সূর্য সেন

    স্বাধীনতা সংগ্রামের আর এক দুঃসাহসী যোদ্ধার নাম সূর্য সেন। তাঁর জন্ম চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায়। ১৮৯৩-এর অক্টোবরে। তাঁর পিতার নাম রমণীরঞ্জন সেন। মাতা শশিবালা সেন।

   ১৯১৮-তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পাস করেন সূর্য সেন। বিশেষ মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল।

   জাতীয় বিদ্যালয়ে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। স্বভাব-মাধুর্যে ও চারিত্রিক দৃঢ়তায় অল্পদিনেই সকলের কাছে বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। তিনি উমাতারা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময় ‘মাস্টার-দা’ নামে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।

   সূর্য সেন ১৯২০-তে গান্ধীজির আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। যুবকদের সংগঠনের কাজে বিশেষ মনোযোগী হয়ে ওঠেন। পরে তিনি যোগ দেন সশস্ত্র বিপ্লবী দলে।

   তাঁরই নির্দেশে ১৯২৩-এর ২৩শে ডিসেম্বর দিবালোকে প্রকাশ্য রাস্তায় রেলওয়ে কর্মচারীদের জন্য নিয়ে যাওয়া বেতন বাবদ ১৭ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয়। তাতে শেষপর্যন্ত ধরা পড়েন সূর্য সেন। কিন্তু প্রমাণের অভাবে ছাড়াও পান তিনি।

   ১৯২৪-এ টেগার্ট হত্যা প্রচেষ্টার কারণে কলকাতায়  বন্দী হন সূর্য সেন। তারপর ১৯২৮-এ তিনি মুক্তি পান। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে সূর্য সেন ছাত্রদের নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ গঠন করেন। ১৯২৯-এ  চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন সূর্য সেন।

   চট্টগ্রামে গোপন বিপ্লবী দল সংগঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩০-এর ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও ২২শে এপ্রিল জালালবাদের কালারপোলের খণ্ডযুদ্ধে তাঁর ও তাঁর অনুগামীদের আত্মত্যাগ, রণকৌশল ভারতবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

   চট্টগ্রামে মাস্টারদার (সূর্য সেন) দলই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ইউনিফর্ম পরে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহর ৪৮ ঘণ্টার জন্য ইংরেজ শাসনমুক্ত ও স্বাধীন ছিল। এই প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে অসম্ভব ভালোবাসাও পেয়েছিলেন তিনি। ফলে ব্রিটিশ সরকার দীর্ঘ চার বছর ধরে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষদের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েও গোটা চট্টগ্রাম জেলায় মাস্টারদার বিরোধী জনমত তৈরী করতে পারেননি। সেখানকার অসংখ্য মানুষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু তাদের একজনের কাছ থেকেও মাস্টারদার বিরুদ্ধে কোনোরকম স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারেননি তারা।

   অথচ এই মানুষটাকেই ১৯৩৩-এর ১৬ই ফেব্রুয়ারি তাঁর এক জ্ঞাতিভ্রাতার (নেত্র সেন) বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়তে হয়। ১৯৩৪-এর ১২ই জানুয়ারি তাঁর ফাঁসি হয়।