১।অম্লবৃষ্টি কি? (Acid Rain)
যানবাহন, শিল্প কারখানা, তৈল শোধনাগার, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি থেকে নির্গত গ্যাস প্রধানত সালফার, নাইট্রোজেন ও কার্বন ঘটিত অক্সাইড বায়ুতে মিশে থাকে। পরিসংখ্যান বলছে প্রতিবৎসর পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কয়েক মিলিয়ন টন ঐ সকল অক্সাইড মিশছে। বৃষ্টির সময় জলে দ্রবীভূত হয়ে (সালফিউরিক, নাইট্রিক ও কার্বনিক ইত্যাদি) অ্যাসিড উৎপন্ন করে, জলধারার সাথে মাটিতে নেমে আসে তখন একে অম্লবৃষ্টি বলে। এই সময় জলের PH 5.6 এর নীচে নেমে যায়। এই অম্লবৃষ্টির জন্য 65% দায়ী সালফিউরিক অ্যাসিড এবং 35% দায়ী নাইট্রিক অ্যাসিড। এই বৃষ্টির ফলে মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি, উর্বরতা হ্রাস, ব্যবহৃত জলের অম্লত্ব বৃদ্ধি, উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াও পাকা বাড়ী, মূর্তি সৌধ, ব্রীজ এবং অধিকাংশ ধাতব বস্তুর উপর ক্ষতিকর প্রভাব হয়ে থাকে।
২। আগুন কি?
দাহ্য বস্তুর সাথে দ্রুত অক্সিজেনের বিক্রিয়াতে যে তাপ, আলো এবং শিখার উৎপত্তি হয়ে থাকে তাকে আগুন বলা হয়। পদার্থের ঘর্ষণ, রাসায়নিক, বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংহত সূর্যের আলো ইত্যাদি বহু পদ্ধতিতে আগুন উৎপন্ন করা যায়। এছাড়া এমন কতগুলি পদার্থ আছে যা বায়ুর সংস্পর্শে এলেই জ্বলে ওঠে। আগুনের ব্যবহার মানুষের শ্রেষ্ঠতম আবিস্কার।
৩। আগুনের শিখা উপরের দিকে ওঠে কেন?
প্রায় সকল জ্বালানীতেই কার্বন, ও হাইড্রোজেন থাকে। জ্বালানী যখন জ্বলে তখন অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়াতে তাপ নির্গত হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড, জল বা জলীয় বাষ্প ও নানা গ্যাস উৎপন্ন হয়। ঐ গ্যাসগুলি হালকা তাই উপরে উঠে তার সাথে ঐ জ্বলন্ত সকল গ্যাসের সমন্বয়ে তৈরী আগুনের শিখাও উপরের দিকে ওঠে।
৪। আগুনে জল দিলে নিভে যায় কেন?
জ্বলন্ত বস্তুর সংস্পর্শে জল এলেই বাস্পীভূত হয় ফলে জ্বলন্ত বস্তুর উত্তাপ কমে যায়। যে বাষ্প উৎপন্ন হয় সেই বাষ্পের আয়তন জল অপেক্ষা বহুগুণ বেশি স্থান অধিকার করে এবং জ্বলন্ত বস্তুটিকে ঘিরে ধরে এবং বাহিরের বাতাসের সংস্পর্শে আসা বাধা দেয়, ফলে দহন অসম্ভব হয়ে পরে। কিন্তু তেল জাতীয় পদার্থে আগুন লাগলে জলদিলে তা নেভানো যায় না কারণ তেল জল অপেক্ষা হালকা হওয়ায় উহা জলের উপরে ভেসে উঠবে এবং জ্বলতে থাকবে।
৫। আগুনে পুড়ে না এমন পদার্থ আছে কি?
আমরাতো আগুনকে সর্বভূক বলে জানি কিন্তু আগুনে পুড়ে না এমন পদার্থও আছে। পদার্থটির নাম অ্যাসবেসটস্। খনি থেকে অ্যাসবেসটস্ তুলে শুকিয়ে এর তত্ত্বকে পৃথক করা হয় এবং ঐ তন্তু থেকে সুতো তারপর কাপড় বা পাতে পরিণত করা হয় এবং প্রয়োজন মতো ব্যবহার করা হয়। দমকলকর্মীদের এর দ্বারা তৈরী পোষাক জুতা, টুপি ইত্যাদি তৈরী করা হয়। তাপ, বিদ্যুৎ, ক্ষার, অম্ল এর ক্ষতি করতে পারে না। আজকাল বিশেষ ধরনের অ্যাসবেটস্ পাওয়া যায় যা 5000°C এ ও পুড়ে না, এর বহুল ব্যবহার আছে বিভিন্নক্ষেত্রে যেহেতু অদাহ্য।
৬। আগুনের উপর দিয়ে হাঁটা সম্ভব হয় কিরূপে?
বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আগুনের উপর দিয়ে হাঁটার প্রথা আছে। আগুনের উপর দিয়ে হাঁটাকে অনেকে এক কঠিন জিমনাস্টিক বলে থাকেন। এর মধ্যে কোন অলৌকিত্ব নাই। এ বিষয়ে বহু পরীক্ষা, গবেষণা হয়েছে, তা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাহল দ্রুতপদক্ষেপ, বেশী ভর পায়ে না পড়া, আগুনের সাথে স্পর্শ খুব কম সময়ের জন্য হওয়া, এই তিনটিই প্রধান শর্ত। দ্রুত হাঁটা মানে দুই সেকেন্ডের কম সময় আগুনের স্পর্শ থাকলে ফোস্কা পড়ে না। এছাড়া যারা হাঁটেন তাদের বয়স সাধারণত বেশী, পায়ের তলার চামড়া পুরু ও কর্কশ হয়ে থাকে। সর্বপরি এর জন্য সাহস, দক্ষতা প্রয়োজন হয়।
৭। আঙুলের ছাপকে প্রমাণ্য হিসাবে ধরা হয় কেন?
