মাতঙ্গিনী হাজরা

   বিপ্লবী শহিদ মাতঙ্গিনী হাজরা জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে। মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত তমলুক থানার হোগলা গ্রামে। তাঁর পিতার ঠাকুরদাস মাইতি ছিলেন এক দরিদ্র কৃষক। ফ‍্যাঁকটার আলিনান গ্রামের ত্রিলোচন হাজরার সঙ্গে অল্প বয়সেই বিবাহ হয় মাতঙ্গিনীর।কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর স্বামীর মৃত্যু ঘটে। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বিধবা হন মাতঙ্গিনী। তিনি নিরক্ষর ও নিঃসন্তান ছিলেন। কিন্তু সুগভীর দেশপ্রেম ছিল তাঁর অন্তরে।

   গ্রামের এই গৃহস্থ বিধবা অতঃপর আত্মনিয়োগ করেন সমাজকল্যাণের কাজে। ইতিমধ্যে আসে গান্ধিজির আহ্বান। নিজ হাতে চরকা কাটতে শুরু করেন মাতঙ্গিনী। বিপ্লবীদের আশ্রয় হয় এই স্বেচ্ছাসেবিকা জননীর গৃহে।

   মাতঙ্গিনী আইন-অমান্য আন্দোলন ও লবণ আইন সত্যাগ্রহে যোগ দেন ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারি। এ-সময়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

   আবার, তমলুকে ইংরেজ গভর্নরের দরবারকালে মাতঙ্গিনী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়ে একটি শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। কালো পতাকা দেখিয়ে শ্লোগান দেন মাতঙ্গিনী―‘গভর্নর, ফিরে যাও।’ পুলিশবাহিনী তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করেন।ছ-মাস সশ্রম কারাদণ্ড হয় মাতঙ্গিনীর।

   জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মাতঙ্গিনী চৌকিদারী ট‍্যাক্স বন্ধের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। এ কারণে ইংরেজ সরকার আবার মাতঙ্গিনীকে কারারুদ্ধ করেন। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত তমলুক মহাকুমার কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করেন মাতঙ্গিনী হাজরা।

   দীর্ঘদিন ধরে সেবামূলক কাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন মাতঙ্গিনী। আশপাশের গ্রামে কলেরা, বসন্তে মাতঙ্গিনীর দিবারাত্র সেবা সকলকে বিস্মিত করে।

   এই সেবাব্রতী, দয়ালু, মমতাময়ীকে এজন্য সকলে শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘গান্ধিবুড়ি’ বলে স্মরণ করত।

   ১৯৪২-এর আগস্ট মাসে সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে শুরু হয় ‘আগস্ট আন্দোলন’। জাতীয় কংগ্রেসের আহ্বানে সকলের মুখে তখন এক দাবি― ‘ইংরেজ, ভারত ছাড়।’ মেদিনীপুরের তমলুক মহাকুমাতেও এই আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠে।

   অসংখ্য বিপ্লব-কর্মী তমলুক থানা দখল করতে এগিয়ে আসেন। শুরু হয় পুলিশের গুলিবর্ষণ। ব্রিটিশ পুলিশবাহিনীর মারমুখী আক্রমণে মাতঙ্গিনীর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী কর্মিগণ ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করে। সে-সময়ে মাতঙ্গিনী হাজরা একাই জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে সর্বাগ্ৰে এগিয়ে এসে সহযাত্রী বিপ্লবীদের উৎসাহিত করতে থাকেন। পুলিশের গুলি এসে লাগে মাতঙ্গিনীর দুই বাহুতে। কপালে। জাতীয় পতাকাটি বুকে জড়িয়ে বৃদ্ধ জননী লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। তাঁর কণ্ঠে শেষ উচ্চারিত হয় ‘বন্দেমাতরম্’ ধ্বনি। দিনটা ছিল ১৯৪২-এর ২৯শে সেপ্টেম্বর।