‘মুন্ডা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘মুণ্ড’ বা মস্তক। সাধারণতঃ মুণ্ডারি গ্রামের যিনি প্রধান তাঁকে মুণ্ডা বলা হত। মুণ্ডারা হল ভারতের প্রকৃত আদিবাসী। মধ্যপ্রদেশ ও বিন্ধ্য পর্বতের বাসভূমি থেকে কালক্রমে তারা ছোটনাগপুরের মালভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করে। সাঁওতাল, হো, ভূমিজ এবং কোল উপজাতিরা প্রকৃতপক্ষে মুণ্ডাদেরই বিভিন্ন শাখা। ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের ব্রিটিশ-বিরোধী বিদ্রোহের নায়ক বীরসা মুণ্ডাও ছিলেন মুণ্ডা পরিবারেরই একজন।
মুণ্ডারি কৃষি ব্যবস্থায় যৌথ মালিকানা ছিল মূল কথা। এই যৌথ মালিকানা ‘খুঁটকাঠি’ ব্যবস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। প্রসঙ্গক্রমে ‘খুঁটকাঠি’ ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন। গ্রামে যারা প্রথম জঙ্গল কেটে বসবাস করত তাদেরই সেই গ্রামের ‘খুঁটকাঠি’ বলা হত। আক্ষরিক অর্থে জমি পরিষ্কার করে সেখানে খোঁটা বা খুঁট অর্থাৎ বাঁশের লাঠি পোঁতা হয় জমির সীমানা বোঝাবার জন্য। যেহেতু জঙ্গল কেটে খুঁটি দিয়ে নিজের নিজের জমির সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হত, সে কারণে সেই জমিতে অন্য কারও প্রবেশাধিকার তারা বরদাস্ত করত না। কিন্তু ব্রিটিশরা জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে মুণ্ডাদের প্রাচীন ভূমি ব্যবস্থায় প্রচণ্ড আঘাত হানে। ছোটনাগপুরের বাইরে থেকে চাষী, ব্যবসায়ী এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দু ও মুসলমানদের খাজনাবিহীন স্বত্বে ইংরেজরা জমির বন্দোবস্ত দিতে শুরু করল। শুধু তাই নয়, প্রাচীন মুণ্ডারি খুঁটকাঠি ব্যবস্থা বিলোপ করে জমিদারি ব্যবস্থা প্রবর্তিত হল। ফলে নতুন ব্যবস্থায় বিনিময় প্রথার পরিবর্তে নগদে খাজনা দেওয়া আর না দিতে পারলে আইনের সাহায্যে জমি থেকে উৎখাতের ব্যবস্থাও হল। এখানেই ঘটল প্রথম বিপত্তি।
দ্বিতীয়ত, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে উদ্ভূত মধস্বত্বভোগীদের মধ্যে যারা ছোটনাগপুর অঞ্চলে নিজেদের অধিকার কায়েম করল তাদের অধিকাংশই ছিল বাইরের লোক। তারা কোনো দিক দিয়েই আদিবাসীদের আশা আকাঙ্ক্ষার শরিক ছিল না। তাই মুণ্ডাদের চোখে তারা ছিল ‘দিকু’ বা বাইরের লোক। এই মধ্যস্বত্বভোগীরা নানাভাবে মুণ্ডাদের শোষণ করত। তারা গ্রামাঞ্চলে প্রবর্তন করল বিনা মজুরিতে বাধ্যতামূলক শ্রমদান বা ‘বেট বেগারী’। যেমন, চাষের সময়ে অন্ততঃ চারদিন চাষ করতে হবে, একদিন কোদালের কাজ করতে হবে, একদিন জনমজুরের কাজ করতে হবে, এবং ধান কাটার সময় একদিন বা দুদিন জমিদারের ধান কেটে দিতে হবে। এছাড়া একটা হিসাবে দেখা গেছে, খাজনা ও সেস ছাড়াও আরও দশ প্রকারের ‘আবওয়াব’ বা অতিরিক্ত কর আদিবাসীদের দিতে হত। সেগুলি যথাক্রমে (১) ডাক সেস (২) পার্বনি (৩) মাঙ্গন (৪) মাসুলি (৫) কাঁড়া বেওরি (৬) নগদি (৭) রথ প্রণাম (৮) হিন্দোল প্রণাম (৯) জড়োয়া এবং (১০) অন্যরকম (নানাবিধ ব্যয়ের জন্য অর্থ)।
ফলতঃ মুণ্ডাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা ইংরেজ আইনে কোন স্বীকৃতি পেল না। যারা ছিল নিজেদের অঞ্চলে প্রধান ও সম্মানীয় ব্যক্তি তারাই এখন বহিরাগত দিকুদের দাসে পরিণত হল। মুণ্ডাদের সামাজিক মর্যাদা এইভাবে প্রচণ্ড আঘাত পেল।