প্রকৃতি আমাদের হাতের প্রতিটি আঙুলে আলাদা আকৃতির রৈখিক চিত্র সৃষ্টি করেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল দুজন লোকের হাতের ওই রেখাগুলি একই প্রকারের হয় না। বিজ্ঞানীগণ গবেষণা করে বলছেন প্রায় প্রতি আড়াই কোটিতে একজনের সাথে আগের একজনের ওই রেখাচিত্রের মিল পাওয়া যেতে পারে এবং তারা ওই রেখাচিত্রকে 6 টি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন যাতে অপরাধী সনাক্ত করণের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। আর এই সত্যটি বহু পূর্বেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা আবিস্কার করেছিলেন তাই তাদের লিখিত দলিল পত্রে টিপসই এর প্রচলন করেছিলেন।
৮। কপূর কিরূপে তৈরী হয়? ব্যবহার।
সিন্নামোমম কাম্ফোরা নামক বৃক্ষ থেকে কপূর তৈরী হয়। এই বৃক্ষের সকল অংশের তেল থেকেই কপূর উৎপন্ন হয়। এই গাছের কাঠে, পাতার পাতনের দ্বারা কপূর নিষ্কাষিত হয়। তবে বর্ত্তমানে তার্পিন তেলের রাসায়নিক উপাদান ‘পাইনিন' থেকেও কপূর সংশ্লেষিত হয়। ইহা অ্যান্টি-সেপটিক, সুগন্ধি দ্রব্য, জীবাণু নাশক, প্লাস্টিক, সেলুলয়েড, বিস্ফোরক উৎপাদনে এবং পূজা আরতিতে ইহা ব্যবহৃত হয়।
৯। কাঁদুনে গ্যাস কি?
যে সকল গ্যাস চোখের সংস্পর্শে এলে চোখে জ্বালা, যন্ত্রণা সৃষ্টি হয় তাদের কঁাঁদুনে গ্যাস বলে। অস্বাভাবিক অবস্থা থেকে চোখকে রক্ষা করার জন্য চোখ দিয়ে জল বের হয়ে ঐ গ্যাসকে দ্রবীভূত করে দূর করার চেষ্টা করে। এই গ্যাস নাক ও গলায়ও যন্ত্রণার সৃষ্টি করে থাকে। সাধারণত যে টিয়ার গ্যাস ব্যবহৃত হয় তাতে ক্লোরো অ্যাসিডেযেনন (CN) রাসায়নিক পদার্থ থাকে এর একটি আধুনিক সংস্করণ তৈরী হয়েছে তার নাম টু ক্লোরোবেজ্ঞাইলাডেনিম্যালোনওনাইট্রাইল (CS)।
১০। কৃত্রিম মিষ্টত্ব কি থেকে তৈরী হয়?
মিষ্টত্বের প্রধান উপাদান চিনি, গুড় (সুক্রোজ) যা প্রাকৃতিক আখ, বীট, ফল, মধু ইত্যাদিতে পাওয়া যায়। কিন্তু ইহা কৃত্রিম উপায়ে ও তৈরী করা সম্ভব। একদিন আলকাতরা থেকে পাওয়া গেল টলুইন আর পরবর্তী কালে এই টলুইন থেকেই তৈরী হল স্যাকারিন যা চিনির চেয়ে সাড়ে পাঁচশ গুণের বেশী মিষ্টি কিন্তু এর কোন খাদ্য গুণ নেই। এছাড়া কৃত্রিম উপায়ে আরো অনেক মিষ্টিত্ব তৈরীর পদার্থ তৈরী হয়েছে যেমন ডালসিন, এসমুলফ্যাম-কে, স্টেভিওসাইড এবং পি 4000। এই পি-4000 চিনির চেয়ে চার হাজার গুণ মিষ্টি কিন্তু এগুলির ক্যালরী মূল্য শূণ্য প্রায় নেই বললেই চলে।
১১। কৃত্রিম দুধ কিরূপে তৈরী হয়?
দুধে জল, রং, সোডা ও বনস্পতি ইত্যাদি মেশানো হয় প্রায় অনন্তকাল ধরে, কিন্তু বর্তমানে কৃত্রিম দুধ প্রস্তুত করতে জলের সাথে মিশ্রিত করা যে কোন সস্তা ভোজ্য তেল (ফ্যাটি অ্যাসিড) এবং সলিডনটফ্যাটের জন্য ইউরিয়া। গরুর দুধে মিল্ক ফ্যাট 3% এবং সলিডনট ফ্যাট 8.5%। মোষের দুধে মিল্ক ফ্যাট 6% এবং সলিডনট ফ্যাট 9%। এর কম হলে তা ভেজাল বলে গণ্য হয়। এবার তেল ও জল একত্রে মেশানোর জন্য ব্যবহার করা হয় ডিটারজেন্ট যা দিয়ে জামাকাপড় পরিষ্কার করা হয়। যা এক্ষেত্রে মিশ্রিত ফ্যাটকে ছোট ছোট কণায় ভেঙে দিয়ে দ্রবণীয় করতে সহায়তা করে। অর্থাৎ কৃত্রিম দুগ্ধ মানে নিম্নমানের ভোজ্য তেল, ইউরিয়া ও ডিটারজেন্টের পাউডারের মিশ্রণ। এই দুধ খেলে কি উপকার হবে এখনও জানা যায় নি তবে ক্ষতি কি হতে পারে তা জানা গিয়েছে, মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত, হাইপার টেনশন, রক্তে ইউরিয়া বৃদ্ধি ফলে কোমায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
১২। গরম দুধ উপচে পড়ে কেন?
দুধ একটি কলোয়ড, তার মধ্যে অনেক পদার্থ মিশ্রিত থাকে। যেমন – জল, চিনি, প্রোটিন, ফ্যাট, কিছু খনিজ। যখন দুধ গরম করা - হয় সেই সময় ফ্যাট ও প্রোটিন আলাদা হয়, যেহেতু তুলনামূলক হালকা। তাই দুধের উপরিতলে একটি আস্তরণ পড়ে। দুধ গরম হতে থাকলে জলীয় বাষ্প ঐ আস্তরণের নীচে থেকে চাপ দিতে থাকে। ফলে আয়তনে প্রসারিত হতে হতে ঐ স্তরকে উপরে ঠেলে দিতে থাকে। একসময় পাত্রের বাইরে উঠে আসে অর্থাৎ দুধ উপচে পড়ে।
১৩। গ্রীজ (Grease) কি দিয়ে তৈরী?
