২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী আয়োগের অর্থানুকূল্যে একটি দু-বছর ব্যাপী গবেষণা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এর পোশাকি নাম ‘ইনোভেটিভ রিসার্চ প্রজেক্ট’। এই প্রকল্পের শীর্ষক ছিল ঔপনিবেশিক সময়কাল থেকে উত্তর ঔপনিবেশিক সময়কাল অবধি দক্ষিণবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের ক্রমবিবর্তনের ধারা বিচার ও বিশ্লেষণ। এই কাজ করতে গিয়ে মূলতঃ ‘জঙ্গলমহল’ বলে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশে দফায় দফায় ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজ চালানো হয়। বাস্তবিক, প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় ক্ষেত্রসমীক্ষকেরা পৌঁছে গিয়েছিলেন স্থানীয় মানুষ, আদিবাসী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ও সক্রিয় সহযোগিতায়। ঔপনিবেশিক সময়কালের বিপুলতা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ঘটনা পরম্পরা একটি দু-বছর ব্যাপী গবেষণা প্রকল্পে বিচার বিশ্লেষণ করে ফেলা দুষ্কর। এর প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে অন্ততঃ এক দশক লেগে যাওয়ার কথা। তাই এই বিশাল বৌদ্ধিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলার জন্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের প্রক্রিয়াটিকে অনেকগুলি ভাগে বিভক্ত করে বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এখানে যেমন ছিল আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির লোককথা, বিশ্বাস, আচার অনুষ্ঠানের বিশ্লেষণের কর্মসূচী তেমনই ডাইনি, কুসংস্কার, জড়িবুটি ও লোকচিকিৎসক, ওঝা, গুণিনদের কার্যকলাপের যথাযথ বিচারের পরিকল্পনাও রচনা করা হয়েছিল। এই কর্মসূচীর অঙ্গ হিসেবে আমরাও বেছে নিয়েছিলাম এমন একটি বিষয় যা সামগ্রিক সংকটের প্রতিফলন ঘটাতে সমর্থ ছিল। আমরা কাজ শুরু করেছিলাম আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির ভাষা ও সংস্কৃতির বিপন্নতা নিয়ে। ক্ষেত্রসমীক্ষার সুবাদে আমরা গ্রামাঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির কাছে বহুবার পৌঁছে গিয়েছি। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, মধ্যবয়স্ক-মধ্যবয়স্কা, তরুণ-তরুণী, বালক-বালিকা এমনকি শিশুদের মধ্যেও ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা ও সুযোগের বাস্তবতা নিয়ে অনেক নিবিড় আলোচনা করেছি।
এই প্রসঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করা প্রয়োজন। শুধু ঔপনিবেশিক শাসনকালের নিরিখে নয়; স্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকের কিছু বেশী সময় ধরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আদিবাসী নীতি প্রণয়ন নিয়ে বিস্তর আলোচনা, বিতর্ক, মতান্তর হয়েছে। অনেক অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। বহু জায়গায় তা হিংসাত্মক প্রতিবাদের চেহারাও ধারণ করেছে। তবে ক্ষেত্রসমীক্ষার সময়ে প্রারম্ভিক লগ্নে আমাদের মনে হয়েছে ঔপনিবেশিক ও স্বাধীনতা-উত্তর চার দশকের বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে তাত্ত্বিক স্তরে বিশদে চর্চা করা হয়েছে ও বহু মূল্যবান গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করাও হয়েছে। ক্ষেত্রসমীক্ষায় গেলে সঙ্গে প্রশ্নমালা নিয়ে যাওয়াও বাধ্যতামূলক। আমাদের গবেষণার অভিমুখের কথা মাথায় রেখে আমরা ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়কালে বিশেষ ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহার ও সাংস্কৃতিক জীবনে বহির্বিশ্বের প্রভাব ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর প্রশ্ন তৈরি করে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে একেবারেই হতাশাজনক। তার প্রধান কারণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির নিজস্ব ইতিহাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণার অভাব। এমন নয় যে বংশ পরম্পরায় এই ভাষা সংস্কৃতির বিবর্তনকে প্রাঞ্জলভাবে বহন করে নিয়ে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার হার উদ্বেগজনকভাবে কম হওয়ায় এক্ষেত্রে ঐ ভাষাগোষ্ঠীর অতীত ঐতিহ্য নিয়ে যেসব গবেষণামূলক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল তাঁদের পূর্বপুরুষদের সাথে আলোচনা করে, সেইসব ঘটনাবলীও এঁদের জ্ঞান পরিধির বাইরে অবস্থান করে। ডালটন, রিজলি, গ্রীয়ারসন, বোডিং নিয়ে এঁরা মাথা ঘামান না। এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নেহেরু, ভেরিয়ার এলুইন, গান্ধী বা জি. এস. ঘ্যুরের মত নৃতাত্ত্বিকরাও এঁদের ভাষা সংস্কৃতির সংরক্ষণে কি কি মডেল সুপারিশ করেছিলেন ও তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে কি ধরণের তীব্র বাদানুবাদের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন সেইসব ধারণা এঁদের মনোজগৎ থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করে। তাই আমাদের প্রশ্নমালা বদলাতে হয়েছে। শুধু তাই নয় গবেষণাকালের পরিধি অনেক সংকুচিত করতে হয়েছে। এর একটা বড় কারণ যেসব আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে আমরা গিয়েছি, যেমন খেড়িয়া শবর সম্প্রদায়, সেখানে ৬০ বছর অবধি বেঁচে আছেন এমন লোকের সংখ্যাও হাতে গোনা যায়। অপরিসীম দারিদ্র্য, অশিক্ষা, প্রাথমিক স্তর থেকেই মাতৃভাষায় শিক্ষার কোনো সুযোগ না পাওয়া — এই সবকিছুই জঙ্গলমহলের অনগ্রসর আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে কোনো ইতিহাসচেতনা তৈরি করেনি। আমরা তাই এই সমীক্ষার সূচনালগ্ন ১৯৯০ এর দশক থেকে ধরেছি। মূলতঃ বিশ্বায়নের প্রভাবের বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা এমন এক কালবিভাজন করেছি। মুক্ত বাজার অর্থনীতি বিশ্বের দরজা খুলে দেওয়ার ফলে ভারতীয় সমাজের মূলস্রোতে যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল তেমনই প্রান্তিক অনগ্রসর আদিবাসী জীবনেও ধীরে ধীরে এই প্রভাব সঞ্চারিত হয়েছে। এর ফলে ভাষা-সংস্কৃতির সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ক্ষমতাশালী ভাষাগোষ্ঠীকে আঁকড়ে ধরে নিজের আদিবাসী অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার মরীয়া প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। কোথাও আবার আদিবাসীত্ব বজায় রাখতে না পেরে প্রভাবশালী ও অন-আদিবাসী ভাষা-সংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসাতে হয়েছে। এর পেছনে বহু ধরণের আর্থসামাজিক বাধ্যবাধকতা কাজ করেছে। রাষ্ট্রশক্তির কল্যাণকামী কর্মসূচীর সুফল গ্রহণ করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক আপোষের পথে হাঁটতে হয়েছে। এতে সংকট বেড়েছে বই কমেনি। আজকের আইডেনটিটি পলিটিক্সের যুগে ‘এরা কারা’ সেই প্রশ্ন উঠে গেছে। না পেরেছে মূলস্রোতে মিশতে, না পেরেছে সদর্পে নিজেদের আদিবাসী সত্তাকে জাহির করতে। পরিণামে এক দোদুল্যমান, দোরগোড়ায় অপেক্ষমাণ, জনজাতি হিসেবে গ্লানিময় জীবনযাপন করতে হচ্ছে। ক্ষেত্রসমীক্ষায় এমন আরো অনেক বেদনাদায়ক বাস্তবচিত্র পরিস্ফুট হয়েছে।
এখন দক্ষিণবঙ্গের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আমরা নিবিড় ক্ষেত্রসমীক্ষা চালিয়েছিলাম সেখানে যে কয়েকটি আদিবাসী ভাষাগোষ্ঠীর সম্মুখীন হয়েছিলাম তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরছি। এর বাইরেও আরো কিছু জনজাতি সম্প্রদায় সরকারী রেকর্ড অনুযায়ী অবস্থান করছে। কিন্তু বর্তমানে তাদের ভাষা-সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য বজায় আছে কিনা তা নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। এছাড়াও গ্রীয়ারসনের ‘Linguistic Survey of Bengal’ গ্রন্থে যে গোষ্ঠীগুলির উল্লেখ রয়েছে সেগুলির উপরেই আমাদের বিশেষ দৃষ্টি ছিল। এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই যে তাঁর ভাষাসমীক্ষার একশো বছর বাদে যে পুনর্মূল্যায়নের কাজ আমরা করার চেষ্টা করেছি সেখানে কোনো জীবন্ত ভাষাগোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই ধরণের ভাষাগোষ্ঠী বেঁচে থাকলে গবেষকের দূরবীণের আওতায় ঠিকই চলে আসতে পারত। বিশ্বায়নের যুগে মাইনরিটি কালচার নিয়ে হইচই খুব কম হচ্ছে না। সেই প্রেক্ষিতে এই ধরণের ভাষাগোষ্ঠী অবহেলার শিকার হত না বলেই আমাদের মনে হয়েছে।
এবার আদিবাসী ভাষাগোষ্ঠীগুলির আলোচনা শুরু করা যাক।
মালপাহাড়িয়া — ‘পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী’ গ্রন্থে সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা মালপাহাড়িয়াদের কথা বলেছেন। এঁরা ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ, মূলতঃ মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলায় বসবাস করেন। এদের ভাষা মালতো দ্রাবিড় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। মুণ্ডারি গোষ্ঠীর ভাষাগুলো থেকে (সাঁওতালি, মুণ্ডারি, হো, মাহালি ইত্যাদি) এরা আলাদা। রিজলী সাহেব সাঁওতালসহ সব জনজাতিকে দ্রাবিড়ীয় বলে চিহ্নিত করেছিলেন। এখন সাঁওতালদের অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হচ্ছে। সাঁওতালদের মত স্থায়ী কৃষিতে এঁরা অনেক পরে এসেছেন। ভাষার পার্থক্য রয়েছেই। মালপাহাড়িয়াদের সাক্ষরতার হার তফসিলভুক্ত জনজাতিগুলির গড় থেকে অনেক কম (২৪.৫ শতাংশ)। পশ্চিমবঙ্গের মালপাহাড়িয়ারা মালতো ও বাংলা উভয় ভাষায় কথা বলেন। লোকগণনায় এদের হিন্দু বলে চিহ্নিত করা হয়। খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ খ্রীষ্টান। ঝাড়খণ্ড থেকে পশ্চিমবঙ্গে এরা বহিরাগত।
২০০১ সালের জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গে মালপাহাড়িয়াদের সংখ্যা ছিল ৩৭৪৪০। এঁদের বসবাস প্রধানতঃ মুর্শিদাবাদ (২৯.৮ শতাংশ), নদীয়া (২৩.৩ শতাংশ), মালদা (১১.২ শতাংশ), বর্ধমান (৯.৮ শতাংশ) ও জলপাইগুড়ি (৭ শতাংশ) জেলাগুলিতে। মেদিনীপুর, হাওড়া ও পুরুলিয়া জেলায় এদের বসবাস নেই বললেই চলে। ৭১.৩ শতাংশ ক্ষেতমজুর হিসেবে কাজ করে।
তাঁদের ধর্মীয় অনুশীলন মূলতঃ জনজাতীয়, তবু কিছু হিন্দু প্রভাব আছে। ঝাড়খণ্ডের মালপাহাড়িয়াদের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় কিছুটা ভালো।
অন্যদিকে ‘বাংলার জনজাতি’ গ্রন্থে প্রদ্যোত ঘোষ উল্লেখ করেছেন E. T.
