চিত্তরঞ্জন দাশ

   চিত্তরঞ্জন দাশের জন্ম কলকাতার পটলডাঙায় ১৮৭০-এর ৫ই নভেম্বর।পিতা ভুবনমোহন।মাতা নিস্তারিণী দেবী।১৮৮৬-তে এনট্রান্স পাশ করেন তিনি।১৮৯০-এ প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ.পাশ করে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য বিলেত যান।সেখানে এক প্রতিবাদ সভায় ইংরেজনীতির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন।ফলে তিনি আই.সি.এস.পরীক্ষায় বসার অনুমতি পান না।পরিবর্তে ব‍্যারিস্টার হয়ে (১৮৯৩) দেশে ফিরে বিচারের কাজে মনোনিবেশ করেন।

   সূচনা থেকেই তিনি ‘অনুশীলন’ বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন(১৯০৩)। যুক্ত ছিলেন(১৯০৬) অরবিন্দ ঘোষ ও তাঁর ‘বন্দেমাতারাম’ পত্রিকার সঙ্গেও।১৯০৮- এ আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় আসামী পক্ষের উকিল হিসেবে অরবিন্দ ঘোষকে মুক্ত করে (১৯০৯) প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন চিত্তরঞ্জন।

   ১৯০৬-এ কলকাতা কংগ্রেসের প্রতিনিধি ও ১৯১৭-তে  বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাজনৈতিক সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। নৃশংস জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সক্রিয় আন্দোলনে নামেন চিত্তরঞ্জন।গান্ধীজীর ডাকে সে-সময়ে সহজেই সহস্রটাকা মাসিক উপার্জনের ব্যারিস্টারি পেশা ত্যাগ করে দেশসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি।দেশবাসীর চোখে চিত্তরঞ্জন হয়ে ওঠেন ‘দেশবন্ধু’।

   ১৯২১-এ ‌আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছ’মাস কারাবরণ করেন তিনি। কারারুদ্ধ হন তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী ও বোন ঊর্মিলাও।   

   এরপর ১৯২২-এ তিনি গয়ায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। কিছুদিনের মধ্যেই   কংগ্রেসের সভাপতিত্ব ত্যাগ করে ‘স্বরাজ্য দল’ গঠন করেন।১৯২৩-এর নির্বাচনে তাঁর দল চূড়ান্ত সাফল্য  পায়।১৯২৪-এ তিনি তারকেশ্বরের মোহান্তের নানা অনাচারের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন।

   নির্বাচনে জিতে প্রথম কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত (১৯২৪) হন তিনি। চাকুরীক্ষেত্রে মুসলমানদের  ‌অধিকহারে চাকরীদান নীতি তিনিই  প্রথম গ্রহণ করেন।তাঁর দানশীলতা ছিল বিস্ময়কর।কত মানুষকে কত অর্থ দিয়ে যে তিনি সাহায্য করেছেন তা বলে শেষ করার নয়।

   দেশসেবার পাশাপাশি দেশবন্ধু সাহিত্য-চর্চাও করেছেন। সে-সময়ের বিখ্যাত ‘নারায়ণ’ পত্রিকাটির     প্রতিষ্ঠাতা তিনিই। তাঁর রচিত ‘মালঞ্চ’, ‘সাগরসঙ্গীত’ ‘অন্তর্যামী’ গ্ৰন্থত্রয়ী  সেকালে বিশেষ খ্যাতি পেয়েছিল।তাঁর লেখা ‘ডালিম’ গল্পটি ১৯২৪-এ নাট্যরূপে পরিবেশিত হয় মিনার্ভা রঙ্গমঞ্চে।

    মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর পৈতৃক বসতবাড়িটি জনসাধারণকেরণকে দান করে যান।এখন সেখানেই  ‌ ‌‘চিত্তরঞ্জনরঞ্জন সেবাসদন’প্রতিষ্ঠিত।

    এই মহান মানুষটির মৃত্যু হয় ১৯২৫-এর ১৬ ই জুন।রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে লিখেছেনঃ

 ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ

  মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’।