গ্রীজ এক প্রকার ঘন পিচ্ছিলকার পদার্থ। বিভিন্ন পিচ্ছিলকারক তেল, সাবান বা সোডা জল মিশ্রিত করে তৈরী করা হয়। সাধারণত বল, বিয়ারিং বা যন্ত্রে যেখানে ঘর্ষণ বেশী হয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় সেখানে ব্যবহৃত হয়। কাপড়ে গ্রীজের দাগ হয়ে গেলে তুলোতে কার্বন টেট্রা ক্লোরাইড বা বেনজিনে ভিজিয়ে দাগযুক্ত স্থানে ঘষলে দাগ উঠে যাবে।
১৪। চীনামাটি কি চীনদেশের মাটি?
এই মাটিতে বালি, অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড ও জল থাকে। এ মাটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং আমাদের দেশেও পাওয়া যায়। তবে চীনদেশে এই মাটি দ্বারা জিনিসপত্র প্রথম তৈরী হয় তাই হয়তো এই নামকরণ হয়েছে। এই মাটির দ্বারা জিনিস তৈরী করতে প্রথমে এই মাটির সাথে কোয়ার্টজ, ফেলসপার চূর্ণ মিশিয়েমণ্ড তৈরী করে। তারপর বিভিন্ন পাত্র তৈরী হয়। তারপর প্রচণ্ড উত্তাপে শুকানো হয়, পরে ঐ পাত্রগুলির উপর কাঁচের প্রলেপ দেওয়ার পরেও আবার সেঁকা হয় প্রায় 1200°C। এই চিনামাটি শুধু কাপ, প্লেটইনয়, বিভিন্ন শৌখিন জিনিস, কাগজ, রাবার, রং, প্রসাধনীদ্রব্য তৈরীতেও ব্যবহৃত হয়।
১৫। জলভরা মেঘ কালো কেন?
জল ভরা মেঘে ছোট ছোট অসংখ্য জল কণা থাকে। সূর্য্যের আলো যখন ঐ মেঘের উপর পড়ে তখন ঐ জলকণা সূর্য্যের আলোকের প্রায় সবটাই শোষণ করে নেয়। তাই জলভরা মেঘ কালো দেখায়। কিন্তু মেঘে জল কণা না থাকলে সূর্যের আলো ঐ মেঘে পড়লে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে সেজন্য সাদা দেখায়।
১৬। জামাকাপড় ড্রাইওয়াশ কিরূপে করা হয়?
ড্রাইওয়াস কথার অর্থ হল এক্ষেত্রে জলে, সাবান বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার না করে জামা কাপড় পরিষ্কার করা। সাধারণত এই ব্যবস্থায় প্রথমে ময়লা যুক্ত জামা কাপড় একটি ড্রামে নেওয়া হয় যার মধ্যে থাকে মির্নাল টারপিন অয়েল (MTO) যা সাধারণত নিম্নশ্রেণীর পেট্রোলিয়াম থেকে তৈরী। ঐ ড্রামটিকে ঘড়ির কাটারদিকে ও বিপরীত দিকে প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে ঘুরানো হয়। তারপর বস্ত্রগুলি বের করে শুকানো হয় যন্ত্রের মাধ্যমে। এছাড়া বেনজিন, পলিক্লোরো অ্যালকেইনস্ ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিতে গরম জামাকাপড় এবং দামী সৌখিন কাপড় কাচা ভাল কারণ এতে রং উঠে না বা নষ্ট হয় না।
১৭। জীবনের ভৌত ভিত্তি কি?
প্রোটোপ্লাজমকেই জীবনের ভৌত ভিত্তি বলা হয়। প্রকৃতিতে 92 টি মৌলিক পদার্থ পাওয়া যায় তার মধ্যে প্রায় 25 টি মৌলই প্রোটোপ্লাজমে থাকে কিন্তু ঐ মৌলগুলি জীবনহীন। এছাড়া ঐ মৌলগুলিথেকে যে সমস্ত যৌগ উৎপন্ন হয় তারাও জীবন হীন। কিন্তু যখন ঐ যৌগগুলি অর্থাৎ প্রোটিন, স্নেহ পদার্থ,শর্করা,নিউক্লিক অ্যাসিড, ভিটামিন, খনিজ লবণ, হরমোন, সর্বোপরি জল সুসংগঠিত হয় তখনই সজীব বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। অনুবীক্ষণযন্ত্রে প্রোটোপ্লাজমকে এক প্রকার বর্ণহীন, অর্ধস্বচ্ছ, থকথকে জেলির মত মনে হয়।
১৮। জেল (Gel) কি জিনিস?
জেলির মত আঠাল দ্রবণ। এই দ্রবণে আঠালো ঘণত্ব খুব বেশী তাই স্থিতিস্থাপকতা প্রায় কঠিন পদার্থের মত। বিভিন্ন পদ্ধতিতে জেল তৈরী হয়। সাধারণত প্রাণীদেহের হাড়কে জলে ফোটালে জেলির মত এক প্রকার পদার্থ তৈরী হয় যার নাম জিলোটিন। এই জিলোটিন সামান্য জলে মিশিয়ে জেল তৈরী করা হয়। প্রতিদিন আমরা বহু জিনিস ব্যবহার করি যেগুলি জেল ঘটিত। যেমন সাবান, জুতোর কালি, টুথপেস্ট, মলম ইত্যাদি।
১৯। টেরিলিন কি?
ইহা এক প্রকার পলিমার। টেরিথ্যালিক অ্যাসিডের ডাইমিথাইল ইস্টারের সাথে ইথিলিন গ্লাইকলের বিক্রিয়ায় এই পলিমার তৈরী করা হয়। এই পলিমার থেকে টিকসই মজবুত সুতো তৈরী করা যায়। এই সুতোতে তৈরী কাপড় কে টেরিলিন কাপড় বলা হয়।
২০। ডিটারজেন্ট কি?