Dalton-এর Descriptive Ethnology of Bengal বইটির। এই বইয়ের ২৭৪ পৃষ্ঠার উল্লেখ করে বলা হয়েছে বীরভূম জেলার রামগড় পাহাড়বাসী এবং সাঁওতাল পরগণা তথা রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশের জাতিবিশেষ এই মালপাহাড়িয়া। তবে তারা রাজমহল পাহাড়বাসীদের থেকে আলাদা। ডালটন সাহেব মালভূমের খেড়িয়া ও পাহাড়িয়াদের সঙ্গে এদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করে তাদের কোল গোষ্ঠীভুক্ত বলে গণ্য করলেও ভাষার নিরিখে এদের দ্রাবিড়জাতিরই অন্তর্ভুক্ত বলে অনেকে মনে করেন। আবার ক্যানিংহাম সাহেব এদের ভাগলপুরের দক্ষিণে মন্দর পর্বতের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করেন। H. Baverley তাঁর Report on the Census of Bengal (1872)–এ ক্যানিংহামের মতকে উল্লেখ করে বলেছেন যে ভাগলপুরের মন্দর পর্বতের মান্দেই (Mandei) নামক অধিবাসীদের সঙ্গে মহানদী তীরের মানদা ও টলেমি কথিত Mandalae জাতি একই শাখাসম্ভূত। প্রদ্যোত ঘোষ অনুমান করেছেন পাটনার দক্ষিণ গঙ্গাতীরে যে সব মলৈ বা মল্লি জাতি বাস করে তারাই টলেমির মণ্ডলাই জাতি। বর্তমান মুণ্ডা-কোলদের সঙ্গে এদের তফাৎ নেই বললেই চলে। একই সাথে প্রদ্যোত ঘোষ বলেছেন তামিল ভাষায় ‘মলয়’ শব্দে পাহাড় বোঝায়। সুতরাং ‘মাল’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল পাহাড়িয়া বা পার্বত্যজাতি। প্রায় দুহাজার বছর আগে এইসব দ্রাবিড়ীয় জাতি সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে বিভিন্ন জাতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা আরো প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়। উত্তর আর দক্ষিণের মালপাহাড়িয়াদের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ বর্তমান। ‘চেট’ উত্তরের মানুষদের আর ‘মাল’ দক্ষিণের মানুষদের বলা হয়। মালপাহাড়িয়াদের দুইটি খণ্ড জাতি আছে —
১. মালপাহাড়িয়া ও ২. কুমার বা কোমরভাগ পাহাড়িয়া।
মালপাহাড়িয়ারা দুর্গা, কালী, মনসা বা বিষহরির পূজা করে থাকে। এছাড়া শীতলা পুজো, লক্ষ্মী পুজোরও চল রয়েছে। এদের মধ্যে ঝুমুর গানের প্রচলন আছে। প্রচলিত বাংলা শব্দের প্রয়োগ এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।
ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে ‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ গ্রন্থে মালপাহাড়িয়াদের নিয়ে কোনো পৃথক অধ্যায় লেখেন নি। শুধু ১৯৭৬ সালের ‘The Scheduled Castes and Scheduled Tribes Order (Amandment) Act’ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের যে ৩৮টি গোষ্ঠীকে আদিবাসী তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে মালপাহাড়িয়ার উল্লেখ করেছেন। আরো উল্লেখ করেছেন যে মালপাহাড়িয়ারা কলকাতা, ২৪ পরগণা, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, নদিয়া, দিনাজপুর, বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুর, হাওড়া ও পুরুলিয়া জেলায় ছড়িয়ে আছে।
লোধা — ‘পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী’ বইটিতে লোধাদের অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এটাও বলা হয়েছে যে তাঁরা এখন বাংলার সঙ্গে মুণ্ডারি মিশিয়ে এক মিশ্র ভাষায় কথা বলেন। H. H. Risley লোধাদের বর্ণনা করতে গিয়ে তাদের ভূমিজদের অন্তর্গত একটি শ্রেণী বলে উল্লেখ করেছেন। আমাদের ক্ষেত্রসমীক্ষায় লোধাজাতির ‘চাংগান’ ও অন্যান্য সাহিত্য নমুনার বিশ্লেষণ করে বোঝা গেছে যে এদের নিজস্ব ভাষার কোনো অস্তিত্ব বজায় নেই। বাংলা, ওড়িয়া ও স্বল্প পরিমাণে মুণ্ডারি মিশিয়ে তাঁরা এক মিশ্র রীতির প্রচলন করেছেন। তাঁদের নিজস্ব ভাষাগত ঐতিহ্য লোপ পেয়েছে। ২০০১ এর জনগণনায় লোধারা ছিলেন ৮৪৯৬৬। ১৯৯১-এ সংখ্যা ছিল ৬৮০৯৫। জনসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রধানতঃ মেদিনীপুর ও জলপাইগুড়ি জেলায় বাস করেন। তবে হুগলী, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলাতেও কিছু লোধা আছেন। তবে জলপাইগুড়িতে তাঁরা চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে গেছেন। লোধারা এখন তফসিলভুক্ত জনজাতি গোষ্ঠী। তবে ব্রিটিশ আমলে ১৮৭১ সালে কুখ্যাত ‘Criminal Tribes Act’ রচনা করে এদের ‘অপরাধপ্রবণ জনজাতি’ তকমা দেওয়া হয়েছিল যা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ সালে আইন করে denotify করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রশাসনে এখনো পুরনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা রয়ে গেছে। কোনো চুরি ডাকাতির ঘটনা ঘটলে পুলিশ লোধাগ্রামে হানা দিত ও গ্রেফতার করত। লোধাদের ছোট একটি অংশ খ্রীষ্টান। বাকিদের জনগণনায় হিন্দু বলে দেখানো হয়। অথচ এঁরা অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর মত প্রকৃতির উপাসক। সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণার বইতে লোধাদের পরিচয় শেষ করতে গিয়ে শবর জনজাতির উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে — “এঁরা এবং লোধারা একই জনগোষ্ঠীর মানুষ বলেই মনে হয়।” একইসঙ্গে ঐ অধ্যায়ে খেড়িয়া বা খাড়িয়া জনজাতির উল্লেখ করলেও তাঁরা এঁদের ওপর কোনো আলোচনা করেননি। তাই প্রশ্ন জাগে তাঁরা লোধা, খেড়িয়া ও শবরকে একই জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে গণ্য করেছেন কিনা। আমাদের ক্ষেত্রসমীক্ষায় লোধা ও খেড়িয়া — উভয় জনজাতির ক্ষেত্রেই ‘শবর’ পরিচয়টি যুক্ত করে নেবার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। People’s
Linguistic Survey of India-র কাজ করার সময়ে লোধা ও খেড়িয়া জনজাতির ভাষা প্রতিনিধিরা নিজেদের ভাষাকে যথাক্রমে ‘লোধা শবর’ ও ‘খেড়িয়া শবর’ বলে উল্লেখ করেছেন। সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা শবর জনজাতির আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন — “মনে হয় ১৯৯১ সালে যাঁরা শবর হিসাবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছিলেন তাঁদের একাংশ ২০০১ সালে অপর কোনও পরিচয়ে রেকর্ডভুক্ত হয়েছেন। খুব সম্ভবতঃ এঁরা লোধা পরিচয়ে রেকর্ডভুক্ত হয়েছেন।” কে. এস. সিং সম্পাদিত ‘People of India’ সিরিজে ‘তফসিলভুক্ত জনজাতি’ গ্রন্থে শবরদের কোনো উল্লেখ নেই। রিজলি সাহেব তাঁর বইয়ে শবরজাতির উল্লেখ করে তাদের দ্রাবিড় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা করেছেন। ক্যানিংহাম সাহেব তাঁর বইয়ে ভাষাগত বিচারে শবরদের কোল গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রিজলির মতে এঁরা ওড়িশা, ছোটনাগপুর, বাংলার পশ্চিমভাগ, মাদ্রাজ ও মধ্যপ্রদেশে ছড়িয়ে ছিলেন। ক্যানিংহামের মতে শবর কথাটি ‘সগর’ থেকে এসেছে এবং স্কাইথিয়ান ভাষায় ‘সগর’ শব্দের অর্থ ‘কুঠার’। বনে জঙ্গলে ঘোরার সময়ে কাঁধে কুঠার নিয়ে ঘুরতেন বলে এঁদের নাম শবর হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এঁদের বাস মূলতঃ পুরুলিয়া (১৬.৪ শতাংশ) ও মেদিনীপুর (৫৯.৪ শতাংশ) জেলায়। লোধাদের মত শবররাও ভূমিহীন জাতি। বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার শবররা বিবাহ অনুষ্ঠানে নিম্নশ্রেণীর ব্রাহ্মণ পুরোহিত ডাকেন।
