রীষ্টাব্দের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভারতীয় ডাক-ব্যবস্থার মোট ৪,৭৪,৫৭৪ কর্মীর মধ্যে আদিবাসী (ST) কর্মী হলেন ১৫,১৮৪ (i.e. 7.19%) এবং দলিত (SC) কর্মীর সংখ্যা ৩৬,৬৯০ (i.e. 17.38%)। মোট SC এবং ST কর্মীর সংখ্যা সর্বভারতীয় মোট কর্মীর প্রায় 24.57% বা 25% । অর্থাৎ, ভারতে ডাকের দৈনন্দিন কাজকর্মের বৃহৎ কর্মযজ্ঞের প্রায় এক চতুর্থাংশ কর্মী ‘সরাসরি’ কর্তব্যসাধনের মধ্য দিয়ে নীরবে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। ‘পরোক্ষ’ অবদান বলতে জনজাতিগোষ্ঠীর ডাক-সঞ্চয়ের অভ্যাস, গ্রামীন ডাক জীবনবীমা (Rural Postal Life Insurance — RPLI since 1995), Monthly Income Scheme (MIS), Kisan Vikas Patra (KVP), Public Provident Fund (PPF), Senior Citizen Savings Scheme (SCSS), National Savings Certificate (NSC), Sukanya Samriddhi Account (SSA) প্রভৃতি প্রকল্পে আর্থিক বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি তাঁদের সক্রিয় সহযোগিতাকে বোঝানো হয়। দুঃখের বিষয়, কিছু স্বনামধন্য সংবাদপত্রে বা অন্য প্রচারমাধ্যমে দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের অবদানকে ‘OBJECT’ হিসেবে দেখানো হয়। আসলে জনজাতি গোষ্ঠীর অবদান সাবলীলভাবে ‘SUBJECT’-এর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে —এটা সত্য।
কিছু বার্তা -
ইংরেজ প্রশাসক Geoffrey Clarke ভারতীয় ডাকের ডাইরেক্টর জেনারেল ছিলেন ১৯১৯ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত। ঐ সময়ে তিনি একটি মূল্যবান বই লিখেছিলেন “The Post Office of India and Its Story”। সেখানে পাওয়া যায় ভারতের বহু মানুষের Money Order-এর প্রতি দারুণ নির্ভরতার বিষয় — “Probably in no country in the world is the poor man so dependent upon the Post Office for the transmission of small sums of money as in India”. ভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে যেখানে ST — majority দেখা যায়। যথা- মিজোরামের প্রায় 95% মানুষ ST (১৯৯১-এর লোকগণনার রিপোর্ট), লাক্ষাদ্বীপে 93% ST, নাগাল্যাণ্ডে 88% ST, মেঘালয়ে ST-র সংখ্যা 86%, দাদরা ও নগর হাভেলিতে 79% এবং অরুণাচল প্রদেশে 64% ST । এই সব অঞ্চলে ডাক-সঞ্চয়ের অধিকাংশই ST population কর্তৃক জমা হয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মহিলাদেরও অবদান এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এমনকি সারা ভারতের মোট ব্যাঙ্ক-আমানতের (Bank-Deposit) প্রায় 53% জমা হয় Indigenous People কর্তৃক। ভারতের ২০১১-এর লোকগণনা অনুসারে মোট ভারতীয় দলিত (SC)জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বসবাস করেন চারটি রাজ্যে — উত্তরপ্রদেশ (20.5% of national total SC population), পশ্চিমবঙ্গ (10.7%), বিহার (8.2%) এবং তামিলনাড়ু (7.2%)। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় 16.6% হল দলিত (SC) যা 20.14 কোটি। ২০১২-২০১৩ আর্থিক বছরে ভারতে মোট ডাক-আমানত (Postal Deposit) ছিল প্রায় INR ৮৩,৭১৬ কোটি যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল জনজাতি গোষ্ঠীর অবদান। ডাকঘরের জমানো অর্থ থেকে ভারত সরকার রাজ্যগুলোকে 75% বা 80% পর্যন্ত লোন দেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য।
পৃথিবীতে মোট ব্যাঙ্কের সংখ্যা প্রায় ৯,২৮,০০০; আর সকল দেশের মোট পোস্ট অফিসের সংখ্যা প্রায় ৬,৬১,০০০ (মোট ব্যাঙ্কের 40%) যার মধ্যে প্রায় ১,৫৬,০০০ (২৩.৬% of total Post Office) পোস্ট অফিস ভারতে অবস্থান করে। একটা ডাকঘর গড়ে প্রায় আট হাজার গ্রামাঞ্চলের মানুষের সাথে এবং শহরে প্রায় ২৬,০০০ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এখনও ভারতে প্রায় পাঁচ লক্ষের বেশি গ্রাম ব্যাঙ্কিং পরিষেবার বাইরে। ঐ সব অঞ্চলে মানুষের টাকা জমা রাখার একমাত্র ভরসা ডাকঘর যা সরাসরি ভারত সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এক্ষেত্রে জনজাতি গোষ্ঠী ভারতীয় ডাক-ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছেন। ১৮৮২ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর ধরে ডাক-সঞ্চয়ের (Postal Savings Deposit) পরিমাণ নিয়মিতভাবে বেড়ে চলেছে। Table No. 4 এবং Figure : 1 প্রাক্-স্বাধীনতার সময়ে (Pre-Independence Period) বর্ধিষ্ণু ডাক-সঞ্চয়কে প্রমাণ দেয়। অবশ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে (১৯১৪-১৯১৮) বহু মানুষ ডাকঘরে জমানো সঞ্চয় তুলে নিয়েছিলেন। ভারতে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে (Post-Independence Period : ১৯৫০-৫১ থেকে ২০১২-১৩) ডাক-আমানত (Postal Savings-Deposit) ক্রমশ বেড়েছে [Table : 5] দ্রষ্টব্য ।