সাধারণত এর মধ্যে অ্যালকিন বেঞ্জিন সালফোনেট, অ্যালকিন সালফোনিক অ্যাসিডের সোডিয়াম লবণ ও নানা প্রকার অজৈব লবণ ও অজিব, অজৈব অ্যাসিড মিশ্রিত থাকে। জলের মধ্যে তেল, গ্রিস, কালি ইত্যাদি ময়লা দ্রবীভূত হয় না কিন্তু জলে ডিটারজেন্ট মেশালে এগুলি সহজেই পরিস্কার হয় কারণ ডিটারজেন্টের দীর্ঘ শৃঙ্খল অণুগুলির একপ্রান্ত জল দ্বারা আকৃষ্ট হয় এবং অপরপ্রাক্ত তেল বা গ্রিজ দ্বারা আকৃষ্ট হয় ফলে জল ও তেলের মধ্যে পৃষ্ঠটান কমে যায়। তারজন্য তেল গ্রিজ ইত্যাদি জলে পরিস্কার হয়।
২১। ডেটল এবং ফিনাইল জলে মেশালে সাদা হয় কেন?
যে সকল পদার্থ জলে দ্রাব্য সেগুলি পূর্ণ দ্রবীভূত হলে স্বচ্ছ দ্রবণ প্রস্তুত করে। কিন্তু যে সকল পদার্থে তেল জাতীয় পদার্থ থাকে তা জলে দ্রাব্য হয় না সেগুলি দুগ্ধবৎ নির্যাসে পরিণত হয় (Emul sion)। ডেটল ও ফিনাইল জলে মিশালে উহাদের মধ্যে অনেক পরিস্কারক, ফেনা তৈরীর রাসায়নিক খনিজ পদার্থ থাকে যা তেল জাতীয় পদার্থকে ছোট ছোট কণায় ভেঙে দেয় যা জলে খুব ভাল ইমালসন অর্থাৎ দুগ্ধবৎ নির্যাসে পরিণত করে।
২২।দুটি পদার্থ মিশিয়ে দিলে তাদের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় কেন?
প্রত্যেক যৌগিক বস্তু (System) এর সর্ব্বোচ স্থিতিশীল অবস্থা থাকার শর্তসাপেক্ষ প্রবল প্রবণতা থাকে। এবং এই স্থিতিশীলতা আসে যখন শক্তি কমে যায়। রাসায়নিক বিক্রিয়া বা প্রতিকূল ক্রিয়া ঘটে সাথে সাথে শক্তি কমতে থাকে। সুতরাং অণু তার গঠনকারী বিভিন্ন পরমাণু থেকে বেশী স্থায়ী হয়। এই হল রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণ।
২৩। দিয়াশলাই কাঠি জ্বলে উঠে কেন?
দিয়াশলাই কাঠিতে পটাসিয়াম ক্লোরেট ও অ্যান্টিমনি সালফাইড, ফসফরাস ট্রাই সালফাইড, লাল ফসফরাসের মিশ্রণকে কাঠির ডগাতে আঠার সাহায্যে আটকে দেওয়া হয় এবং বাক্সের দুই দিকে রেড লেড, সোডিয়াম নাইট্রেট মিহি বালি ইত্যাদিলাগানো থাকে। কাঠিটি ঘর্ষণের ফলে তাপের সৃষ্টি হয় এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আলো জ্বলে উঠে।
২৪।দাড়ি কাটার সময় সাবান বা ক্রিম ব্যবহার হয় কেন?
সাবান বা ক্রিম জলে ভিজানো ব্রাস দিয়ে ঘষলে প্রচুর ফেলা ও বুদবুদের সৃষ্টি হয়। যখন ফেনার উপর দিয়ে রেজার টানা হয় তখন ঐ ফেনা দাড়ি ও রেজারের মধ্যে চাপ এর বিপরীতে অল্প পৃষ্ঠটানে আবিষ্ট করে ফলে ঘর্ষণ জনিত বাধা আনেকটা কমে যায় অনায়াসেই রেজার টেনে দাড়ি কাটা যায়।
২৫। দাঁড়ি কাটার পর ফিটকিরি ব্যবহার করা হয় কেন?
যখন দাড়ি কাটা হল তখন বিভিন্নস্থানে খুব সামান্য হলেও কেটে যায় এবং রক্ত বের হতে থাকে তাই রক্ত পড়া বন্ধ করতে ফিটকিরি ব্যবহৃত হয় কারণ ফিটকিরিতে ধণাত্মক আধানযুক্ত আয়ন থাকায় তা রক্তের বিপরীতধর্মী আয়নকে প্রশমিত করে রক্তকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
২৬। ধাতব পদার্থ উত্তপ্ত করলে লাল বর্ণের হয় কেন?
ধাতব পদার্থের পরমাণুর ইলেকট্রন শক্তি সংগ্রহ করে উচ্চতর কক্ষে চলে যায় এবং পুনরায় নিম্নস্তরে চলে আসে। প্রথম অবস্থায় ইনফারেড রশ্মি বিকীরণ করে থাকে তাই লাল বর্ণের দেখি তবে আরো উত্তপ্ত করল দৃশ্যমান আলো দেখতে পাওয়া যায়।
২৭। ধোঁয়া আসলে কি?
ধোঁয়া সাধারণত কয়লার (কার্বন) সুক্ষ্মবণা, কার্বন ডাই অক্সাইড ও জলীয় বাষ্পের মিশ্রণ বলা যায়। আমরা যে কোন প্রকার জ্বালানী (কাঠ, কয়লা, কেরোসিন, প্লাস্টিক ইত্যাদি) বা কোন বস্তু যখন জ্বলে তখন যদি অক্সিজেনের ঘাটতি থাকে তাহলে জ্বালানীর অসম্পূর্ণ দহন ঘাট তারজন্য ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। ধোঁয়াতে কার্বণ কণা বেশী থাকলে কালো ধোঁয়া এবং জলীয় বাষ্প বেশী থাকলে ধোঁয়া সাদা দেখা যায়। জ্বালানীর যদি পূর্ণ দহন হয় তবে ধোঁয়া সৃষ্টি হয় না।
২৮। নাইলন কি দিয়ে তৈরী হয়?
ইহা একপ্রকার প্লাস্টিক সুতার ব্যবহারিক নাম। ইহা অ্যাডিপিক অ্যাসিড ও হেক্সামিথিলিন ডাই অ্যামিন নামক পদার্থের বহু অণু পরস্পরের সহিত যুক্ত হয়ে নাইলনের বৃহৎ অণুর সৃষ্টি করে। ইহা রেশমের চেয়ে টিকসই একটি পলিমার। উত্তাপে তরলে পরিণত করে তার দ্বারা সরু সুতা তৈরী করে কাপড় মোজা, মাছ ধরার জাল তৈরী করা হয়।
২৯। পশমের বা উলের কাপড়কে গরম কাপড় বলে কেন?