(তথ্য সূত্রঃ পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী — সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা)
‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ বইতে ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে ‘লোধা’ শব্দটির উৎস সন্ধান করতে গিয়ে সংস্কৃত ‘লুব্ধক’ শব্দের উল্লেখ করেছেন। ‘লুব্ধক’ মানে ‘ব্যাধ’। লোধারাও ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করে। তাই তিনি অনুমান করেন তারা এইভাবে ‘লোধা’ নামে পরিচিত হয়েছে। ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে ১৯০১ সালের জনগণনা রিপোর্টের উল্লেখ করেছেন যেখানে বলা হয়েছে লোধারা মূলতঃ মধ্যপ্রদেশ থেকে এসেছে। উনিও রিজলের উল্লেখ করেছেন। রিজলে যাদের ‘শবর’ বলেছেন এরা তাদের স্বজাতি। কিন্তু ময়ূরভঞ্জে শবরদের লোধাদের থেকে ‘উঁচু জাত’ বলে গণ্য করা হয়। হয়ত নিজের জাতিকে সমাজের চোখে সম্মানজনক অবস্থানে রাখার জন্য লোধারা নিজেদের ‘লোধা শবর’ বলে পরিচয় দেয়। ‘People’s Linguistic Survey of India’-তে ‘লোধা শবর’ পরিচয়ে একটি পৃথক অধ্যায় সংযোজন করা হয়েছে। ‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ বইটিতে লেখক ১৯৬১ সালের জনগণনার উল্লেখ করে বলেছেন যে লোধার সঙ্গে খেড়িয়া বা খাড়িয়া জনজাতিকেও গণনা করা হয়েছিল। তাদের সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকলেও তাদের একই গোষ্ঠীভুক্ত করা হয়েছিল। লোধারা প্রকৃতিগত ভাবে প্রাক্-দ্রাবিড় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের নিজস্ব ভাষা নেই, দেহাতী বাংলায় কথা বলে। কথাবার্তা বলার সময় উচ্চারণ ধ্বনির মধ্যে ওড়িয়া ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কের এই পর্যবেক্ষণটি আমাদের ক্ষেত্রসমীক্ষার সময়েও লক্ষ্য করা গিয়েছিল। লোধারা নিজেদের ‘শবর’ বলে পরিচয় দেয় এ কথা আগেই বলা হয়েছে। এর আর একটি বড় কারণ ওরা রামায়ণের শবরীর প্রতীক্ষার কাহিনীটিকে নিজেদের ঐতিহ্য মনে করে। অপরাধপ্রবণ জাতির তকমা থাকায় মিশনারিরাও তাদের ব্রাত্য করে রেখেছিল। এর ফলে শিক্ষা ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক পরিষেবা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছিল। লোধারা আদিম জনজাতি (Primitive Tribe)। পশ্চিমবঙ্গে তিনটি জনজাতি গোষ্ঠী Primitive Tribe স্বীকৃতি পেয়েছে — বিরহড়, লোধা এবং টোটো। এদের এখন Vulnerable Tribe বলে পরিচয় দেওয়া হয়।
বিস্ময়করভাবে প্রদ্যোত ঘোষের ‘বাংলার জনজাতি’ বইটিতে লোধা, খেড়িয়া বা খাড়িয়া এবং শবর গোষ্ঠীর কোনো উল্লেখ নেই। ২০০৭ সালে প্রকাশিত প্রথম খণ্ডটিতে এই গোষ্ঠীগুলি সম্বন্ধে কোনো আলোচনা পাওয়া যায় না। ভেরিয়ার এলুইন-এর ‘The Aboriginals’ (১৯৪৪) গ্রন্থের শেষে ‘প্রাসঙ্গিক তথ্য’ অংশে সম্পাদক ঋত্বিক মল্লিক খেড়িয়া বা খাড়িয়া জনজাতির পরিচয় দিয়েছেন ব্রিটিশ রাজত্বকালে এক অপরাধপ্রবণ জাতি হিসেবে। এদের মূল দুটি গোষ্ঠী — দুধ ও ঢেলকি। অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের অন্তর্গত হলেও স্থান অনুসারে বাংলা, হিন্দি ও ওড়িয়া ভাষাতে কথা বলে। এই বইতে শবর বা সাওরা গোষ্ঠীর বর্ণনাও মেলে। শবর শব্দের অর্থ ‘পাহাড়ি, বর্বর’। নৃবিজ্ঞানীরী এদের চিহ্নিত করেছেন ‘an ancient aboriginal community which had a widespread distribution in middle and south-eastern India during the period 800 BC to AD, 1200. প্লিনি ও টলেমির লেখাতেও এদের উল্লেখ মেলে। চর্যাপদেও উল্লেখ আছে। ওড়িশায় এদের সংখ্যা চার লক্ষেরও বেশি। এরা কাঠের কাজে অত্যন্ত পারঙ্গম। হয়তো এই কারণে জগন্নাথদেবের দারুবিগ্রহ ও রথ নির্মাণে এদের বিশেষ প্রয়োজন থাকে। Verrier Elwin-এর ‘The Tribal Art of Middle India’ এবং ‘The Religion of an Indian Tribe’ বই দুটিকে শবরদের ‘ইত্তালান’ নামক দেওয়াল অঙ্কন শিল্পের বিস্তৃত আলোচনা আছে। (তথ্যসূত্রঃ ঋত্বিক মল্লিক — ভেরিয়ার এলুইন-এর আদিবাসী)
হো / কোল-হো — ‘পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী’ বইতে হো-দের মূল বাসভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার কোলহান এলাকা। এঁদের কোল বা লারকা কোল নামেও পরিচিতি ছিল। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ, কালাহাণ্ডি ও সংলগ্ন এলাকায় এরা বসবাস করেন। পশ্চিমবঙ্গে হো-দের সংখ্যা নগণ্য। ২০০১-এর জনগণনায় এই সংখ্যা ১৫,৫৪০। মূলতঃ পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় এদের বাস। প্রায় ৭২.৬ শতাংশ মানুষ এই দুই জেলায় থাকেন। জলপাইগুড়ি চা-বাগান, হাওড়া ও হুগলীতে কিছু হো মানুষের বসবাস রয়েছে। হো-দের সাক্ষরতার হারও সাঁওতাল, মুণ্ডাদের তুলনায় বেশ কম। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে এদের সাক্ষরতার হারও কমেছে। অথচ সাঁওতাল ও মুণ্ডাদের মত হো-রাও অস্ট্রো-এশীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ভাষা পরিবারও এক। তাই মুণ্ডা ও হো জনজাতির মানুষেরা পরস্পরের ভাষা বোঝেন। সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা একটি জনশ্রুতির উল্লেখ করেছেন, কথিত আছে, মুণ্ডাদের দাঁত পড়ে গেলে তাঁরা হো ভাষায় কথা বলেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত হো-রা জনগণনায় নিজেদের ‘হিন্দু’ বলে চিহ্নিত হতে দেন নি। এখান থেকে বোঝা যায় তাঁদের আত্মপরিচিতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বেশ শক্তিশালী ছিল। ১৮৩১-৩২এর কোল বিদ্রোহ ছাড়াও ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে হো-রা অনেক আন্দোলন করেছিলেন।
ডালটনের ‘Descriptive Ethnology of Bengal’ বইতে মন্তব্য করা হয়েছে যে হো-জাতির মধ্যে আর্য রক্তের সংমিশ্রণ ঘটেছে সবচেয়ে বেশী। এতদ্ সত্ত্ৱেও এদের মধ্যে ‘অন্য ধর্মাবলম্বী’ মানুষ ৮১.৬ শতাংশ। জনগণনায় ‘হিন্দু’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে কম। ইংরেজদের সঙ্গে প্রায় ১৯০০ সাল পর্যন্ত তীব্র আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য এরা ‘লড়াকু কোল’ নামেও পরিচিত।
পশ্চিমবঙ্গের হো-রা ১৯৫৬ সালের ‘The Scheduled Castes and Scheduled Tribes Order (Amendment)’ অনুযায়ী আদিবাসী তালিকাভুক্ত হয়। অবশ্য ১৯৫১ সালের জনগণনায় হো-দের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫১। পরবর্তীকালে কিছু সংখ্যা বাড়লেও ‘Scheduled Tribe’-এর স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও বহু সমস্যা দেখা দিয়েছে। ‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ বইতে ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে লিখেছেন হো-দের অবস্থা পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে অত্যন্ত সংকটজনক। তিনি লিখছেন — “ওকাপি বা এক শিঙ্গা গণ্ডার যেমন ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, আমাদের এক প্রাচীন মানব শ্রেণীও কি ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হবে ? তাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু এই দেশের সরকারের নয়, আন্তর্জাতিক দায়িত্বও বটে।”
