তস্কর জানে

এই প্রবচনটা সবাই জানে – পহেলা প্রহর মে সবকোঈ জাগে / দুসরা প্রহর মে ভোগী / তিসরা প্রহর মে তস্কর জাগে / চৌঠা প্রহর মে যোগী।’
রাত্রি তৃতীয় যামে পৌঁছতেই তস্কর তৈরি হয়ে নিল। এখন তার সময়।
অন্ধকার নিশুতি রাতে পুরো মহল্লা ঘুমে কাতর। দু একটা খক খক কাশির শব্দ শোনা যায়। মাঝেমধ্যে কীসের যেন খসখসে আওয়াজ। কুকুরগুলো হঠাৎ হঠাৎ ডেকে ওঠে, আবার চুপ মেরে যায়।
তস্করের হাতের জাদু দুর্দান্ত। যে কোনও তালা সে খুলে ফেলতে পারে নিমেষে। অবলীলায়, যে কোনও বাড়ির, যে কোনও ঘরে ঢুকে পড়তে পারে তস্কর। তার মুখস্ত, কোন বাড়িতে এই মুহুর্তে কে কোথায় কী ঢঙয়ে শুয়ে আছে।
নিঃশব্দে কুকুরের নজর বাঁচিয়ে পাঁচিল ডিঙোলো এক বাগানওয়ালা বাড়ির। ঘাসে নামার সময় সামান্য খসখসে আওয়াজও হলো। তস্কর মুখ তুলে সামান্য দূরে বাড়িটা দেখে কপাল চাওড়ালো প্রথমে। মনে মনে হেসেও ফেলল সে।
যাবে, যাবে। এই বাড়িতে সে আর একবার যাবে। হা হা, সে জানে ওই বাড়িতে এই মুহুর্তে কী হচ্ছে।
বাড়িটা তমাল সেনের। তমাল সেন, বেশ নামডাকওয়ালা পার্টির নেতা। সবাই ভয় ভক্তি করে।
কিন্তু সে তো তস্কর – তার কোনও ভক্তির প্রশ্নই নেই, আর ধরা না পড়লে তার ভয়ও নেই। এবাড়িতে সে হানা দিয়েছিল বইকি। এখানে সে ধরাও পড়েনি। ফলে ভয়ও নেই, কিন্তু ‘ভেতরে’র খবর সে পেয়ে গেছিল দুর্দান্ত ভাবে।
এক রাত্তিরে ঠাওর না করে সে ঢুকে পড়েছিল এ বাড়িতে। তখনও হিসেব মতো রাত্রির দ্বিতীয় যাম – সে কী জানি কেন ঝুঁকি নিয়ে আগেই বেরিয়েছিল সেদিন।
দুসরা প্রহর মে ভোগী জাগে। কিন্তু আড়াল থেকে তমাল সেনের দুর্ভোগ দেখে তার একেবারে আক্কেল গুড়ুম হয়েছিল সে রাতে।
অত বড় ডাকাবুকো পার্টির নেতা, জনগনের নেতা তমাল সেন, বউয়ের হাতে প্যাঁদানি খাচ্ছে।
মা কসম। তস্কর নিজেকেই নিজে যতবার একথা বলেছে, নিজেই নিজের মায়ের কসম খেয়েছে।
রাত দুপুরে নিশঃব্দে বউয়ের হাতে মারধোর খেয়ে শুতে গেছিল তমাল। আর চান করতে ঢুকেছিল ওর বউ। টয়লেটে ঢোকার আগে বুড়ো তমালের কম বয়সী সুন্দরী বউ রাগে গজ গজ করতে করতে বলেছিল, বুড়ো ভাম, কিচ্ছু পারে না, এদিকে শখ হয়েছিল বিয়ে করার।-- ছিঃ। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করলাম। পুরো গায়ে সাবান মাখতে হবে এখন।
একথা শুনে তস্করের কী যে মনে হলো, সে ইম্প্রেসড হয়ে গেল। সে আড়ালে অপেক্ষা করেছিল ওই সাবানটা চুরি করবে বলে।  বিভিন্ন মঞ্চে এই মিয়াবিবি কী সুন্দর পাশাপাশি বসে থাকে, গুজ গুজ ফিস ফিস করে। এখন ওদের এই দারুণ রিলেশনের পর ওই সাবানটি তার কাছে সংরক্ষণ যোগ্য বলেই মনে হয়েছিল।
তস্কর হাত দিয়ে মুখ মুছল। সাবান জমানোর ওই পিকিউলিয়ার নেশা তার হয়েছিল এই বাড়ি থেকেই।
সেই শুরু।
তারপর বাংলা সিরিয়ালের এক হার্টথ্রব হিরোইনের বাড়িতে হানা দিয়ে সে যেটা জেনেছিল, সেটা বিনোদন জগত জানে না।
প্রোডিউসার নয়, নায়ক নয়, বয়ফ্রেন্ডও নয়, ওই অসামান্য সুন্দরীর ‘আসলি বডিগার্ড’ বাড়ির মুখ্যুসুখ্যু কিন্তু ‘দমদার’ চাকরটা। ওই নচ্ছারটা ন্যাংটো হিরোইনকে যে সাবান ঘষে দেয় নিজের হাতে, সেই সাবান তস্করের দ্বিতীয় সংগ্রহ!
এরপর তিন নম্বর সাবানের কাহিনিতেই তস্কর বুঝলো, তাকে নেশায় পেয়েছে। সাবান সংগ্রহের নেশা। শুধু কারোকে কখনও বলা যাবে না, কোন সাবানের পিছনে কী ইতিহাস রয়েছে। আর সে এটা পেলই বা কী ভাবে।
সে রাত্রে তৃতীয় যামেও হাজব্যান্ড-ওয়াইফ ব্যস্ত! তস্কর সেদিন বেশ বিরক্ত ও ক্রুদ্ধও হয়েছিল।
এ আবার কী! দ্বিতীয় যামেই এসব সেরে ফেলে এতক্ষনে দুজনেরই গভীর ঘুমে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু চাপা স্বরে হলেও তাদের বেহায়া কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিল তস্কর।
সে এসব দেখতে বের হয় না। লুকিয়ে দেখার মানসিক রোগও তার নেই। শুধু মেয়েটির অপূর্ব রিনঝিনে গলার স্বর শুনে সে ভেবেছিল, একবার উঁকি মেরে দেখা যেতে পারে।
তার কাজ যে এখন হবে না বোঝাই যাচ্ছে – এরা বিছানাতে লেট নাইট পার্টি করছে। তার কৌতূহল হয়েছিল, এরা কারা, একবার দেখবে না এদের শ্রীমুখ?
উঁকি মেরেই তস্কর বুঝেছিল, কাজটা ভাল হলো না। খুবই আপত্তিকর প্রাপ্তবয়স্ক সিনেমা চলছে যেন।
তস্করের নিঃশ্বাসটা উল্টোপাল্টা হয়ে গেল। সে সামান্য উঁকি মারবে ভেবেছিল, এখন ফিনিশিং দেখার লোভ হলো তার।
আর সেটা দেখতে গিয়েই, পুরুষ মানুষ বলে কথা, তারও উত্তেজনা চড়ে গেল খামোকা। এসব সে পছন্দ করে না। কিন্তু উদোম নারী শরীর তাকে একেবারে কাবু করে দিল। পরের দুপুর পর্যন্ত যে তার কী ভাবে কেটেছে।
প্রথমে ওই বাড়ি থেকে খালি হাতে পালিয়ে নিজের ঠেকে এলো। কিন্তু অত রাতে মেয়ে শরীর আর পাবে কোথায়? সে-ই পরের দিন ওপাড়ায় গিয়ে তবেই হলো শান্তি। কেউ বিশ্বাস করবে না, এটাই তার প্রথম ওপাড়ায় যাওয়া।
যার জন্য তাকে এই কুকর্ম করতে হলো, তাকে তো মনে রাখা দরকার, নাকি?
সেই রিনঝিনে গলার রমণীর সাবানটি সে অগত্যা নিজের জিম্মায় নিয়ে নিল পরের রাত্রেই। নিজেকে কুরবানির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।