পশমী বা উল্লার কাপড়ের আঁশগুলি অপেক্ষাকৃত আলগাভাবে থাকে ফলে উহাতে অসংখ্য সুক্ষ্ম সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত হয় এবং ঐ ছিদ্রগুলি বায়ু পূর্ণ থাকে। বায়ু তাপের কুপরিবাহী, পশম বা উল নিজেও কুপরিবাহী তাই আমাদের দেহের তাপ পরিবাহিত হয়ে বাহিরে যেতে পারে না ফলে গরম অনুভব করি।
কিন্তু সুতীর কাপড়ে বায়ুপুর্ণ ছিদ্র প্রায় থাকে না, ওই কাপড়ের মধ্যে দিয়ে তাপ দেহের বাহিরে সহজেই পরিবাহিত হয় আমরা ঠান্ডা বোধ করি, তাই পশমী বা উলের কাপড়কে গরম কাপড় বলা হয়।
৩০। প্লাস্টিক কি দিয়ে তৈরী?
উদ্ভিদের দেহ কোষের একটি উপাদান সেলুলোজ। এই সেলুলোজ এর সাথে অ্যাসেটিক অ্যাসিড মিশ্রিত করে কঠিনে রূপান্তরিত করে যে পদার্থটি পাওয়া যায় তাকে সেলুলোজ অ্যাসিটেট প্লাস্টিক বা সংক্ষেপে শুধু প্লাস্টিক বলে। নিত্য ব্যবহার্য জিনিস চিরুনী, বোতাম, খেলনা, পেন ইত্যাদি। কিন্তু অসুবিধা হল আগুনের সংস্পর্শে জ্বলে উঠে এবং ধীরে ধীরে জলীয় বাস্প শোষণ করে অব্যবহার্য হয়ে পড়ে।
এই ত্রুটি দূর করলে রসায়ন বিজ্ঞানী, সেগুলোজের সাথে আসেটিক ও প্রেপিওলিক অ্যাসিড মিশ্রিত করে তৈরী করলেন আর এক প্রকার প্লাস্টিক যা দিয়ে রেডিও, টিভি, কমপিউটারের ক্যাবিনেট, টেলিফোন, সুন্দর সৌখিন দ্রব্য তৈরী করা হচ্ছে। তাপ সহনশীলতা ধর্মের উপর ভিত্তি করে নানা রকমের শ্রেণী আছে প্লাস্টিকের যেমন ব্যাকেলাইট, নাইলন, সেলুলয়েড ইত্যাদি।
৩১। প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ব্যবস্থরে কি ক্ষতিকর?
বর্তমান কালকে age of plastic বললে হয়তো ভুল হবে না। গৃহ সামগ্রী থেকে মহাকাশযানের অংশ তৈরীতে প্লাস্টিক ব্যবহৃত হচ্ছে। ইথিলিন কে উচ্চচাপে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে উত্তপ্ত করে পলিথিন তৈরী করা হয়। 20 মাইক্রনের চেয়ে কম পুরু প্লাস্টিক পলিপ্যাক গুলি ভয়ঙ্কর সমস্যা হয়ে উঠেছে। তার প্রধান কারণগুলি মাটিতে এগুলি জৈব সরলীকরণ হয় না, মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। পুণনবীকরণের সময় নাইট্রোবেঞ্জিন, ডায়াসিন, ইত্যাদি বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশকে দুষিত করে। পুড়িয়ে দিলে CFC CDF CDD হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাস নির্গত হয়েও পরিবেশের ক্ষতি করে। এছাড়া এই পলিব্যাগকে ব্যবহৃত রঞ্জক (pigments) সংযোজক (additives) ক্যাডামিয়াম, লেডট্রাইট্রেনিয়াম ইত্যাদি খাদ্যের সাথে মিশে ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া নিকাশী ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তবে আশার কথা নাগপুরে একটা প্ল্যান্ট তৈরী হয়েছে যেখানে 1kg প্লাস্টিক ব্যাগ থেকে 40 থেকে 60 ভাগ তরু পেট্রোলিয়াম পাওয়া যাবে। ভারতে প্রতিদিন 7 হাজার টন বর্জ্য প্লাস্টিক তৈরি হয়।
৩২। প্লাস্টার অফ প্যারিস কি জিনিস?
ক্যালসিয়াম সালফেট নামক রাসায়নিক পদার্থে কেলাস জল থাকে এ অবস্থায় পদার্থটিকে জিসাম বলা হয়। এই জিসাম কে উত্তপ্ত করলে ঐ কেলাস জল আংশিকভাবে দুর করার পর যে সাদা কঠিন পদার্থে পরিণত হয় তখন তাকে প্লাস্টার অফ প্যারিস বলা হয়। এবার যদি এই সাদা কঠিন পদার্থে জল মিশ্রিত করে লেই-এ পরিণত করে শুকালে উহা জমে কঠিন পদার্থে পরিণত হয়। বাড়ীর দেওয়াল প্লাস্টার করতে, বিভিন্ন সৌখিন বস্তু তৈরীতে ভাঙা হাড় ব্যান্ডেজ করতে ইহার ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
৩৩। পি. এইচ ভ্যালু (PH) কি?
পি এইচ মানে পোটেনসিয়াল হাইড্রোজেন। কোন দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ নির্দেশ করে। কোন দ্রকা আম্লিক না ক্ষারিয় তা এই মান দ্বারা নির্ধারিত হয়। PH এর মান 7 হলে দ্রবণটি প্রশম নির্দেশ করে। এই মান 0 থেকে 14 পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিশুদ্ধ জলের মান 7, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড এর মান 0 অ্যামেনিয়ার 12, মানুষের রক্ত 7.4।
৩৪। পুরাতন জিনিসের বয়স কিরূপে নির্ণয় করা হয়?
