প্রফুল্ল চাকী

   বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর জন্ম ১৮৮৮-র ডিসেম্বর মাসে, বগুড়া জেলার বিহার গ্রামে। তাঁর পিতার নাম রাজনারায়ণ চাকী।

   রংপুর জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন প্রফুল্ল। ছাত্রাবস্থাতেই রংপুর গুপ্ত সমিতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি।এ কারণে স্কুল থেকে বিতাড়িত হতে হয় তাঁকে।

   ১৯০৩-এ ‘বান্ধব সমিতি’ বিপ্লবী দলে যোগ দেন তিনি। স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে রংপুরে প্রথম জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তিনি সেখানে ছাত্রদের লাঠিখেলা ও মুষ্টিযুদ্ধ শেখান। ছাত্রদের সৈন্যদলের মতোই সুসংগঠিত করে তোলেন প্রফুল্ল চাকী।

   ১৯০৬-এ বিপ্লবী বারীন ঘোষ রংপুরে এসে প্রফুল্ল চাকীকে নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। বিপ্লবী বারীন ঘোষের সুযোগ্য শিষ্যে প্রফুল্ল চাকীর উপর ভার পড়ে  পূর্ববঙ্গের গভর্নর অত্যাচারী মিঃ ফুলারকে হত্যা করার। অসম সাহসী বীর, রংপুর রেলস্টেশনে ফুলারকে হত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। এরপর এনড্রুফেজারকে হত্যার জন্যও পাঠানো হয়েছিল প্রফুল্ল চাকীকে।

   ভয়ংকর অত্যাচারী শাসক কিংসফোর্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব আসে প্রফুল্ল চাকীর উপরে।সেই হত্যার পরিকল্পনা নিয়েই মজঃফরপুরে চলে আসেন প্রফুল্ল।তাঁর সঙ্গী ছিলেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম। মজঃফরপুর এক ধর্মশালায় এসে ওঠেন দু-জনে। উভয়েরই ছদ্মবেশ। পোশাকে। নামেও। প্রফুল্ল চাকী হলেন দীনেশ রায়।   আর ক্ষুদিরাম দুর্গাদাস সেন।

   সেদিনটা ছিল ১৯০৮-এর ৩০শে এপ্রিল। ক্লাবহাউস থেকে যথাসময়ে ফিরছে অত্যাচারী কিংসফোর্ড! তার সাদা ফিটন গাড়িটি চড়ে। তৎক্ষণাৎ সেই গাড়ি লক্ষ করে দুর্গাদাস  নিক্ষেপ করলেন হাত-বোমা। অব্যর্থ লক্ষ্য। কিন্তু উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল না। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন সে গাড়িতে কিংসফোর্ডের পরিবর্তে ছিলেন দুই বিদেশিনী।

   অতঃপর দু-জনে ছুটলেন দু-দিকে। দুর্গাদাস সমস্তিপুরের দিকে। আর মোকামঘাট স্টেশনের দিকে  দীনেশ। সারারাত ধরে হেঁটে এসে ট্রেনে উঠলেন দীনেশ। ট্রেনের মধ্যেই এক সরকারি উকিলের নাতির সঙ্গে তাঁর  আলাপ হল। নাম তার নন্দলাল। দারোগা নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। পরাধীন ভারতবর্ষের সেই কুখ্যাত বাঙালি নন্দলালের চরম বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়লেন দীনেশ।

   কিন্তু বিদেশি শাসক নন; তিনি নিজেই নিজের পরিত্রাতা। পরাধীন দেশের স্বাধীন কিশোর তাই স্বেচ্ছামৃত‍্যু বরণ করলেন। পকেট থেকে বার করলেন সর্বক্ষণের সঙ্গীটিকে। নিজের কন্ঠে লাগিয়ে দিলেন নিজেরই রিভলভারের নল। ট্রিগারে চাপ দিলেন। বন্দেমাতরম্। সব শেষ। দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত(১৯০৮-এর ১লা মে) তাজাপ্রাণ প্রফুল্ল চাকী অমর হয়ে রইলেন দেশবাসীর অন্তরে।