এরকম সংগ্রহ যোগ্য সাবান তস্করের অনেকগুলো জমে গেল কিছুদিনের মধ্যেই।
কিন্তু কী করবে সে এগুলো নিয়ে? তার তো তেমন বুদ্ধিমান বন্ধুবান্ধবও নেই, যে ঠিক পরামর্শটা দেবে। থানায় গেলে, নির্ঘাত হাজতে পুরে দেবে। কাগজে গেলে কেউ বিশ্বাস করবে নাকি?
এইসব সাতপাঁচ ভাবনা তার ছিল গতকাল পর্যন্তও।

ভুল করে আজ তমাল সেনের চৌহদ্দীর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সিকিউরিটি ফিকিউরিটি কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে। তস্করও কম ঘাপটি জানে নাকি। সে পাঁচিল ঘেঁষে গুড়ি মেরে বসল। সাবানের গল্প শেষ। আজ সে এসেই যখন পড়েছে, তমালের ক্যাশের ভার কিছু তো কমাবেই। উঠবে একটু পরেই।
   
গতকাল সে সাবানগুলো নিয়ে কিছুই না ভেবে এক চ্যানেলের অফিসের সামনে চলে গেছিল। আর দেখে, বাইরে পাতি এক চায়ের দোকানে বিখ্যাত সাংবাদিক হেমন্ত দত্তগুপ্ত তার এক বিদেশিনী বান্ধবীকে নিয়ে গুলতানি করছে।
তস্করের হাতে এক ময়লা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগে কয়েকটা সাবান। তস্কর মরিয়া হয়ে বোঝাতে গেল, সব সাবানই সংগ্রহ যোগ্য। কেন সংগ্রহ যোগ্য? কারন প্রতিটি সাবানেই রয়েছে কারুর না কারুর ‘পোল খোলার’ ইতিহাস। তার নিজেরও ।
কিন্তু গুছিয়ে সে কিছুই বলতে পারল না। উলটে ধান বলতে কান শুনল হেমন্তের বান্ধবী। সে ভাবল তস্কর ব্যবহৃত সাবান বিক্রি করতে এসেছে।
হেমন্তের বান্ধবী কপালে করাঘাত করে বলল, মাই গড হেমনৎ -- তোমাদের দেশে সাবানও সেকেণ্ড হ্যান্ড বিক্রি হয়?
উপস্থিত সকলে হো হো করে হেসে উঠে দেখতে লাগল তস্করের আপাদমস্তক।
আর তস্কর? তা সে বোকা বনেই গেছিল, কিন্তু ফেসবুকের গল্প বানাবে বলে দু একজন মোবাইল অন করলেও ধরা সে পড়ে নি।
হাসি ঠাট্টার মধ্যেই তস্করের মতোই চুপিসারে, সবাইকে বোকা বানিয়ে, ভ্যানিশ হয়েছিল সে।