মহজাগতিক রশ্মির বাহিত নিউট্রনের সাথে বায়ুতে উপস্থিত নাইট্রোজেনের বিক্রিয়াতে নির্দিষ্ট হারে তেজস্ক্রিয় কার্বন তৈরী হয়। অর্থাৎ বায়ুতে উপস্থিত কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে তেজস্ক্রিয় কার্বন নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশে থাকে। উদ্ভিদ ও প্রণী কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে কিন্তু উদ্ভিদ ও প্রাণী মৃত্যুর পরে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে না। তখন পুৰ্ব্ব গৃহীত কার্বন ডাই অক্সাইহের মধ্যে যে তেজস্ক্রিয় কার্বন হিল তা বিটা কণা নিঃসরণ করে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। এবারে বহু বৎসরের আগের কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ কাঠেও বর্তমান কালের সম পরিমাণ অনুরাপ কাঠে তেজস্ক্রিয় কার্বনের পরিমাণ নির্ণয় করে। তেজস্ক্রিয় বিভিন্ন জিনিসের বয়স নির্ধারণ করতে ভিন্ন প্রকার প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় মৌল যেমন পটাসিয়াম, রুবিডিয়াম 87 ইউরেনিয়াম 238, 238 থোরিয়াম ব্যবহৃত হয়।
৩৫। বাজী (Fire-work) সুদৃশ্যবাহারী বর্ণের হয় কিরূপে?
পৃতিবীর বিভিন্ন প্রদেশে সামাজিক, ধর্মীয় আনন্দ উৎসবে, বিজয় উৎসবে বাজী পোড়ানোর নিয়ম আছে, বাজী বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। (তারা, ফুলঝুড়ি, তুবড়ি, চরকি, হাউৎ ইত্যাদি) বাজী তৈরীতে রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞানের মিশ্র কারিগরি থাকে। সাধারণত বাজীর উপাদন হল পটাসিয়াম, নাইট্রেট, গম্বুক, লৌহ, আলুমিনিয়াম, বেরিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম চূর্ণ, কয়লার গুড়ো, এদের বিভিন্ন অনুপারে বিভিন্ন আকারে বিশ্রিত করা হয়। তারা, ফুলকি, বিভিন্ন বর্ণ সুদৃশ্য করতে পটাসিয়াম ক্লোরেট, পারক্লোরেটের সাথে বিভিন্ন প্রকার লবণ মিশ্রিত করা হয়। যেমন, সবুজ বর্ণের জন্য কার্বনেট, নাইট্রেট বা সালফেট অফ বেরিয়াম, লাল বর্ণের জন্য সালফেট বা নাইট্রেট অফ স্ট্রেন্টিয়াম, হলুদ বর্ণের জন্য কার্বনেট বা অকজালেট অফ সোডিয়াম এবং নীল বর্ণের জন্য কার্বনেট সালফাইড, আর্সেনাইট অপ কপার, এছাড়া আরো অনেক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৩৬। ব্যাকেলাইট কি?
ফিনল ও ফরম্যালডিহাইড নামক রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে কনডেনসেশন পলিমেরিজেশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী করা হয়। আবিষ্কারক বিজ্ঞানীর নামানুসারেই এই নামকরণ হয়েছে। ইহা বিদ্যুৎ অপরিবাহী, তাপে গলে না, জলে দ্রবীভূত হয় না তাই এর দ্বারা প্লাগ, সুইচ, লাইটের সেড ইত্যাদি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রস্তুত করা হয়।
৩৭। বায়োমাস কি?
বায়োমাস হল একপ্রকার বিকল্প শক্তির উৎস। আমাদের অব্যবহার্য জৈব ও অজৈব বর্জ্য পদার্থ যেমন তরকারির খোসা, আঁখের ছিবড়ে, ধানের খোসা, নারকেল মালা, বাঁশ, আগাছা, কৃষি বর্জ্যা ইত্যাদি থেকে জ্বালানি, এবং জৈবসার রূপে ব্যবহার করা যায়। এদেরকে বায়োমাস বলে।
এই জৈব শক্তি উৎপাদনের জন্য একপ্রকার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, এই যন্ত্রে পর্যায়ক্রমে ঐ সকল বর্জ্য পদার্থগুলি শুষ্ক করা, বিশুদ্ধ করা, জারণ ও বিজারণ করানোর পর তা থেকে গ্যাসের মিশ্রণ পাওয়া যায়। ওই গ্যাস জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং এর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এইপ্রকার ক্ষুদ্র প্রকল্প তৈরী করে ছোট এলাকাতে বিকল্প শক্তি হিসাবে ইহা ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে প্রায় 20 লাখ এইরূপ প্লান্ট তৈরী হয়েছে। যেহেতু এক্ষেত্রে উৎস হিসাবে অব্যবহার্য পদার্থ ব্যবহৃত হয় সেজন্য পরিবেশ দূষণ কমাতে সাহায্য করে এছাড়া এই ব্যবস্থায় বর্জ্যকে সার হিসাবে ব্যবহার করা যায়। আগামীদিনে এই প্রকার শক্তি উৎপাদনে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।
৩৮। বিষাক্ত গ্যাস কি কি?
মানবদেহের ক্ষতি সাধন করতে পারে এমন বহু গ্যাসই আবিষ্কৃত হয়েছে। ঐ গ্যাসগুলি সাধারণত চোখ, নাক, ফুসফুস, চামড়া এবং নার্ভ কোষের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেয়। যেমন ক্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড, এছাড়া মাস্টার্ড গ্যাস, যা চামড়ার সংস্পর্শে ফোসকা পড়ে এবং ফুসফুসের জ্বালা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা এই গ্যাস ব্যবহার করে। নার্ভ গ্যাস আরও বেশী বিষাক্ত যা দেহে প্রবেশের ফলে বমি এবং মৃত্যু ঘটায়। টিয়ার গ্যাস যার সংস্পর্শে এলে চোখ, নাক জ্বালা করে এবং হাঁচি, কাশি হয়। শুধু কাঁদনে নয় হাসুনে গ্যাসও আছে তার নাম নাইট্রাস অক্সাইড (N2O) এই গ্যাস নিশ্বাসে সঙ্গে বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে হাসির উদ্রেক করে কিন্তু বেশী সময় ধরে গ্রহণ করলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যেতে পারে।
৩৯। ব্রিচিং পাউডার থেকে বাঁঝালো গন্ধ বের হয় কেন?