প্রদ্যোত ঘোষের লেখা ‘বাংলার জনজাতি’ গ্রন্থে হো বা কোলদের ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে পৃথকভাবে কিছুই লেখা হয়নি। এদের মুণ্ডা শাখার অন্তর্ভুক্ত করে শুধু একটি সৃষ্টি কথার উল্লেখ করে আলোচনা শেষ করা হয়েছে। তবে ভেরিয়ার এলুইন-এর ‘The Aboriginals’ গ্রন্থের ‘প্রাসঙ্গিক তথ্য’ অংশে সম্পাদক ঋত্বিক মল্লিক ‘হো’ জনজাতির উল্লেখ করেছেন। হিন্দুধর্মের প্রকোপ এদের মধ্যে ছড়ায়নি বলে তিনিও অভিমত পোষণ করেন। এরা নিজস্ব আদিবাসী ধর্মেই বিশ্বাসী। এদের মাতৃভাষা হো অস্ট্রিক ভাষা বংশের খেড়োয়ারি শাখার অন্তর্ভুক্ত।
তবে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের কোল-হো গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষেত্রসমীক্ষা করার সময়ে আমাদের নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে সক্রিয় সদস্য কার্ত্তিক চন্দ্র বাঁআদা অভিযোগ করেন কিভাবে পশ্চিমবঙ্গে স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলন এখনো সেভাবে সাফল্য পায়নি। সমস্যাটা নামকরণ নিয়ে হচ্ছে। ঝাড়খণ্ডে হো-রা ST সম্প্রদায়ভুক্ত। ওড়িশায় কোল-রা SC তালিকাভুক্ত। অথচ পশ্চিমবঙ্গের কোলদের জন্য সুদীর্ঘকাল সংরক্ষণের সুবিধে মেলেনি। কলকাতায় অবস্থিত Cultural Research Institute পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংস্থা যেটি এইসব বিষয়ে সরকারীভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে এই জনজাতি ‘কোল’ নামে পরিচিত ছিল আর ST তালিকাভুক্ত ছিল ‘হো’, তাই স্বীকৃতি মেলেনি। কার্ত্তিক বাবুরা অনেক ছোটাছুটি করে, ইতিহাসের বই ও নথিপত্র দেখিয়ে বারংবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে যিনি ‘কোল’, তিনি ‘হো’। কিন্তু সমস্যা রয়েই গেছিল। অতি সম্প্রতি সরকারী হস্তক্ষেপে আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে। জেলাশাসকের দপ্তর থেকে বিশেষ শুনানির ব্যবস্থা করে ‘হো’ হিসেবে ST শংসাপত্র বিতরণের একটা প্রচেষ্টাও হয়েছে। বিক্ষিপ্তভাবে বণ্টন চলছে। কিন্তু কোল-হো ভাষার স্বীকৃতি নেই। প্রাথমিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেই। কার্ত্তিকবাবুরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুটি স্কুল চালাচ্ছেন। শিশু ও বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র চালাচ্ছেন। ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসছেন। হো-দের নিজস্ব লিপি আছে। সাঁওতালদের যেমন ‘ওলচিকি’, হো-দের তেমন ‘বারাং-ক্ষিতি’। এই লিপির প্রবর্তন করেন গুরু লাকো বদরা। হো ভাষায় সমৃদ্ধ সাহিত্যের নমুনাও রয়েছে। কার্ত্তিকবাবু স্বয়ং একজন প্রতিষ্ঠিত কবি ও গল্পকার। প্রকাশক নেই। নিজের খরচে বই ছাপাচ্ছেন। একাই প্রচেষ্টা করছেন। কিন্তু সংকট মোচনের আশু কোনো লক্ষণ নেই।
মাহালি – এই জনগোষ্ঠীটি আমরা ভারত ভাষা সর্বেক্ষণের ক্ষেত্র সমীক্ষা করার সময়ে আবিষ্কার করি। পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনী ও লালগড় এলাকায় বেশ কিছু মাহালি জনজাতির মানুষ বসবাস করেন। গোয়ালতোড় কলেজে ২০১৩ সালে একটি কর্মশালায় আমরা মাহালি জনজাতির প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার নিই। এঁরা পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি ব্লক থেকে এসেছিলেন। লালগড়ের শত্রুঘ্ন মাহালি ৯০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধী। সবসময় খাটিয়ায় শুয়ে তাঁর দিন কাটে। কিন্তু মাহালি সাহিত্য চর্চায় তাঁর অসীম আগ্রহ। সম্পূর্ণ শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মশালায় যোগদান করেছিলেন। তিনি এবং আরো এক ডাক্তার, অভিজিৎ রায়, মাহালি সাহিত্যের নমুনা আমাদের কাছে পেশ করেন। তবে পরবর্তী ক্ষেত্রে ভাষাবিদদের সহায়তায় মাহালি সাহিত্যের নমুনা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখতে পাই সাঁওতালির সাথে মাহালির সেভাবে কোনো প্রভেদ নেই।
রিজলির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Tribes and Castes of Bengal’–এর এক জায়গায় মাহালিদের পরিচয় দিয়ে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছেন—
“মাহালিরা খুব অল্পদিন হল মূল সাঁওতালি জনজাতি থেকে ভেঙ্গে এসেছেন। তাঁরা কিছু হিন্দু দেবদেবীর পুজো করলেও সাঁওতাল দেবতাদেরও পুজো করেন। সাঁওতালদের মত তাঁদের জাতি সংগঠনের সমস্যার দেখাশোনা করেন এক পারাগানাইত। আমি তাঁদের সাঁওতাল বলেই চিহ্নিত করব, যাঁরা মুড়ি তৈরির নীচু পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন।” (সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা, ৯৩)
মেদিনীপুর ও পুরুলিয়ার মাহালিরা সাঁওতালি ও কুড়মালি ভাষায় কথা বলেন। সাঁওতালদের মতই পদবী যেমন বেসরা, টুডু, মুর্মু প্রভৃতি ব্যবহার করেন। মাহালি ভাষা মুণ্ডাগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। কিন্তু তারা ক্রমশঃ হিন্দু মনোভাবাপন্ন হয়ে পড়ায় আর নিজস্ব ভাষায় কথা বলেন না। পুরুলিয়া বা মানভূমের লোকেরা বাংলায় কথা বলেন। এটাকে ‘মানভূমী বাংলা’ বলা হয়। ১৯৫৬ সালের ‘The Scheduled Castes and Scheduled Tribes Order (Amendment) Act’ অনুযায়ী মাহালিরা আদিবাসী তালিকাভুক্ত। কিন্তু ১৯৭১-এর জনগণনায় ৯০.৪৯ শতাংশ মাহালিই নিরক্ষর। সংরক্ষণের সুযোগ তারা নিতে পারেনি। গ্রীয়ারসনের ‘Linguistic Survey of Bengal’–এ মাহালি নামে কোনো ভাষাগোষ্ঠীর উল্লেখ নেই। শ্যামলকান্তি সেনগুপ্তের লেখা ‘Social Profiles of the Mahalis’-এ মাহালিদের সামাজিক চরিত্রটি পরিস্ফুট হলেও এদের ভাষা সংস্কৃতির বিষয়টি কোনো ভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
কোড়া – অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে জর্জ আব্রাহাম গ্রীয়ারসনের ভাষা সমীক্ষায় কোড়া জনজাতির কোনো উল্লেখ নেই। আজ একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে ভাবতে অবাক লাগে কিভাবে গ্রীয়ারসন কিছু সরকারী আধিকারিক, ভারতীয় ভাষাবিদ বন্ধু ও অল্পশিক্ষিত স্বদেশী সাহায্যকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নিজের সমীক্ষা সম্পন্ন করেছিলেন। কোড়ার কপালে ভাষা তো দূর অস্ত, উপভাষা বা তস্য উপভাষা বা মিশ্র তস্য উপভাষা কোনো তকমাই জোটেনি। একটা আস্ত ভাষা সংস্কৃতি এইভাবে বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গিয়েছিল এই বিদেশী ভাষাবিদের সমীক্ষার সৌজন্যে যা কিনা জনজাতি সমাজের পক্ষে সামগ্রিকভাবে যথেষ্ট অবমাননাকর।
অথচ ‘পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী’ গ্রন্থে পশ্চিমবঙ্গে কোড়াদের বিষয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। মেদিনীপুর (১৭.৪ শতাংশ), পুরুলিয়া (১৫.২ শতাংশ), বাঁকুড়া (৭.৬ শতাংশ), বর্দ্ধমান (২৬ শতাংশ), হুগলী (৭.৯ শতাংশ) ও বীরভূম (৯.৪ শতাংশ) জেলায় কোড়া সমাজের মানুষজন দীর্ঘকাল বসবাস করছেন। ২০০১-এর জনগণনা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে কোড়ার সংখ্যা ১,৪২,৭৮৯।
