যদি সাবানে লেখো নাম!

সাবানে কোম্পানির নাম খোদাই করা থাকে। সামনের লেডিজ হোস্টেলের ম্যামেরা সে সাবান কিনে যায়। গোপাল মুদির ছেলে পানুর তাতে লাভটা কী? চল্লিশ টাকার সাবান বিয়াল্লিশ টাকায় বেচলে দুটাকা লাভ হয়, সবাই জানে। সে তো কালু ময়রাও মিষ্টি বেচে পায়। তাতে আর আলাদা ক্রেডিট কোথায়!!!!!  
বস্তি ঘেঁষা এদিকের অন্য কোনও দোকানে না এলেও ম্যামেরা শুধু পানুর দোকানেই আসে। পানু খুব চিন্তা ভাবনা করেই, শুধুই ম্যামেদের জন্য স্টকে রাখে বহুমূল্য সাবান।
আর সাবান নিয়ে পানুর চিন্তা ভাবনা একটু অন্যরকমই। সে চায় তার নাম খোদাই হোক সুন্দর, রঙিন বহুমূল্য সাবানগুলিতে। তার ‘নাম’ ওই সুন্দরীদের ‘সজল’ শরীরে ‘মাখামাখি’ হোক!!
পানুর বন্ধু কাবুল সব শুনে হা হা করে হাসে। বলে, তোর নাম লেখা সাবান ওই মেয়েছেলেগুলো শুধু ওইখানেই ( হাত ঘুরিয়ে স্তন বোঝায়) মাখবে কী করে বুঝলি? বড় বাইরে করে হাত ধুলে গন্ধ সহ্য করতে পারবে তোর নাম বেচারা?
নিরুৎসাহ না হয়ে পানু বলে, জীবনে সুগন্ধ, দুর্গন্ধ দুটোই আছে। তুই শুধু আলাদা করে ওদের শরীরের একটা পার্টসের কথা ভাবছিস। আমি তো পুরোটাই দেখতে পাচ্ছি।
-    অ্যাঁ? মানে?’ কাবুল ঘাবড়ে যায়।
বলে, তোর জেল হাজত হবে পানু বলে দিলাম। অশ্লীলতার দায়ে। তুই ব্যাটা সাবান হয়ে ওদের নাঙ্গা দেখবি? ইয়ার্কি হচ্ছে?
পানু আলতো হেসে বলে, দূর পাগল। আমি কিছুই দেখব না। আমার নাম দেখবে। নাম।

পানুর গার্লফ্রেন্ড মনা, বস্তিতেই থাকে। পানুর ইচ্ছে শুনে রেগে আগুন। বলল, অ। দেখে তো মনে হয় পাগল ছাগল, ব্রহ্মচারী। কিন্তু পেটে পেটে এইসব!!! সেদিন দোকান থেকে যে সাবানটা দিলে, তাতে তো দেখলাম উল্টোপিঠে তোমার নাম কেটে কেটে লেখা। বলতে ভুলে গেছি। ... ওটা তোমারই কীর্তি?
-    মেখেছো?’ পানু প্রবল উৎসাহ নিয়ে বলে।
মনা আরও রেগে গিয়ে ভেঙিয়ে বলে, অ্যাঁ – মেকেচো? ... না-আ, ওইখানে মাখিনি ... পায়ে মেখেছি।
পানু চোখ বড় বড় করে নিজের ঊরুতে চাপড় মারে, এইখানে? বা বা বা।
মনা এবার বেশ ঘাবড়ে গিয়ে বলে, যা ক্কলা। এর মাথাটা গেছে নাকি?
 
পানুর ব্লুজম ফ্রেন্ড পল্টু অবশ্য তাকে উৎসাহই দিল। বলল, বা বা ভেরি গুড। মুদির ছেলে সাবান ফ্যাকটরি করে হিন্দুস্তান লিভারকে পটকে দিবি, এর থেকে গৌরবের কিছু আছে? তোর নামেই সাবান বের করতে চাইছিস তো?
পানু রেগে গিয়ে বলে, হ্যাঁ-আ, আমার বাপের কোটি কোটি টাকা তো। ফ্যাক্টরি করবো।
-    তবে? ওদের শরীরে মাখামাখি করবি কী করে, সাবানই যদি পয়দা করতে না পারিস?
-    না-আ, এইসব সাবানের পেছন দিকে ডাই দিয়ে আলাদা করে নিজের নামটা ঢোকাবো ভাবছি।
 
রাত জেগে বাবাকে লুকিয়ে নতুন সাবানের মোড়ক সাবধানে খুলে তার পিছন দিকে পানু তার নাম খোদাই করল বেশ পরিশ্রম করেই।
আর তার পরের দিনেই তো সেই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটা ঘটল। শুনলে লোকে মনে করবে গল্পের গরু গাছে তোলা হচ্ছে, কিন্তু আদৌ তা নয়।