ব্লিচিং পাউডার বায়ুর সংস্পর্শে এলে বায়ুর উপস্থিত জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়ায় বা উত্তপ্ত হলে উহার থেকে ক্লোরিণ নামক এক প্রকার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত গ্যাস নির্গত হয়। উৎকৃষ্ট ব্লিচিং পাউডারে শতকরা প্রায় 36 ভাগ ক্লোরিন গ্যাস থাকে।
৪০। বেকিং পাউডার কি দিয়ে তৈরী?
ইহা টার্টারিক অ্যাসিড এবং সোডিয়াম বাই কার্বনেটের মিশ্রণ। এই পাউডারে জল মিশাল বা উত্তপ্ত করলে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়। পাউরুটি তৈরীর সময় ময়দার সাথে জল ও এই পাউডার মিশিয়ে দেওয়া হয় যখন উত্তপ্ত করা হয় তখন কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়ে আসে ফলে পাউরুটি ফুলে উঠে এবং সেটি বহুল ছিদ্র যুক্ত হয়।
৪১। ভেসেলিন কিরূপে তৈরী করা হয়?
পেট্রলিয়ামকে 400° এর ঊর্দ্ধ পাতন করলে নরম প্যারাফিন পাওয়া যায় যার ব্যবসায়িক নাম ভেসেলিন। ইহা সামান্য স্বচ্ছ, ইহা জলে অদ্রবণীয়। ইহ সাদা ও হলুদ বর্ণের তৈরী হয়। মলম ও প্রসাধনীতে এটি ব্যবহৃত হয়।
৪২। মুক্তা কিরূপে তৈরী হয়?
ঝিনুকের মধ্যে কোন কারণে যদি ছোট বালির কশা ঢুকে পড়ে তাহলে ঐ বালির উপর ঝিনুকের লালা জমে জমে দুই তিন বৎসর পরে বড় মুক্তায় পরিণত হয়। যার আসল উপাদান ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। মুক্তা বিভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে, রূপালী, কালো, গোলাপী। জাপানীরা কৃত্রিম উপায়ে প্রথম মুক্তা তৈরী করে। এই মুক্তাকে কালচার্ড পার্ল বলে। খাঁটি মুক্তা পাওয়া যায় কম, তাই দাম বেশী। আজকাল কাঁচের গোলকের উপর মাদার অফ পার্লের প্রলেপ দিয়ে বাজারে কৃত্রিম মুক্তা খুবই চালু হয়েছে।
৪৩। মোম কি দিয়ে তৈরী হয়?
মোমের উৎস সাধারণত চার প্রকার। প্রাণীজ, খনিজ, উদ্ভিজ এবং কৃত্রিম। তবে ব্যবহৃত মোমের 95% পেট্রোলিয়াম থেকে উৎপন্ন হয়। 400°C উষ্ণতার উপরে C20 থেকে C30 হাইড্রোকার্বনের মিশ্রণই ওয়ান্স বা মোম। মোমবাতি, রং পেন্সিলে, ফ্লোর ড্রেসিং, মলম, ক্রিম ও চিকিৎসাক্ষেত্রে তরল মোম ব্যবহার হয়ে থাকে।
৪৪। রুজ কি? উত্তর ব্যবহার কি?
ফেরাস সালফেট নামক একপ্রকার যৌগের অণুতে সাতটি জালের অণু থাকে (যার অপর নাম গ্রিণ ভিট্রিয়ল) ওই যৌগটিকে উত্তপ্ত করলে উহা সাদা হয়ে যায় আরও বেশী উত্তপ্ত করলে উহা একটি লাল রং এর ফেরিক অক্সাইডে পরিণত হয় একে রুজ বলা হয়। ইহ৷ সৌখিন কাঁসা, পিতলের দ্রব্য ও সোনার গহনা পালিশ করতে ব্যবহৃত হয়।
৪৫। সাবান কিরূপে ময়লা দূর করে?
কাপড় কাচা সাবানে কষ্টিক সোডা ও উদ্ভিদ ও প্রাণীজ তেলের মিশ্রণ উত্তপ্ত করে তৈরী করা হয়। ভিজ়ে জামা কাপড়ে সাবান ঘষলে সাবান জলে দ্রবীভূত হয়ে পিছিল ও বায়ুর সংস্পর্শে ফেনা তৈরী হয় আসলে সাবানের অনুগুলি সোডিয়াম ও ফ্যাটি অ্যাসিডের আয়নে পরিণত হয়। ফ্যাটি অ্যাসিডের আয়নগুলি ময়লা, তেল ধুলিকণা দ্বারা আকর্ষিত হয় এবং ঐ গুলির কাছে ভীড় করে এবং কাপড়ের পৃষ্ঠতল থেকে ময়লা, ধুলিকশা মুক্ত করে এবং তা জলে ধুয়ে যায়। তবে ঘষা, আঘাত করা এবং নাড়াচারা করায় ময়লাকে আলগা করতে সাহায্য করে।
৪৬। সৰন জলে ফুঁ দিলে বুদবুদ তৈরী হয় কিন্তু সাধারণ জলে হয় না কেন?
সাধারণ জালের পৃষ্ঠটান (Surface tension) খুব বেশী থাকার জন্য সরু পাইপের সাহায্যে জলে বায়ু প্রবেশ করিয়ে বুদবুদ তৈরী করা যায় না কিন্তু জলে সাবান বা ডিডারজেন্ট মিশ্রিত করলে (ওর মধ্যে থাকা সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড) স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরী হয় যা মধ্যে সারফেস ট্যান্ট (Surfacetants) থাকায় জলের পৃষ্ঠটান কমিয়ে দেয় ফলে বুদবুদ তৈরী হয়ে থাকে।
৪৭। সিমেন্ট কি দিয়ে তৈরী হয়?
তিনভাগ চুনাপাথর ও একভাগ খনিজ কদম (ক্যালসিয়াম সিলিকেট, অ্যালুমিনেট, সামান্য লোহা) মিশিয়ে অতি উত্তপ্ত চুল্লীতে পাঠানো হয়, সেখানে প্রায় 1500° উষ্ণতায় কঠিন বস্তুতে পরিণত হয়, ঠান্ডা হলে ঐ কঠিন বস্তুকে মিহি পাউডারে পরিণত করে তার সাথে তিনভাগের মত জিপসাম মেশান হয়। এই মিশ্রণই সিমেন্ট। এর সাথে সামান্য ক্যালসিয়াম সালফেট মিশানো হয় যাতে সিমেন্ট জমাট বেঁধে না যায় তারজন্য।
৪৮। সুগন্ধি ব্যবহার কতটা ক্ষতিকর?