রিজলীর সাহেবের বইতে কোড়াদের মুণ্ডা জনজাতির একটি অংশ বলে ধরা হয়। কুমার রাণা ও সন্তোষ রাণা এই অনুমানকে সঠিক বলে মত প্রকাশ করেছেন। তবে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এঁরা অঞ্চল বিশেষে মুণ্ডারি ও কুড়মালিভাষার দ্বারা অনেকখানি প্রভাবিত। কোড়ারা ST তালিকাভুক্ত। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারী পদে কর্মরত। কোড়াদের একটি ছোট অংশ খ্রীষ্টান। বাকিদের সেন্সাসে ‘হিন্দু’ বলে গণ্য করা হয়। ‘অন্যান্য ধর্মাবলম্বী’ লেখানোর প্রতিরোধ সেভাবে গড়ে ওঠে নি। ময়ূরভঞ্জ, ওড়িশা ও গোপীবল্লভপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরের কোড়ারা কুড়মালি মিশ্রিত ভাষা ব্যবহার করেন। অন্যদিকে বীরভূমের কোড়ারা মুন্ডারির প্রভাবঋদ্ধ ভাষায় আদানপ্রদান করেন।
‘বাংলার জনজাতি’ গ্রন্থে প্রদ্যোত ঘোষ কোড়াদের অনেকগুলি বিকল্প নামে চিহ্নিত করেছেন। এগুলি হল ‘কাওরা,’, ‘খইরা’, ‘খয়রা’ ও ‘কারা’। এদের দ্রাবিড়ীয় অস্ট্রিক-ভাষাগোষ্ঠীর কৃষিজীবী জনজাতি নামে অভিহিত করা হয়েছে রিজলীর ‘The Tribes and Castes of Bengal’ গ্রন্থে। পশ্চিম ও দক্ষিণ বঙ্গের মুণ্ডা জাতিরই একটি শাখা হল কোড়া সমাজ।
প্রবোধকুমার ভৌমিক তাঁর বই ‘প্রথাসিদ্ধ আইন প্রসঙ্গে - কোড়া’-তে কোড়াদের উপর বৈষম্যের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করেছেন। সাঁওতালিতে কোড়ার অর্থ ‘ছোট’। এখানে বৃহত্তম জনজাতি গোষ্ঠী সাঁওতাল একটি ক্ষুদ্র জনজাতি গোষ্ঠীর প্রতি অবহেলার মনোভাব প্রকাশ করেছে। প্রবোধবাবুর মতে, সম্ভবতঃ কোড়ারা জমি হারিয়ে দিন মজুরীর কাজ করতো বলে সাঁওতালরা তাদের ‘পতিত’ বলত। এই অবজ্ঞা থেকে তাদের ‘কোড়া’ নামে ডাকা শুরু হয়। তাই শুধু গ্রীয়ারসন বা স্বাধীনতা পরবর্তী দেশীয় শাসকেরাই নন, আদিবাসী সাঁওতাল গোষ্ঠীও ঔপনিবেশিক centre- margin–এর ক্ষমতায়নের discourse–টিকে সযত্নে লালন করেছেন। তাতে কোড়া ভাষা সংস্কৃতির সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ বইতে ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে কোড়াদের আদি অস্ট্রাল শ্রেণীর জনজাতি এবং মুণ্ডাদের বিচ্ছিন্ন শাখা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা মাটি কাটা ক্ষেতমজুর হওয়ায় মুণ্ডা সমাজ তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আদিবাসী সমাজের অন্তর্নিহিত স্তরবিন্যাসের বিষয়টি এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়। সাঁওতালদের সাথে তাদের বিশেষ যোগ আছে বলে শ্রী বাস্কে মন্তব্য করেছেন। সেক্ষেত্রে সাঁওতালদের অবজ্ঞার বিষয়টি সামগ্রিকভাবে কোড়া-সাঁওতাল জাতি সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। এই বইয়ে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে কোড়ারা আর মুণ্ডারি গোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহার করে না। বাংলা ও হিন্দিতে বেশী কথা বলে থাকে। বেশ কিছু জায়গায় ‘সাদ্রি’ ভাষাও ব্যবহার করে। ‘শাক্ত’ কোড়া ও ‘বৈষ্ণব’ কোড়াও দেখা যায়। হিন্দু ধর্মের প্রভাব বেশ জোরালো। ১৯৫৬ সালের আইন মোতাবেক কোড়ারা ST একথা আগেই আলোচিত হয়েছে। কিন্তু আদিবাসী উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের সেভাবে শামিল করা হয়নি। ভাষা সংস্কৃতি চর্চার বিষয়টি তো আরো পরের কথা। ১৯৭১-এর আদমসুমারিতে ৯১.৫৭ শতাংশ কোড়া নিরক্ষর ও মাত্র ০.৩২ শতাংশ ম্যাট্রিক বা স্কুল ফাইনাল অবধি পড়েছে। ১৯৯৫ সাল অবধি জমি বণ্টনের সুবিধাও তারা পায়নি। তাই ভূমিহীন খেতমজুর হিসেবে থেকে গেছে। ভেরিয়ান এলুইন-এর ‘The Aboriginals’ গ্রন্থেও কোড়া জনজাতির কোনো উল্লেখ নেই।
বিরহড় — মুণ্ডারি ভাষায় ‘বির’ শব্দের অর্থ ‘জঙ্গল’ এবং ‘হড়’ শব্দের অর্থ মানুষ। ‘বিরহড়’ মানে তাই জঙ্গলের মানুষ। এরা মূলতঃ ভবঘুরে জাতি। এদের মাতৃভাষা বিরহড় অস্ট্রো-এশীয় গোষ্ঠীর ভাষা। পশ্চিমবঙ্গে এরা খুব ছোট জনগোষ্ঠী। তিনটি primitive tribe–এর একটি বিরহোড়। ২০০১-এর লোকগণনায় এদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১,০১৭। মূলতঃ পুরুলিয়া, মালদা ও উত্তর ২৪ পরগণা জেলায় এদের বসবাস। লোকগণনায় এদের ‘হিন্দু’ বলে গণ্য করা হয়। ঋত্বিক মল্লিক ভেরিয়ার এলুইন-এর ‘The Aboriginals’ গ্রন্থের সম্পাদনায় ‘প্রাসঙ্গিক তথ্য’ অংশটি সংযোজন করেন। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিরহড় মুণ্ডাদেরই একটি অংশ। বিরহড়দের ভাষা মুণ্ডারি ভাষার অন্তর্গত। এদের যাযাবর গোষ্ঠী ‘উথালু’ বা ‘ভুলিয়া’ ও স্থায়ীভাবে বসবাসকারী গোষ্ঠী ‘জাঘি’ বা ‘থানিয়া’ নামে পরিচিত। তবে এলুইন ও ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে উভয়ের মতেই পশ্চিমবঙ্গের শুধুমাত্র পুরুলিয়া জেলায় বিরহড়দের বসতি। পুরুলিয়া জেলার বাগমুণ্ডি থানার ‘ভূপতিপল্লী’ গ্রামে সরকারী প্রকল্পে তাদের স্থায়ী আস্তানা করে দেওয়া হয়েছে। বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় তাদের ব্যাপক বসতি থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যাটা নগণ্য। আমাদের ক্ষেত্রসমীক্ষায় দেখা গেছে শিকারের মরসুমে সরকারী ঘরবাড়ি ছেড়ে তারা দলে দলে জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করে। ২০১২ সালে এমন এক ক্ষেত্রসমীক্ষায় ভূপতিপল্লী গিয়ে দেখা যায় সমগ্র লোকালয় একেবারে জনশূন্য। পাশের গ্রামে খবর নিয়ে জানা গেল যে তারা সবাই জঙ্গলে গেছে। তবে একথাও ঠিক যে আদি বিরহড় অর্থাৎ যাযাবর ‘উথালু’ বা ‘ভুলিয়া’রা নিজেদের ভাষা সংস্কৃতিকে যেভাবে দৈনন্দিন ব্যবহারে জীবন্ত করে রেখেছিল পরবর্তী ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসকারী ‘জাঘি’ বা ‘থানিয়া’রা তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলে গিয়ে আলোচনা করে দেখা যায় সেখানকার একমাত্র শিক্ষিকা একজন অন-আদিবাসী মানুষ যাঁর মাতৃভাষা বাংলা। ফলতঃ মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাগ্রহণের কোনো সুযোগ বিরহড় পড়ুয়ারা কখনোই পায় না। এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী জনজাতীয় ভাষা সাঁওতালি শেখার সুযোগও এখানে নেই। বাংলা, ইংরেজী, হিন্দির বাইরে আর ভাষাশিক্ষার কোনো পরিবেশ নেই। কিংবদন্তী অনুযায়ী ‘বিরহড়’ নামকরণের মধ্যে কোড়ার মতই উপহাস আছে। ‘বন্য’ বলে এক বিদ্রূপ আছে। তিন ভাইয়ের মধ্যে দুভাই রামগড়ের রাজা আর এক ভাই অরণ্যে থেকে যাওয়ায় ‘বিরহোড়’। আদিবাসীদের মধ্যে প্রান্তিক অবস্থানের ভাষাসংস্কৃতি গোষ্ঠীগুলি জনজাতি সমাজের প্রবল বিদ্রূপ ও উপহাসের পাত্র হয়েছে। সেইসঙ্গে গ্রীয়ারসনের ‘Linguistic Survey of Bengal’ গ্রন্থে বিরহড়ের কোনো উল্লেখ নেই। যেখানে শরৎচন্দ্র রায় বা বিরজাশঙ্কর গুহ-র মত নৃতাত্ত্বিকেরা বিরহোড়দের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন সেখানে গ্রীয়ারসনের ‘ভাষাধরা’ দেশীয় আধিকারিকরা পশ্চিমবঙ্গে একজনও বিরহড় পেলেন না, ভাষার নমুনা পেলেন না !