তাছাড়া আসামের চা বাগানে সস্তায় কুলির কাজ করার জন্য ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসীদের উপর আড়কাঠিদের দৃষ্টি পড়ল। নানা মিথ্যা প্রলোভনে এইসব আড়কাঠিরা দলে দলে আদিবাসীদের আসামে পাঠাতে লাগল এবং সেখানে তারা চা-বাগানের ইউরোপিয়ান মালিকদের অত্যাচারের শিকার হল। ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এ ধরনের ১২,০০০ আদিবাসী শ্রমিকের ভেতর মুণ্ডাদের সংখ্যাই ছিল প্রায় ৪,০০০। এর উপর গ্রামে গ্রামে মদ ও চোলাইয়ের দোকান খুলে বেশ কিছু লোক তাদের নেশায় প্রলোভিত করে দেনার দায়ে জমিজমা লিখিয়ে নিল।
সর্বোপরি ১৮৫৫ সালে সিধু-কানহুর সাঁওতাল বিদ্রোহের পর ইংরেজরা প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাথে সাথে মিশনারিদের উৎসাহ দিল উপজাতিদের মধ্যে খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের জন্য। অর্থাৎ শাসকদের ধর্ম গ্রহণ করলে তারা ইংরেজদের সাথে একাত্মতা অনুভব করবে। কিন্তু এতে অনেক ক্ষেত্রে ফল বিপরীত হল। আদিবাসীদের সনাতন রীতিনীতি এবং ধর্ম ও পদ্ধতির সমালোচনা করার ফলে তারা ইংরেজবিরোধী হয়ে পড়ল।
এবার আসি বীরসার কথায়। ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে রাঁচী জেলার উলিহাতু গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। পিতা সুগান মুণ্ডা ছিলেন একজন ভাগচাষী। মায়ের নাম কার্মি। সুগান মুণ্ডা খ্রীষ্টান ছিলেন। তাই বীরসাও খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম হয় দাউদ মুণ্ডা বা দাউদ বীরসা। সীমাহীন দারিদ্র্যের জন্য তিনি মামাবাড়ী সালসা গ্রামে মানুষ হন। গ্রামের বিদ্যালয় থেকে পাশ করে তিনি চাঁইবাসায় জার্মান মিশনে আসেন আপার প্রাইমারীতে পড়ার জন্য। সেখানে সামান্য ইংরেজীও শেখেন। ছোটবেলা থেকেই গান, বাজনা এবং বাঁশি বাজাতে বীরসা বিশেষ পটু ছিলেন। কিন্তু অচিরেই খ্রীষ্টান মিশনারিদের সাথে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় তিনি মিশন থেকে বহিষ্কৃত হন এবং খ্রীষ্টধর্ম পরিত্যাগ করে মুণ্ডাদের ধর্মমতে ফিরে আসেন।
১৮৯৩-৯৪ খ্রীষ্টাব্দে সিংভূম, মানভূম, পালামৌ অঞ্চলে নতুন করে সেটেলমেন্টের কাজ শুরু হয়েছিল। আদিবাসী সর্দার এবং রায়তরা তাদের পুরানো অধিকার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশংকা করছিল। বীরসা এগিয়ে এলেন এদের সাহায্যের জন্য।
১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে যখন তাঁর বয়স ২০ বছর তখন তিনি অন্তর থেকে এক প্রেরণা লাভ করে নিজেকে ঐশীশক্তির অধিকারী ‘ধরতি আবা’ বা ধরণীর পিতা বলে ঘোষণা করেন। ফলে তিনি তাঁর অনুগামীদের চোখে আর নিছক ভগবানের দূত হয়ে রইলেন না, হলেন স্বয়ং ভগবান। তাঁর জন্মস্থান মুণ্ডাদের কাছে তীর্থস্থানে পরিণত হল।
কিন্তু বীরসার বক্তব্য কিছুদিনের মধ্যেই ধর্ম ছেড়ে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করল এবং স্পষ্টতঃ সরকারবিরোধী হয়ে পড়ল। তিনি বলতে আরম্ভ করলেন, বিদেশীদের বহিষ্কার না করলে স্বাধীন ধর্মীয় আচরণ সম্ভব নয়। অনুগামীদের আহ্বান জানালেন ছোটনাগপুরে মুণ্ডারাজ কায়েম করতে এবং জমির খাজনা বন্ধ করতে।
ফলে ইংরেজদের চোখে বীরসা হলেন এক বিপজ্জনক ব্যক্তি এবং অবিলম্বে তাঁকে গ্রেপ্তার করার ব্যবস্থা হল। ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে আগষ্ট বীরসা এবং তাঁর ১৫ জন অনুগামী গ্রেপ্তার হলেন। বিচারে রাষ্ট্র-বিরোধী প্রচারের অপরাধে বীরসা ও তাঁর সঙ্গীদের দুবছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার আদেশ দেওয়া হল।