সকাল আটটা পনেরো টনেরো হবে। এই মাত্র সাবান কিনে নিয়ে গেল কাবেরী ম্যাম। কাবেরী ম্যামের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দোকানের চটা দেওয়ালে অদ্ভুত ভঙ্গীতে হেলান দিয়ে বসল পানু। সেই মুহুর্তে দোকানে অন্য খদ্দেরও নেই।
গোপালমুদি কী এক প্রয়োজনে বার দুই তিন ছেলেকে ডেকেছে।
পানুর সাড়া নেই।
কাবুল ফোন করেছিল, ফোন বেজে গেছে।
মনা রোজই এই সময়ে একবার ছোট্ট করে ঘুরে যায়। সে এসে পানুকে দেখে হতবাক।
পানু বসে রয়েছে চুপটি করে। মুখে কথা নেই।
তার শরীর এখানে, কিন্তু আত্মা খাঁচা ছাড়া হয়ে কাবেরী ম্যামের সঙ্গে ঠিক তক্ষুনি ঢুকে পড়ল লেডিজ মেসের বাথরুমের সাবান কেসে।!!!!!!

কাবেরি ম্যাম বিশেষ শাড়ি টাড়ি পরে না। সালোয়ার কামিজ। সালোয়ারের দড়িতে গিঁট পড়ে গেছিল। কামিজটা তুলে থুতনিতে নিয়ে অতি কষ্টে গিঁটটা খুলল। সড়াৎ করে সেটা নীচে নেমে গেল। এক পা তুলে সেটা শরীর থেকে আলাদা করে তুলে রাখল হুকে।
বাথরুমের দরজার দিকে একবার অকারনেই তাকাল কাবেরি। ওটা বন্ধই। কিন্তু তার মনে যেন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি। মনে হচ্ছে যেন দরজাটা খোলা। আর কেউ যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে ওপাশে।
হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নিজের শরীরের তাপ একবার যেন মেপে নিল কাবেরি।
ধ্যুৎ, ঠিকই তো আছে।
একটা অকারণ হাই এসে যেতে বরং এবার নিজেই বিরক্ত হলো নিজের ওপর। বিরক্ত মুখে কলটা খুলে দিল সে।
নীচে রাখা লাল টুকটুকে বালতিতে জল পড়তে শুরু করল এবার। বালতির পাশে গাঢ় নীল রঙের একটা প্লাস্টিকের টুল। তার ওপর সাবান কেসে রাখা বিখ্যাত কোম্পানীর দামী সাবান। কোম্পানির দুনিয়া কাঁপানো নামের পাশে পানুর নাম খুব কৌশলে লেখা। আর পুরো দৃশ্যটা সে দেখছে বেশ তারিয়ে তারিয়ে।
কাবেরী কামিজ খুলে ফেলতে ‘সাবানে-লেখা-পানু’ ছটফট করে উঠল। ওঃ!!! অবিশ্বাস্য টু পিসে তার স্বপ্নের খদ্দের কাবেরী ম্যাম !!
বাথরুমের বন্ধ দরজার গা ঘেঁষে বড় প্লাস্টিকের পাত্র। তাতে কাবেরী এখুনি ছেড়ে ফেলা সালোয়ার ও কামিজ ফেলল। সেখানে ডিটারজেন্টের ফেনা।
ওদিকে ঘোরা মানে পানুর নাম-লেখা সাবানের দিকে পিছন ফেরা টু পিসে কাবেরী। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে টু থেকে এক, এক থেকে জিরো। এক্কেবারে বিনা সুতোয় পানুর কাবেরী ম্যাম।
এই বার ... এই বার ... এদিকে ঘুরবে ম্যাম ... পানুর একেবারে সামনে ... চার আঙুল দূরত্ব মাত্র ...

ঠিক এই সময়ই এক ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল পানুকে নিয়ে!!
মনার আর্ত চিৎকারে লোক জুটে গেছে। পানু নাকি অজ্ঞান।
চোখে মুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলো তার। তখন অস্ফুটে পানু শুধু বলেছিল, এত সাধনা করে সাবানে লিখেছি নাম, সাবান গলে গেল ...

জ্ঞান ফিরেছে বলে দারুণ স্বস্তিতে তখন মনা। সে কিছু না বুঝেই গলা জড়িয়ে ধরল পানুর। আবেগে বিহ্বল হয়ে বলল, বাব্বা, তুমি মান্না দের ওই গানটার কথা বলছো?’ তারপর নিজের বুকে হাত দিয়ে সুর করে বলল, হৃদয়ে লিখেছি নাম, এ নাম রয়ে যাবে।