মুন্ডারি — পশ্চিমবঙ্গের সব জেলাতেই মুণ্ডারা অল্পবিস্তর ছড়িয়ে আছে। ‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ বইয়ে ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে বলেছেন যে তারা ছোটনাগপুরের আদি-অস্ট্রাল শ্রেণী থেকে এসেছে যাদের বলা হত ‘মুরা’ বা ‘হোরোহন’। তাঁর মতে মুণ্ডারাই ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম সমানাধিকারের ভিত্তিতে গ্রাম সমাজ পত্তন করেছিল। ভূমিদাসত্বের কারণে মুণ্ডাদের স্বল্প ব্যয়ে কঠোর শ্রম প্রদানের জন্য সুন্দরবন, নদীয়া ও মুর্শিদাবাদে নীল চাষের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং-এর চা বাগানেও কুলি হিসেবে এদের নিয়োগ করা হয়। এখনো সেইসব অঞ্চলে ধনী অন-আদিবাসী মানুষের কাছে তারা দায়বদ্ধ শ্রমিক। ১৯৮১-র লোকগণনায় এ রাজ্যের আদিবাসী জনসংখ্যার মাত্র ৭ শতাংশ মুণ্ডা।
মুণ্ডারি ভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় আজকাল মুণ্ডাদের অনেকেই ‘সাদরি’ ভাষায় কথা বলে। আর বাংলা ব্যবহৃত হয় দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে।
ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই মুণ্ডারা বঞ্চনার শিকার। কোলারিয়ান গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে মুণ্ডাদের উপর ব্রিটিশ ও দিকু-মহাজনরা কি ধরনের নির্মম নির্যাতন চালাত তার এক সংক্ষিপ্ত ছবি পাওয়া যায় শরৎচন্দ্র রায়ের লেখা ‘The Mundas and their Country’ বইতে —
When the oppressor wants a horses the Kol must pay; when he desires a ‘palki’, the Kols have to pay and afterwards to bear him therein. They must pay for his musicians, for his milch cows, for his pan. Does someone die in his house ? He taxes them; is a child born ? again a tax; is there a
marriage or puja ? a tax. Is the ‘Thikadar’ found guilty at cutchary and
sentenced to be punished ? The Kol must pay the fine. Or does a death
occur in the house of the Kol ? The poor man must pay a fine. Is a child born ? Is a son or daughter married ? The poor Kol is still taxed. And this
plundering, punishing robbing system goes on till the Kols run away. These unjust people not only take away everything in the house, but even force the Kols to borrow, that they may obtain what they want, reminding one of Sydney Smith’s account of the poor man taxed from birth to his coffin. Again whenever the Thikadar has to go to Kutchary or to the king to a marriage or a pilgrimage, however distant the place, the Kol must
accompany him and render service without payment. [Roy, 19].
এই অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিরসা মুণ্ডা ‘উলগুলান’-এর ডাক দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ অত্যাচারী জমিদার-মহাজন ও ব্যবসায়ীদেরও তিনি মুণ্ডা জাতির শত্রু বলে ঘোষণা করেন। ১৮৯৯-১৯০০ সালে এই বিদ্রোহ চরম আকার নেয়। কিন্তু বিরসা মুণ্ডার মৃত্যুর পরে বৃটিশরাজের অত্যাচারে মুণ্ডাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির দারুণ অবনতি ঘটে।
১৯৫০ সালের ‘Scheduled Tribes Order’ অনুযায়ী মুণ্ডারা তফসিলভুক্ত হয়েছে। এমনকি ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদ্স্য নির্বাচিত হন। অথচ ১৯৫২ সালের জুন মাস থেকে আদিবাসী কল্যাণ বিভাগের কাজ শুরু হলেও মুণ্ডা জনপ্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও মুণ্ডা সমাজে সেইসব প্রকল্পের সুবিধে পৌঁছয়নি। সঠিক প্রচারের অভাব ও মুণ্ডাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে তারা শিক্ষা-দীক্ষায় খুব অগ্রসর হতে পারেনি। ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন যেগুলি সাধারণভাবে বিপন্ন ভাষাগোষ্ঠীগুলির ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে প্রামান্য হতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে মুণ্ডাদের এত শোচনীয় অবস্থা কেন ? প্রাথমিক স্তরে মুণ্ডা শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীর সংখ্যা এত নগণ্য কেন ? তারা কি শিক্ষিত হতে চায় না ? শিক্ষাপদ্ধতিতে কি কোনো গলদ আছে যা তাদের বিদ্যার্জনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ? আর এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনেক অস্বস্তিকর তথ্য উঠে এসেছে। মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা (Mother Tongue based Multi-lingual Education) সমস্ত আদিবাসী শিশুদের জন্য চালু করা যায় নি। মার্শাল হেমব্রম, ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কের মত সাঁওতাল বুদ্ধিজীবীরা স্বীকার করেছেন একমাত্র সাঁওতালি ভাষাকে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম করা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য আদিবাসী ভাষা এখনো প্রাথমিকে চালু হয়নি। মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষা তেমন ভাল না জানায় আদিবাসী শিশুরা স্কুলমুখো হতে চায় না। তাছাড়া আদিবাসী শিক্ষার্থীর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পড়াশোনার জন্য একেবারেই উপযোগী নয়। দারিদ্র্যের কারণে মা-বাবা ছেলেমেয়েদের স্কুলে না পাঠিয়ে গোরু ছাগল চরাতে মাঠে পাঠায়। চাষবাসের সময়ে বাড়ীর লোকেদের সাহায্য করতে তাদের ক্ষেতখামারে যেতে হয়। এ অবস্থায় ভালোভাবে পড়াশোনা চালানো অসম্ভব। তাই প্রাথমিক স্তরেই স্কুলছুটের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। আদিবাসী আবাসিক বিদ্যালয় অনেক বেশী করে স্থাপন করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে আমাদের ক্ষেত্রসমীক্ষায় অনেক তথ্য হাতে এসেছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রামে, বাঁকুড়ার খাতড়ায়, পুরুলিয়ার শুশুনিয়ায় ও বর্ধমানের কাঁকসায় একলব্য আদিবাসী স্কুলে শিক্ষাদানের পর্ব চলছে। আমরা ক্ষেত্রসমীক্ষার অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় লিখব। তবে মুণ্ডারি ভাষা পশ্চিমবঙ্গে কেন বিপন্ন হয়ে পড়ল তা নিয়ে আমাদের কৌতূহল ছিল। যেখানে পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ড রাজ্যে মুণ্ডারা বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী সেখানে পশ্চিমবঙ্গে তারা মোট জনজাতি সংখ্যার ৭ শতাংশেরও কম। শুধু তাই নয় ঝাড়খণ্ডে যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য— সব জায়গাতেই মুণ্ডাদের প্রাধান্য রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে সে জায়গায় জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মু্ণ্ডা আদিবাসীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত কম। রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ে মু্ণ্ডারি ভাষায় গবেষণার কাজ পুরোদমে চললেও পশ্চিমবঙ্গে কোনো মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে মুণ্ডারি ভাষায় পঠনপাঠন বা গবেষণার সুযোগ নেই। বিদ্যালয় স্তরে মু্ণ্ডারি ভাষায় শিক্ষাগ্রহণের সুযোগের অভাব নিয়ে আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে আরো বিশদে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে।
জর্জ আব্রাহাম গ্রীয়ারসনের ‘Linguistic Survey of Bengal’-এর ৭৭ পৃষ্ঠায় ‘Western Bengal’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অদ্ভুতভাবে ছোটনাগপুরের আদি জনজাতিগোষ্ঠী মুণ্ডাদের ভাষাকে ‘Munda dialects’ বলে খাটো করা হয়েছে। একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর ভাষাকে ‘dialect’ বলে অভিহিত করার মধ্যে সেই একভাষিকতার রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