ঐ আমানত ১৯৫০-৫১-এর *INR ১৮৫ কোটি থেকে বেড়ে ২০১২-১৩-তে হয়েছিল INR ৩৭,৯৯২ কোটি (Figure : 2]। দুই বছর আগে ভারতে সমস্ত তালিকাভূক্ত বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের মোট আমানত ছিল প্রায় INR ৭৯,৫৫,৭২১ কোটি। Table : 1-এর রাজ্যগুলোর (ST সহ) মোট আমানত ছিল INR ২৬,৬৩,৬৭৭ কোটি (33% of national total deposit_ এবং Table : 2 -এর রাজ্যগুলোর (SC সহ) মোট আমানত ছিল INR ১৫,৭৭,৭৬১ কোটি (20% of national total deposit)। অর্থাৎ জনজাতি গোষ্ঠীর আমানত হল 53% (= 33% + 20%) of national total deposit [Table : 3]।
প্রথম ছবিতে (Photograph) ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ ভারতে ডাক-বিভাগের কয়েকজন বরিষ্ঠ আধিকারিকগণকে দেখা যাচ্ছে। পিছনের সারিতে উত্তর-পূর্ব কোণে দণ্ডায়মান রয়েছেন G. R. Clarke যাঁর মূল্যবান বই থেকে তদানীন্তন ভারতীয় ডাকব্যবস্থার সাথে জনসাধারণের সংযোগের বিষয় অনেকটা জানা যায়। তিনি Postal Runner-দের কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা, সাহসিকতা প্রভৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
পরবর্তী ছবিতে (Photograph) পশ্চিমবঙ্গের অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলের Postal Runner (Female) — পুতুনা মুরাকে দেখানো হয়েছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্তরালে টানা কুড়ি বছর ধরে তিনি রোজ ২০ থেকে ৩০ কিমি. পথ অতিক্রম করে চিঠিপত্র, Parcel ইত্যাদি বহন করে প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেন। কখনও দস্যু, কখনও বা বন্য প্রাণীদের বিরুদ্ধে তাঁকে লড়াই করতে হয়। তিনি আদিবাসী সম্প্রদায়ের কঠোর পরিশ্রমের একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। ভারতীয় ডাকব্যবস্থায় এমন বহু কর্মীর অবদান অবিস্মরণীয়।
উপসংহার —
ভারতীয় ডাকব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু বাধা রয়েছে। সেগুলো শীঘ্রই দূর করা প্রয়োজন। যেমন - India Post-এ অনেক বেশি নতুন কর্মী নিয়োগ করা দরকার। যাঁরা কর্মরত রয়েছেন তাঁদেরকে ব্যাপকভাবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে কাজ করার প্রশিক্ষণ দান অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের উপলব্ধি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য — “যতদিন না ভারতের আপামর জনসাধারণকে ভালোভাবে খাইয়ে, শিক্ষা দিয়ে উন্নততর জীবনযাত্রার মান দেওয়া যায়, ততদিন এদেশের সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব।” পরিকাঠামোর দ্রুত উন্নয়ন প্রয়োজন। ডাকঘরের বিভিন্ন আর্থিক সেবামূলক কাজের ব্যাপক প্রচার জনজাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রসারিত করতে হবে। কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে — বর্তমানে ভারত সরকার Post Office-গুলোকে ‘Mini Bank’ হিসেবে বাঁচাতে আগ্রহী।
References :
Geoffrey Clarke : The Post Office of India and Its Story (1920).
Basudeb Chattopadhyay : ‘A Jingle of Bells’ : A Short History of the
General Post Office, Kolkata (2004).
Mohinilal Mazumdar : The Imperial Post Offices of British India (Calcutta : Phila Publications, 1990), P. 1.
Postal Savings in India — A Survey : S. C. Jain; Journal of Indian
Institute of Bankers, 1966; Volume 37, Number 3.
Rural Development Through Post Offices — Alkesh Tyagi, Postal
Information Bureau (PIB), Government of India, 9th October, 2012 .
Report of Population Census, 1991 and 2011.
Basic Statistical Returns of All Scheduled Commercial Banks of India, Reserve Bank of India Publication, 2015.
V. Ranganathan (September 17-23, 2005; EPW, Volume 40, No. 38, PP. 4121-4125) : Challenges in Reform of the Indian Postal Service.
Annual Report : 2014-2015; India Post.
Ei Samay (Newspaper), 1st April, 2017.