১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বীরসা এবার পুরোপুরি ইংরেজ-বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে মুণ্ডাদের সংগঠিত করলেন। শুধু প্রচার নয় তাদের দুঃখকষ্টেরও তিনি ব্যক্তিগতভাবে শরিক হলেন। সেই সময়ে অনাবৃষ্টির জন্য শতশত আদিবাসী দুর্ভিক্ষ কবলিত হয়। বীরসা সত্যই ঈশ্বরের মত তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন স্নেহ, মমতা ও খাদ্য সাহায্য নিয়ে। বীরসা কল্পনাবিলাসী ছিলেন না। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ সংগ্রামের জন্য তিনি অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহে মন দিলেন। গোপনে তৈরি হল তীর, ধনুক, বর্শা, তলোয়ার প্রভৃতি নানা ধরনের অস্ত্র। রীতিমত একটি বাহিনী গড়ে তুললেন। সৈন্যাধ্যক্ষ হলেন তাঁরই বিশ্বস্ত সহচর গয়া মুণ্ডা। প্রধান কেন্দ্র হল খুঁটি। এর শাখা কেন্দ্র তৈরি হল চক্রধরপুর, বুন্দু, তামার, তোরফ, বাসি, সিসাই প্রভৃতি স্থানে। এ সবই ছিল গোপন কেন্দ্র এবং বীরসা ছদ্মবেশে এসব স্থান পরিদর্শন করতেন ও অনুগামীদের সামনে ইংরেজদের অত্যাচার আর অবিচারের কাহিনী মর্মস্পর্শী ভাষায় বর্ণনা করতেন।
অবশেষে ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দের বড়দিনে ‘উলগুলান’ বা বিদ্রোহের দিন স্থির হল। প্রথমে আক্রান্ত হল মিশনারীদের কার্যালয়গুলি এবং তারপর ইংরেজ পুলিশের ফাঁড়িগুলি। ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই জানুয়ারী যখন খুঁটি পুলিশ ফাঁড়ি বীরসাপন্থীদের অধিকৃত হল তখন ইংরেজরা রীতিমত তৎপর হল বিদ্রোহ দমনের জন্য। ছোটনাগপুর ডিভিশনের কমিশনার আর্থার ফরবেস স্বয়ং সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিলেন। ৯ই জানুয়ারী শৈলরাকাবে বীরসাপন্থীদের প্রধান জমায়েতকে ইংরেজ সৈন্য দুদিক দিয়ে ঘিরে আক্রমণ করল। ইংরেজদের বন্দুকের বীরসাপন্থীরা জবাব দিল সামান্য তীর ও বর্শা দিয়ে — তবু আত্মসমর্পন করল না। নারী পুরুষ মিলে প্রায় দুশো থেকে চারশো জনের মত প্রাণ হারাল ইংরেজদের গুলিতে।
অচিরে গয়া মুণ্ডা ইংরেজদের গুলিতে নিহত হন, আর ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের ৩রা ফেব্রুয়ারী ইংরেজরা বীরসাকে তাঁর গোপন ঘাঁটি থেকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়। কিন্তু বিচার চলাকালীন অবস্থায় তিনি হঠাৎ কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯ই জুন মারা যান। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর।
বিদ্রোহ দমনের পর বীরসাপন্থীদের গ্রেপ্তার করার নামে ইংরেজরা মু্ণ্ডাদের উপর অকথ্য অত্যাচার করে। শত শত নিরীহ মুণ্ডাকে গ্রেপ্তার করা হল। তারপর দিনের পর দিন চলল বিচারের প্রহসন। বন্দীদের মধ্যে দুজনের ফাঁসি হল এবং ৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হল।
মুণ্ডা আন্দোলনকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের তরফে শেষ সশস্ত্র বিদ্রোহ বলে অভিহিত করা যায়। স্বাভাবিকভাবে বীরসার পক্ষে সম্ভব ছিল না সারা ভারতের অধীশ্বর উন্নত ধরনের সামরিক অস্ত্রের অধিকারী ইংরেজদের বিরুদ্ধে জয়লাভের। বীরসা অশিক্ষিত ছিলেন না। সুতরাং এটা তাঁর অবিদিত ছিল না। তাই নিশ্চিত পরাজয়ের সামনে বীরসার অকুতোভয় সাহস ও অতুলনীয় দেশপ্রেম দেখে বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় মন আপ্লুত হয়। তাঁর আপনজন মুণ্ডাদের কাছে বীরসা হয়ত ঈশ্বর ছিলেন কিন্তু সাধারণ দেশবাসীর কাছে তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ইংরেজ-বিরোধী এক অমর শহীদ হিসাবে।