সাঁওতালি — আগেই আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছি গ্রীয়ারসনের ‘Linguistic Survey of Bengal’ গ্রন্থে একমাত্র সাঁওতালিকে ‘Tribal language’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বইয়ের ১১৬, ১১৭, ১৩৩ ও ১৪৩ পৃষ্ঠায় তিনি সাঁওতালিকে ‘language’ বলে উল্লেখ করে গেছেন।
২০০১ সালের জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সাঁওতালরা বৃহত্তম। পশ্চিমবঙ্গে মোট জনজাতি সংখ্যার ৫১.৮ শতাংশ সাঁওতাল। এখনো শিক্ষার হার খুবই কম। যেসব জেলায় সাঁওতালরা সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় বসবাস করছে সেগুলি হল মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমান, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা ও হুগলি। সারা ভারতের হিসেবে সাঁওতালরা তৃতীয় বৃহত্তম জনজাতি গোষ্ঠী। প্রতিবেশী ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় প্রচুর সাঁওতাল গোষ্ঠীর বাস। যদিও অসমে সাঁওতালদের Scheduled Tribe হিসেবে গণ্য করা হয় না।
রিজলি তাঁর বইতে সাঁওতালদের দ্রাবিড়ীয় জনজাতি বলে অভিহিত করেন। তাঁদের ভাষাকে কোলারিয়ান পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু রিজলির মত নৃতাত্ত্বিকেরা ঔপনিবেশিক ভাবধারায় পরিপুষ্ট ছিলেন। ফলতঃ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে বর্বর, অর্ধ-বর্বর ইত্যাদি আখ্যা দিয়েছেন। এর ফলে জাতিগত ঘৃণার মানসিকতা ফুটে উঠেছে। ‘পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী’ বইটিতে ১৯৮০-র দশকে বিখ্যাত ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী Stephen J. Gould–এর ‘Mismeasure of Man’ বইটির উল্লেখ করা হয়েছে। এতে anthropometry-র ঔপনিবেশিক রাজনীতিকে বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক শাসনকালে অন-আদিবাসী প্রশাসকদের মানসিকতার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী শাসক গবেষকরা আদিবাসীদের ‘উপজাতি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘উপ’ পূর্বপদ ব্যবহার করে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে যে তাঁরা ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক জাতি ব্যবস্থায় (Caste System) প্রবেশাধিকার পাননি। তাঁরা এখনো বর্বর, নীচু, করুণার পাত্র।
কে. এস. সিং সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁরাও প্রভৃতি জনজাতিকে প্রোটো-অস্ট্রেলীয় বলে চিহ্নিত করেছেন। সাঁওতালদের ভাষাকে অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন। সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে জনজাতি ভাষাগোষ্ঠীগুলির সংকট নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এর একটি অংশ তুলে দেওয়া হল—
এটা লক্ষ্য করার বিষয় যে, ভারতের জনজাতিগুলির মধ্যে অনেকে তাঁদের নিজস্ব ভাষা ভুলে গেছেন। যেমন মুণ্ডাদের এক বড় অংশ মুণ্ডারি ভাষা ভুলে গেছেন এবং তাঁরা কুড়মালি বাংলা বা সাদরিতে কথা বলেন। তাঁদের মধ্যে একাংশ (ভূমিজ ও কোড়া) আলাদা জনজাতি হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছেন। তেমনি ওরাঁওদের নিজস্ব ভাষা হচ্ছে কুড়ুখ। এটি দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা। অনেক ওঁরাও এখন কুড়ুখ ভুলে গেছেন এবং সাদরিতে কথা বলেন। বিশেষতঃ যেসব ওরাঁও উত্তরবঙ্গ বা আসামের চা বাগানে কাজ করেন তাঁদের মধ্যে সাদ্রিভাষীর পরিমাণ বেশী। সাঁওতালরা নিজেদের ভাষা ভোলেননি। তাঁদের বসবাসের মূল ভূখণ্ড ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন এলাকায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে সাঁওতালিতেই কথা বলেন। এমনকি উত্তরবঙ্গ বা আসামেও যেসব সাঁওতাল রয়েছেন তাঁরাও সাঁওতালি ভাষাতেই কথা বলেন। যেসব জনজাতি সংখ্যার দিক থেকে সাঁওতালদের চেয়েও বড় (ভীল এবং গোণ্ড) তাঁরা কিন্তু একই ভাষায় কথা বলেন না। এক ভাষাভাষী জনজাতিগুলির মধ্যে সাঁওতালরাই বৃহত্তম। ... কী কারণে সাঁওতালরা নিজেদের ভাষা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেত পারলেন এবং কী কারণে অন্যান্য জনজাতিগুলো তা পারলেন না তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে পারেন। (রাণা, ১১৭-১১৮)
মেদিনীপুরে প্রথম শিকড় বিস্তার করা জনজাতি সাঁওতাল কিভাবে এই ভাষা ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে রাখল তা সত্যিই নিবিড় গবেষণার দাবী রাখে। স্ত্রেপাসরুডের মতে এরা মেদিনীপুরের ‘সাঁওত’ নামে একটি স্থানে প্রথম অধিবাসী ছিল। খেরোয়াড় হিসেবে তাদের পরিচিতি ছিল বলে H. H. Risley–র বই ‘The Tribes and Castes of Bengal’, Vol. II–তে ২২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে। আবার E. T. Dalton–এর ‘Descriptive Ethnology of Bengal’ গ্রন্থে বলা হয়েছে সাঁওতাল নাম থেকে মেদিনীপুরের ঐ স্থানের নাম ‘সাঁওত’ বা ‘শিলদা’। সেটিই যথার্থ বলে অনুমান করা হয়েছে।
‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ গ্রন্থে ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে গ্রীয়ারসনের ‘Linguistic Survey of India’ গ্রন্থের উল্লেখ করে বলেছেন মুণ্ডা ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারপরে অনেকটা গ্রীয়ারসনের সুরে তিনি সাঁওতালিকে ভাষা ও অন্যান্য জনজাতিগুলির ভাষাকে ‘dialect’ হিসেবেই ধরে নিলেন। একটি অংশে উদ্ধৃত করলে পাঠকের কাছে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে —
একটু খোঁজ নিলেও দেখা যায় হো, মুণ্ডা, মাহালি, ভূমিজ ও কোড়া সম্প্রদায়ের আদিবাসীরাও অল্প বিস্তর সাঁওতালিতে কথা বলে থাকে। তাদের কথ্য ভাষা সাঁওতালি ভাষারই কতকটা অপভ্রংশ।
এখান থেকে বোঝা যায় বৃহত্তম জনজাতি ভাষাগোষ্ঠীর বিশেষজ্ঞরা কিভাবে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কাঠামোর অনুকরণ করে চলেছেন বিংশ শতকের শেষ দশকে এবং একবিংশ শতকের প্রথম দশকে। জনজাতীয় ক্ষেত্রেও সংখ্যার বিচারে ‘বড়’ ভাষা ও ‘ছোট’ ভাষার বৈষম্য ভীষণভাবে বর্তমান।
প্রকৃতপক্ষে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার একলব্য আদিবাসী আবাসিক স্কুলগুলিতে নিবিড় সমীক্ষা চালিয়ে আমাদের মনে হয়েছে আদিবাসী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে একমাত্র সাঁওতালি ভাষা চর্চা সরকারীভাবে চালু আছে। প্রাথমিকে সাঁওতালি কিছু জায়গায় পড়ানো হচ্ছে। অবশ্য একলব্য স্কুলগুলির কোনো প্রাথমিক শাখা নেই। বাইরের ‘feeder’ স্কুল থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে তারা ছাত্রছাত্রী ভর্তি করে। তবে সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশোনার একটি সরকারী উদ্যোগ সাম্প্রতিককালে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চ মাধ্যমিক অবধি আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা সাঁওতালি ভাষায় সব বিষয় পড়তে পারবে। অবশ্য এই সাঁওতালি মাধ্যম সাঁওতাল ছেলেমেয়েদের কাছে কতখানি গ্রহণযোগ্য হবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।
অন্যদিকে একলব্য মডেল স্কুলগুলি কেন্দ্র সরকারের পরিকল্পনায় স্থাপিত হওয়ার কারণে এখানে CBSE মাধ্যমে পঠনপাঠন চালু করার পরিকল্পনা আছে। বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামে ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশোনা চালু হয়েছে। সাঁওতাল ছেলেমেয়েরা যুগের দাবী মাথায় রেখে ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশোনার বিষয়ে বেশী আগ্রহী। এই বিষয়টি মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সরকারী নীতিকে নতুন প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
