বাঘাযতীন

  বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ৮ই ডিসেম্বর। মাত্র ৫ বছর বয়সে তাঁর পিতা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।

   প্রথমাবধি যতীন শরীর গঠনে বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। সে জন্য তিনি নিয়মিত দেহচর্চা, খেলাধুলা, ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার কাটা, বন্দুক ছোঁড়া ইত্যাদি অনুশীলন করতেন। আসলে বিদেশি শাসকদের সঙ্গে সংগ্রামের জন্য নিজেকে সমস্ত দিক দিয়েই প্রস্তুত করে তুলেছিলেন যতীন।

   ১৮৯৮-তে তিনি এনট্রান্স পাশ করেন। তারপর কলকাতায় সেন্ট্রাল কলেজে এফ.এ.-তে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্ষেত্র গুহর আখড়ায় নাম লিখিয়ে নিয়মিত চলতে থাকে দেহ-গঠনের অনুশীলন।পড়তে-পড়তে শর্টহ্যান্ড শেখাও চলতে থাকে। সেই সূত্রে তিনি একটি চাকরীও পেয়ে যান। বিহারের মজঃফরপুরে। পরে সেখান থেকে তিনি বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে চাকরী নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়।

  ১৯০১-২ থেকেই অত্যাচারী, দুর্বিনীত ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে দেশের তরুণ-সম্প্রদায়, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন শুরু করে। তাতে যোগ দেন যতীন্দ্রনাথ। লর্ড কার্জনের বাংলাকে ভাগ করার ষড়যন্ত্রকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তখন শুরু হয়েছে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫)।পরাধীন ভারতবাসীর উপর তখন বিদেশি শাসকদের অত্যাচার চরমে পৌঁছেছিল।

   একবার দার্জিলিং-এ যাবার সময় ট্রেনের মধ্যে তার প্রতি অকারণ দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে চারজন গোরা সৈন্যকে তিনি একাই উত্তমমধ্যম দেন। দোকানদারদের প্রতি সেনাবাহিনীর জুলুমবাজির বিরুদ্ধেও ইংরেজ সেনার নাকে ঘুষি মেরে তাকে ধরাশায়ী করেছিলেন অসম সাহসী যতীন।শরীরে ছিল তার অসম্ভব শক্তি। তাই বাঘে আক্রান্ত যতীন ভোজালির সাহায্যে বাঘকে হত্যা করেছিলেন। সেই থেকেই যতীন মুখার্জী ‘বাঘাযতীন’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

   তাঁর নির্দেশেই ভয়ংকর অত্যাচারী সি.আই.ডি. সামসুল আলমকে হত্যা (১৯১০-এর ২০শে জানুয়ারি) করেন বিপ্লবী বীরেন্দ্র দত্তগুপ্ত। কিন্তু তাঁরা সকলেই ধরা পড়েন। এই ‘হাওড়া ষড়যন্ত্র’ মামলায় কারারুদ্ধ হন তিনি। অমানুষিক নির্যাতন চলে তাঁর উপর।

   কারামুক্তির পর ১৯১৫-তে যতীনের নেতৃত্বে ইংরেজ- কর্তাদের বিরুদ্ধে দেশজোড়া সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। সে-সময়ের এক নির্মম, নিষ্ঠুর অত্যাচারী পুলিশ-কমিশনার ছিলেন চার্লস টেগার্ট। তার দলবলের সঙ্গেই বালেশ্বরের বুড়ি বালামের তীরে সম্মুখ সংগ্রামে নামেন যতীন। প্রথম দিনের যুদ্ধে টেগার্ট পিছু হটলেও, দ্বিতীয় দিনে (১৯১৫-র ১০ই সেপ্টম্বর) টেগার্টৈর গুলিতে প্রাণ হারান দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিবেদিত-প্রাণ, নির্ভীক সৈনিক বাঘাযতীন।