কতকগুলি প্রাকৃতিক/খনিজ রাসায়নিক পদার্থ এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহে সংগৃহীত পদার্থের মিশ্রণে সুগন্ধি তৈরী হয়। আমরা প্রতিদিন যেসকল প্রসাধনী যেমন টুথপেস্ট, সাবান, তেল, ডিটারজেন্ট, ক্রীম, মশা তাড়ানোর ম্যাট বা কয়েল, দেহের গন্ধ দূর করতে স্প্রে বা ক্রিম এছাড়া শিশুদের ব্যবহৃত পেন্সিল, পেন, কালি, রাবার ইত্যাদি প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই কম বেশী গম্ব মিশ্রিত থাকে তা শুধু আমাদের আকৃষ্ট করে না ওই সকল পদার্থের ব্যবহৃত রাসায়নিকের দুর্গন্ধ দূর করতে ব্যবহার করা হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে সংগৃহীত তেলের দাম অনেক তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃত্রিম জৈবরাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয়। এদের মধ্যে অ্যালকোহল, ইথানল, বেঞ্জিন, কিটোন অ্যালডিহাইড ইত্যাদির যৌগ। প্লাস্টিক নরম ও দ্রবীভূত করতে ও পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ থ্যালেট যৌগ ব্যবহৃত হয়। এই সকল পদার্থ দীর্ঘদিন ব্যবহারে শরীরের মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় জানা গিয়েছে যারা বেশী প্রসাধনী ব্যবহার করেন তাঁদের ছেলেদের যৌনাঙ্গের ত্রুটি দেখা যায় এবং হরমোন ক্ষরণ কমিয়ে দিয়ে বিভিন্ন প্রকার সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাদের মধ্যে সিগারেট যিনি খান তার ফল পাশের লোকজনও ভোগ করেন তেমনি প্রসাধনী যিনি ব্যবহার করেন তার নিকটের লোকও ভোগ করেন তথা পরিবেশ দুষণ হয়ে থাকে।
৪৯। সেলোফেন কি?
একপ্রকার বিশেষ ধরনের পাতলা ও স্বচ্ছ কাগজকেই বুঝে থাকি। তুলোর আঁশকে ক্ষারীয় করে তার সাথে কার্বনডাই অক্সাইড, অ্যামোনিয়াম সালফেট ও সালফিউরিক অ্যাসিড মিশ্রিত করে যে পদার্থ তৈরী হয় তা থেকে সালফার মুক্ত করে গ্লিসারল যুক্ত করলেই সুন্দর ও নমনীয় হয় তার সাথে মোম, রজন মিশিয়ে তৈরী হয় সেলোফেন। প্যাকেটের স্বচ্ছ চক্চকে মোড়ক হিসাবে যা ব্যবহার করা হয়।
৫০। সেনাকে গাঢ় নাইট্রিক অ্যাসিড বা গাঢ় হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড দ্রবীভূত করতেপারে না কেন?
দুটি অ্যাসিডের কোনটিই এককভাবে সোনাকে জারিত করতে পারে না কারণ কেউই প্রচুর পরিমাণে ক্লোরাইড বা নাইট্রেট আয়ন উৎপন্ন করতে পারে না যা সোনার সাথে বিক্রিয়া করে সোনার স্থায়ী লকা উৎপন্ন করবে। কিন্তু তিন অয়তন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও এক আয়তন নাইট্রিক অ্যাসিড মিশ্রিত করলে নাইট্রোসিল ক্লোরাইড ও জারমান ক্লোরিন উৎপন্ন হয় ওই ক্লোরিন সোনার সাথে বিক্রিয়া করে দ্রাব্য যৌগ গঠন করে।
৫১। সোনা এত মূল্যবান কেন এর ব্যবহার কি?
সোনা মূল্যবান হওয়ার কারণ প্রধানত এর সৌন্দর্য অর্থাৎ চকচকে উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ, প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। কিছু ধাতু টেলিরিয়াম, সোলিনিয়াম ইত্যাদির সাথে মিশ্র অবস্থায়ও পাওয়া যায়। অন্য ধাতুর তুলনায় কম পাওয়া যায়, প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তনে তেমন পরিবর্তিত হয় না।
গহনা, মূর্তি ও মুদ্রা তৈরী হয়। এছাড়া ইলেকট্রনিক শিল্পে প্রিন্টেড সার্কিট, সেমিকন্ডাকটর, দাঁতের ক্ষত ভর্তি করতে, রুবি গ্লাস তৈরীতে, কাঁচ ও চীনামাটির শিল্পে কারুকার্য করতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সোনার পাত ইনফারেড বিকিরণকে প্রতিফলিত করতে পারে। প্রায় 98% এর পাত তাই মহাকাশযানের ও মহাকাশ যাত্রীদের পোষাক তৈরীতে ব্যবহার হয়ে থাকে যা গরম হওয়াকে রোধ করে। অন্য ধাতুর উপর আস্তরণ এবং আয়ুর্বেদিক ঔষধেও ব্যবহার হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিনিময় মূল্য দিতে সোনার ব্যবহার হচ্ছে। কিমিয়াবিদেরা পরশ পাথর তৈরীর বহু চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তৈরী করা সম্ভব হয়নি তবে আজকাল সাইক্লোট্রন যন্ত্রের সাহায্যে অন্য ধাতুকে সোনায় পরিণত করা সম্ভব।
৫২। সেপস্টোন কি?
ইহা একপ্রকার নরম পাথর এই পাথর। এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা গঠিত যার নাম ম্যাগনেসিয়াম সিলিকেট, এর অণুতে ফটিক জল থাকে, উত্তপ্ত করলে শক্ত হয় এবং চূর্ণ করলে তাকে ট্যাল্ক বলে। টয়লেট পাউডারের সাথে ট্যাল্ক মেশানো হয়।