অন্যদিকে কোড়া, মুণ্ডা, হো, মাহালি ও লোধা-খেড়িয়া শবর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সাঁওতালদের তুলনায় অনেক কম। তাদের মাতৃভাষা চর্চার কোনো সুযোগ একলব্য স্কুলে নেই। মূলস্রোতের স্কুলগুলিতে এ ব্যাপারে অবহেলা আরও অনেক বেশি। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই মুণ্ডা, হো, কোড়া, খেড়িয়া, বিরহড় ছেলেমেয়েরা মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত হলে কিভাবে উচ্চবিদ্যার্জনের পথে যেতে পারবে বা পড়াশোনার আগ্রহ জিইয়ে রাখতে পারবে তা নিয়ে গভীর প্রশ্নচিহ্ন রয়ে যায়। জঙ্গলমহলের ভাষাসংস্কৃতি এভাবেই অনাদর ও অনভ্যাসে হারিয়ে যাচ্ছে। সাঁওতালি ভাষার চর্চাও শহরাঞ্চলে একেবারে কম। ২০১১-র লোকগণনায় অনেক লব্ধপ্রতিষ্ঠ, স্বচ্ছল সাঁওতালি পরিবার কলকাতা শহরে সমীক্ষায় নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা বলে পরিচয় দিয়েছেন। ভাষাগত পরিচয় এখন নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত একশ্রেণীর জনজাতীয় মানুষজনের কাছে আর কোনো প্রায়োরিটি নয়। এখন মূলস্রোতে মিশে গিয়ে জাগতিক উন্নতির সোপান বেয়ে ওপরে ওঠাই জীবনের মূলমন্ত্র। এই পরিস্থিতিতে ভাষাসংস্কৃতির সংকট এক স্বাভাবিক পরিণতি। যেখানে অষ্টম তফসিলভুক্ত সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি লিপি নাগরিক সভ্যতায় অবহেলার শিকার হচ্ছে সেখানে অন্যান্য তফসিল বহির্ভূত জনজাতীয় ভাষা হারিয়ে যাবে এটা ভবিতব্য বলে ধরে নিতে হবে। গ্রীয়ারসনের সমীক্ষায় ভাষা-উপভাষার রাজনীতি এই সংকটের গোড়াপত্তন ঘটিয়েছিল। বিশ্বায়ন পরবর্তী সময়ে এই সংকট মহীরূহের আকার ধারণ করেছে। আগামী দুদশকের মধ্যে সাঁওতালি ছাড়া অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীগুলি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এই সমস্যা নিয়ে তাই সহমতের ভিত্তিতে কর্মসূচী গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। ভাষা সংস্কৃতির সংরক্ষণে সরকারী উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।
কুড়মালি — জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে ক্ষেত্রসমীক্ষা চালানোর সময়ে সাঁওতাল জনজাতির পরেই যে ভাষাগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় পাওয়া গিয়েছিল সেটি হল কুড়মি বা কুর্মী। পশ্চিমবঙ্গে এদের Scheduled Tribe হিসেবে স্বীকৃতি নেই। সাম্প্রতিককালে Backward Classes-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। সেই কারণে ‘পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ’ গ্রন্থে এদের কোনো উল্লেখ নেই। ভেরিয়ার এলুইন-এর ‘The Aboriginals’ বইতেও এদের প্রসঙ্গ নেই। তবে প্রদ্যোত ঘোষের ‘বাংলার জনজাতি’ গ্রন্থে কুড়মিদের ওপর একটি পৃথক অধ্যায় আছে। এখানে তাদের বিকল্প নামগুলি উল্লেখ করা হয়েছে — কুর্মী, কুনবি, কুরম্বি, কুরুম, কুরুমানিক প্রভৃতি। ‘Descriptive Ethnology of Bengal’ বইটির ৩১৭ পৃষ্ঠায় E. T. Dalton কুড়মিদের প্রাচীনতম আর্য ঔপনিবেশিকদের অন্যতম বংশধর বলে অনুমান করেছেন। ‘কূর্ম’ বা ‘কুরুম’ টোটেম থেকেই ‘কুর্মী’ নাম। সুধীর কুমার করণের লেখা ‘সীমান্ত বাংলার লোকযান’ বইটির ৩৩ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ আছে। ‘The Account of Gorakhpur’ গ্রন্থের ৪৬৮ পৃষ্ঠায় H. Buchanan হিন্দুদের শূদ্রজাতির মধ্যে কুড়মিদের এক উচ্চ স্থান দিয়েছেন। কুড়মি জমিদার ও রাজাদের কথাও শোনা যায়। ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বভাগে পরিশ্রমী কৃষিজীবী হিসেবে এদের খ্যাতি রয়েছে। ছোটনাগপুর ও ওড়িশাতে বিপুল সংখ্যক কুড়মি জাতির মানুষ বসবাস করেন। আকৃতিগত দিক থেকে ধরলে এরা আর্য ও অনার্য উভয় বৈশিষ্ট্যই অঞ্চলভেদে বহন করে থাকে। ডালটনের মতে এটি বর্ণসংকর প্রক্রিয়ার কারণে ঘটে থাকে।
বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে ‘বাংলাভাষী’ আদি মাহাতো সম্প্রদায় ‘কূর্ম’ ক্ষত্রিয় নামেও পরিচিত। এই মত প্রদ্যোত ঘোষের বই থেকে পাওয়া যায়। প্রধানত মানভূম (পুরুলিয়া), ধলভূম-ঝাড়গ্রাম এবং ময়ূরভঞ্জ সীমান্তে এদের বসবাস। এরা প্রায় সকলেই ‘মাহাতো’ পদবি ব্যবহার করে। তবে পৈতাধারণ আন্দোলনের ফলে উচ্চ, মধ্যম ও নীচ কুড়মি বলে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ভারতে টোটেমিক কুড়মি জাতির একাশিটি গোষ্ঠী আছে। অন্যান্য ট্রাইবসদের পাশাপাশি বসবাসে কুড়মি সম্প্রদায় বিশেষ আগ্রহী।
সাঁওতালরা কুড়মিদের হাতের রান্না খায়, কিন্তু কুড়মিরা খায় না। তবে উভয় জাতিই একে অপরের হুঁকায় তামাক খায়। নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত ‘বাংলা বিশ্বকোষ’ চতুর্থ খণ্ডে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। কুড়মিদের ঝুমুর গান ও নৃত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া উৎসেবর মধ্যে জনজাতীয় উৎসবগুলি — সারহুল, করম, টুসু, সোহরাই, দশতাই, সাতার প্রভৃতি — কুড়মিরা পালন করে থাকে। ‘পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী’ গ্রন্থে ‘কারমালি’ বলে এক জনজাতি গোষ্ঠীর উল্লেখ রয়েছে। এরা মূলতঃ পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও নদীয়া জেলায় বাস করে। তবে অনেক নৃতাত্ত্বিক মনে করেন এঁরা মুণ্ডাদের একটি অংশ। হাজারিবাগে তাঁরা খোট্টা বা কারমালি ভাষায় কথা বলেন। এদের সঙ্গে কুড়মিদের কোনো যোগ আছে কিনা তা আরো গবেষণা করে দেখা দরকার।
এই নিবন্ধের শুরুতে জর্জ আব্রাহাম গ্রীয়ারসনের ‘Linguistic Survey of India’র অন্তর্গত ‘Linguistic Survey of Bengal’ গ্রন্থে কিভাবে কুড়মালিকে মিশ্র উপভাষা হিসেবে বাংলা, বিহারী ও ওড়িয়ার ‘curious dialect’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে তা সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। এইভাবে সাঁওতালদের পরে জঙ্গলমহল এলাকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও কুড়মিদের ভাষা কুড়মালির ভাষাগত স্বীকৃতি মেলে নি। প্রাথমিকে কুড়মালি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। অতি সম্প্রতি ঝাড়গ্রামের কুড়মি সমাজের অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী জয়ন্ত মাহাতো ‘চিসয়া’ নামক লিপি উদ্ভাবন করেছেন যার মাধ্যমে কুড়মালি ভাষায় লেখালেখি করা সম্ভব হবে। বাংলা, দেবনাগরী বা ওড়িয়া লিপির প্রয়োজন হবে না। এত বড় উদ্ভাবনের পরেও সরকারী স্বীকৃতির বিষয়টি অনিশ্চিত হওয়ায় কুড়মালি এখনো সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে। কাজের ভাষা না হওয়ায় তরুণ কুড়মি সমাজের কাছে এই ভাষা দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী লোকনাটকের ধারা ‘মাছানি’ সংরক্ষণের ব্যাপারেও নবীন প্রজন্মের আগ্রহ নেই। তাই জয়ন্ত মাহাতো, মঙ্গল মাহাতো, কিরীটি মাহাতো, অনাদি মাহাতো আর শিরিপদ বংসিরারের যাবতীয় সাধু প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখতে পায়নি। প্রস্তাবিত কুড়মালি অ্যাকাডেমি গঠিত হলে অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।
তথ্যসূত্র –
পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী — সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা। কলকাতাঃ ক্যাম্প, ২০০৯।
বাংলার জনজাতি — প্রদ্যোত ঘোষ। কলকাতাঃ পুস্তক বিপণি, ২০০৭।
পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ — ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে। কলকাতাঃ বাস্কে পাবলিকেশন, সুবর্ণরেখা, ২০১৩ (ষষ্ঠ সংস্করণ)।
ভেরিয়ার এলুইন-এর আদিবাসী — সম্পাদনা – ঋত্বিক মল্লিক। কলকাতাঃ সেতু, ২০১২।
Linguistic Survey of Bengal, Vol. I – G. A. Grierson., Kolkata : Kreativemind, 2007 edn.
Annals of Rural Bengal - W.W. Hunter
The Tribes and Castes of Bengal, Vol. I - H. H. Risley
Descriptive Ethonology of Bengal – E. T. Dalton.