বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জন্ম ১৮৮৫-র ২৫শে মে, বর্ধমান জেলার কালনার সুবলদহ গ্রামে। তাঁর পিতার নাম বিনোদবিহারী বসু।
মর্টন স্কুলে ও চন্দনগরের ডুপ্লে কলেজে পড়াকালে ফরাসি ভাষাতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন রাসবিহারী। এছাড়াও ১০-১২ টি ভাষায় বিশেষ দক্ষ ছিলেন তিনি। খেলাধুলা ও ব্যায়ামেও বিশেষ পটু ছিলেন রাসবিহারী।
চন্দননগরের কানাই দত্ত, মতিলাল রায়, শ্রীশচন্দ্র ঘোষ, শচীন সান্যাল, অধ্যাপক চারু রায় প্রমুখ বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে আসেন রাসবিহারী। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯০৮-এ আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলার ব্যাপারে বিপ্লবীদের ঘাঁটি মানিকতলার মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে তল্লাশির সময় ব্রিটিশ সরকার রাসবিহারীর দুখানা চিঠি উদ্ধার করেন।
বিপদ বুঝে দেরাদুনে চলে আসেন রাসবিহারী। প্রথমে তিনি এখানে শিক্ষকতার কাজ করেন। তারপর বন-বিভাগের গবেষণার চাকুরিতে যোগ দেন। তারপর সমস্ত ভারত জুড়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন।
বেনারস, দানাপুর, মিরাট, জব্বলপুর, লাহোর, দিল্লি প্রভৃতি স্থানের সমস্ত সৈন্যশিবিরে একই দিনে একই সময়ে একসঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা স্থির হয়। দিনটাকে (১৯০৫-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি) চিহ্নিত করা হয় ‘জাতীয় অভ্যুত্থান’ দিবস হিসেবে। এদিকে ১৯১৫-এর ২৩শে মার্চ রাসবিহারীর অনুগামী বিপ্লবী বিষ্ণু পিংলে ১০টি বোমা সহ মিরাটে ধরা পড়েন। শুরু হয় বিরাট লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। চল্লিশ জনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। আর দ্বীপান্তর হয় সাতাশ জনের।
দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা ও লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় রাসবিহারীর অসংখ্য সহযোগীর প্রাণদন্ড ও দ্বীপান্তর হাওয়ায় ভেঙে পড়েন তিনি। এই বিরাট ‘জাতীয় অভ্যুত্থান’-এর পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের কারণে ব্রিটিশ সরকার রাসবিহারীকে গ্রেপ্তার করার জন্য সে সময়েই এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
বিদেশ থেকে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্যের আশায় রাসবিহারী ১৯১৫-র ১২ই মে বিদেশযাত্রা করেন। জাপানের প্রভাবশালী প্রসিদ্ধ দার্শনিক পণ্ডিত মিৎসুয়ো তোয়ামার গুপ্তদল ‘ব্ল্যাক ড্রাগন সমিতি’-তে বক্তৃতা দিয়ে সেখানকার সভাসদগণকে মুগ্ধ করেন রাসবিহারী। জাপানেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ।’ ১৯৩৯-এ শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন প্রবাসী ভারতীয়দের সহায়তায় তিনি গঠন করেন ‘আজাদ্ হিন্দ বাহিনী’। জার্মান ঘুরে জাপানে এলে তরুণ সুভাষ সুভাষচন্দ্র কে প্রবীণ বিপ্লবী রাসবিহারী তাঁর আজাদ্ হিন্দ ফৌজের যাবতীয় দায়িত্ব ভার অর্পণ করেন।
স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণ, দেশত্যাগী রাসবিহারী বসুর মতো বিপ্লবী বাংলাদেশ কমই জন্মেছে। ১৯৪৫-এর ২১শে জানুয়ারি এই মহাবিপ্লবীর মৃত্যু ঘটে।